মৃত্যুর অমোঘ বাস্তবতা ও আমরা
ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব
ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব 457 বার পঠিত
আমাদের চারিদিকে এখন ভবিষ্যতের গল্প। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), বহুমুখী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AGI), মহাকাশ গবেষণা, রোবটিক্স, ড্রোন, নিত্য-নতুন ডিজিটাল প্রযুক্তির উন্মাদনায় আমরা এতটাই ভবিষ্যতমুখর হয়ে উঠছি যে, আমাদের বর্তমান, আমাদের পরিপার্শ্ব, আমাদের সমাজব্যবস্থা, আমাদের নিত্য কর্তব্য-করণীয় সবকিছুই যেন আড়ালে চলে যেতে বসেছে। অতি ভবিষ্যতচিন্তার বুদবুদ যেমন আমাদের হৃদয়জগতকে পরকালীন ভাবনা, মৃত্যুপরবর্তী জীবন, আল্লাহর সামনে দায়বদ্ধতার চেতনা থেকে বিমুখ করেছে; তেমনি আশপাশের মানুষের প্রতি ছোট ছোট কর্তব্য, সমাজ ও পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ সব ভুলিয়ে দিয়েছে। আমরা হয়ে উঠছি বর্তমান থেকে সুদূরে বসবাস করা এক ভবিষ্যতমুখী কল্পনার পুতুল। ফলে আমরা নিজের হাতে গড়া এক অজানা ফাঁদে আটকা পড়ে নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি; ক্ষতিগ্রস্ত করছি অন্যদেরকেও।
ইসলামে ভবিষ্যৎভাবনা যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। এজন্য পরকালীন ভাবনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদানের জন্য উৎসাহ দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আর প্রত্যেক ব্যক্তির উচিৎ এ বিষয়ে ভেবে দেখা যে, সে আগামী দিন (আখেরাত)-এর জন্য কি অগ্রিম প্রেরণ করছে? (হাশর ৫৯/১৮)। তবে ইসলামের এই ভবিষ্যৎভাবনা অতি বাস্তবতভিত্তিক। এতে কোন অলীক কল্পনা নেই, অনর্থক আবেগের ছোঁয়া নেই। যেমন ছাহাবী সা‘দ বিন আবী ওয়াক্কাছ (রা.) মৃত্যুর সময় তাঁর মীরাছের সমস্ত মাল দান করার জন্য অছিয়ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রাসূল (ছা.) তাঁকে নিষেধ করে বলেন, তুমি সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ দিতে পার। তবে এটাও অনেক বেশী। অতঃপর ভবিষ্যৎভাবনাকে উৎসাহিত করে রাসূল (ছা.) বললেন, মনে রেখ! তোমার ওয়ারিছদের সচ্ছল রেখে যাওয়া তাদেরকে মুখাপেক্ষী করে যাওয়ার চেয়ে উত্তম (বুখারী হা/১২৯৫)। এই হাদীছে রাসূল (ছা.)-এর ভবিষ্যৎভাবনা আমাদের দারুণ একটি বার্তা দেয়। আর তা হ’ল, তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর উপর ভরসার অর্থ ভবিষ্যৎচিন্তামুক্ত দায়িত্বহীনতা নয়; বরং তা বর্তমানের কর্তব্যকে যথাযথ পালনের মাধ্যমে বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে একটি চমৎকার ভারসাম্য রক্ষা করার নাম।
মানুষকে বলা হয় তার স্বপ্নের সমান বড়। হ্যাঁ, কথাটা মিথ্যা নয়। ভবিষ্যতের জন্য বড় স্বপ্ন দেখা ও তার জন্য প্রস্ত্ততি নেয়া অন্যায় কিছু নয়। ভবিষ্যৎকে কেন্দ্র করে কোন লক্ষ্য সাজানোও দোষের কিছু নয়। কিন্তু সেই স্বপ্ন যদি অলীক হয়ে দাঁড়ায়, সেই লক্ষ্য যদি অসম্ভব কিছুর পিছনে ধাবিত হয়ে বর্তমানের দায়িত্ব, সম্পর্ক এবং বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করতে শেখায়, তবে তা নিঃসন্দেহে বিপদজনক। আর এমনটাই এখন সাধারণত হচ্ছে। ভার্চুয়াল জগতে আমাদের অনেকে বড় বড় স্বপ্ন দেখেন। পরিকল্পনা নেন যে, ‘একদিন অনেক বড় কিছু করব, একদিন জিহাদে যাব, একদিন ইসলামী রাষ্ট্র হবে, একদিন আমরা শক্তিশালী হব, একদিন এটা হবে, সেটা হবে’। কিন্তু সেই ‘একদিন’-এর পেছনে তারা এতটাই মগ্ন হয়ে যান যে বর্তমানের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোকে অবহেলা করে ফেলেন। বাস্তব জীবনের সাথে সেসব স্বপ্নের কোন সামঞ্জস্য থাকে না। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য যে পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও ধৈর্যের প্রয়োজন, তার কোনটাই তাদের মধ্যে থাকে না। বরং তারা অলৌকিক কিছুর অপেক্ষায় থাকেন। ফলে তাদের সে স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। হতাশার গ্রাসে হারিয়ে যায় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সব মুহূর্ত ও সুযোগগুলো।
আরেক দল আছেন যারা ভবিষ্যতের দুঃচিন্তায় এতই নিমগ্ন হয়ে পড়েন যে আল্লাহর দেয়া নে‘মতগুলো ভুলে একসময় আল্লাহর প্রতি ভরসাই হারিয়ে ফেলেন। শত সান্ততনাতেও তাদের হৃদয়ে কোন আশার বার্তা জাগে না, প্রশান্তির সুবাতাস প্রবাহিত হয় না। ফলে নিজের শক্তি ও প্রাপ্তির জায়গাগুলো নিদারুণ অবহেলায় নষ্ট করেন। অপচয় করেন বর্তমানের অপার সম্ভবনাগুলো। তাদের প্রতিই ইঙ্গিত করে রাসূল (ছা.) বলেন, ‘যারা তোমাদের চেয়ে নিচে আছে তাদের দিকে তাকাও, আর যারা উপরে আছে তাদের দিকে তাকিও না। নতুবা তোমরা আল্লাহর নে‘মতকে তুচ্ছজ্ঞান করে ফেলবে’ (বুখারী হা/৬৪৯০)।
ইসলাম এভাবেই আমাদের ভবিষ্যতের প্রতি যেমন সচেতন হতে বলে, তেমনি বর্তমানকেও সমান গুরুত্ব দিতে শেখায়। জনৈক ছাহাবী রাসূল (ছা.)-কে জিজ্ঞাসা করল যে, হে রাসূল (ছা.)! ক্বিয়ামত কবে হবে! তিনি পাল্টা উত্তর দিয়ে বললেন, তুমি এর জন্য কী প্রস্ত্ততি গ্রহণ করেছ! (বুখারী হা/৩৬৮৮)। অর্থাৎ রাসূল (ছা.) তাকে ক্বিয়ামতের সময়ক্ষণের চিন্তায় বুঁদ না থেকে নিজের কর্তব্য পালনের প্রতি উৎসাহিত করলেন। অনুরূপভাবে তিনি একদিকে ছাহাবীদেরকে ভবিষ্যতের সংবাদ (রোম-পারস্য জয়ের ভবিষ্যদ্বাণী) দিতেন, অপরদিকে তাদের নিত্যদিনের দায়িত্ব-কর্তব্যও শেখাতেন। লক্ষ্যে পৌঁছাতে আকাশ-কুসুম কল্পনা কিংবা তাড়াহুড়া করতে নিষেধ করতেন। সুতরাং অতিরিক্ত ভবিষ্যৎমুখী কল্পনায় ভেসে যাওয়া নয়, বরং আজকের সময়, আজকের পরিবেশ অনুযায়ী বাস্তবমুখী পথ বেছে নেয়াই মুমিনের কর্তব্য। বর্তমানকে কাজে লাগিয়েই গড়ে ওঠে আমাদের ভবিষ্যৎ সফলতার সোপান।
এক্ষেত্রে আমরা যেন সফলভাবে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারি, সেজন্য কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা যেতে পারে। যেমন- (১) ধাপে ধাপে লক্ষ্য পূরণের পথ নির্ধারণ করা : হঠাৎ বড় স্বপ্নের পিছনে না ছুটে প্রতিদিন ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে যেন সেই মোতাবেক নিজের স্বপ্নকে বাস্তবের সাথে মিলিয়ে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়া যায়। (২) বর্তমানকে গুরুত্ব প্রদান করা : একটি প্রতিষ্ঠান করতে চাই, কিন্তু সেজন্য শুরুতেই বিশাল মহাপরিকল্পনা তৈরী না করে যতটুকু সম্ভব সেখান থেকে শুরু করা উচিৎ। বর্তমানে পা রেখেই ভবিষ্যত ভাবার চর্চা থাকলে তাতে স্বপ্ন পূরণের পথটা সহজতর হয়। (৩) বাস্তবমুখী নতুন নতুন পন্থা চিন্তা করা : সৃষ্টিশীল মানুষ প্রতিনিয়ত অন্যদের সাথে পরামর্শ করে। প্রতিদিন নিজের চিন্তাকে নতুনভাবে সাজায়। তারপর একটি স্থিতিশীল পরিকল্পনা জাগিয়ে তোলে মনের ক্যানভাসে। এজন্য চিন্তার রাজ্যকে সবসময় খোলা রাখতে হবে।
সর্বোপরি ইসলামের অন্যতম মূলনীতি হ’ল মধ্যমপন্থা। অতি ভবিষ্যৎকল্পনা যেমন আমাদের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে, তেমনি অতি বর্তমানমুখিতা আমাদের জীবনের মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করে। এজন্য উভয়ের মাঝে ভারসাম্য বজায় রেখেই আমাদের কর্তব্য নির্ধারণ করতে হবে। আমরা স্বপ্ন দেখব, ভবিষ্যতের কথা ভাবব। তবে বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই যেন তা আবর্তিত হয়। সুতরাং নীতি ও আদর্শের উপর অটল থেকে সততার সাথে আজকের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করলেই আগামী দিনের সফলতা নিশ্চিত হবে ইনশাআল্লাহ। ভবিষ্যৎ আল্লাহর হাতে, কিন্তু আজকের কাজ আমাদের হাতে। সে দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করাটাই যেন আমাদের মূল লক্ষ্য হয় এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে যেন সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা যায়। আল্লাহ আমাদের সে তাওফীক দান করুন- আমীন!