হিজরী ৩য় শতক পর্যন্ত বিশিষ্ট মুহাদ্দিছ ও ফক্বীহগণের তালিকা
নাজমুন নাঈম
মুহাম্মাদ আব্দুন নূর 295 বার পঠিত
জ্ঞান মানবজাতির উপর আল্লাহ প্রদত্ত সর্বশেষ্ঠ নে’মত। জ্ঞানার্জন ও তার উপর আমলের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হয় মানুষের মর্যাদা। তাই ছাহাবীগণ (রাঃ), তাবেঈগণ (রহঃ) জ্ঞানার্জনের জন্য সাধানা করতেন। জ্ঞানের জন্য তীব্র কষ্ট স্বীকার করতেন, যা বর্তমান সময়ে বিলুপ্ত প্রায়। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে তাদের ত্যাগের কিছু নমুনা আলোচনার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।
কুরআন সংকলনের ইতিহাস : বর্তমানে আমাদের নিকট যেভাবে কুরআন লিখিত আছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মৃত্যুর সময় এরূপ ছিল না। তখন ছাহাবীগণের নিকট কুরআনের বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন বস্ত্ততে লিপিবদ্ধ ছিল। বহু ছাহাবীর স্মৃতিতে সম্পূর্ণ কুরআন মুখস্থ ছিল। প্রথম খলীফা আবুবকর (রাঃ)-এর সময়ে যায়েদ ইবনু হারেছার নেতৃত্বে লিখিতভাবে সম্পূর্ণ কুরআনের প্রথম পান্ডুুলিপি প্রস্ত্তত করা হয়। কপিটি আবুবকর (রাঃ)-এর সংরক্ষণে ছিল। অতঃপর ওমর (রাঃ)-এর নিকট। অতঃপর ওমর (রাঃ)-এর মৃত্যুর পর তা উম্মুল মুমিনীন হাফছা (রাঃ)-এর হেফাযতে ছিল। এরপর ওছমান (রাঃ) খলীফা হয়ে হাফছা (রাঃ)-এর নিকট রাখা কপিকে মূল কপি হিসাবে ধরে বেশ কিছু কপি তৈরী করেন এবং সেগুলিকে বিভিন্ন স্থানে বণ্টন করেন’।[1]
হাদীছ সংকলেন ইতিহাস : হাদীছ লিপিবদ্ধ করার কাজ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর অনুমতিতে তাঁর জীবদ্দশাতেই শুরু হয়েছিল। এ বিষয়ে প্রসিদ্ধ ছিলেন তরুণ ছাহাবী আব্দুুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল ‘আছ।[2] তাছাড়া মক্কা বিজয়ের দিন তিনি আবু শাহ ইয়ামানীর জন্য হাদীছ লিখে দেওয়ার নির্দেশ দেন’।[3] অতঃপর হাদীছ সংকলনের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করেন খলীফা ওমর ইবনু আব্দুল আযীয (৯৯-১০১ হি.)।
হাদীছ বিশুদ্ধভাবে একত্রীকরণ, সংরক্ষণ, সংকলন এবং পরবর্তীতে পৃথিবীতে আগন্তুক মানবজাতির কাছে তা পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্ব, ফযীলত এবং মর্যাদার বিষয়টি ছাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) সবচেয়ে বেশী বুঝেছিলেন।
কেননা আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) বিদায় হজ্বের ভাষণে ছাহাবীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন,أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي وَاللهِ لَا أَدْرِي لَعَلِّي لَا أَلْقَاكُمْ بَعْدَ يَوْمِي هَذَا بِمَكَانِي هَذَا، فَرَحِمَ اللهُ مَنْ سَمِعَ مَقَالَتِي الْيَوْمَ فَوَعَاهَا، فَرُبَّ حَامِلِ فِقْهٍ وَلَا فِقْهَ لَهُ، وَرُبَّ حَامِلِ فِقْهٍ إِلَى مَنْ هُوَ أَفْقَهُ مِنْهُ- ‘হে জনগণ! আল্লাহর কসম, আমি জানিনা আজকের পরে আর কোনদিন তোমাদের সঙ্গে এই স্থানে মিলিত হ’তে পারব কিনা। অতএব আল্লাহ রহম করুন ঐ ব্যক্তির উপরে যে ব্যক্তি আজকে আমার কথা শুনবে ও তা স্মরণ রাখবে। কেননা অনেক জ্ঞানের বাহক নিজে জ্ঞানী নয় (সে অন্যের নিকট জ্ঞান বহন করে নিয়ে যায়) এবং অনেক জ্ঞানের বাহক তার চাইতে অধিকতর জ্ঞানীর নিকটে জ্ঞান বহন করে নিয়ে যায়’।[4] তিনি বলেন, فَلْيُبَلِّغْ الشَّاهِدُ الْغَائِبَ فَرُبَّ مُبَلَّغٍ أَوْعَى مِنْ سَامِع ‘আর তোমাদের উপস্থিতগণ যেন অনুপস্থিতগণকে কথাগুলি পৌঁছে দেয়। কেননা উপস্থিত শ্রোতাদের অনেকের চাইতে অনুপস্থিত যাদের নিকট এগুলি পৌঁছানো হবে, তাদের মধ্যে অধিক জ্ঞানী ব্যক্তি থাকতে পারেন’।[5]
অন্যত্র রাসূল (ছাঃ) বলেন, بَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيَةً ‘আমার পক্ষ হ’তে (মানুষের কাছে) একটি বাক্য (আয়াত) হলেও পৌঁছে দাও’।[6]
ছাহাবায়ে কেরামের পর তাবেঈ, তাবে-তাবেঈগণ এর গুরুত্ব অনুধাবন করে এ বিষয়ে মনোনিবেশ করেন। এরপর তাদের থেকে জ্ঞানার্জনের জন্য যারা বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সফর করতেন তারাও পরবর্তীতে বড় বড় মুহাদ্দিছ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
হাদীছ সংগ্রহের পেছনে তারা একেকজন এমনভাবে সফর করেছেন যে, এই মহৎ কাজে তাদের প্রায় পুরো জীবনটাই অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে। একটি মাত্র হাদীছ সংগ্রহ করার জন্য তারা শত শত মাইল সফর করেছেন। নিম্নে তার কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হ’ল-
খোরাসান হ’তে কূফায় সফর : ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) ছালিহ আল-হামদানী (রহঃ) হ’তে বর্ণনা করেন, ইমাম শা’বীর নিকট এসে জনৈক খোরাসানী ব্যক্তিকে প্রশ্ন করতে দেখলাম। সে বলল, হে আবু আমর! আমাদের অঞ্চলে কতিপয় খোরাসানীর মতামত হ’ল, যে ব্যক্তি নিজের দাসীকে আযাদ করে দিয়ে তাকে বিয়ে করল সে যেন নিজে কুরবানীর উটের উপর সওয়ার হ’ল (অর্থাৎ তারা তা নিন্দনীয় কাজ মনে করে)। শা’বী উত্তরে বললেন, আমাকে আবূ বুরদাহ (রাঃ) তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, তিন ধরনের লোককে দ্বিগুণ ছওয়াব দান করা হবে। (তারা হ’ল) (১) যে আহলে কিতাব তার নবীর উপর ঈমান এনেছে ও পরে আমার প্রতি ঈমান এনেছে, সত্য বলে মেনে নিয়েছে এবং আমার অনুসরণ করেছে সে দ্বিগুণ ছওয়াব পাবে। (২) যে দাস আল্লাহ তা‘আলার হক আদায় করেছে এবং তার মালিকের হকও আদায় করেছে, সেও দ্বিগুণ ছওয়াব লাভ করবে। (৩) যে ব্যক্তি তার দাসীকে উত্তম খাবার দিয়েছে, উত্তমরূপে আদব-কায়দা শিখিয়েছে, তারপর তাকে আযাদ করে বিয়ে করেছে, সেও দ্বিগুণ ছওয়াবের অধিকারী হবে’।[7]
বর্ণনাকারী বলেন,ثُمَّ قَالَ الشَّعْبِيُّ لِلْخُرَاسَانِيِّ خُذْ هَذَا الْحَدِيثَ بِغَيْرِ شَىْءٍ. فَقَدْ كَانَ الرَّجُلُ يَرْحَلُ فِيمَا دُونَ هَذَا إِلَى الْمَدِينَةِ এরপর শা’বী উক্ত খোরাসানীকে বললেন, কোন বিনিময় ছাড়াই তুমি এ হাদীছ নিয়ে যাও। অথচ এর চেয়ে কম হাদীছের জন্যও এক সময় লোকেরা মদীনা পর্যন্ত সফর করত।
উল্লেখ্য যে, খ্যাতনামা তাবেঈ ইমাম শা’বী (রহঃ) ইরাকের কূফায় বসবাস করতেন। আর খোরাসান হ’ল মধ্য এশিয়ার একটি ঐতিহাসিক অঞ্চল। বর্তমান ইরানের উত্তরপূর্ব অঞ্চল, প্রায় সমগ্র আফগানিস্তান, দক্ষিণ তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান ও উজবেকিস্তানের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল খোরাসানের অন্তর্ভুক্ত বলে পরিগণিত হ’ত’।[8]
একটি হাদীছের জন্য মদীনা হ’তে দামেশক সফর : কায়েস ইবনু কাছীর (রহঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, এক ব্যক্তি মদীনা হ’তে দামেশকে (অবস্থানরত) আবুদদারদা (রাঃ)-এর নিকট এল। তিনি প্রশ্ন করলেন, ভাই! তুমি কী প্রয়োজনে এসেছ? সে বলল, একটি হাদীছের জন্য এসেছি। আমি জানতে পারলাম যে, আপনি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হ’তে সেই হাদীছ বর্ণনা করছেন। তিনি আবারো প্রশ্ন করলেন, তুমি অন্য কোন প্রয়োজনে আস নি? সে বলল, না। তিনি বললেন, তুমি কোন ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আস নি। সে বলল, না; আমি শুধুমাত্র সেই হাদীছটির খোঁজেই এসেছি। এবার তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, ইলম লাভের উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি পথ চলে আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন এবং ফেরেশতাগণ ইলম অন্বেষণকারীর সন্তুষ্টির জন্য নিজেদের ডানা বিছিয়ে দেন। অতঃপর আসমান-যমীনের সকল প্রাণী (আল্লাহ তা‘আলার নিকট) আলেমদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে, এমনকি পানির মাছসমূহও। সমস্ত নক্ষত্ররাজির উপর পূর্ণিমার চাঁদের যে প্রাধান্য, ঠিক তেমনি (মূর্খ) আবেদগণের উপর আলেমদের মর্যাদা বিদ্যমান। অবশ্যই আলেমগণ নবীদের ওয়ারিছ। আর নবীগণ উত্তরাধিকার হিসাবে কোন দীনার বা দিরহাম রেখে যাননি, বরং তারা রেখে গেছেন মীরাছ হিসাবে ইলম। সুতরাং যে ব্যক্তি ইলম লাভ করেছে, সে পূর্ণ অংশ লাভ করেছে’।[9]
উল্লেখ্য যে, প্রিয় পাঠক এই ঘটনা বর্তমান যুগের নয়, ছাহাবায়ে কেরামদের যুগের ঘটনা। সে যুগে বিমান, মাইক্রো, কার, মোটরসাইকেল বা আধুনিক যুগের যান্ত্রিক কোন দ্রুতগামী যানবাহনের ব্যবস্থা ছিলনা। বর্তমানে মদীনা থেকে দামেশকের দূরত্ব আকাশপথে প্রায় ১০৫৬ কি. মি./৬৫৬ মাইল, আর সড়কপথে ১৯০৩ কি. মি. /১১৮৩ মাইল। ভাবা যায়, একটিমাত্র হাদীছ জানার জন্য এতদূর সফর করেছেন।
মদীনা হ’তে (সিরিয়া) শাম এক মাসের সফর : জাবের ইবনু ‘আব্দুল্লাহ্ (রাঃ) একটি মাত্র হাদীছের জন্য এক মাসের পথ সফর করে ‘আব্দুল্লাহ্ ইবনু উনায়েস (রাঃ)-এর নিকট গিয়েছিলেন’।[10]
ইবনে আকীল (রহঃ) হ’তে বর্ণিত জাবের ইবনু আব্দুুল্লাহ (রাঃ) তার নিকট বর্ণনা করেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর এক ছাহাবীর বরাতে একটি হাদীছ সম্পর্কে অবহিত হন। তিনি বলেন,فَابْتَعْتُ بَعِيرًا فَشَدَدْتُ إِلَيْهِ رَحْلِي شَهْرًا، حَتَّى قَدِمْتُ الشَّامَ ‘তারপর আমি (জাবের) একটি উট ক্রয় করে তাতে আরোহণ করে এক মাসের পথ অতিক্রম করে শামে (সিরিয়ায়) গিয়ে তার নিকট উপস্থিত হই। সেই ছাহাবী ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনু উনায়েস (রাঃ)। আমি তাকে খবর পাঠালাম যে, জাবের তোমার দ্বারে অপেক্ষমান। দূত ফিরে এসে জিজ্জেস করল, আপনার নাম কি জাবের ইবনু আব্দুল্লাহ (রাঃ)? আমি বললাম, হ্যাঁ। তখন তিনি বাইরে বের হয়ে এসে আমাকে আলিঙ্গন করলেন। আমি বললাম, এমন একটি হাদীছ আমার নিকট পৌঁছেছে যা আমি ইতিপূর্বে শুনিনি। আমার আশংকা হ’ল হয়তো (হাদীছটি শোনার আগে) আমি মারা যাব অথবা আপনি মারা যাবেন।
আব্দুুল্লাহ ইবনু উনায়েস (রাঃ) বলেন, আমি নবী করীম (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তা‘আলা বান্দাগণকে বা মানবজাতিকে হাশরের মাঠে উঠাবেন বস্ত্রহীন ও সহায় সম্বলহীন অবস্থায়। আমরা বললাম, সহায় সম্বলহীন কি? তিনি বলেন, তাদের কোন সহায় সম্বল থাকবে না। তিনি তাদেরকে সশব্দে ডাকবেন, দূরবর্তীগণও তা শুনতে পাবে, যেমন শুনতে পাবে নিকটবর্তীরা ‘আমিই রাজাধিরাজ’। কোন জান্নাতবাসী জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষণ তার উপর কোন জাহান্নামবাসীর কোন দাবি অবশিষ্ট থাকবে। আর কোন জাহান্নামবাসীও জাহান্নামে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ তার উপর কোন জান্নাতবাসীর কোন দাবি অবশিষ্ট থাকবে। আমি বললাম, সে দাবি কিভাবে মিটমাট করবে, যেখানে আমরা সকলে উত্থিত হব সহায় সম্বলহীনভাবে? তিনি বলেন, নেকী এবং গোনাহ দ্বারা’।[11] জাবের ইবনু আব্দুল্লাহ (রাঃ) শুধু একটিমাত্র হাদীছ জানার জন্য একমাসের পথ সফর করেছিলেন।
ফিলিস্তীন থেকে তায়েফ সফর : ইবনু দাইলামী ছিলেন জ্ঞান অনুসন্ধানে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। একবার তাঁর কাছে আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রাঃ) থেকে একটি হাদীছের সংবাদ পৌঁছে। তখন তিনি ফিলিস্তীনে অবস্থান করছিলেন। কিন্তু কেবল খবর শুনেই তিনি থেমে থাকেননি। হাদীছটি নিজ কানে ছাহাবীর মুখ থেকে শুনতে গভীর আগ্রহ জন্মায় তার মনে। এই লক্ষ্যেই তিনি সমস্ত কষ্ট, দুর্ভোগ আর পথের দীর্ঘতা উপেক্ষা করে সফরে রওনা দেন। অবশেষে বহু দুরূহ পথ পেরিয়ে পৌঁছে যান তায়েফে। সেখানে আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রাঃ)-এর কাছে গিয়ে হাদীছটি জানতে চান। ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রাঃ) তখন নিজ মুখেই তাকে হাদীছটি শুনিয়ে দেন।[12]
দেশে দেশে সফর : ইমাম আবু হাতিম আর-রাযী (রহ) জ্ঞান অর্জনের তীব্র তৃষ্ণায় শহর থেকে শহরে, দেশ থেকে দেশে ছুটে গিয়েছেন। তিনি কূফা থেকে বাগদাদ, মক্কা থেকে মদীনা এই পথ বহুবার অতিক্রম করেছেন। তিনি বাহরাইন থেকে মিসর, তারপর মিসর থেকে রামলা, সেখান থেকে পায়ে হেঁটে পৌঁছেছেন বায়তুল মুক্বাদ্দাস। বায়তুল মুক্বাদ্দাস থেকে গেছেন আসকালানে, সেখান থেকে তিবেরিয়া, তিবেরিয়া থেকে দামেশক, দামেশক থেকে হিমস, হিমস থেকে আনতাকিয়া, আর আনতাকিয়া থেকে তারসুস। এরপর যখন জানতে পারলেন যে, আবু ইয়ামান (রহঃ)-এর একটি হাদীছ এখনো তার শোনা বাকি, তখন তিনি আবার তারসুস থেকে ফিরে এলেন হিমসে, শুধু সেই একটি হাদীছ শুনবার জন্য! হাদীছটি শুনে আবার যাত্রা করলেন হিমস থেকে বৈসান এবং সেখান থেকে রাক্কা। এই বিস্ময়কর সব সফর, এই দুরূহ পথ পাড়ি সবকিছু তিনি করেছিলেন যখন তার বয়স ছিল মাত্র বিশ বছর![13]
ইলম অর্জনে একাল : বর্তমান এই আধুনিক যুগে জ্ঞানার্জন করা এতোটাই সহজ হয়ে গিয়েছে যে, হাতের মুঠোফোনের একটি (Apps) অ্যাপসের মাধ্যমে হাযার হাযার হাদীছ অধ্যয়ন করা যায়, সম্পূর্ণ কুরআনের আরবী থেকে বঙ্গানুবাদ পাওয়া যায়। তবুও আমরা অসংখ্য মুসলমান দ্বীনের জ্ঞানার্জন হ’তে উদাসীন!! আমরা যত সহজে ইলেকট্রনিক মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে দ্বীন জানার বা শেখার সুযোগ পাচ্ছি ততটা সহজ ছিল না ছাহাবায়ে কেরাম (রাঃ), তাবেঈ, তাবে-তাবেঈগণ (রহঃ) এবং মুহাদ্দিছগণ (রহঃ) এর যুগে। একটি হাদীছ সংগ্রহের জন্য তারা যতটা সময়, অর্থ, মেধা, শ্র্রম ব্যয় করেছেন আমরা কি তা উপলব্ধি করতে পারছি? আমরা যদি কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পারি তাহ’লে, সেটাই হবে এই প্রবন্ধ লেখার স্বার্থকতা। আসুন! আমরা এই মূহুর্ত থেকেই বিশুদ্ধ জ্ঞানার্জনের জন্য
নিয়ত করি। ইনশাআল্লাহ!
স্মরণ রাখা ভালো হবে যে-
(ক) আমরা বিশুদ্ধ জ্ঞানার্জন করছি তার মানে আল্লাহ্ আমাদের কল্যাণ কামনা করছেন। মু‘আবিয়া (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ ‘আল্লাহ যার কল্যাণ কামনা করেন, তাকে দ্বীনের সঠিক জ্ঞান দান করেন’।[14]
(খ) উত্তম চরিত্র ও দ্বীনের সঠিক জ্ঞান মুনাফিকদের মধ্যে একত্র হয়না। আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,خَصْلَتَانِ لَا تَجْتَمِعَانِ فِي مُنَافِقٍ: حُسْنُ سَمْتٍ وَلَا فِقْهٌ فِي الدّين ‘মুনাফিকের মধ্যে দু’টি অভ্যাস একত্র হতে পারে না- উত্তম চরিত্র ও দ্বীনের সঠিক জ্ঞান’।[15]
(গ) জ্ঞানার্জনের জন্য নিজেকে নিয়োজিত রাখা মানে আল্লাহর পথেই থাকে। আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,مَنْ خَرَجَ فِي طَلَبِ الْعِلْمِ فَهُوَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ حَتَّى يرجع ‘যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের জন্য বের হয়েছে, সে ফিরে না আসা পর্যন্ত আল্লাহর পথেই রয়েছে’।[16] আর আল্লাহর পথে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি শহীদের মর্যাদা লাভ করে। রসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,مَنْ مَاتَ فِى سَبِيْلِ اللهِ فَهُوَ شَهِيْدٌ ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে মৃত্যুবরণ করলো সে ব্যক্তি শহীদ’।[17]
(ঘ) দ্বীনের সঠিক জ্ঞানার্জন করার জন্য মহান আল্লাহ বলেন,فَلَوْلَا نَفَرَ مِنْ كُلِّ فِرْقَةٍ مِنْهُمْ طَائِفَةٌ لِيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنْذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ ‘মুমিনদের প্রত্যেক দল থেকে একটি অংশ কেন বের হয় না যাতে তারা দ্বীন সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানার্জন করতে পারে এবং তাদের সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পারে যাতে তারা (অন্যায়, পাপকর্ম) থেকে বিরত হয়?’ (তওবাহ ৯/১২২)।
হে দয়াময় আল্লাহ, দ্বীনের সঠিক জ্ঞান প্রচারের জন্য ছাহাবায়ে কেরাম (রাঃ), তাবেঈ, তাবে-তাবেঈগণ (রহঃ), মুহাদ্দীছগণ (রহঃ), সহ সালাফে-ছালেহীনদের উত্তম প্রতিদান দান করুন এবং আমাদেরকে সঠিক দ্বীনের জ্ঞানার্জন করার তাওফীক দান করুন।-আমীন!
মুহাম্মাদ আব্দুন নূর
[কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ]
[1]. কুরতুবী ১/৪৯-৫০; বুখারী, মিশকাত হা/২২২১।
[2]. আবুদাঊদ হা/৩৬৪৬।
[3]. আবুদাঊদ হা/৩৬৪৯।
[4]. দারেমী হা/২৩৩, সনদ ছহীহ।
[5]. বুখারী হা/১৭৪১।
[6]. বুখারী হা/৩৪৬১।
[7]. মুসলিম হা/২৮০।
[8]. উইকিপিডিয়া।
[9]. তিরমিযী হা/২৬৮২, ইবনে মাজাহ হা/২২৩।
[10]. বুখারী হা/৭৮।
[11]. বুখারী হা/৭৮, বিস্তারিত এসেছে ইমাম বুখারী (রহঃ) এর আল-আদাবুল মুফরদ হা/৯৭৯।
[12]. খত্বীব বাগদাদী, আর-রিহলাতু ফী ত্বলাবিল হাদীছ পৃ. ৭।
[13]. আর-রিহলাতু ফী ত্বলাবিল হাদীছ পৃ. ৮।
[14]. বুখারী হা/৭৩১২।
[15]. তিরমিযী হা/২৬৪৭।
[16]. মিশকাত হা/২২০, ছহীহুত তারগীব হা/৮৮, তিরমিযী হা/২৬৪৭।
[17]. আহমাদ হা/১০৭৭২, ইবনু মাজাহ হা/২৮০৪, মিশকাত হা/৩৮১১।