ভোরের আলো ফোটার একটি সুযোগ দাও

নাজমুন নাঈম 41 বার পঠিত

বিখ্যাত লন্ডন ব্রীজের উপর রাতের অন্ধকারে জীবনের প্রতি হতাশাগ্রস্ত তিনজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। তারা শহরের তিনটি ভিন্ন অঞ্চলের বাসিন্দা। একে অপরের সম্পূর্ণ অপরিচিত। প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্ন সমস্যায় জরাজীর্ণ। সমাধানের কোন আশা নেই। তাই তারা সেতুর উপর দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল, কখন পথচারীরা ঘরে ফিরে যারে। আর সে সুযোগে জনশূন্য ব্রীজ থেকে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে কষ্টে ভারাক্রান্ত জীবনতরীকে চিরতরে ডুবিয়ে দেবে।

হঠাৎ প্রত্যেকেই অস্পষ্ট এক অনুভূতিতে টের পেল, বাকী দু’জনও হয়তো একই চিন্তা করছে। রাত বাড়ছে, মধ্যরাত পেরিয়ে যায়। তবুও তিনজনই নিজেদের জায়গায় দাঁড়িয়ে অপর দু’জনের চলে যাওয়ার অপেক্ষা করে। অপেক্ষায় সবার বিরক্তি বাড়ে। শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকে নীরবে সিদ্ধান্ত নেয়, বাকীদের চলে যেতে বলা ভাল, যাতে নিজের পরিকল্পনা নষ্ট না হয়।

তারা একে অপরের কাছে এগিয়ে গেল। একে অপরকে জিজ্ঞেস করল, এত রাতে এমন ভয়ংকর নির্জন জায়গায় তারা কেন এসেছে? সংক্ষিপ্ত কথোপকথনের পর তারা সত্য কথা স্বীকার করে এবং প্রত্যেকে অনুরোধ করে ‘তোমরা ফিরে যাও’। কিন্তু কেউ কারো কথায় রাযী হয় না। কথাবার্তায় জানা গেল, প্রথমজন এক বেকার যুবক। দীর্ঘদিন ধরে কাজ নেই। মাথায় ঋণের পাহাড় জমে গেছে। বাড়িভাড়া, গ্যাস-বৈদ্যুতিক বিল বাকী পড়ে আছে কয়েক মাসের। পরিস্থিতি বদলাবে এই আশা হারিয়ে সে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

দ্বিতীয়জন মাঝবয়সী ব্যক্তি। তিনি একটি মারাত্মক রোগে আক্রান্ত। চিকিৎসকেরা তাকে রোগের গুরুতর অবস্থার কথা বলেছেন তার ভিতর লড়াইয়ের ইচ্ছা জাগাতে। কিন্তু তিনি লড়তে চাননি। তাই ধুকে ধুকে মৃত্যুর প্রতীক্ষায় না থেকে তিনি নিজেই নিজের জীবন শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তৃতীয়জন এক বৃদ্ধ। তার আর্থিক বা শারীরিক কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু তার স্ত্রী তরুণী। তার সাথে প্রতারণা করে সমবয়সী এক যুবকের সাথে দেখা করতে যায়। নানা অজুহাতে প্রতিদিন রাতে বেরিয়ে যায়। আর তিনি একা বসে কষ্টে জ্বলতে থাকেন। তবু স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার সাহস পান না।

তিনজন নিজেদের দুঃখ ভাগাভাগি করল। তাদের কষ্ট যেন তাদেরকে একসূত্রে বেঁধে দিল। সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থা এমনকি বয়সে বিস্তর তারতম্য থাকলেও এই মুহূর্তে জীবন তাদেরকে একই বিন্দুতে মিলিয়ে দিয়েছে, যে বিন্দুর অবস্থান যেন মৃত্যু থেকে কেবল কয়েক মুহূর্ত দূরে। কিন্তু তারা প্রত্যেকে অনুভব করল, অন্যদের সমস্যার সমাধান আছে। কেবল তার সমস্যারই কোন সমাধান নেই।

বেকার যুবক তখন অসুস্থ ব্যক্তিকে বলল, আপনি কেন নিয়তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে চাচ্ছেন? নিজের হাতে জীবনের ইতি টানতে চান কেন? কেন চিকিৎসাকে পুরো সুযোগ দিচ্ছেন না? প্রতিদিনই তো চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন কিছু আবিষ্কার হচ্ছে।

মাঝবয়সী অসুস্থ ব্যক্তি বৃদ্ধকে বলল, আপনার স্ত্রীর অপরাধের জন্য আপনি নিজে কেন শাস্তি ভোগ করবেন? আপনি তো যথেষ্ট অভিজ্ঞ ও ভদ্র মানুষ। এই অবিশ্বস্ত স্ত্রীকে ছেড়ে দিন। নিশ্চয়ই আপনি এমন এক সৎ, বিশ্বস্ত নারীর সন্ধান পাবেন, যে আপনাকে ভালবাসবে।

আর বৃদ্ধ ব্যক্তি যুবককে বলল, এতো কম বয়সেই তুমি কীভাবে জীবনের হাল ছেড়ে দাও? এতো সহজে কেউ জীবন থেকে পালিয়ে যায়? নিশ্চয়ই কোথাও এমন একটি জায়গা আছে, যেখানে তোমার কাজের প্রয়োজন আছে। শুধু তুমি এখনো তা খুঁজে পাওনি। হয়তো অচিরেই তুমি তার সন্ধান পাবে। বাড়ির মালিককে নিশ্চয়ই অনুরোধ করতে পার, যেন তিনি আরও একমাস অপেক্ষা করেন, যতক্ষণ না তোমার অবস্থা ভাল না হয়।

অবশেষে তিনজন একমত হ’ল যে, তারা আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত এক দিন পিছিয়ে দিবে। পরের দিন সন্ধ্যায় একই জায়গায় আবার মিলিত হবে। যদি তাদের মন বা পরিস্থিতিতে কোন পরিবর্তন না আসে, তবে তারা সকলেই একসাথে তাদের সিদ্ধান্ত কার্যকর করবে। এই প্রতিশ্রুতি নিয়ে তারা বিদায় নিল।

পরদিন সন্ধ্যা। প্রত্যেকেই তার দুই সঙ্গীর সাথে কৃত অঙ্গিকার রক্ষা করতে সেতুর দিকে রওনা দিল। বৃদ্ধ লোকটি আগের রাতটা ভালোভাবে ঘুমিয়েছে। সকালে কাজে বের হওয়ার সময় সে তার স্ত্রীর দিকে বিদ্রুপের দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর নিজেকে বলল, ‘লজ্জা তো সেই ব্যক্তির যে প্রতারণা করে, প্রতারিত ব্যক্তির নয়’। তোমাকে নিয়ে আমার যে অকারণ দুর্বলতা ছিল, তা আমি কাটিয়ে উঠব। খুব শিগগিরই আমি এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠব, আর তোমাকে আমার জীবন থেকে বের করে দিব।

সেতুর কাছে এসে সে দেখল, বেকার যুবক ইতিমধ্যেই সেখানে অপেক্ষা করছে। যুবক জানাল, বাড়ির মালিক আসলে ততটা কঠোর নন; তিনি তার অনুরোধ মেনে নিয়েছেন এবং আরও এক মাস সময় দিয়েছেন। তারা উষ্ণ অভিবাদন বিনিময় করল। আগ্রহ নিয়ে পরস্পরের কথা শুনল এবং বুঝল, তাদের সমস্যাগুলোই জীবনের শেষ নয়।

তাদের চেয়ে আরও দুঃখী মানুষ পৃথিবীতে আছেন। যেমন তাদের তৃতীয় সঙ্গী, মারাত্মক রোগে আক্রান্ত। হঠাৎ তাদের মনে হ’ল, সে এখনো আসল না কেন? দু’জন চারদিকে তাকাল, অপেক্ষা করতে থাকল। অপেক্ষা দীর্ঘ হ’ল। কিন্তু তার দেখা পাওয়া গেল না। তাদের দৃষ্টিতে একটি নির্মম উপলব্ধি প্রকাশ পেল, সে আর আসবে না।

সম্ভবত তিনি এসেছিলেন, আগের রাতে তাদের চলে যাওয়ার পর। হয়তো রাতের অাঁধারে সেই নির্জন ব্রীজে পুনরায় হতাশায় ডুবে গিয়ে তিনি তার জীবনাবসান করেছেন।

যাওয়ার আগে যুবক তার নতুন বন্ধুকে জিজ্ঞেস করল, কেন আমাদের বন্ধু এমনটি করল? আমরা তো আত্মহত্যা একদিন পিছিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে একমত হয়েছিলাম। বৃদ্ধ এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিল, কারণ সে কেবল রাতের অন্ধকার ও হতাশাকেই অাঁকড়ে ধরে ছিল। ভোরের সূর্য দেখার জন্য অপেক্ষা করতে পারেনি।

আনন্দ-বেদনা মিশ্রিত এই প্রত্যাবর্তনে যুবকের মনে কেবল একটি বাক্যই জাগ্রত হ’ল, ‘রাতের অাঁধার পেরিয়ে ভোরের আলো ফুটবার একটি সুযোগ দাও’

শিক্ষা : মানুষের জীবন সর্বদা সুখের প্রশান্ত সাগরে ভেসে চলে না। কখনো রাতের অাঁধারে জীবনতরী দুঃখের প্রবল ঝড়ের কবলে পড়ে। তাই বলে দিশেহারা নাবিক কখনো সাহস হারায় না। দৃঢ় মনোবলে কেবল অপেক্ষা করে ভোরের আলো ফোটার। কেননা আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে’ (শরহ ৯৪/৬)

মূল : মুহসিন জববার; অনুবাদ : নাজমুন নাঈম

[সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ, রাবি শাখা]



বিষয়সমূহ: ইসলামের সৌন্দর্য
আরও