জীবনের বাঁকে বাঁকে

তাওহীদের ডাক ডেস্ক 33 বার পঠিত

চাকরির ইন্টারভিউ বোর্ড। কর্মকর্তার কণ্ঠস্বর দৃঢ়। তোমার সম্পর্কে কিছু বল। রায়হানুল ইসলাম এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করল। জীবনের সব সংগ্রাম যেন বুকের ভেতর একটুখানি ঢেউ তুলে গেল। সে ধীরে ধীরে মাথা তুলে বলল, স্যার! আমার নাম রায়হানুল ইসলাম। মানিকগঞ্জ যেলার হরিরামপুর উপযেলার আযীমনগর গ্রাম। বাবা একজন কৃষক। আমি ইব্রাহীমপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছি। ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ করেছি। সেখানে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে পাশ করেছি। এখন এমবিএ করছি।

কর্মকর্তা বললেন, ঢাকায় থেকেছ, বাবা কৃষক। নিশ্চয়ই টিউশনি করে খরচ চালিয়েছ? রায়হান মাথা নিচু করে বলল, না স্যার! বাবা কখনোই টিউশনি করতে দেননি। কঠোরভাবে নিষেধ করতেন। বলতেন, টিউশনি করলে সময় নষ্ট হবে। শিক্ষার সময় শুধু শিক্ষা। টাকার চিন্তা আমার। বাবা প্রতিমাসে কষ্ট করে টাকা পাঠাতেন। নিজে শত কষ্ট সহ্য করেছেন, শুধু আমাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য।

কর্মকর্তার কণ্ঠে নতুন প্রশ্ন। তোমার বাবা কতটুকু পড়াশোনা করেছেন? নিশ্চয় গ্রামে বড় জমির মালিক? রায়হান চোখ তুলে তাকাল, চোখে গর্ব আর ব্যথা একসাথে। স্যার, আমার বাবা নিরক্ষর। নিজের নামটাও ঠিকমতো লিখতে পারেন না। আর জমি, আমাদের নিজস্ব কোন জমি নেই। অন্যের জমি চাষ করেন বাবা। সেটা দিয়েই আমাদের সংসার চলে। আমার পড়ালেখার জন্য বাবা আমাদের ভিটেটুকু পর্যন্ত বন্ধক রেখেছেন। তিনি সবসময় শুধু একটি কথা বলেন, সবচেয়ে বড় সম্পদ হ’ল শিক্ষা। শিক্ষায় খাটালে লোকসান হয় না বাজান। শেষ কথাগুলো বলার সময় তার চোখ ভিজে ওঠে।

গলায় একধরনের কৌতূহল আর কঠোরতা মিলিয়ে কর্মকর্তা আবার প্রশ্ন করলেন, বাবার সাথে কখনো ক্ষেতের কাজ করেছ? প্রশ্নটা শুনে রায়হানের বুকটা হু-হু করে উঠল। তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল। বলল, না স্যার। বাবা কখনোই করতে দেননি। সবসময় বলতেন, আমি তো আছি, তুই শুধু পড়। আমার সামান্য কষ্টও বাবা সহ্য করতে পারতেন না। নিজে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, ক্ষুধা-তৃষ্ণা ভুলে পরিশ্রম করতেন। কিন্তু আমাকে এসবের বাইরে রাখতেন। শুধু যাতে আমার ভবিষ্যৎ ভালো হয়।

ঘরের ভেতর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। কর্মকর্তা রায়হানের চোখের দিকে তাকিয়ে এক নিরক্ষর বাবার আত্মত্যাগের চিত্র দেখছিলেন। তারপর বললেন, আজই গ্রামে যাবে। তোমার বাবার হাত-পায়ের ছবি তুলে আনবে। উনি দিনে কত ঘণ্টা কাজ করেন, কত টাকা আয় করেন সব লিখে আনবে। রবিবার এই সময়ে আমার কাছে উপস্থিত হবে। আর তোমার বাবাকে আমার সালাম দিবে।

সেদিনই রায়হান গ্রামে যায়। বাবা সন্ধ্যা বেলায় ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাড়ি ফেরেন। ছেলে বাবাকে পাশে বসায়। বাবা তোমার প্রতিদিন কত ঘন্টা কাজ হয়? মাসে কত টাকা আয়? ছুটি পাও? বাবা অবাক হয়ে বলেন, এত প্রশ্ন কেন করছিস! সব লিখে নেওয়ার পর রায়হান বলল, বাবা! তোমার হাত দেখি? বাবা লজ্জিতভাবে হাত বাড়ালেন। হাত দু’টোর চামড়া মোটা, সাপের গায়ের মতো শক্ত ও খসখসে। পায়ের আঙুলে পুরনো ক্ষতের দাগ। জুতা বলতে রাবারের পুরনো জীর্ণ এক জোড়া স্যান্ডেল।

রায়হান ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, বাবা, তুমি এভাবে কত কষ্ট করছ? বাবা মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, তুই যেমন বই ধরস, আমি তেমনি কোদাল ধরি বাজান। তোরা মানুষ হবি এই আশাতেই সব করি। ছেলের কান্না থামছিল না। আমি কখনো অনুভব করিনি, তুমি আমার জন্য কত কিছু সহ্য করেছ। বাবা হাসার চেষ্টা করলেন, কিন্তু চোখ থেকে গড়িয়ে পানি পড়ল। আমার কষ্ট দেখলে তোর পড়ালেখা বন্ধ হইয়া যাইত বাজান। আমি না খাইয়া থাকলে চলবে। কিন্তু তোর শিক্ষা যেন কমে না যায়। এটাই আমার একমাত্র চিন্তা ছিল।

এবার রায়হান কান্নায় বাবার কোলে ভেঙে পড়ল। বাবা! আমি কি তবে স্বার্থপর ছেলে? বাবা তাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। স্বার্থপর হইলে আমি এত কষ্ট করে তোরে মানুষ বানাইতাম বাজান? তুই আমার গর্ব, আমার স্বপ্ন, আমার সবকিছু।

রবিবার। চোখ ফুলে থাকা রায়হান অফিসে হাযির। ছবি আর নোটগুলো এগিয়ে দিয়ে বলল, স্যার! আমি আমার বাবার যোগ্য সন্তান হ’তে পারিনি। যে মানুষটা আমার জন্য রক্ত-ঘাম ঝরায়, আমি তার পাশে বসে কখনো দু’টো কথা বলিনি। কর্মকর্তা উঠে দাঁড়ালেন। তারও চোখে অশ্রু। তুমি যোগ্য বলেই বুঝতে পেরেছ, বাবার ভালবাসার মূল্য কত!

তিনি একটি খাম এগিয়ে দিয়ে বললেন, তোমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার সেদিনই ইস্যু হয়েছিল। কিন্তু তুমি যেনো বাবার ত্যাগটুকু উপলব্ধি করতে পার, সেজন্য তোমাকে গ্রামে যেতে বলেছিলাম। তার গলা ভারী হয়ে এল। বললেন, আমিও তোমার মতো দরিদ্র বাবার ছেলে। তোমার সৌভাগ্য! তুমি আজ থেকে বাবা-মায়ের দেখভাল করতে পারবে। তাদের মুখে হাসি ফুটাতে পারবে। কিন্তু আমার বাবা-মা আমার সাফল্য দেখে যেতে পারেননি।

এক চিলতে ব্যথা লুকাতে না পেরে যোগ করলেন, মনে রাখবা, বাবা-মা অন্যায় করলে সন্তান রাগ ধরে রাখে। কিন্তু সন্তান অন্যায় করলে বাবা-মা কষ্ট পেলেও কিছুই মনে রাখেন না। এই ছবি আর নোটগুলো তোমার কাছে সযত্নে রেখে দাও। কখনো বাবা-মায়ের উপর অভিমান হ’লে বের করে দেখ। তারাই তোমার জান্নাত অথবা জাহান্নাম। হাত বাড়িয়ে বললেন, নতুন চাকরীর জন্য অভিনন্দন। [সংকলিত ও পারিমার্জিত]



বিষয়সমূহ: আদর্শ জীবন
আরও