জার্মান তরুণী মার্টিনা ওবারহোলজনার ইসলাম গ্রহণ
তাওহীদের ডাক ডেস্ক
[আদনান স্মিথ ১৯৮৮ সালে একটি খ্রিস্টান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পূর্বনাম ছিল এড্রিয়ান উড স্মিথ। তার মা আমেরিকান এবং বাবা ব্রিটিশ। অষ্টম শ্রেণিতে তিনি যখন ক্যারিয়ার অ্যাসপিরেশন টেস্ট দেন, তখন তিনি ‘ল এনফোর্সমেন্ট’ (আইন প্রয়োগকারী সংস্থা)-এ সর্বোচ্চ স্কোর করেন, যেখান থেকে তাঁর এফবিআই হওয়ার স্বপ্ন শুরু হয়। ডার্টমাউথ কলেজে পড়াশোনার সময়, এফবিআই-তে যোগদানের প্রস্ত্ততির অংশ হিসাবে তিনি আরবী ভাষা শেখা শুরু করেন। এসময় তিনি এফবিআই-এর জন্য ইন্টার্নশিপ এবং নিরাপত্তা যাচাই প্রক্রিয়া (security clearance) সফলভাবে সম্পন্ন করেন। আরবী ভাষা শেখার উদ্দেশ্যে তিনি আরব বিশ্ব ও মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় দেড় বছর কাটান। বর্তমানে তিনি রোড আইল্যান্ডের প্রভিডেন্সে একজন ইমাম এবং ব্রাউন ইউনিভার্সিটির মুসলিম চ্যাপলিন হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি তিনি হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি প্রার্থী হিসাবে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন।]
প্রশ্ন : ইসলাম গ্রহণের আগে আপনার বিশ্বাস কেমন ছিল?
আদনান স্মিথ : সাত বছর বয়সে আমি একটা চার্চ খুঁজতে জেদ করেছিলাম। এরপর চার্চের সদস্য হই, যেন আমি ‘ব্যাপটাইজড’ হ’তে পারি। কারণ ধর্ম বিশ্বাস আর খ্রিস্টধর্ম তখন আমার জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অতঃপর চার্চের সঙ্গে আমার এতটাই নিবিড় ঘনিষ্ঠতা হয়ে যাই যে, হাই স্কুলের শেষ বছরে যুবদের জন্য আয়োজিত সানডে প্রোগ্রামে আমি উপদেশমূলক বক্তব্য (সারমন) দিতাম। নানা উপায়ে চার্চের বিভিন্ন কর্মকান্ডের অংশ ছিলাম। তবে চার্চে কাজ করতে করতে আমি খ্রিস্টধর্মের কিছু বিষয় দেখেছি, যা আমাকে অস্বস্তিতে ফেলত। কিছু বিষয় ঠিক বুঝতে পারতাম না, কিন্তু মনে হ’ত ঈশ্বরের সঙ্গে একটি গভীর সম্পর্ক আমার খুব প্রয়োজন।
প্রশ্ন : কোন বিষয়গুলো আপনাকে বিব্রত করত?
আদনান স্মিথ : প্রথম যে বিষয়টি আমাকে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করেছিল, তা হ’ল বিভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষ তাদের প্রার্থনা ও বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের আচার-অনুষ্ঠান পালন করে। আমি যখন বড় হচ্ছিলাম, তখন চার্চে একটি নির্দিষ্ট ধাঁচের প্রার্থনা সমাবেশ দেখতাম। পরে আমাদের চার্চে এক নতুন অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান যাজক এলেন, যিনি মাত্র এক বছরের জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তার আগমনের পর থেকেই অনেক কিছু বদলাতে শুরু করল। যেভাবে আমরা প্রার্থনা করতাম, তিনি ধীরে ধীরে সেসব পরিবর্তন করতে থাকলেন। কিছু বিষয় তিনি এমনভাবে রূপান্তর করলেন, যা অনেকেই মেনে নিতে পারছিলেন না। এই অভিজ্ঞতা আমার মনে এক গভীর প্রশ্নের জন্ম দিল, এটা কীভাবে সম্ভব যে, আমরা কীভাবে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করব, সেই পদ্ধতি এমন একজন মানুষের ইচ্ছায় বদলে যায়, যিনি নিজেই সাময়িক দায়িত্বে রয়েছেন?
প্রশ্ন : ইসলামের পথে আপনার যাত্রা কীভাবে শুরু হয়েছিল?
আদনান স্মিথ : অষ্টম শ্রেণিতে আমরা একবার ক্যারিয়ার অ্যাসপিরেশন টেস্ট দিয়েছিলাম। সেখান থেকে দেখা গেল, আমার সর্বোচ্চ নম্বর এসেছে আইন প্রয়োগ সংক্রান্ত বিভাগে। তখন মনে হ’ল ভালোই তো, যদি আইন প্রয়োগের কাজ করতে পারি, পুলিশ অফিসার হওয়ার সুযোগ পাব। কিন্তু আমার লক্ষ্য ছিল শুধু ভালো হওয়া নয়, সেরা হওয়া। আর সবচেয়ে সেরা, উচ্চ পর্যায়ের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হ’ল এফবিআই। সেদিন থেকেই মনে মনে দৃঢ় সংকল্প করেছিলাম, একদিন আমি এফবিআইতে যোগ দিতে চাই।
আমাদের পরিবারের একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, যিনি গোয়েন্দা হিসাবে কাজ করেছেন এবং এফবিআইয়ের সাথেও যুক্ত ছিলেন। তাঁর সঙ্গে কয়েকবার আলাপের পর একদিন আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, যদি এফবিআই এজেন্ট হ’তে চাই, তাহ’লে কী নিয়ে পড়াশোনা করব, ক্রিমিনোলজি, সাইকোলজি, নাকি অন্য কোনো বিষয়? তিনি হেসে বললেন, না, আরবী আর ফার্সী শিখ। এখন তাদের আরবী ও ফার্সী জানা লোকের খুব প্রয়োজন। এই দু’টির যেকোনো একটি যদি জানো, বা দু’টিই জানো, তাহ’লে খুব সহজে এফবিআইতে ঢুকতে পারবে।
ডার্টমাউথ কলেজে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম বর্ষে আমি আরবী মেজর সাবজেক্ট নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আরবী মেজর করার শর্ত ছিল, ‘আরব সংস্কৃতির পরিচিতি’ নামের আরেকটি কোর্স সম্পন্ন করতে হবে। আমি সেই কোর্সে ভর্তি হলাম। আমার মনে আছে, সেটা ছিল প্রথম বর্ষের শীতকাল। একদিন ক্লাসরুমে বসে আমরা একটি বিশেষ ডকুমেন্টারি দেখছিলাম, নামটা ছিল ‘উসরা’ বা ‘দ্য ফ্যামিলি অব ইসলাম’। সেই ভিডিওতেই জীবনে প্রথমবার আযান শুনেছিলাম। ক্লাসরুমে বসে আযান শোনার সেই মুহূর্ত যেন হৃদয়ের গভীরে গেঁথে গিয়েছিল।
এরপরের কয়েক সপ্তাহ ধরে মনে হ’ত, চারপাশের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি নিস্তব্ধতার মাঝেই সেই আযানের সুর বেজে চলেছে। নিউ হ্যাম্পশায়ারের বরফে ঢাকা রাস্তায় হেঁটে যেতে যেতে। এমনকি একলা ঘরে বসেও বারবার মনে হ’ত কেউ যেন আমাকে কোথাও ডেকে নিচ্ছে। সেই মুহূর্ত থেকেই ইসলামকে জানতে শুরু করি। প্রথমে ভেবেছিলাম, দেখি, একটু বুঝে নিই বিষয়টা। কিন্তু যত জানলাম, ততই মনে হ’ল ওহ! এ তো বেশ যুক্তিসঙ্গত। এই চর্চাগুলোই মনে হচ্ছে সেই সত্য, যা সারাজীবন আমি খুঁজে ফিরেছি, একজন ভালো খ্রিস্টান হওয়ার জন্য।
একদন আমি প্রথমবারের মতো ডার্টমাউথ কলেজের মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের রুমে গেলাম। সেখান থেকে ছালাতের ওপর একটি ছোট বই হাতে তুলে নিলাম। বইটি পড়তে পড়তে মনে হ’ল সারাজীবন তো এটাই খুঁজছিলাম! তখন ভাবলাম, ভালো, শেখা যাক। অনেক খ্রিস্টান যাজককেও দেখেছি, যারা যোগ বা বৌদ্ধ-হিন্দু আচার থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে আরও ভালো খ্রিস্টান হয়েছেন। আমিও মুসলিমদের কিছু রীতি, যেমন ছালাত গ্রহণ করে নিজের বিশ্বাস সমৃদ্ধ করতে পারি। তাই গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে হ্যারিকেন ক্যাটরিনার পর নিউ অরলিন্সে বিপর্যস্তদের সাহায্যে এক ‘মিশন’-এ গিয়েছিলাম। একদিন প্রোগ্রামের লিডারকে জিজ্ঞেস করলাম, পূর্বদিক কোন দিকে? কারণ আমি ক্বিবলা ঠিক করে ছালাত পড়তে চাচ্ছিলাম। তাঁর চোখে বিস্ময় ছিল, একজন খ্রিস্টান হয়ে ছালাত! এটা ছিল ইসলামে আসার মাত্র দুই মাস আগের ঘটনা।
প্রশ্ন:একজন খ্রিস্টান হয়ে ছালাত পড়ার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
আদনান স্মিথ : মনে হচ্ছিল আমি যেন সেই ছোট্ট এড্রিয়ান হয়ে গেছি, যে উদগ্রীব হয়ে জীবনের সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে। আর অজানা অনেক কিছুতে অস্থির হয়ে পড়ছে। তখন মনে হ’ত, অবশেষে শান্তি পেয়েছি, সব প্রশ্নের উত্তরও পেয়েছি। পরের দুই মাসে ইসলামের নানা দিক একটু একটু করে গ্রহণ করতে থাকলাম। কোথাও থেকে কোনো প্র্যাকটিস, কোথাও থেকে কোনো বিশ্বাস। ভাবতাম এগুলো আমাকে একজন ভালো খ্রিস্টান বানাবে।
কিন্তু দুই মাস পর নিজেকে মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের রুমে পেলাম। সেদিন দ্বিতীয়বারের মতো জুম‘আর ছালাত পড়ছিলাম। সেই অভিজ্ঞতা ছিল একেবারে নতুন। চার্চের প্রার্থনার সঙ্গে কোনো সাদৃশ্য নেই। মনে হচ্ছিল এই প্রার্থনাই আমি সারাজীবন খুঁজছিলাম। যেন প্রতিটি বাক্য আমার হৃদয়ের জন্যই বলা হচ্ছে। সবাই মিলে দাঁড়ালাম, রুকূ করলাম, সিজদায় অবনত হলাম। এমন অনুভূতি আগে কখনো হয়নি। জুম‘আ শেষে ক্যাম্পাসের ছোট্ট ছালাতের রুমে বসে ভাবছিলাম, ইসলামের এই দিকটা নিয়েছি, ওটা নিয়েছি। আর খ্রিস্টধর্মের কিছু মূল্যবান অংশও বুকে রেখেছি। কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝতে পারছি, ইসলামের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অনেক গভীর হয়ে গেছে। সেই মুহূর্তেই মনে হ’ল, হয়তো আমি এখন একজন মুসলিম। আমি উঠে ইমামের কাছে গিয়ে বললাম, আমি মুসলিম হ’তে চাই। আমি শাহাদাহ দিতে চাই।
প্রশ্ন : এমন কী কারণে আপনি খ্রিস্টধর্ম ত্যাগ করলেন?
আদনান স্মিথ : কখনোই মনে হয়নি যে আমি খ্রিস্টধর্ম ত্যাগ করেছি। আসলে খ্রিস্টধর্ম ছেড়ে দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্তও নিইনি। আমার ইচ্ছে ছিল ভিন্ন আচার ও বিশ্বাসের মাধ্যমে নিজেকে একজন ভালো খ্রিস্টান হিসাবে গড়ে তোলা। কিন্তু পরে জানতে পারি, প্রকৃত খ্রিস্টান যীশু খ্রিস্ট (আঃ)-এর প্রকৃত অনুসারী আসলে মুসলিম। তিনি মানুষকে ইসলামের পথেই ডাকতেন। তাই এই যাত্রা কোনো গোষ্ঠী বা সংস্কৃতি ত্যাগ করার নয়, বরং সত্যকে খুঁজে পাওয়ার যাত্রা। বুঝতে শিখি প্রায় সব ধর্মই কোনো মানুষ বা এলাকার নামে পরিচিত। যেমন খ্রিস্ট থেকে খ্রিস্টধর্ম, বুদ্ধ থেকে বৌদ্ধধর্ম, জুডা থেকে জুডাইযম। কিন্তু ইসলাম কোনো জাতি বা ব্যক্তির নামে নয়, এটা একটি সর্বজনীন স্রষ্টার প্রতি আত্মসমর্পণ। আর এ ধর্মেই যীশু (আঃ)-এর প্রকৃত সম্মান রক্ষিত। ভালো খ্রিস্টান হ’তে চেয়ে আমি শেষ পর্যন্ত এমন এক পরিচয় খুঁজে পেলাম, যা সব চেয়ে সুন্দর ও পরিপূর্ণ মুসলিম।
প্রশ্ন : ইসলাম গ্রহণের পর আপনার পরিবারের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?
আদনান স্মিথ : আমার মাকে সবকিছু স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে কয়েক মাস সময় লেগেছিল। এর জন্য আমি নিজেও কিছুটা দায়ী। কারণ যেদিন আমি শাহাদাত পাঠ করেছিলাম, সেদিনই তাকে ফোন করে খবরটা জানাই। সন্ধ্যায় ফোন করে বললাম, মা! তোমার সঙ্গে একটা কথা বলার আছে। মা বললেন, এড্রিয়ান, আমি ঠিক এখন ঘর থেকে বেরোচ্ছি। পরে বলা যাবে না? আমি একটু থেমে বলি, মা! আমি মুসলিম হয়েছি। তিনি বললেন, আমাকে এখন যেতে হবে। আমরা পরে কথা বলব। আমি বুঝতে পারছিলাম, তিনি চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। আসলে সে সময় আমার দিনগুলো বেশ কঠিন যাচ্ছিল, তাই স্বাভাবিকভাবেই তিনি আমার জন্য ভাবছিলেন। আমার উচিত ছিল কিছুটা সময় নিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করে বুঝিয়ে বলা।
প্রশ্ন : আপনি কি মুসলিম হয়েও এফবিআই-এ কাজ করেছেন?
আদনান স্মিথ : বলতে গেলে এফবিআই এজেন্ট হওয়ার স্বপ্নই আমাকে ইসলামের পথে নিয়ে আসে। এফবিআইতে যোগ দিতে চেয়েছিলাম বলেই আমি আরবী শেখা শুরু করি। আর আরবী শেখার মধ্য দিয়েই ইসলামের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়। সেই পরিচয় থেকেই আমি মুসলিম হই। কলেজের পুরো জুনিয়র এবং সিনিয়র বছর জুড়ে এফবিআই-এর বিভিন্ন পদের জন্য আবেদন করছিলাম। দুটো ইন্টার্নশিপের সুযোগও পেয়েছিলাম। গ্রীষ্মের ছুটিতে ওয়াশিংটন ডিসিতে কাজ করেছিলাম।
পরে আমাকে টপ সিক্রেট ক্লিয়ারেন্স দেওয়া হয়। এর মানে ছিল আমার পুরো জীবন, আমার পরিচিত মানুষ, কোথায় কোথায় গিয়েছি সবকিছুর পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত হয়েছে। আমাকে পলিগ্রাফ টেস্টের (লাই ডিটেক্টর) মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। জীবনের প্রতিটি বিষয়ে তারা আমাকে প্রশ্ন করেছিল। ছয় থেকে আট মাস ধরে নানা ধাপের পরীক্ষা চলেছিল। সবশেষে আমি সরকারী গোপন নথি দেখার যোগ্যতা অর্জন করি। এফবিআই-এর চাকরীর সময়ে এমন অনেক নথি হাতে পেয়েছি, যেগুলো ‘টপ সিক্রেট’ হিসাবে চিহ্নিত ছিল। আমি টপ সিক্রেট ক্লিয়ারেন্স পেয়েছিলাম। ইন্টেলিজেন্স অ্যানালিস্ট হিসাবে চাকরীর অফারও পেয়েছিলাম। তখনও আমার কাজের ধারা এফবিআই-এর সঙ্গে ছিল। আমি চাইছিলাম ভাষাবিদ হিসাবে যোগ দিতে। যখন আমার বয়স ২৬ হবে, তখন বিশেষ এজেন্ট পদে আবেদন করতে পারতাম। সেখান থেকে ক্যারিয়ার আরও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল।
প্রশ্ন : এফবিআইতে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
আদনান স্মিথ : এফবিআইয়ে কাজ করার সময়ে আমি অসংখ্য আন্তরিক ও নিবেদিত মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। কিন্তু ধীরে ধীরে আমার চোখ খুলতে শুরু করে, আর এই পরিবর্তনকে পুরোপুরি বুঝতে আমার কিছুটা সময় লেগেছে। আমি ধীরে ধীরে সাদা মানুষের প্রাধান্য এবং তার প্রভাব নিয়ে সচেতন হয়ে উঠছিলাম। সাদা আমেরিকানদের সঙ্গে বড় হ’তে গিয়ে সবকিছুই স্বাভাবিক মনে হ’ত। ভাবতাম, সব ঠিক আছে। নিজের জীবনটা ভালো কাটলেই হ’ল। একটা সুন্দর বাড়ি, ভালো চাকরি হবে। কারো ক্ষতি না করে একজন ভালো মানুষ হয়ে থাকব।
কিন্তু বুঝতে শিখলাম, আমার সেই বাড়ি, চাকরী বা শিক্ষার সুযোগ সবই দেশের ভেতরে ও বাইরে চলমান এক অত্যাচারী, স্বাধীনতাহরণকারী ব্যবস্থার সাথে জড়িত। পশ্চিমা নাগরিক হিসাবে আমরা বড় হই এই ধারণা নিয়ে যে, পুলিশ আমাদের রক্ষা করে। কিন্তু যদি কোনো সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর মধ্যে বেড়ে উঠতাম, তাহ’লে বুঝতাম, রক্ষার কাজ তারা করে ঠিকই। কিন্তু একই সাথে ভিন্ন গোষ্ঠীর ওপর প্রচুর হিংসা-নিপীড়নও চালায়। এফবিআইও ঠিক তেমনি। একদিকে এখানে এমন অনেক মানুষ আছে, যারা অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে বঞ্চিতদের অধিকার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। কিন্তু একই সাথে এফবিআই গভীরভাবে রাজনৈতিক একটি প্রতিষ্ঠান, যার অনেক কাজই রাজনীতিবিদদের স্বার্থে পরিচালিত হয়।
বুঝতে শুরু করলাম, আজ এফবিআই তাদের বিপুল রিসোর্স ঠিক কোন হুমকির পেছনে ব্যয় করছে? ততদিনে আমার ইন্টার্নশিপ শেষ হয়ে এক বছর পেরিয়ে গেছে। সবসময় একধরনের চাপা দ্বন্দ্ব কাজ করত। একদিকে ধর্মীয় পরিমন্ডলের প্রতি টান, যা আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর অন্যদিকে সেই প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করা, যারা সেই পরিমন্ডলকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। শেষ পর্যন্ত স্পষ্ট হয়ে গেল, আমি আর এই দুই ভূমিকা একসাথে পালন করতে পারছি না।
প্রশ্ন : আপনি কি ধর্মের কারণে স্বপ্নের ক্যারিয়ার ছেড়েছিলেন?
আদনান স্মিথ : বেশ মজার বিষয় এটা। স্পষ্ট মনে আছে, হবু শ্বশুরবাড়ির লিভিং রুমে বসেছিলাম। তিনি একজন আফগান, অসাধারণ হৃদয়ের মানুষ। তাঁর ব্যবহারে অশেষ উষ্ণতা আর আন্তরিকতা। তিনি সাদরে আমাকে গ্রহণ করেছিলেন। আমি খুব খুশি হয়েছিলাম এই ভেবে যে, একজন সৎ মানুষের মেয়েকে বিয়ে করতে যাচ্ছি। আমরা বসে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলছিলাম, কীভাবে তাঁর কন্যা আমার জীবনের অংশ হবে। হঠাৎ তাঁর মুখাবয়ব বদলে গেল। তিনি বললেন, আমার মনে হয়, এফবিআই-তে তোমার মতো মুসলিমদের থাকা দরকার। কিন্তু সেই মুসলিম আমার মেয়েকে বিয়ে করতে পারবে বলে মনে হয় না। সেই মুহূর্তে মনে হ’ল, এক নিমেষে আমি কত ছোট হয়ে গিয়েছি। তাঁর কথায় বুকের ভেতর এক শীতল স্রোত বয়ে গেল। তবে এটা বুঝতে পারছিলাম, তিনি ঠিকই বলছেন। আমি আগেই এই দ্বন্দ্বে ভুগছিলাম। তখনই স্পষ্ট হয়ে গেল, এই দুই জগৎ একসঙ্গে আর টেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
এফবিআই আমাকে লক্ষ্য স্থির করা, দায়িত্ববোধ আর জীবনের উদ্দেশ্য শিখিয়েছিল। কিন্তু যখন তা হাতছাড়া হ’ল, তখন ভাবলাম, এবার আমি মুসলিম কমিউনিটির সেবা করব, ইসলামের জ্ঞান আরও গভীর করব। আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহর কৃপায় কুরআন শিক্ষা, হিফয, ইসলামী আইন ও ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে কিছু ইজাযাহ অর্জন করেছি। মুসলিমদের সেবা এবং ইসলামের জ্ঞান অর্জনই হয়ে উঠল আমার জীবনের মূল লক্ষ্য। সবচেয়ে বড় কথা, আমার রবের ইবাদতই চূড়ান্ত লক্ষ্য। ইসলাম আমাকে সেই দিশা দিয়েছে। যতদিন এ পৃথিবীতে আছি, ততদিন এখানেও কিছু দায়িত্ব রয়ে যাবে।
প্রশ্ন : মুসলিম হওয়ার পর আশেপাশের কেউ কি আপনাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে?
আদনান স্মিথ : এটা ছিল আমার ইসলামে আসার প্রায় দশ বছর পরের ঘটনা। একদিন দাদীর বাড়ি গেলাম। তখন তিনি ডিমেনশিয়ায় ভুগছিলেন। ধীরে ধীরে তাঁর মনোবল কমে যাচ্ছিল। শিশুর মতো সরল হয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর মধ্যে ছিল এক অনন্য পবিত্রতা। সেদিন তিনি গভীরভাবে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, উপরতলায় তুমি যে কাজটা করো, আমিও তা করতে চাই। প্রথমে আমি বুঝতে পারিনি, তিনি কী বলতে চাইলেন? পরে মনে পড়ল, ছালাতের সময় হ’লে আমি উপরতলায় যেতাম। তিনি হয়তো সেটা দেখতেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি ছালাত পড়তে চান? তিনি হাসিমুখে বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, সেটাই। আমি তাঁকে ছালাত পড়ালাম। আরেকদিন তিনি বললেন, আমরা কি আবার সেই কাজটা করতে পারি? আমি রাযী হলাম। সেদিন তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, দাদী! আমি কি আপনাকে ইসলাম ও আমাদের নবী মুহাম্মদ (ছাঃ) সম্পর্কে কিছু বলতে পারি? তিনি স্নেহভরে বললেন, অবশ্যই, বল। আমি তাঁকে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর অর্থ, ঈমানের গুরুত্ব, রাসূলের পরিচয় সব বুঝিয়ে বললাম। তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনে একদম প্রস্ত্তত হয়ে গেলেন। সেদিনই তিনি শাহাদাহ পড়লেন।
প্রশ্ন : রাসূল (ছাঃ)-কে নিয়ে আপনার সবচেয়ে প্রভাবিত হওয়ার দিক কী?
আদনান স্মিথ : রাসূল (ছাঃ)-এর জীবনী পড়তে গিয়ে আমি স্পষ্ট বুঝেছি, তিনি ছিলেন নিষ্পাপ, সদা সঠিক পথের পথিক। তাঁর জীবন আমার জন্য বিশাল অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। কারণ আমি সবসময় পারফেকশন খুঁজেছি। ভুল করলে হতাশ হয়ে পড়তাম। আর রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতিটি পদক্ষেপে দেখেছি, একজন মানুষের সাধ্যে কতটা উত্তম হওয়া সম্ভব। তাঁকে জানতে গিয়ে মনে হয়েছে, এটাই জীবনের সত্যিকারের সঞ্জীবনী।
[তথ্য সূত্র : ইন্টারনেট]