জাহেলী মতবাদের বলি মুসলিম রাষ্ট্র বাংলাদেশ
মুযাফফর বিন মুহসিন
ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব 432 বার পঠিত
সৃষ্টির সেরা জীব আমরা মানুষ। মহান রবের অপার করুণায় আমরা এমন বহু গুণের অধিকারী, যার কারণে আমরা সকল সৃষ্টির মাঝে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব খুঁজে পাই। আর সৃষ্টিজগতে আমাদের প্রভাব-ক্ষমতা খুব স্বাভাবিকভাবেই হৃদয়ে জাগায় আত্মগরিমা বা অহংকারের ইন্ধন। সেই ইন্ধনকে যারা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন তারাই হ’লেন প্রকৃত মানুষ। তাদের হাতে দিগন্তজোড়া পৃথিবীর আবাদ হয় এবং মানুষ খুঁজে পায় আপন শ্রেষ্ঠত্বের প্রকৃত নিশান। কিন্তু যারা এই ইন্ধনে জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়, নিজেকে নিঃশেষ করে ফেলে, তারা আবির্ভূত হয় ভিন্ন এক বেশে, ভয়ংকর নাগিনীর ফনায়, সুন্দর এই পৃথিবীর হন্তারক হয়ে। যার বিষ নিঃশ্বাসে জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয় কলকাকলিমুখর জীবনের পয়গামগুলো।
মানবজীবন বড় অদ্ভুতুড়ে এক উপাখ্যান, যার প্রতিটি পাতাই ভীষণ রহস্যমুখর। কখনও সাসপেন্স, কখনও কৌতুক ভরা। যে আত্মবিশ্বাস একসময় ছিল নয়া যামানার স্বপ্নময়ী এক সিংহশার্দুলের নাম, সময়ের বিবর্তনে একান্ত সংগোপনে তাই হয়ে ওঠে এক হিংস্র শ্বাপদ। হ্যাঁ, এর নাম আত্মশ্লাঘা। ভারিক্কি এক নাম। হওয়াই স্বাভাবিক। কেননা মানবজীবনের অদৃশ্য এক নীরব ঘাতক সে। হৃদয়ের গভীর কন্দরে বসবাস তার। বাহ্যিকভাবে তাকে দেখায় স্বর্ণমোড়া, কিন্তু ভেতর থেকে কুরে কুরে খায় ঈমান, তাক্বওয়া, বিনয়। শুভ্র লেবাসে এত বড় ভয়ংকর শত্রু বোধহয় মানুষের আর নেই। একজন আত্মবিশ্বাসী মুমিনের ঈমান, আমলকে যে নিজের অগোচরেই নিঃশেষ করতে পারে, তার চেয়ে বড় ঘাতক আর কে হতে পারে!
একজন ঈমানদার, বিশ্বাসী মানুষ যখন আপন অর্জনকে হঠাৎ বড় করে দেখা শুরু করে, নিজেকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ভাবতে শুরু করে, তখন নিজের প্রতি এই সুধারণা, এই আত্মমর্যাদাবোধই হয়ে দাঁড়ায় তার জন্য কাল, তার পতনের প্রধান কারণ। আত্মশ্লাঘা বা আত্মঅহংকার নামক এই অন্তর ব্যাধি তখন মানুষকে ঠেলে দেয় নিশ্চিত আত্মবিনাশের পথে। ধীরে ধীরে কেটে ফেলে তার তাক্বওয়া, ইখলাছ, মানবিকতার শেকড়।
পৃথিবীতে সর্বপ্রথম আত্মশ্লাঘা নামক মানসিক রোগের শিকার হয়েছিল ইবলীস। আল্লাহ যখন আদম (আঃ)-কে সিজদা করার নির্দেশ দিলেন, তখন সে ঔদ্ধত্যের সাথে বলেছিল, أَنَا خَيْرٌ مِنْهُ ‘আমি তার চেয়ে উত্তম; তুমি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছ, আর তাকে সৃষ্টি করেছ মাটি থেকে’ (আ‘রাফ ১২)। এই একটা বাক্যই তার চূড়ান্ত সর্বনাশ ঘটিয়ে দিল। কোন বড় পাপ নয়, শুধুমাত্র এই অহংকারই তাকে ফেরেশতাদের কাতার থেকে নামিয়ে দিল। কেবল তাই নয়, বরং চিরকালের জন্য তাকে করল লাঞ্ছিত, অভিশপ্ত। কারূুন নিজের ধন-সম্পদ, তার বিদ্যা-বুদ্ধি, যোগ্যতা নিয়ে আত্মতৃপ্তি সহকারে বলেছিল إِنَّمَا أُوتِيتُهُ عَلَى عِلْمٍ عِندِي ‘এ সম্পদ আমি পেয়েছি আমার নিজের জ্ঞানের কারণে’ (ক্বাছাছ ২৮/৭৮)। অবশেষে আল্লাহ তাকে তার ধন-ভান্ডারসহ পৃথিবীতে ধসিয়ে দিলেন। ফেরাঊন গর্ব করতে করতে একসময় ভীষণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলেছিল, أَنَا رَبُّكُمُ الْأَعْلَى ‘আমিই তোমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ রব’ (নাযি‘আত ৭৯/২৪)। ফলে আল্লাহ তাকে আখেরাত ও দুনিয়ার মহাশাস্তিতে পাকড়াও করলেন।
এভাবে আমাদের জ্ঞান, বংশমর্যাদা, পদমর্যাদা, ধন-সম্পদ, সৌন্দর্য, জনপ্রিয়তা যখনই আমাদের মধ্যে আত্মগরিমা উস্কে দেবে, ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই হারাতে থাকবে আমাদের ঈমান, আমাদের আদর্শ, আমাদের নীতিবোধ। যাদের হৃদয়ে আল্লাহর মহত্ত্বের স্থান থাকে না, তারাই কেবল নিজের মহত্ত্বের বড়াই করতে পারে। যারা নিজেকে বড় ভাবে, তারা স্বয়ং আল্লাহকেই ছোট করে ফেলে, যদিও তারা তা অনুভব করে না। এই ধরনের ব্যক্তিরা সমাজে যত সম্মানী বা দ্বীনদার হিসাবে পরিচিত হোক না কেন, আল্লাহর কাছে তারা কখনও ভালোবাসার পাত্র হ’তে পারে না। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ অহংকারী ও আত্মগর্বিত কাউকে পসন্দ করেন না’ (নিসা ৪/৩৬)। এজন্য রাসূল (ছা.) বলেন, ‘যার অন্তরে এক বিন্দু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না’ (ছহীহ মুসলিম হা/৯১)।
অহংকার মানুষকে শুধু আল্লাহর রহমত থেকেই বঞ্চিত করে না, বরং সমাজেও তাকে একাকী, অসহ্য ও অন্ধ করে তোলে। আত্মশ্লাঘায় আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের ভুল দেখতে পায় না, সমালোচনা সহ্য করতে পারে না, প্রশংসা ছাড়া বাঁচতে পারে না। ফলে সে ধীরে ধীরে আল্লাহ ও মানুষ উভয়ের কাছেই প্রিয়তা হারায়। তার অন্তর এমন পাথরের মত কঠিন হয়ে যায়, যা বৃষ্টির পানি শোষণ করে না। সে ব্যক্তি নিজেকে সবচেয়ে বুদ্ধিমান মনে করে বলে আর কারও কাছ কিছু শিখতে চায় না, কারো পরামর্শ গ্রহণ করতে পারে না। আত্মশ্লাঘা এমন এক কাঁচের দেওয়াল তৈরি করে দেয়, যার ভেতরে কেবল নিজের প্রতিচ্ছবিই দেখা যায়, বাইরের আলো, নতুন জ্ঞান বা সমালোচনা কিছুই প্রবেশ করতে পারে না। ফলে প্রগতি থেমে যায়, জানার পথ বন্ধ হয়ে যায়, সম্পর্ক নষ্ট হয়, কৃতজ্ঞতাবোধ হারিয়ে যায়, বিনয় ও নম্রতা একেবারে মুছে যায়, ঈর্ষা-প্রতিহিংসায় তার অন্তরটা যেন হয়ে ওঠে অগ্নিগর্ভ। এজন্য আল্লাহ সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘তোমরা নিজেদের পবিত্র বলে দাবী কর না; কে প্রকৃত পরহেযগার, তা আল্লাহই ভালো জানেন’ (নাজম ৫৩/৩২)।
প্রিয় পাঠক, আমাদের সমাজে আত্মশ্লাঘার রূপটা এখন ভীষণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো আমাদের সামান্য অর্জনগুলোকে এত স্ফীত করে দেখানোর সুযোগ দিয়েছে যে, তাক্বওয়া, ইখলাছ ধরে রাখা কাজটি হয়ে পড়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে দুরূহ কর্ম। আর তাই এ পথ ধরে নিজের অজান্তে মনের গহীনে বাসা বাঁধছে নতুন এক মানসিক ব্যাধি-আত্মগর্ব। অতএব মুমিন হিসাবে আমাদের এই রোগের ব্যাপারে সদা সতর্ক হওয়াটা অতীব যরূরী। প্রকৃত মুমিন তো সেই, যে নিজেকে সর্বদা ক্ষুদ্র মনে করে এবং আল্লাহর অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করে। নিজের সকল প্রাপ্তিকে আল্লাহর কাছে সঁপে দেয়। বিনয়ই তার সৌন্দর্য, আর আত্মশ্লাঘা তার কাছে শয়তানী ফাঁদ, যাকে সে ধারে কাছে ঘেঁষতে দেয় না। অতএব আসুন, আমরা হৃদয়ে আত্মসমালোচনার আলো জ্বালাই, বিনয়কে ধারণ করি, কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নিত্য অনুশীলন করি। সেই সাথে নিজের সাথে প্রতিনিয়ত বোঝাপড়া করি, নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করে মানুষের সমালোচনাকে স্বাগত জানাই। সর্বোপরি দো‘আ করি আল্লাহ যেন আমাদেরকে তাঁর কৃতজ্ঞ বান্দাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেন এবং আমৃত্যু ইখলাছ ও ইস্তিকামাতের সমুজ্জ্বল পথে সুদৃঢ় রাখেন। আল্লাহ আমাদের সকলকে তাঁর অনুগ্রহ প্রাপ্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমীন!