দোষ-গুণের তারতম্য
নাজমুন নাঈম
গল্পটি তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ুয়া এক শিশুর। একদিন শিশুটির ক্লাসে শিক্ষক ফজরের ছালাতের কথা আলোচনা করলেন। তিনি এমনভাবে ছালাত আদায়ের ফযীলত ও পরিত্যাগের পরিণাম বর্ণনা করলেন যে, ছোট ছোট ছাত্রদের মনোযোগ আকৃষ্ট হ’ল। শিশুটি গভীর মনোযোগ দিয়ে শিক্ষকের কথা শুনল এবং কথাগুলো তার হৃদয় স্পর্শ করল। কিন্তু সে নিজে কখনও ফজরের ছালাত পড়েনি, তার বাবা-মা বা পরিবারের অন্য কেউ পড়ে না। |
বাড়ি ফিরে শিশুটি ভাবতে লাগল, আগামীকাল কীভাবে সে ঘুম থেকে জাগ্রত হবে ও ফজরের ছালাত আদায় করবে। অনেক ভেবে সে কোনো উপায় খুঁজে পেল না। শেষে সিদ্ধান্ত নিল, সারা রাত জেগে থাকবে। তাহ’লে ছালাতের সময় উঠতে পারবে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর ঘুমে তার চোখ ভারী হয়ে আসল। তবু সে তার সিদ্ধান্তে অটল রইল এবং বিভিন্ন কসরত করে সে নির্ঘুম রাত কাটাল।
ভোরে আযান শুনে শিশুটি অযূ করে ছালাতের জন্য প্রস্ত্তত হ’ল। কিন্তু নতুন একটি সমস্যা দেখা দিল। মসজিদ অনেক দূরে, আর সে একা যেতে পারবে না। তাই সে কেঁদে দরজার সামনে বসে পড়ল। হঠাৎ সে রাস্তায় কারো হাঁটার শব্দ শুনতে পেল। সে তাকিয়ে দেখল, এক বৃদ্ধ লোক তাসবীহ পাঠ করতে করতে মসজিদের দিকে যাচ্ছেন। শিশুটি তাকে চিনতে পারল। উনি তো তারই বন্ধু আহমাদের দাদা। সে খুশিতে দরজা খুলে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। শিশুটি নিঃশব্দে ও সতর্কভাবে সেই বৃদ্ধের পিছনে পিছনে হাঁটতে লাগল, যাতে কেউ টের না পায় এবং বাড়িতে গিয়ে কেউ তাকে বকাঝকা না করে।
এরপর থেকে সে নিয়মিত ফজরের সময় অযূ করে দরজার কাছে অপেক্ষা করে। অতঃপর আহমাদের দাদার পিছনে পিছনে মসজিদে যায়। আবার একইভাবে ফিরেও আসে। এইভাবে অনেক দিন কেটে গেল। তবু পরিবারের কেউ কিচ্ছু জানতে পারল না। কিন্তু পৃথিবীতে কেউ চিরস্থায়ী নয়। একদিন সেই বৃদ্ধ মারা গেলেন। খবর শুনে শিশুটি স্তব্ধ হয়ে গেল এবং হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। শিশুটির এরকম কান্না দেখে তার বাবা-মা অবাক হয়ে গেলেন।
তারা চিন্তা করতে লাগলেন, একজন বৃদ্ধ লোকের মৃত্যুর জন্য সে এত কাঁদছে কেন? বাবা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বাবা! তুমি কেন এত কাঁদছ? উনি তো তোমার সমবয়সী নন, তোমার আত্মীয়ও নন!’
অশ্রুসজল চোখে শিশুটি বলল, ‘হায়! যদি উনি না মরে তুমি মারা যেতে’।
নিজের ছেলের কথা শুনে বাবা স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তিনি এর কোন কারণ খুঁজে পেলেন না। তখন শিশুটি বলল, ‘আমি এটা তোমার প্রতি ঘৃণা বা কষ্টের কারণে বলিনি। বরং ছালাতের জন্য বলেছি’।
বাবা অবাক হয়ে বললেন, ছালাতের জন্য কেন? ছালাতের সাথে উনার মৃত্যুর সম্পর্ক কী?
শিশুটি বলল, ‘তুমি ফজরের ছালাতে মসজিদে যাও না। কেন তুমি ওই লোকটার মতো হ’তে পারো না? বা আরো যেসব মানুষকে আমি মসজিদে দেখি তাদের মতো?
বাবা বললেন, ‘তুমি কবে দেখলে, তারা ফজরের সময় মসজিদে যায়?
শিশুটি তখন সব কথা খুলে বলল, কীভাবে সে ছালাতের জন্য সারারাত জেগে থাকত। কীভাবে সে ওই বৃদ্ধের পিছনে লুকিয়ে মসজিদে যেত। শিশুটি কেঁদে কেঁদে বলল, উনি আমার ফজরের সাথী ছিলেন। আমি এখন থেকে আর মসজিদে যেতে পারব না।
ছেলের কথা শুনে বাবার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। অশ্রুতে চোখ ভিজে গেল। তিনি তার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, তোমাকে আর সারারাত জেগে থাকতে হবে না। কাল থেকে আমিই তোমাকে ডেকে মসজিদে নিয়ে যাব। সেই দিন থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি কখনো মসজিদে ছালাত আদায় ছেড়ে দেননি।
আল্লাহ সেই বাবাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন, সেই সন্তানকেও উত্তম প্রতিদান দান করুন। আর উত্তম প্রতিদান করুন সেই শিক্ষককে, যিনি এই পরিবর্তনের সূচনা করেছিলেন।
শিক্ষা : গল্পটিতে পিতা-মাতা ও সন্তান সকলের জন্য শিক্ষা রয়েছে। শিক্ষা রয়েছে মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকমন্ডলীর জন্যও। একটি ছোট্ট কথা, একটি সুন্দর উপস্থাপন শিশুর হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলতে পারে। পরিবর্তন করতে পারে একটি পরিবার বা পুরো একটি সমাজকে। কেননা আল্লাহ কখন কাকে কার মাধ্যমে হেদায়াত দান করবেন, তা আমরা কেউ জানি না। আল্লাহ বলেন, ‘আর তুমি উপদেশ দিতে থাক। কেননা উপদেশ মুমিনদের উপকারে আসে’ (যারিয়াত ৫১/৫৬)।
মূল : মুহসিন জববার
অনুবাদ : নাজমুন নাঈম