খ্রিস্টান পাদ্রী সামি ফার্নান্ডেজ-এর ইসলাম গ্রহণ
তাওহীদের ডাক ডেস্ক
তাওহীদের ডাক ডেস্ক 32 বার পঠিত
[১৯৫৯ সালে জন্মগ্রহণকারী খ্রিস্টান-আমেরিকান বংশোদ্ভূত ডা. লরেন্স ব্রাউন-এর পূর্বপুরুষদের ইতিহাস ১৬৭৭ সাল পর্যন্ত প্রসারিত। ১৯৯৪ সালের এপ্রিল মাসে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। চাকরীজীবনে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের এয়ার ফোর্সে টানা আট বছর একজন সম্মানিত চক্ষু বিশেষজ্ঞ হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এয়ার ফোর্স ক্যারিয়ারের মাঝামাঝি সময়ে ডা. লরেন্স ব্রাউনের পরিবারে একজন স্ত্রী, দুই সন্তান, দু’টি গাড়ি ছিল। তাদের কান্ট্রি হাউস ছিল আধুনিক সুবিধা-সামগ্রী ও নানা রকম বিলাস সামগ্রীতে ভরপুর। যা বস্ত্তবাদে নিমগ্ন মানুষের জীবনে স্বাভাবিকভাবেই দেখা যায়। কিন্তু একসময় গভীর ধর্মীয় উপলব্ধি তাঁর জীবনকে এমনভাবে নাড়িয়ে দেয় যে, তিনি অর্জিত প্রায় সবকিছুই ত্যাগ করেন।
শিক্ষাজীবনে তিনি Cornell University College of Arts and Sciences থেকে বি.এ., Brown University Medical School থেকে এম.ডি. এবং George Washington University Hospital থেকে চক্ষুবিদ্যায় রেসিডেন্সি সম্পন্ন করেন। তিনি একজন বোর্ড সার্টিফাইড চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ, চক্ষু-সার্জন, পরামর্শক এবং বেশ কিছু বেস্ট সেলিং বইয়ের লেখক। পাশাপাশি তিনি তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের উপর একজন গবেষক, বিশ্লেষক ও আলোচক হিসাবে পরিচিত।
রচনাকর্ম : ডা. লরেন্স ব্রাউন চারটি জনপ্রিয় উপন্যাস রচনা করেছেন, 1. The Eighth Scroll (2008) 2. The First and Final Commandment (2010) 3. The Returned (2011) 4. The Zion Deception (2012). তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বে তাঁর উল্লেখযোগ্য চারটি গ্রন্থ, 1.God’ed 2. MisGod’ed 3. They Are Either Extremely Smart or Extremely Ignorant 4. Bearing True Witness. বর্তমানে তাঁর পরিবারে রয়েছেন স্ত্রী, তিন কন্যা। নিম্নে তার ইসলাম গ্রহণের কাহিনী তুলে ধরা হ’ল।]
প্রশ্ন : আপনার জীবন সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু বলুন?
ডা. লরেন্স ব্রাউন : আমি একজন চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ এবং লেখক। বর্তমানে সউদী আরবে বসবাস করছি এবং এখানেই কাজ করছি। আমি একটি কোয়েকার পরিবারে জন্মেছি। যা খ্রিস্টানদের একটি প্রোটেস্ট্যান্ট সম্প্রদায়। তবে আমার পরিবার ধর্মচর্চা করত না। আমি প্রায় ৩১ বছর আগে ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং সে কারণেই সউদী আরবে এসে বসবাস শুরু করি।
প্রশ্ন : ইসলাম গ্রহণের পূর্বে আপনার বিশ্বাস কেমন ছিল?
ডা. লরেন্স ব্রাউন : আমি মূলত নাস্তিক হিসাবে বড় হয়েছি। যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। একাডেমিক হাইস্কুল, কলেজ, মেডিকেল স্কুল, ইন্টার্নশিপ, রেসিডেন্সি সব জায়গাতেই আমার শিক্ষক, বন্ধু ও সহপাঠীদের বড় অংশ নাস্তিক ছিলেন। বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সাধারণ ধারণাই ছিল আল্লাহর অস্তিত্ব যুক্তির মাধ্যমে অস্বীকারযোগ্য। আমিও সেই প্রভাবেই নাস্তিক ছিলাম, যতক্ষণ না আমার মধ্যে একটি আধ্যাত্মিক জাগরণ ঘটে।
প্রশ্ন : কোন অভিজ্ঞতা আপনার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়?
ডা. লরেন্স ব্রাউন : আমি ডাক্তার হিসাবে সফল ছিলাম, স্বচ্ছল জীবন ছিল, সবকিছুই যেন নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু হৃদয়ের গভীরে অনুভব করতাম, জীবনে নিশ্চয়ই আরও কিছু আছে। তবে প্রকৃত ধাক্কা আসে ১৯৯০ সালের শীতকালে যখন আমার দ্বিতীয় মেয়ের জন্ম হয়। আমার মেয়ের জন্মের পর দেখলাম, মহাধমনী (aorta) গুরুতর সংকীর্ণ। তার শরীর নীল হয়ে যাচ্ছিল, যেন ধীরে ধীরে মৃত্যু হচ্ছে। একজন ডাক্তার হয়েও আমি কিছুই করতে পারছিলাম না। পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন। একজন ডাক্তার হিসাবে আমি বুঝলাম যে, এর চিকিৎসা হচ্ছে যরূরী কার্ডিও থোরাসিক সার্জারি। যাতে দীর্ঘমেয়াদী বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ওয়াশিংটন ডিসি শহরের পেডিয়াট্রিক হাসপাতালের একজন কনসালট্যান্ট কার্ডিও থোরাসিক সার্জন ডেকে আনা হ’ল।
তার আগমনের পর আমাকে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়। কারণ আমি মাত্রাতিরিক্ত আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেছিলাম। তখন ভয়ই ছিল আমার একমাত্র সঙ্গী। কনসালট্যান্ট-এর পরীক্ষার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া কোথাও যাওয়ার জায়গা না থাকায় আমি হাসপাতালে প্রার্থনা রুমে গেলাম এবং হাঁটু গেড়ে বসলাম। জীবনে প্রথমবার আমি আন্তরিকতার সাথে প্রার্থনা করলাম। একজন নাস্তিক হিসাবে আমার জীবন অতিবাহিত করে এই প্রথমবার আমি আংশিকভাবে ঈশ্বরকে স্বীকৃতি দিলাম। আমি আংশিকভাবে বলেছি। কারণ এই প্যানিকের সময়েও আমি সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাস করিনি। তাই আমি সন্দিহান প্রার্থনা করলাম, হে ঈশ্বর, তুমি যদি থাক, আমার মেয়েকে বাঁচাও। তাহ’লে আমি তোমার সবচেয়ে পসন্দের ধর্ম অনুসরণ করব।
১০-১৫ মিনিট পর আইসিইউতে ফিরে গিয়ে দেখি পরিবেশ বদলে গেছে। আমি বিস্মিত হ’লাম। কনসালট্যান্ট আমাকে বললেন যে, আমার মেয়ে ভালো হয়ে যাবে। ডাক্তাররা বললেন, ও এখন সুস্থ হয়ে যাবে। তার মূল্যায়ন সত্য হ’ল। পরবর্তী দুই দিনে মেডিসিন বা সার্জারি ছাড়াই সে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক শিশু হয়ে বেড়ে উঠেছে। সেই মুহূর্তেই আমার অন্তরে স্রষ্টার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস জন্মায়।
প্রশ্ন : এরপর আপনার মধ্যে কী পরিবর্তন আসে?
ডা. লরেন্স ব্রাউন : মেয়ের সুস্থতার পর আমার জীবনে শুরু হয় বছরের মানসিক অস্থিরতা। আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, আল্লাহ যদি পথ দেখান তবে আমি তা অনুসরণ করব। কিন্তু আমি সত্যিকারের ধর্ম খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আমি খুঁজেছি বৌদ্ধ ধর্ম, হিন্দুধর্ম। তারপর পড়তে শুরু করি বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্ট। ওল্ড টেস্টামেন্ট পড়তে গিয়ে বুঝলাম, এখানে অনেক সত্য আছে। কিন্তু একই সঙ্গে বারবার তিনজন নবীর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী আছে। তখন প্রশ্ন জাগল তৃতীয় নবী কোথায়?
প্রশ্ন : বাইবেলে পাওয়া কোন বিষয় ইসলাম সম্পর্কে আপনার আগ্রহ তৈরি করে?
ডা. লরেন্স ব্রাউন : বাইবেলের ‘প্যারাক্লিটোস’ শব্দটি আমাকে গভীরভাবে ভাবায়, যা অনেকের মতে ‘আহমাদ’ অর্থ বহন করে। অন্যদিকে ঈসা (আঃ) নিজেকে বারবার ‘মানবপুত্র’ বলেছেন, কখনও ঈশ্বরের পুত্র বলেননি। ফলে ‘ত্রিত্ববাদ’ আমি যুক্তিগতভাবে মেনে নিতে পারছিলাম না। আমি পুরোহিতদের প্রশ্ন করতাম, ‘যীশু কোথায় বলেছেন তিনি ঈশ্বরের পুত্র? তারা টেক্সট দেখাতেন, কিন্তু আমি দেখতাম এগুলো মিলছে না। এখানেই আমার মনে দৃঢ় হয়, শেষনবী অবশ্যই আছেন এবং তাকে খুঁজে পাওয়া দরকার।
প্রশ্ন : কীভাবে কুরআন ও সীরাত আপনার সামনে সত্যকে স্পষ্ট করে দেয়?
ডা. লরেন্স ব্রাউন : এক বছর পর আমার ভাই, যিনি তখন মুসলিম হয়ে গিয়েছিলেন, আমাকে কুরআনের অনুবাদ এবং সীরাতের বই পাঠালেন। বিশেষ করে মার্টিন লিংসের Muhammad : His Life Based on the Earliest Sources। এগুলো পড়ার পর মনে হ’ল জিগস পাজলের সব টুকরো একত্রে মিলতে শুরু করেছে। কুরআন, তাওহীদের ধারণা সবকিছু ওল্ড টেস্টামেন্টের ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। আমার সামনে পূর্ণাঙ্গ ছবি দাঁড়িয়ে যায়, মুহাম্মাদ (ছাঃ)-ই শেষনবী। কুরআনই চূড়ান্ত অহি। তখনই আমি ইসলাম গ্রহণ করি।
প্রশ্ন : হেদায়াত সম্পর্কে আপনার উপলব্ধি কী?
ডা. লরেন্স ব্রাউন : হেদায়াত আসে দু’টি মাধ্যমে (১) হৃদয়ের উন্মোচন (২) অহি-র সত্যকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে গ্রহণ। আল্লাহ যাকে চান তাকেই হেদায়াত দেন। আমি কুরআন পড়েছি, প্রমাণগুলি দেখেছি, বুদ্ধি দিয়ে বুঝেছি। আর হৃদয় দিয়ে সত্য গ্রহণ করেছি।
প্রশ্ন : ইসলাম গ্রহণের মুহূর্তে আপনার অনুভূতি কেমন ছিল? তখন আপনি কী অনুভব করেছিলেন?
ডা. লরেন্স ব্রাউন : আমার প্রকৃত অনুভূতি ছিল হৃদয়ে গভীর প্রশান্তি। ইসলাম গ্রহণের পর আমার চারপাশের মানুষও লক্ষ্য করেছিল যে, আমি আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরুদ্বেগ ও প্রশান্ত হয়ে গেছি। ওযূর অভিজ্ঞতাটাও আমার মনে বিশেষভাবে জায়গা করে নিয়েছিল। প্রথমবার ওযূ করতে গিয়ে অনুভব করলাম, এটা কত প্রশান্তিদায়ক, কত শান্তিময়! ওযুর সময় মানুষ যা করছে তা থামিয়ে নিজের ভিতরে তাকায় কেন আমি এটা করছি? ছালাতের আগে এই পরিশুদ্ধি যেন মন-আত্মাকে বিশেষভাবে প্রস্ত্তত করে। পুরো প্রক্রিয়াটা আমাকে প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিয়েছিল।
প্রশ্ন : ইসলাম গ্রহণের পর আপনার আশপাশের মানুষের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?
ডা. লরেন্স ব্রাউন : ইসলাম গ্রহণের পর আমার জীবনে বড় ধরনের ঝড় নেমে আসে। আমার স্ত্রী, যার সঙ্গে ১৪ বছরের সংসার ছিল, আমাকে তালাক দেন। মুসলিম হওয়ায় আদালতও আমার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। আমার স্ত্রী আদালতে ডিভোর্স চাইলে বিচারক আমাকে কোনো প্রমাণ ছাড়াই বাড়ির ১০০ ফুটের মধ্যে যেতে নিষেধাজ্ঞা দেন। আমার নিজের বাড়ি, স্ত্রী ও সন্তানদের ১০০ ফুটের মধ্যে যাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়। অদ্ভুত ব্যাপার হ’ল বিচারক আমার স্ত্রীর কাছে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি কি বিপজ্জনক? স্ত্রী বললেন, না। আমি কি কখনো তাকে মেরেছি? বললেন, না। গালাগালি করেছি? বললেন, না। শুধু সে মুসলিম হয়ে গেছে, আর আমি ‘খ্রিষ্টান’। এই কারণেই বিচারক আমার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারী করলেন। ফলে আমি এক সময় এমন অবস্থায় ছিলাম, নিজের সন্তানদের দিনে একবারও দেখতে পারতাম না। এমনকি আদালত নিয়ম করেছিল, সন্তানদের দেখতে চাইলে আমাকে একজন দেহরক্ষী ভাড়া করতে হবে, যেন সে আমার সন্তানদের আমার থেকে রক্ষা করতে পারে! একজন পিতার জন্য এর চেয়ে অপমানজনক দৃশ্য আর কী হ’তে পারে!
প্রশ্ন : ইসলাম গ্রহণের পর আপনি আর কী কী হারিয়েছেন?
ডা. লরেন্স ব্রাউন : আমি প্রায় সবকিছু হারিয়েছিলাম, স্ত্রী, সন্তান, বাড়ি, গাড়ি, সম্পদ। এমনকি আমার বাড়ির দেয়ালে থাকা প্রায় আড়াই লাখ ডলারের আর্টওয়ার্ক সবই। ডিভোর্সের পর আমার হাতে যা থাকে একটি এসইউভি এবং মাত্র ৫,০০০ ডলার। এতকিছু হারানোর পাশাপাশি হারিয়েছিলাম বহু ঘনিষ্ঠ বন্ধু, আমার মা-বাবার সঙ্গ। আমার বাবা-মা আমাকে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন, বাড়িতে এসো না, কল করোনা, চিঠি লিখো না। আমরা তোমার সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখতে চাই না’। উইল থেকেও আমাকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
প্রশ্ন : পরিবার-সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক কি কখনো স্বাভাবিক হয়েছে?
ডা. লরেন্স ব্রাউন : হ্যাঁ, আলহামদুলিল্লাহ। এটাই পুরো ঘটনার সবচেয়ে সুন্দর দিক। অনেক বছর পর, বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমার মা-বাবার মন নরম হয়। ধীরে ধীরে আমাদের সম্পর্ক আবার গড়ে ওঠে। অবশেষে, মৃত্যুর আগে দু’জনেই আলাদাভাবে শাহাদাহ গ্রহণ করেন। আমি আশা করি, আল্লাহ তাদের ঈমান কবুল করবেন।
প্রশ্ন: আপনি বর্তমানে মদীনায় থাকেন। নবী করীম (ছাঃ)-এর কোন গুণটি আপনাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে?
ডা. লরেন্স ব্রাউন : মদীনাকে ‘নবী (ছাঃ)-এর শহর’ বলে ডাকতে পারাটাই একটি বরকত, সৌভাগ্য। আর তাঁর চরিত্রের যে গুণ আমাকে সবচেয়ে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে তা হ’ল তাঁর চরিত্রের দৃঢ়তা এবং সত্যের উপর তাঁর অবিচলতা। যারা নবী করীম (ছাঃ) সম্পর্কে বলেন, তিনি নাকি ধন, নারী, নেতৃত্ব বা রাজত্ব চাইতেন। তারা একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন না। যদি তিনি সত্যিই এসব চাইতেন, তাহ’লে কুরায়েশরা তাকে রাজা বানাতে প্রস্ত্তত ছিল। সবচেয়ে ধনী বানাতে প্রস্ত্তত ছিল। সীমাহীন স্ত্রীর অনুমতি দিতে প্রস্ত্তত ছিল। শুধু একটি ব্যাপারই প্রয়োজন ছিল। তিনি যেন ইসলামের দাওয়াত ছেড়ে দেন।
কিন্তু নবী করীম (ছাঃ) এসব কিছু প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি বেছে নিয়েছিলেন কষ্টের পথ, ত্যাগের পথ, আল্লাহর বার্তা পৌঁছে দেওয়ার পথ। এটাই তাঁর সত্যের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তিনি ওহির উপর একান্তভাবে বিশ্বাস করতেন এবং নিজেকে রবের খিদমতে উৎসর্গ করেছিলেন। মানুষের পক্ষে এমন দৃঢ়তা অর্জন করা সত্যিই অসম্ভব।
প্রশ্ন : আপনি কি কখনও নবী করীম (ছাঃ)-কে স্বপ্নে দেখেছেন?
ডা. লরেন্স ব্রাউন : আপনি আমাকে সত্যিই কোণঠাসা করে ফেলেছেন। তবে জ্বী আলহামদুলিল্লাহ, আমি তাঁকে স্বপ্নে দেখেছি। এক রাতে আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সামনে দাঁড়িয়ে আছি। পরিবেশটা যেন পুরনো কোনো শহর। নবী করীম (ছাঃ) পাহাড়ের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, পাহাড়ের দিকে যাও। সেখানে মানুষের কাছে যাও। সেখানে জিহাদ আছে। আমি বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমাদের সময় তো আপনার সময়ের মতো নয়। যদি আমার কিছু হয়ে যায়, তাহ’লে আমার স্ত্রী-সন্তানদের দেখাশোনা করবে কে? নবী করীম (ছাঃ) উত্তর দিলেন, আমি তোমার স্ত্রী ও সন্তানদের দেখাশোনা করব। এ স্বপ্নের আরেকটি ঘটনা আছে।
তারপর স্বপ্নের দৃশ্য বদলে গেল। আমরা যেন একটি কাঠের দোকানের ভেতরে চলে গেলাম। কাউন্টারে বড় বড় কাচের বয়াম টফি-ক্যান্ডিতে ভরা। নবী করীম (ছাঃ) একটি ক্যান্ডিভরা বয়াম আমার এক হাতে দিলেন, আরেক হাতে আরেক বয়াম দিলেন। অতঃপর বললেন, এসব পাহাড়ের মানুষদের কাছে নিয়ে যাও। এটাই ছিল স্বপ্ন। ঘটনাটি প্রায় ১৯৯৯ সালের।
প্রশ্ন : এই স্বপ্ন আপনার জীবনে কী প্রভাব ফেলেছিল?
ডা. লরেন্স ব্রাউন : এই স্বপ্নের পর আমি সউদী আরবের চাকরীর প্রস্তাব গ্রহণ করি। দুই বছরের জন্য এসেছিলাম, আজ ২৬ বছর ধরে মদীনায় আছি আলহামদুলিল্লাহ। একদিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওহোদ পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হ’ল এটাই তো সেই পাহাড়! এটাই স্বপ্নে দেখা পাহাড়ের মানুষের শহর, মদীনা। আর এখানে থাকা, শিক্ষা দেওয়া, মানুষের উপকার করা এটাই আমার জিহাদ।
প্রশ্ন : আপনি বলেছিলেন, স্বপ্নের আরও এক ঘটনা আছে?
ডা. লরেন্স ব্রাউন : জ্বী, আশ্চর্যজনক একটি ঘটনা। আমার মেয়ে কলেজে যাওয়ার সময় আমার স্ত্রী তাকে সাহায্য করতে আমেরিকায় ছিলেন। প্রতিদিন তাকে উবারে করে কলেজে নিয়ে যাওয়া-আসা করতে হ’ত। একজন নারী ও কিশোরীর জন্য বিষয়টি খুবই কষ্টকর ছিল। এই সময়ে আমার স্ত্রী একটি স্বপ্ন দেখলেন, তিনি উবারে উঠতে যাচ্ছেন, আর ড্রাইভার দরজা খুলে দিচ্ছেন। কিন্তু সেই ড্রাইভার আর কেউ নন, নবী করীম (ছাঃ)। এর কিছুদিন পর আমার স্ত্রী আমাকে ফোন করে বললেন, তোমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। নবী করীম (ছাঃ) সত্যিই আমার ও মেয়ের দেখাশোনা করছেন। এটি তার ভয় দূর করে দিয়েছিল; তাকে শক্তি দিয়েছিল, ধৈর্য দিয়েছিল। দু’টি আলাদা স্বপ্ন অদ্ভুতভাবে একে অন্যকে পূর্ণ করল।
প্রশ্ন : একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ হিসাবে আপনি মানুষের শরীরের কোন দিককে সবচেয়ে অলৌকিক মনে করেন?
ডা. লরেন্স ব্রাউন : আমি মুসলিম হওয়ার আগেই একটি জিনিস আমাকে আধ্যাত্মিক যাত্রার দিকে ঠেলে দিয়েছিল, মৃত্যুর কাছাকাছি অভিজ্ঞতা। লন্ডনে একটি সংস্থা প্রায় ২০০০টি এমন অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করেছিল, যারা দেহ থেকে বের হয়ে নিজেদের শরীরকে উপর থেকে দেখেছিলেন, যারা বহু দূরের দৃশ্য দেখতে ও কথাবার্তা শুনতে পেরেছিলেন। এসব অভিজ্ঞতার কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই। এসব থেকে আমি বুঝলাম, আমরা শুধু দেহ নই; আমাদের মধ্যে রূহ আছে। সুতরাং মানবদেহের সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হ’ল রূহ। আর দ্বিতীয় বিস্ময় হ’ল জীবন নিজেই। নাস্তিকরা ব্যাখ্যা করতে পারে না জীবনের শুরু কোথা থেকে হ’ল? প্রথম কোষকে জীবিত করল কে? মৃত দেহে আবার প্রাণ ফেরাতে পারে কে? মানুষ সব চেষ্টা করেও পারেনি। কেবল আল্লাহই জীবন দেন এবং নেন।
[তথ্য সূত্র : ইন্টারনেট]