সফলতার দৈনন্দিন কর্মসূচী (২য় কিস্তি)
আবু আফিয়া
আবু আফিয়া 349 বার পঠিত
উপস্থাপনা : জীবনের ভিড় আর কোলাহলে, দেহের চাহিদা, হৃদয়ের দোদুল্যমানতা, মনের স্বপ্ন-বাসনা আর অর্থের চাপের মাঝে মানুষ প্রায়ই হারিয়ে ফেলে পথ। কখনও সফলতার পেছনে ছুটে, কখনও মুক্তির সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়। তবু মনে হয়, আসল গন্তব্যে পৌঁছানো হ’ল না। আপনার কি কখনও এমন দিন গেছে, যখন সারাদিন খাটাখাটনি করেছেন, অথচ মনে হয়েছে এক ধাপও এগোনো হয়নি? আপনি কি কখনও চেয়েছেন, জীবনটা হোক সহজ ও সুশৃঙ্খল, যেখানে দুনিয়া আর আখিরাতের সমন্বয়ে গড়ে উঠবে এক সুন্দর ভারসাম্য? এই প্রবন্ধটি সেই কাংখিত ভারসাম্য খুঁজে পাওয়ার এক আন্তরিক প্রয়াস। যা আপনাকে অস্থিরতার ভিড়ে স্থিরতা, ব্যস্ততার মাঝে শান্তি, আর দুনিয়া ও আখিরাতকে মিলিয়ে নিতে এক সুশৃঙ্খল জীবনের সেতুবন্ধন উপহার দিবে ইনশাআল্লাহ।
(১) লক্ষ্য স্পষ্ট করে দিন শুরু করুন : দুনিয়ার কোলাহল আর অগণিত ব্যস্ততার ভিড়ে আমরা অনেক সময় দিন শুরু করি এমনভাবে, যেন এক পথিক মানচিত্রহীন অজানা রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছে। অথচ লক্ষ্য ছাড়া আমাদের মন ও চিন্তা কখনোই পূর্ণ শক্তিতে কাজ করতে পারে না। আপনি যদি নিজের মনে লক্ষ্য স্থির না করেন, তবে অন্যরা তা পূরণ করবে এমনসব তুচ্ছ বিষয়ে, যা আপনাকে কোথাও পৌঁছে দেবে না। তাই প্রতিটি সকাল হোক নতুন সূচনা। চোখ খোলার সাথে সাথে নিজেকে প্রশ্ন করুন আজ আমার লক্ষ্য কী?
এটি বিশাল বা কঠিন কোনো কিছু হ’তে হবে না। বরং ছোট ছোট পদক্ষেপই দিনটিকে অর্থবহ করে তুলবে। একটি কাজ সম্পন্ন করা, পাঁচ পৃষ্ঠা পড়া, কারো সাথে যোগাযোগ করা, কিংবা শুধু কারো দিকে হাসিমুখে তাকানো। এজন্য বলা হয়ে থাকে, আকল বা বুদ্ধির পূর্ণতা আসে দু’টি জিনিসে (১) এমন চিন্তা যা তাকে সত্যের পথে পৌঁছে দেয় (২) আর এমন দৃঢ় সংকল্প যা তাকে সে সত্যের কাজ করতে সক্ষম করে’। লক্ষ্যহীন দিন আপনাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু লক্ষ্যভরা দিন আপনাকে দেবে নিয়ন্ত্রণ দিকনির্দেশনা ও অগ্রগতির আনন্দ। আপনার প্রতিটি সকাল হোক উদ্দেশ্যময়। যাতে আপনি নিজেই দিনের নিয়ন্ত্রক হন, দিন যেন আপনাকে নিয়ন্ত্রণ না করে।
কার্যকরের উপায় : প্রতিদিনের কাজ বা পড়াশোনা শুরু করার আগে মাত্র ৩ মিনিট সময় বের করুন। একটা কাগজ নিন এবং লিখে ফেলুন (১) আজ আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৩টি কাজ কী? (২) কেন আমি এগুলো করতে চাই? (আমার নিয়ত বা উদ্দেশ্য)। (৩) কখন করব? সময়ের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। অতঃপর কাগজটা সারাদিন সামনে রাখুন। দেখবেন, আপনার মনোযোগ ও গতি কতটা বদলে যায়। মনে রাখবেন, প্রতিটি সকাল মানে এক নতুন সুযোগ, নতুন করে নিজেকে গড়ে তোলার সুযোগ। প্রতিটি সঠিক অভ্যাস, প্রতিটি সচেতন পদক্ষেপ আপনার সফলতার ভবনে একটি নতুন ইট যুক্ত করে। তাই অপেক্ষা নয়, শুরু করুন এখানই, এই মুহূর্ত থেকে।
২. সময়কে গুছিয়ে নিন : সময়ই আসলে জীবন। যে সময় নষ্ট করে, সে নিজের জীবনকেই নষ্ট করে। দুনিয়া ও আখিরাতে মানুষের আসল পুঁজি হ’ল তার বয়স ও সময়। আমরা প্রায়ই শুনি, সময় নেই। কিন্তু সত্য হ’ল প্রত্যেক মানুষের কাছেই দিনে সমান ২৪ ঘণ্টা থাকে; কারও কমে না, কারও বাড়ে না। পার্থক্য কেবল এ জায়গায়। কে সেই সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগায়, আর কে তা অবচেতনে হারিয়ে ফেলে। আমাদের উচিত সময়কে এমনভাবে ব্যবস্থাপনা করা, যেমন একজন সফল ব্যবসায়ী নিজের মূলধনকে সযত্নে বিনিয়োগ করে। প্রতিটি মিনিটের সঠিক ব্যবহার হ’ল নিশ্চিত লাভ। আর প্রতিটি অপচয়িত মুহূর্ত হ’ল নীরব ক্ষতি, যা আর কখনও ফিরে পাওয়া যায় না।
সময় মানে শুধু বড় পরিকল্পনা নয়, বরং প্রতিটি মুহূর্তের সঠিক ব্যবস্থাপনা। কখন ঘুমাবেন? কখন কাজ করবেন? কখন বিশ্রাম নেবেন? কখন নিজের উন্নতির জন্য সময় দেবেন? সব কিছুর জন্য দরকার সচেতনতা আর সঠিক ভারসাম্য। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘দু’টি নে’মত আছে, যেগুলোতে অনেক মানুষ ধোঁকায় পড়ে, সুস্বাস্থ্য এবং অবসর সময়’।[1] যে নিজের সময়কে উপকারী কাজে লাগায় না, তার সময় নীরবে, অজান্তেই অপকারে ব্যয় হয়।
কার্যকরের উপায় : দিনের শুরুতে বসুন এবং একটি সহজ পরিকল্পনা লিখে ফেলুন। আজকের ৩টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। প্রতিটি কাজের জন্য নির্দিষ্ট সময়। আর ছোট ছোট বিশ্রামের সময়, যা আপনাকে সতেজ রাখবে। সময়ের কৌশল ব্যবহার করুন। যেমন Pomodoro Technique ২৫ মিনিট মনোযোগী কাজ + ৫ মিনিট বিশ্রাম। এভাবেই মনোযোগ বাড়বে, ক্লান্তি কমবে, কাজ হবে সহজ। দিনের শেষে নিজের কাছে জবাবদিহি করুন। কোথায় সফল হ’লাম? কোথায় ভেঙে পড়লাম? কেন হ’ল? কীভাবে উন্নতি করা যায়? প্রয়োজনে সাহায্য নিন আধুনিক অ্যাপ থেকে। মনে রাখবেন, আপনি দিনের সব ফলাফল নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। কিন্তু সময়কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। আর সময়কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই দিনও আপনার নিয়ন্ত্রণে আসবে। তাই আর দেরি নয়, আজই কলম হাতে নিন, সময়ের হিসাব লিখুন। দেখবেন, আপনার দিন আর আপনাকে ঠেলে নিয়ে যাবে না, বরং আপনার ইশারায় চলবে।
৩. অবিরাম শিখুন : মস্তিষ্ক ঠিক পেশীর মতো। যত ব্যবহার করবেন, যত শিখবেন, ততই সে হবে শক্তিশালী ও নমনীয়। আর অবহেলা করলে ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাবে, শক্ত হয়ে যাবে, জীবন থেকে হারাবে তার দীপ্তি। শিক্ষা শুধু স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি আজীবনের এক যাত্রা। প্রথম সচেতনতা থেকে শুরু হয়ে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত চলতে থাকে। মনে রাখুন, যেদিন কিছু শিখলেন না, সেদিন আসলে আপনি পিছিয়ে গেলেন। তাই প্রশ্ন হোক শুধু আমি কি শিখছি? না। বরং আমি কী শিখছি? কেন শিখছি? আর কীভাবে শিখছি? আজ জ্ঞান সবার হাতে। একটি ছোট বই, একটি পিডিএফ, একটি ভিডিও লেকচার, একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা কিংবা একটি বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনা। সবই আপনার চিন্তার জানালায় আলোর প্রদীপ জ্বালায়।
এক ব্যক্তি ইমাম আহমাদ (রহঃ)-এর সঙ্গে একটি দোয়াত (কালির পাত্র) দেখতে পেয়ে বলল, ‘হে আবু আব্দুল্লাহ! আপনি তো এই উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছেছেন, মুসলিমদের ইমাম হয়ে গেছেন তবুও আপনার সঙ্গে একটি দোয়াত বহন করছেন? তিনি জবাবে বললেন, দোয়াত থেকে কবরে পর্যন্ত। (অর্থাৎ আমি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন করে যাবো)।[2] উল্লেখ্য, মৃত্যুর আগ পর্যন্তও শেখার পথ বন্ধ হয় না। সুতরাং শেখা মানেই এগিয়ে যাওয়া। থেমে যাওয়া মানেই পতনের শুরু। তাই আজই শুরু করুন। প্রতিদিন কিছু শিখুন, ছোট হলেও। আপনার জ্ঞানই হবে আপনার শক্তি, আর শক্তিই হবে আপনার সাফল্যের সোপান।
কার্যকরের উপায় : ক্ষেত্র বেছে নিন। এই মাসে কোন বিষয়ে শিখবেন ঠিক করুন। যেমন কুরআন শিক্ষা, আরবী ভাষা, ইসলামিক স্টাডিজ, প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা, বক্তব্য, মার্কেটিং ইত্যাদি। বিশ্বস্ত উৎস খুঁজে নিন একটি বই, অনলাইন কোর্স, ইউটিউব চ্যানেল, পডকাস্ট। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন ১৫-৩০ মিনিট যথেষ্ট। নিজস্ব নোটবুকে লিখুন আজ আমি কী শিখলাম? আমি কীভাবে তা কাজে লাগাবো? কোন বিষয়টি আমাকে অবাক করেছে? মনে রাখবেন, শেখা শুধু জ্ঞানের স্তর বদলায় না, বদলে দেয় আপনার চিন্তার ধরণ, আপনার স্বপ্নের সীমানা, আর আপনার নিজের চোখে নিজের পরিচয়। শরীরকে যেমন প্রতিদিন অনুশীলন করান, তেমনি প্রতিদিন আপনার মস্তিষ্ককেও শিখনের অনুশীলন করান। যদিও তা হোক মাত্র একটি নতুন তথ্য।
৪. দক্ষতা উন্নয়ন করুন : আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল দুনিয়ায় শুধু ডিগ্রি বা সনদপত্র যথেষ্ট নয়। যা আপনাকে সবার ভিড় থেকে আলাদা করবে, সেটি হ’ল আপনার দক্ষতা আপনি কী করতে পারেন এবং কতটা নিখুঁতভাবে করতে পারেন। দক্ষতাই আপনার আসল মূলধন। এটাই আপনাকে কাজের সুযোগ এনে দেয়, প্রভাব বিস্তার করতে সাহায্য করে, আর স্বাধীনতার দ্বার খুলে দেয়। কিন্তু আমরা অনেকেই একটি বড় ভুল করি, চাকরি বা সুযোগ আসার পর দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করি। অথচ সোনালী নিয়ম হ’ল আগে দক্ষতা অর্জন করুন, সুযোগ তখন নিজেই আপনার দরজায় কড়া নাড়বে। আপনার দক্ষতা হ’তে পারে প্রযুক্তিগত বা সফট স্কীল (Soft Skills)। যেমন আলোচনা, উপস্থাপন, বা সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি।
একবার ভেবে দেখুন, কোন একটি দক্ষতা যদি আগামী ৬ মাসে আয়ত্ত করতে পারি, তবে আমার জীবন বদলে যাবে? মনে রাখবেন, দক্ষতা কোনো জন্মগত প্রতিভা নয়। বরং এগুলো গড়ে ওঠে অভ্যাস, অনুশীলন, ভুল থেকে শেখা এবং বারবার চেষ্টার মাধ্যমে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই জ্ঞান আসে শেখার মাধ্যমে, আর সহনশীলতা আসে অনুশীলনের মাধ্যমে’।[3] অর্থাৎ উন্নতি আসে ধীরে ধীরে, ধৈর্য ও ধারাবাহিকতার মাধ্যমে। তাই আজই সিদ্ধান্ত নিন, প্রতিদিন একটু হলেও নতুন দক্ষতা গড়ার পথে হাঁটবেন। কারণ আপনার দক্ষতাই আপনার আসল ভবিষ্যৎ!
কার্যকরের উপায় : একটি দক্ষতা বেছে নিন। আজই ঠিক করুন কোন দক্ষতা আপনি উন্নয়ন করতে চান। যেমন খুৎবা, বক্তৃতা, লেখা, ভাষাশিক্ষা, সংগঠন পরিচালনা, অনলাইন মার্কেটিং, ভিডিও এডিটিং। শেখার পথ নির্ধারণ করুন। অনলাইন কোর্স বা প্র্যাকটিক্যাল বই বা প্রজেক্ট-বেসড গাইড। এরপর নিয়মিত সময় নির্ধারণ করুন। প্রতিসপ্তাহে নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন, যেমন প্রতি শনিবার ২ ঘণ্টা। ছোট একটি প্রকল্প তৈরি করুন। যেমন ব্লগ পোস্ট, ভিডিও, প্রেজেন্টেশন, প্রোটোটাইপ বা ডেমো প্রোডাক্ট। এভাবে আপনি শেখা এবং প্রয়োগ একসাথে করবেন।
দক্ষতার মূলনীতি হ’ল আপনি একটি দক্ষতা আয়ত্ত করুন, সুযোগ নিজেই আপনার দরজায় আসবে। দক্ষতা মূলত পার্থক্য তৈরি করে স্বপ্নদ্রষ্টা ও সম্পাদনকারী, পর্যবেক্ষক ও অংশগ্রহণকারী, প্রান্তিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তির মধ্যে। সুতরাং আজ থেকেই একটা দক্ষতা অর্জনের কাজ শুরু করুন। মনে রাখবেন, দক্ষতা চর্চা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে অর্জিত হয়, জন্মগত নয়।
৫. কাজের ওপর সম্পূর্ণ মনোযোগ দিন : যদি এক সাথে অনেকগুলো কাজ শুরু করেন, তাহ’লে কোন কাজই পরিপূর্ণভাবে শেষ করতে পারবেন না। আজকের যুগে স্মার্টফোন, ক্রমাগত নোটিফিকেশন এবং একাধিক কাজের চাপের মধ্যে মনোযোগ একটি বিরল এবং অমূল্য সম্পদ। মস্তিষ্ক একসঙ্গে দু’টি গভীর কাজ করতে পারে না। চেষ্টা করলে আসে ক্লান্তি, বিভ্রান্তি, অপ্রতুল বা নিম্নমানের ফলাফল। সত্যিকারের সাফল্য আসে তখন, যখন প্রতিটি কাজকে দেওয়া হয় পূর্ণ সময় ও পূর্ণ মনোযোগ। যত বেশি ফোকাস করবেন, তত কম সময় লাগবে, দক্ষতা বাড়বে, এবং নিজের ওপর সন্তুষ্টি বাড়বে। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ কোনো মানুষের অন্তরে দু’টি হৃদয় দেননি’ (আহযাব ৩৩/৪)। অর্থাৎ আমাদের মন একসঙ্গে দুই জিনিসে ফোকাস করতে পারে না। তাই নিজেকে সম্মান করুন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যিনি সেরা নেতা ও শিক্ষক ছিলেন, যখন কোনো কাজ শুরু করতেন,
পুরো মন শরীর এবং আত্মা দিয়ে সেটি সম্পন্ন করতেন।
কার্যকরের উপায় : একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ বেছে নিন। উদাহরণ : লেখা, পড়াশোনা, প্রেজেন্টেশন প্রস্ত্ততি, যা কালকে করতে হবে। যাবতীয় বাধা দূর করুন। ফোনকে সাইলেন্ট বা এয়ারপ্লেনে রাখুন। যে কোনো সম্ভাব্য বিভ্রান্তি দূরে সরিয়ে রাখুন। ৬০ মিনিট একাগ্রতা। মৌলিক কাজের প্রতি সম্পূর্ণ মনোযোগ দিন, কোনো বিরতি নয়। এক ঘণ্টা শেষে মূল্যায়ন করুন। ১০ মিনিট বিশ্রাম নিন। তারপর নিজের জন্য প্রশ্ন করুন, কতটা কাজ সম্পন্ন হ’ল? মনোযোগের মান কেমন ছিল? কী কী বিষয় আমাকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিল? প্রতিদিন অন্তত একটি কাজের জন্য এই চ্যালেঞ্জটি পুনরাবৃত্তি করুন। এক সপ্তাহের মধ্যেই আপনি লক্ষ্য করবেন আপনার উৎপাদনশীলতায় অসাধারণ পরিবর্তন। সুতরাং আজকেই চ্যালেঞ্জ নিন। একসাথে একাধিক কাজ করার চেষ্টা বাদ দিন। প্রতিটি কাজকে দিন পূর্ণ মনোযোগ। দেখবেন দক্ষতা বাড়বে, সময় বাঁচবে এবং মানসিক শান্তি তৈরি হবে।
৬. যোগাযোগ দক্ষতা বাড়ান : কথা হ’ল হৃদয় ও মনের চাবিকাঠি। মনের সৌন্দর্য তার যুক্তিতে, আত্মার সৌন্দর্য তার চরিত্রে, আর মানুষের সৌন্দর্য তার যোগাযোগের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। মানুষ আপনাকে বিচার করে শুধু আপনার জ্ঞান দেখে না। বরং আপনি কীভাবে বলছেন এবং কীভাবে প্রকাশ করছেন তা দেখে। যতই আপনার জ্ঞান বা ক্ষমতা থাকুক না কেন, যদি তা প্রকাশে সক্ষম না হন, সবকিছু ভেতরে আবদ্ধ থেকে যাবে। যোগাযোগ মানে কেবল কথা বলা নয়। এটি হ’ল ভাবনা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা, অন্যকে বোঝানো ও প্রভাবিত করা, মনোযোগ দিয়ে শোনা, বুঝতে চাওয়া এবং সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে হ’তে পারে। আর এই যোগাযোগ হ’তে পারে কথার মাধ্যমে, লেখার মাধ্যমে বা শরীরী ভাষার (Body Language) মাধ্যমে। কাজের পরিবেশ বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধু বুদ্ধিমান হওয়া যথেষ্ট নয়। আপনাকে হ’তে হবে বোধগম্য, শ্রবণযোগ্য এবং প্রিয়জনের কাছে গ্রহণযোগ্য। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘বক্তৃতার মধ্যে জাদু রয়েছে’।[4] আপনার বক্তব্য এবং প্রকাশের ধরন মানুষের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
কার্যকরের উপায় : কারো কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। কথাগুলো নিজের ভাষায় পুনরায় বলুন। দেখুন, আপনি ঠিক বুঝেছেন কি না। মনে রাখুন, শোনা হ’ল প্রথম ধাপ মানুষের হৃদয় জয় করার। কথা বলার ক্ষেত্রে সহজ ও সরাসরি পরিষ্কার ভাষা ব্যবহার করুন। বোঝার সুযোগ দিন, যেন কেউ বিভ্রান্ত না হয়। কথা বলার সময় চোখে চোখ রাখুন। হাসি ও অভিব্যক্তি ব্যবহার করুন। হাতের নড়াচড়া কাজে লাগান। কথা ও অঙ্গভঙ্গি মিলিয়ে নিজের বার্তা শক্তিশালী করুন। একাই কথা না বলে অন্যকে সুযোগ দিন। এছাড়াও লিখিত যোগাযোগের ক্ষেত্রে স্পষ্ট ও প্রাঞ্জল বার্তা লিখুন। ইমেল, মেসেজ বা নোটে শব্দগুলো যেন সঠিক ও প্রভাবশালী হয়। কোন কথা বুঝতে সমস্যা হলে অনুমান এড়িয়ে চলুন। সরাসরি প্রশ্ন করুন, নিশ্চিত হোন। ভুল বোঝার থেকে তা অনেক গুণ ভালো।
সুতরাং প্রতিদিন একটি চিন্তাকে স্পষ্টভাবে অন্যের সামনে বলার অভ্যাস করুন। লেখা, কথা ও শরীরী ভাষার মাধ্যমে নিজের ভাব প্রকাশের অনুশীলন করুন। লক্ষ্য করুন, কীভাবে আপনার কথাবার্তা মানুষকে প্রভাবিত করছে। স্মরণ করুন, আপনার শব্দই শক্তি। সঠিকভাবে ব্যবহারে আপনি অন্যের হৃদয় জিততে পারেন।
৭. সৃজনশীল হৌন : সৃজনশীলতা কেবল কিছু নির্বাচিত মানুষের জন্য নয়। এটি আপনার ভেতরে, শুধু আপনার অনুমোদনের অপেক্ষায়। আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে, নকল বা প্রচলিত পথ যথেষ্ট নয়। এখন সৃজনশীলতার প্রয়োজনীয়তা চাকরি, সমস্যা সমাধান বা দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। সৃজনশীল হওয়া মানে শিল্পী বা উদ্ভাবক হওয়া নয়। বরং মানসিকতা হ’ল সবসময় প্রশ্ন করা ‘আর কি কোন ভালো উপায় আছে? নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়গুলো দেখা, কিভাবে ভিন্নভাবে দেখানো যায়? নতুন কিছু চেষ্টা করা ‘এভাবে করলে কি হবে? আল-কুরআন আমাদের চিন্তাভাবনা ও পর্যবেক্ষণের জন্য উৎসাহ দেয়। কারণ যারা জানে আর যারা জানেনা তারা সমান নয় (যুমার ৩৯/৯)। জ্ঞান তখনই ফল দেয়, যখন মস্তিষ্ক সচল থাকে, কল্পনা জাগ্রত হয় এবং নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন মদীনায় রাষ্ট্র স্থাপন করেছিলেন, তিনি উদ্ভাবনী সমাধান করেছিলেন ভ্রাতৃত্বের নতুন ধারা, সংবিধান লেখা, বাজারের নিয়ম চালু করা, বিরোধীদের সঙ্গে সমঝোতা। এগুলো হ’ল সৃজনশীলতা ও বাস্তবায়নের অসাধারণ উদাহরণ।
কার্যকরের উপায় : একটি কাজ বেছে নিন যা আপনি সাধারণভাবে করেন। যেমন পড়াশোনা, সময় ব্যবস্থাপনা, প্রোগ্রাম আয়োজন বা প্রেজেন্টেশন। তিনটি বিকল্প ভাবনা ভাবুন। প্রথমত নতুন ও উদ্ভাবনী ভাবনা। দ্বিতীয়ত একটু পাগলামী বা চরম ভাবনা। তৃতীয়ত দু’টি ভাবনার সংমিশ্রণ। তথাপি কোন ধারণা তৎক্ষণাৎ বাতিল করবেন না। আগে লিখুন, পরে মূল্যায়ন করুন।
প্রতিদিন ১০টি নতুন ধারণা লিখুন। যেমন মাদ্রাসা, প্রতিষ্ঠান, কোন সমস্যা, কনটেন্ট, প্রোজেক্ট বা যেকোনো কিছু। মনে রাখুন সৃজনশীল মানুষ বাস্তবতাকে দেখেন না, বরং দেখেন তা কিভাবে হ’তে পারে। কল্পনার দরজা খুলুন। অচিন্তিত সমাধান খুঁজে বের করুন। শুধু অনুসারী হবেন না, নিজের পথ নিজেই তৈরি করুন। মনে রাখবেন, ছোট ছোট ভাবনাও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তাই আজই শুরু করুন। আপনার মন হ’ল সীমাহীন সম্ভাবনার খনি। প্রতিটি কাজকে নতুনভাবে করার উপায় ভাবুন। ছোট পরিবর্তনেও নতুনত্ব আনুন। নিজেকে সীমাবদ্ধ করবেন না। নিজের ভাবনাকে উন্মুক্ত করুন। মনে রাখুন, যে ব্যক্তি সৃজনশীলভাবে চিন্তা করে, সে শুধু সমাধান খুঁজে পায় না, সে সুযোগ তৈরি করে, প্রভাব বিস্তার করে এবং নিজের জগতকে বিস্তৃত করে। (ক্রমশঃ)
আবু আফিয়া
[লেখক : এমফিল গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়]
[1]. বুখারী হা/৬৪১২; মিশকাত হা/৫১৫৫।
[2]. মানাকিবু ইমাম আহমাদ ৩১ পৃ.; আল-মাশূকু ইলা ত্বলাবিল ইলম ১/২৭।
[3]. শো‘আবুল ঈমান হা/১০২৫৪; ছহীহাহ হা/৩৪২।
[4]. বুখারী হা/৫৭৬৭; মিশকাত হা/৪৭৮৩।