সফলতার দৈনন্দিন কর্মসূচী (২য় কিস্তি)

আবু আফিয়া 53 বার পঠিত

অর্থকে নিয়ন্ত্রণ করুন : বিশ্বজনীন একটি প্রবাদ আছে, ‘অর্থ এক অনুগত দাস, কিন্তু ভয়ংকর বস্ত্ত’। আজকের এই ঝলমলে পৃথিবীতে বিজ্ঞাপন, বিলাসিতা ও ভোগবাদের ঢেউয়ে আমরা প্রায়শই ডুবে যাচ্ছি। মাস শেষ হওয়ার আগেই আয় ফুরিয়ে যায়। আর আমরা ভাবি, আরও বেশি আয় করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সমস্যা আয়ে নয়, ব্যয় ব্যবস্থাপনায়।

অর্থ আসলে কেবল বেঁচে থাকার মাধ্যম নয়; এটি স্বাধীনতার চাবিকাঠি, কাজের শক্তি ও প্রশান্তির হাতিয়ার। কিন্তু যখন অর্থের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়, তখন সেটিই হয়ে ওঠে আমাদের দুশ্চিন্তা ও অশান্তির অতল গহবর, যা ধীরে ধীরে টেনে নেয় আমাদের স্বপ্ন, মানসিক স্থিরতা আর হৃদয়ের প্রশান্তি।

তাই শুরু করুন সচেতনতা। আমি কত আয় করি? কোথায় ব্যয় করি? কোনটা প্রয়োজন, আর কোনটা কেবল বিলাসিতা? কতটা সঞ্চয় করা যায়, আর কীভাবে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বিনিয়োগ করা সম্ভব? আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সুন্দর ভারসাম্যের শিক্ষা দিয়েছেন,وَلَا تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلَى عُنُقِكَ وَلَا تَبْسُطْهَا كُلَّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ مَلُومًا مَحْسُورًا- ‘তুমি তোমার হাতকে গুটিয়ে গ্রীবালগ্ন করে রেখ না এবং তাকে একেবারে মুক্ত করে দিয়ো না। তাহ’লে তুমি নিন্দিত ও নিঃস্ব হয়ে বসে পড়বে’(বনু ইস্রাঈল ১৭/২৯)

এই কুরআনিক শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় সফল জীবন মানে ভারসাম্যপূর্ণ জীবন। যেখানে আয়-ব্যয়, সঞ্চয় ও দান সবই সুন্দর সমন্বয়ে চলে। তাই কেবল অর্থ উপার্জনই আপনার উদ্দেশ্য নয়। বরং তার সঠিক ব্যবস্থাপনাও আপনার দায়িত্ব। অর্থকে বুদ্ধিমত্তার সাথে ব্যবহার করতে পারলে জীবন হবে শান্ত, স্থিতিশীল ও সম্মানজনক। মনে রাখবেন, আপনি অর্থের মালিক, অর্থ আপনার মালিক নয়। তাই আপনি আপনার প্রয়োজন মোতাবেক ব্যয় করুন, অর্থ থাকলেই বিলাসিতা করবেন না।

কার্যকরের উপায় : একটি শান্ত মুহূর্ত বেছে নিন। এক কাপ চা হাতে বসে পড়ুন নিজের মাসিক আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে, যেন সে আপনার কোনো প্রিয় বন্ধু। আপনার মাসিক আয় লিখে ফেলুন। স্থায়ী খরচগুলো চিহ্নিত করুন। যেমন বাড়িভাড়া, যাতায়াত খরচ, বিভিন্ন বিল, পড়াশোনা ইত্যাদি যা নিয়মিত প্রদান করতে হয়। পরিবর্তনশীল খরচগুলো আলাদা রাখুন। যেমন বাজার খরচ, শপিং, ভ্রমণ, বিনোদন ইত্যাদি যা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। চলতি মাসের প্রয়োজনীয় খরচ ও বিলাসী সামগ্রী চিহ্নিত করুন। সঞ্চয়ের একটি নিয়মিত অভ্যাস তৈরী করুন। সামান্য হ’লেও দৈনিক, সাপ্তাহিক বা মাসিক কিছু সঞ্চয় করুন; যা আপনার দুশ্চিন্তা দূর করবে ও আকস্মিক বিপদে কাজে লাগবে। নিয়মিত একটি অংশ দানের জন্য বরাদ্দ করুন। এতে বরকত লাভ ও আল্লাহর নৈকট্য হাছিল হবে ইনশাআল্লাহ।

কোন জিনিস শুধু ছাড় আছে বলে কিনবেন না। আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, সত্যিই কি এটা আপনার দরকার আছে? মনে রাখবেন, টাকার পরিমাণ নয়, অভ্যাসই নির্ধারণ করে আর্থিক সাফল্য। আপনার বর্তমান আয়ের মধ্যেই গড়ে তুলুন সুশৃংখল অর্থনৈতিক জীবন। দেখবেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টাকাও আপনার কথা শুনবে। আর আপনি হবেন এর অধিপতি, দাস নয়।

৯. ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করুন : যার জীবনের জন্য কোন পরিকল্পনা নেই, সে সারাজীবন অন্যের পরিকল্পনার অংশ হয়। আপনি কি কখনো নিজেকে প্রশ্ন করেছেন আগামী পাঁচ বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চান? আপনার আর্থিক অবস্থা, পেশাগত অবস্থান, পারিবারিক জীবন কেমন হবে তা কি ভেবে দেখেছেন? আর যদি আজকের মতোই জীবন চলতে থাকে কোনো পরিবর্তন ছাড়া, তবে আপনি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন? দুঃখজনক হলেও সত্য, অধিকাংশ মানুষ শুধু আজকের দিনটিই বাঁচে। তাদের কোনো লক্ষ্য নেই, কোন পরিকল্পনা নেই, ভবিষ্যতের স্পষ্ট কোনো রূপরেখা নেই।

জীবন একটানা ছুটে চলা এক ট্রেনের মতো। যদি আপনি গন্তব্য ঠিক না করে ট্রেনে উঠে পড়েন, তবে ট্রেন আপনাকে এমন জায়গায় পৌঁছে দেবে, যেখানে আপনি যেতে চাননি! সেখান থেকে ফিরে সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছানো তখন আপনার জন্য কেবল কঠিনই নয়; প্রায় অসম্ভব। সুতরাং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কোন বিলাসিতা নয়; এটি একটি মানসিক, আর্থিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়োজন। এটি আপনাকে দেয় স্পষ্টতা, স্থিরতা ও আত্মবিশ্বাস। যা বিপদের সময় আপনাকে স্থির রাখে, আর সুযোগের সময় আপনাকে এগিয়ে দেয়।

ইসলামও আমাদের এই দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গির শিক্ষা দিয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ ‘আর প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত এ বিষয়ে ভেবে দেখা যে, সে আগামী দিনের জন্য কি অগ্রিম প্রেরণ করছে?’(হাশর ৫৯/১৮)

মানুষকে শুধু পরকাল নয়, দুনিয়ার আগামী দিনের কথাও ভাবতে হবে। ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা মানে তাক্বদীরে অবিশ্বাস নয়; বরং সচেতনভাবে পরিকল্পিত জীবন-যাপন করা। তাই এখনই জীবনের একটি রূপরেখা হাতে নিন। তবে এমন স্বপ্ন দেখবেন না, যা কেবল মনের মধ্যেই সাজানো থাকে, বাস্তবে রূপ লাভ সম্ভব নয়। এমন পরিকল্পনা করবেন না, যা আপনার সামর্থ্যের মধ্যে নেই।

কার্যকরের উপায় : যে নিজের ভবিষ্যৎ নিজে গড়ে নেয়, তার হাতেই সফলতার চাবি থাকে। আপনার স্বপণগুলোকে কাগজে লিখুন, আর প্রতিদিন একটু একটু করে সেই স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যান। প্রতিটি লক্ষ্যের নিচে একটি সোনালী প্রশ্ন লিখুন, এই লক্ষ্য পূরণে আমি কী কী প্রথম পদক্ষেপ নিতে পারি? পদক্ষেপগুলো দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক কর্মসূচীতে ভাগ করুন। প্রত্যেক মাস শেষে হিসাব করুন, এই মাসে আমি কতটুকু পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পেরেছি। তাই পরিকল্পনা করুন, যদিও তা প্রথমে সামান্য ও সরল মনে হয়। কারণ, পরিকল্পনা আপনাকে দিকনির্দেশনা দেয়, মনকে প্রেরণা জোগায়, আর জীবনের উদ্দেশ্যকে আরও গভীর অর্থে রাঙিয়ে তোলে।

১০. জামা‘আতবদ্ধ বা দলগত কাজ শিখুন : প্রবাদ আছে, তুমি যদি দ্রুত যেতে চাও, তবে একা যাও। কিন্তু যদি বহু দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে চাও, তবে একসাথে যাও। এই কথাটি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সত্য। ব্যবসা, প্রকল্প, দাওয়াতী কাজ কিংবা সমাজ গঠনে দলগত বা জামাআতবদ্ধ প্রচেষ্টার কোন বিকল্প নেই; এটি অপরিহার্য।

আপনার ব্যক্তিগত দক্ষতা হয়তো দরজা খুলে দিতে পারে, কিন্তু সহযোগিতাই আপনাকে সেই দরজার ভেতর টিকিয়ে রাখে। একজন মানুষ যতই মেধাবী হেŠক, সে একা সব কিছু করতে পারে না। সে একসাথে সব কাজের কাজী হ’তে পারে না। কিন্তু যখন আপনি এমন এক জামাআত বা দল গড়ে তুলবেন, যেখানে পারস্পরিক বোঝাপড়া, আস্থা ও পরিপূরক দক্ষতা রয়েছে, তখন কাজ হবে আরও দ্রুত, আরও নিখুঁত।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)ও মুহাজির ও আনছারদের সমন্বয়ে গড়ে তুলেছিলেন ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ দল। তিনি তাঁদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে এমন এক আদর্শ দ’ল সৃষ্টি করেন, যার ফলেই ইসলাম বিস্তৃত হয় বিশ্বজুড়ে। হোদায়বিয়ার সন্ধির পর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বিভিন্ন অঞ্চলে দাওয়াতী কাজের জন্য প্রতিনিধি প্রেরণ করেন। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে ইসলাম অনেক দূর পৌঁছে যায়, যা রাসূলের একার পক্ষে কখনোই সম্ভব ছিল না।

টিমওয়ার্ক বা দলগত কাজ মানে নতুন কিছু শেখা, একটি বিষয়কে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা, দায়িত্ব ভাগ করে সকলে মিলে একসাথে পথ চলা। মনে রাখবেন, আপনি একা গতি আনতে পারেন, কিন্তু ঐক্যবদ্ধ কাজ স্থায়ী সাফল্য নিয়ে আসে।

কার্যকরের উপায় : দলগত কাজের জন্য ৩ C সূত্র : (১) Clarify : লক্ষ্য স্পষ্ট করুন। কাজ শুরু করার আগে সবাইকে জানান ঠিক কী করতে হবে এবং কেন করতে হবে। স্পষ্ট লক্ষ্য সবাইকে এক সাথে এগোতে সাহায্য করে। (২) Contribute : প্রত্যেকের শক্তি ও দক্ষতা অনুযায়ী দায়িত্ব বণ্টন করুন। যে লেখায় ভালো, সে লিখবে; যে পরিকল্পনায় পারদর্শী, সে পরিকল্পনা করবে; যে বক্তৃতায় পটু, সে প্রচারের দায়িত্ব পালন করবে। সবাইকে তাদের শক্তির জায়গায় রাখতে পারলেই দ্রুত অগ্রগতি হবে। (৩) Celebrate: সাফল্য উদযাপন করুন। যখন কাজ সফল হয়, একসঙ্গে আনন্দ উদযাপন করুন। প্রশংসা ও স্বীকৃতি দিয়ে দলকে আরও উৎসাহিত করুন এবং মনোবল বাড়ান। যা অসাধারণ সাফল্য বয়ে নিসে আসবে।

১১. প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করুন : প্রযুক্তি নিজে ভালো বা খারাপ নয়। এটি একটি সরঞ্জাম। এর ভালো-মন্দ নির্ভর করে সেটি কে ও কিভাবে ব্যবহার করছে তার উপরে। এই ডিজিটাল যুগে, প্রযুক্তি আর কোনো বিকল্প নয়; এটি বেঁচে থাকার ও এগিয়ে থাকার অন্যতম শর্ত। কিন্তু মূল পার্থক্য সফল ও সাধারণ মানুষের ব্যবহারে। আপনি কি প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করছেন, না কি প্রযুক্তি আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করছে? উদাহরণ স্বরূপ একটি স্মার্টফোন হ’তে পারে আপনার শিক্ষা অর্জনের অমূল্য হাতিয়ার বা হ’তে পারে সময় নষ্ট করার এক বিশাল কুয়াশা। ইন্টারনেট এক বিশাল সমুদ্র, যেখানে লক্ষ্যহীন বিচরণ করলে অপ্রয়োজনীয় বিনোদন ও কনটেন্ট আপনাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে রঙিন কল্পনায়। আপনার অজান্তে কেড়ে নেবে আপনার মূল্যবান প্রতিটি মুহূর্ত। সফল মানুষরা প্রযুক্তিকে এড়িয়ে যায় না। বরং প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে কাজের গতি বাড়াতে, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে, নতুন কিছু শিখতে ও নিখুঁতভাবে কার্য সম্পাদন করতে।

বাস্তবতা হ’ল প্রযুক্তি আপনার দাস নয়; আপনি প্রযুক্তির দাস বনে গেছেন! তাই এখনই প্রযুক্তি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করুন। ফোন ব্যবহারের সময় সীমা নির্ধারণ করুন। শিক্ষামূলক অ্যাপস ও কন্টেন্টের জন্য সময় বেঁধে দিন। সামাজিক নেটওয়ার্কে ডুবে যাওয়ার আগে জিজ্ঞেস করুন, এটি কি সত্যিই আমাকে এগিয়ে নেবে? এই অনুশীলন শুধু সময় বাঁচাবে না বরং আপনার জীবনের উপর আপনার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে। প্রবৃত্তি আপনাকে অসৎ পথে পরিচালিত করতে পারবে না।

কার্যকরের উপায় : একটা সপ্তাহ হোক আপনার ডিজিটাল ক্ষমতা বাড়ানোর সপ্তাহ। লক্ষ্য হ’ল প্রযুক্তি আপনার শত্রু নয়, বরং শক্তিশালী সহযোগী। চ্যালেঞ্জ নিন আর অপচয় রোধ করুন। ফোনে এমন কিছু অ্যাপস আছে, যা শুধু সময় নষ্ট করে, সাময়িক বিনোদন ব্যতীত আপনাকে কিছুই দেয় না। সেগুলো আজই মুছে ফেলুন। ছোট ছোট অপচয়ই বড় লক্ষ্যকে আটকায়। উপকারী অ্যাপ ইনস্টল করুন। যেমন, শামেলা, টাস্ক ম্যানেজমেন্ট, শিক্ষামূলক পডকাস্ট, অনলাইন কোর্স ইত্যাদি কোন কাজ বা পড়াশোনার সময় ফোনটি ফোকাস মোড-এ রাখুন। এক মিনিটের মনোযোগ তৈরি করে ঘন্টার অর্জন। এছাড়াও দৈনিক নতুন দক্ষতা শেখা বা অনলাইন কোর্সে অংশ নেওয়ার জন্য সময় নির্ধারণ করুন। কেননা নতুন কিছু শেখা মানে প্রতিদিন নিজের সম্ভাবনাকে ১% বাড়িয়ে নেওয়া। ডিজিটাল ফোল্ডার তৈরি করে নিজের ফাইল, সিভি, প্রজেক্ট সবকিছু সুশৃংখল রাখুন। সংগঠিত ও সুশৃংখল তথ্য মনকে পরিষ্কার রাখে ও দ্রুত কাজ সম্পাদনে সহযোগিতা করে।

সুতরাং ফোন শুধু একটি ডিভাইস নয়। এটি হ’তে পারে আপনার সবচেয়ে বড় শক্তি। যদি আপনি হৌন স্মার্ট ব্যবহারকারী। যারা প্রযুক্তি সচেতনভাবে ব্যবহার করে, তারা সময় বাঁচায়, অর্জন দ্বিগুণ করে এবং জীবনে অন্যদের থেকে এগিয়ে থাকে।

১২. ভুল থেকে শিখুন : ভুল কখনো শেষ নয়। বরং এটি আপনার উন্নতির নতুন পথ। সত্য হ’ল যারা ভুল করে না, তারা কাজই করে না। যারা ভুল স্বীকার করে না, তারা শেখে না। সফল মানুষের এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য হ’ল ভুলের ভয় নয়, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার ক্ষমতা। অনেকেই ভুলের ভয় থেকে দাঁড়িয়ে যায়, চেষ্টা করতে ভয় পায়। কিন্তু মনে রাখবেন চেষ্টা করে ভুল করা, কিছু না করার চেয়ে উত্তম।

তবে ভুল থেকে শিখতে হবে। প্রতিবার নতুন ভুল হোক। কিন্তু একই ভুল বারবার করা যাবে না। নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, لَا يُلْدَغُ الْمُؤْمِنُ مِنْ جُحْرٍ وَاحِدٍ مَرَّتَيْنِ ‘মুমিন একই গর্ত থেকে দু’বার দংশিত হয় না’ (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫০৫৩)। অর্থাৎ মুমিন এক ভুল বারবার করে না।

ভুল করা মানে হার মানা নয়; ভুল থেকে শেখা মানে বড় জয়। প্রতিটি ভুল আপনার শক্তি, বুদ্ধিমত্তা এবং সাহসের নতুন দিক উন্মোচন করে। ভুল থেকে উত্তরণের নতুন অভিজ্ঞতা যোগ করে। ভুলকে ভয় করে এড়িয়ে গেলে আপনি কখনো বড় অর্জন করতে পারবেন না। প্রতিটি ভুলকে শেখার সুযোগ বানান, আর আগামীতে তা জয় করুন।

কার্যকরের উপায় : যখন আপনি কোনো ভুল করবেন, হোক সেটা কোন সিদ্ধান্তে বা দৈনন্দিন জীবনের কোন কাজে। ১০ মিনিট সময় নিন এবং একটি নোট তৈরী করুন। ভুলটা কী? স্পষ্টভাবে লিখুন, কোনো অযুহাত ছাড়াই। কেন হ’ল? আপনি কি কোন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিস করেছিলেন? অন্য কেউ কি প্রভাব ফেলেছিল? আপনি কি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন? এই ভুল থেকে কোন মূল শিক্ষা বা অন্তর্দৃষ্টি পেয়েছেন? কিভাবে এ ধরনের ভুল থেকে বেঁচে থাকবেন? ভবিষ্যতে কি সতর্কতা নেবেন? কারু সাথে পরামর্শ করবেন? নতুন কৌশল শিখবেন বা প্রশিক্ষণ নিবেন?

সুতরাং চ্যালেঞ্জ নিন, প্রতিদিন রাতে ডায়েরীতে আপনার ভুলগুলো লিখুন। প্রতিটি ভুল থেকে একটি শিক্ষা বের করুন। আগামীবারের জন্য পরিষ্কার পরিকল্পনা তৈরি করুন, যাতে ভুল না হয়। ১ মাস পরে আপনি নিজেই অবাক হয়ে যাবেন আপনার সিদ্ধান্ত, দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস কতটা পরিবর্তিত হয়েছে।

১৩. ভয়কে জয় করুন : কারণ এটি অদৃশ্য সবচেয়ে বড় বাধা। ভয় মৃত্যু আটকায় না, কিন্তু ভয় জীবনকে আটকায়। কতগুলো দুর্দান্ত পরিকল্পনা জন্মের আগেই হারিয়েছে শুধু আপনার ভয়ের কারণে! কতগুলো সফল প্রকল্প শুরু হয়নি, কারণ কেউ সাহস করতে পারে না ব্যর্থতা, সমালোচনা বা ক্ষতির ভয়ে। ভয় থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু কখনোই আপনি এই কারণে বন্দী হ’তে পারেন না। সফল মানুষরা ভয়হীন নয়। তবে তারা জানে কিভাবে ভয়কে বাধা নয়, শক্তিতে রূপান্তরিত করতে হয়। ব্যর্থতার ভয়, ভুল করার ভয়, মানুষের কথার ভয়, পরিবর্তনের ভয় এগুলি মিথ্যা প্রতিবন্ধকতা তৈরী করে। প্রতিটি ছোট ভয় বড় বাধায় রূপ নেয়, যতক্ষণ আপনি সাহস না দেখান। আল্লাহ বলেন, ‘অতএব তাদের ভয় কর না; বরং আমাকে ভয় কর, যদি তোমরা মুমিন হও’(আলে ইমরান ৩/১৭৫)। তাই সত্যিকারের ভয় হওয়া উচিত আল্লাহর বিধানের প্রতি অবহেলার, মানুষ বা পরিস্থিতির নয়।

কার্যকরের উপায় : একটি শান্ত সময়ে একটুকরো কাগজ নিন, আর নিজের সঙ্গে একটু সৎ হোন। কোন ভয়টি আজ আপনাকে সবচেয়ে বেশি আটকে রেখেছে? হ’তে পারে নতুন কোন কাজ শুরু করা, জনসমক্ষে কথা বলা কিংবা নিজের আইডিয়া প্রকাশ করা। সবচেয়ে খারাপ কী ঘটতে পারে? একটু বাস্তবভাবে ভাবুন। এটা কি সত্যিই ভয়ংকর? নাকি শুধু সামান্য বিব্রতকর বা সাময়িক অস্বস্তি? যদি আপনি এই ভয়কে জয় করেন, সবচেয়ে ভালো কী হ’তে পারে? আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়বে, নতুন দরজা খুলবে, হয়ত জীবনের দিকটাই পাল্টে যাবে। আজই এর মোকাবিলায় আপনি কী ছোট পদক্ষেপ নিতে পারেন? একটা ফোন কল, তথ্য সংগ্রহ, কারো পরামর্শ অথবা একটি ছোট পরিকল্পনা যা-ই হোক, শুরু করুন।

ভয়কে যত প্রশ্রয় দিবেন, সে তত বড় হবে। আর যত কাছে গিয়ে মুখোমুখি হবেন, সে তত ছোট হয়ে যাবে। মনে রাখবেন প্রতিটি পদক্ষেপ যা আপনি ভয় থাকা সত্ত্বেও নেন, তা আপনাকে আগের চেয়ে আরও শক্ত, আরও জ্ঞানী করে তোলে। ভয়কে আপনার বছরগুলো চুরি করতে দেবেন না। উঠে দাঁড়ান, মুখোমুখি হোন। কারণ সাহস মানে ভয় না থাকা নয়। বরং ভয়ের মাঝেই এগিয়ে যাওয়ার শক্তি খুঁজে পাওয়া।

তাই প্রতিটি ভয়কে সাহসী পদক্ষেপের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ বানান। ভয় আপনাকে থামাতে পারবে না। আজই একটি ছোট কাজ করে ভয়ের মুখোমুখি হৌন এবং লক্ষ্য অর্জনের পথে এক ধাপ এগিয়ে যান।

(ক্রমশঃ)

[এমফিল গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়]



আরও