ইসলামপূর্ব ৪টি সভ্যতা ও তাদের অধঃপতন

মুহাম্মাদ আরাফাত যামান 374 বার পঠিত

ভূমিকা : মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উপর ইসলামকে দ্বীন হিসাবে মহান আল্লাহ সকল দ্বীনের উপর মনোনীত করেছেন। তাই এই দ্বীন আবির্ভাবের মাধ্যমে বিশ্ব যে নতুন সভ্যতার সাথে পরিচিত হয়েছে তা ছিল বিগত সকল সভ্যতার চেয়ে উৎকৃষ্ট। ইসলাম পূর্ব বিশ্বজুড়ে মূলত গ্রিক, ভারতীয়, পারস্য এবং রোমান সভ্যতা বিদ্যমান ছিল। এসব সভ্যতা মানবজাতির বিকাশ ও উৎকর্ষে অবদান রেখেছে। কিন্তু মানব ইতিহাসে এই সভ্যতাগুলোর অবদান থাকলেও তারা নিজেদেরই টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয়েছিল। তাদের অধঃপতনের এই কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে পাঠক মাত্রই বুঝতে পারবেন এর প্রেক্ষিতে ইসলামই শ্রেষ্ঠ সভ্যতা। যা দ্বারা আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভোগা যেকোন মুসলিম নিজের সভ্যতা নিয়ে গর্বিত হবেন ইনশাআল্লাহ।

১. গ্রিক সভ্যতা : গ্রিক সভ্যতা সবচেয়ে আলোচিত প্রাচীন বিশ্বসভ্যতা। যা আধুনিক সভ্যতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দর্শন, জ্ঞানবিজ্ঞান, সাহিত্য ও শিল্পে গ্রিস ছিল উন্নত। সেখানে জন্ম নিয়েছিলেন অনেক বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও সাহিত্যিক। যারা ছিলেন বিশ্ব চিন্তার স্তম্ভ। যেমন সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল। কিন্তু দর্শন ও চিন্তার ক্ষেত্রে তাদের উৎকর্ষ থাকা সত্ত্বেও তাদের রেখে যাওয়া ঐতিহ্য সমূহের কারণেই অবশেষে এই সভ্যতার পতন ঘটে। এইরকম কিছু কারণে উল্লেখ করা হ’ল।-

ক. নোবল সিটি : দার্শনিক প্লেটো গ্রিসকে নোবল সিটি বা অভিজাত নগরীর ধারণা দেন। তিনি মনে করতেন যে, অভিজাত নগরী তিন শ্রেণীর মানুষ দ্বারা গড়ে উঠবে। প্রথম শ্রেণীতে থাকবে দার্শনিক ও জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিবর্গ। দ্বিতীয় শ্রেণীতে থাকবে সেনাসদস্যরা এবং তৃতীয় শ্রেণীতে থাকবে শ্রমিক ও কৃষকেরা। তাতে শাসনকার্য পরিচালনা করবেন কেবল দার্শনিকেরা। প্লেটো সেনাশ্রেণীর জন্য অমানবিক কিছু নিয়ম তৈরি করেন। যেমন, তাদের কোন ব্যক্তি স্বাধীনতা থাকবে না। তারা পরিবার গঠন করতে পারবে না এবং কোন কিছুর মালিক হ’তে পারবে না। সৈনিকদের জন্য নারীদের যৌথ সম্পত্তি হিসাবে দেওয়া হ’ত। এ সকল নারীর সন্তানদের পিতৃ পরিচয় ছিল না, তারা হ’ত রাষ্ট্রের সন্তান। অভিজাত নগরীতে তৃতীয় শ্রেণী অর্থাৎ মজদুর ও কৃষকদের দায়িত্ব ছিল শাসক শ্রেণী ও সেনা শ্রেণীর সেবা ও খেদমত নিশ্চিত করার জন্য শ্রম ব্যয় করা। এই শ্রেণীর কোনো মানবিক অধিকারই ছিল না। প্লেটোর নগরীতে অসুস্থের কোন ঠাঁই ছিল না। রাষ্ট্র তাদেরকে দূরে ছুড়ে দিত। এই হ’ল প্লেটোর অভিজাত নগরীর চিত্র’।[1]

খ. অ্যারিস্টটলের দাসপ্রথা : অ্যারিস্টটলের মতে, প্রকৃতি দাস-মানবদের দিয়েছে শক্তিশালী দেহ, পক্ষান্তরে স্বাধীন মানবদের দিয়েছে অসাধারণ বুদ্ধি ও পরিপক্ব চিন্তা। তাই দাসদের শরীর কঠিন কাজ করার জন্য উপযুক্ত। আর স্বাধীনদের শরীর নগরী বা শহুরে জীবন পালনের উপযুক্ত। তার এই চিন্তা ছিল প্রাকৃতিক অধিকারে সমতানীতির বিরুদ্ধে’।[2]

গ্রিক সভ্যতা প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের এই অমানবীয় চিন্তাধারার মূল্যায়ন করেছে এবং একে একপ্রকার প্রজ্ঞা বলে আখ্যায়িত করেছে। তাইতো উইল ডুরান্ট এ ব্যাপারে আলোচনা করেছেন এবং তিনি বলেছেন, উত্তম চরিত্রের ক্ষেত্রে গ্রিকরা দৃষ্টান্ত হ’তে পারে না’।[3]

গ্রিক সভ্যতার অধঃপতনের ক্ষেত্রে আরও কিছু উল্লেখযোগ্য কারণ।-

গ. তারা প্রবৃত্তির অনুসারী হয়ে গিয়েছিল এবং শুধুমাত্র শারীরিক সুখের পেছনে ছুটছিল। এটাই তাদের সভ্যতার অধঃপতন ত্বরান্বিত করেছিল।

ঘ. দার্শনিকরা খাদ্যের উৎসগুলোতে অধিবাসীদের চাপ কমানোর অজুহাত দেখিয়ে শিশুহত্যা বৈধ করেছিল। এর ফলে নগর ও দেশ বিরান হয়ে পড়েছিল। গ্রিক সভ্যতাকে কেন্দ্র করে বানানো নাটকগুলোতে গ্রিসের রাজধানী এথেন্সের চরিত্রহীন, ভ্রষ্টতা ও জৈবিক যথেচ্ছাচারে ভরপুর জীবনের চিত্র ফুটে উঠে। তাই পতন ছিল স্বাভাবিক পরিণাম’।[4]

২. ভারতীয় সভ্যতা : আর্যদের ভারতীয় সভ্যতা উন্নতি ও উৎকর্ষের শিখরে পৌছা সত্ত্বেও ৬০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে প্রতিটি ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ধর্মীয়, নৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে অবনতি ও অধঃপতনের পথে দ্রুত নেমে যেতে থাকে। এর কিছু কারণ হ’ল।

ক. শ্রেণী প্রথা : মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর জন্মের প্রায় ৯০০ বছর পূর্বে ভারতবর্ষে ব্রাহ্ম-সভ্যতার সূচনা ঘটে। এতে ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার জন্য নতুন নির্দেশনা প্রস্ত্তত করা হয়। যা বর্তমানে মনুশাস্ত্র (মনুসংহিতা) নামে পরিচিত। এই আইন দেশের অধিবাসীদের চার শ্রেণীতে বিভক্ত করেছে। সেগুলো হ‘ল : (১) ব্রাহ্মণ : গণক ও ধর্মীয় পুরোহিত শ্রেণী। (২) ক্ষত্রিয় : সৈনিক বা যোদ্ধা শ্রেণী। (৩) বৈশ্য : কৃষক ও বণিক শ্রেণী। (৪) শূদ্র : সেবক ও দাস শ্রেণী।

এই শ্রেণীকরণ ব্রাহ্মণদের দেবতাসনে আসীন করেছিল। মনু বলেছেন, ব্রাহ্মণরা হ’ল ঈশ্বরের অন্তরঙ্গ বন্ধু এবং তারাই সৃষ্টিজগতের দেবতা। পৃথিবীতে যা কিছু আছে সব তাদের অধীন। তারা শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি এবং বিশ্বব্রহ্মান্ডের প্রভু। তারা তাদের দাস শূদ্রশ্রেণীর সম্পদ থেকে যা খুশি নিতে পারবে। কারণ, দাস কোনো কিছুর মালিক হ’তে পারে না, তার সমস্ত সম্পত্তিই তার প্রভুর সম্পত্তি। মনুসংহিতার আইনের ফলে ভারতীয় সমাজে শূদ্র শ্রেণী ছিল পশুর চেয়েও পতিত, কুকুরের চেয়েও নিকৃষ্ট। কুকুর, বিড়াল, ব্যাঙ, গিরগিটি, কাক ও পেঁচা হত্যার যে জরিমানা ছিল, শূদ্রশ্রেণীর লোকদের হত্যার জরিমানাও ছিল একই’।[5]

খ. নারী সমাজ : ভারতীয় সমাজে নারীদের অবস্থান ক্রীতদাসীর চেয়ে বেশি কিছু ছিল না। জুয়াখেলায় পুরুষেরা নিজের স্ত্রীকে বাজি রাখত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক নারীর একাধিক স্বামী হ’ত। আবার কারও স্বামী মারা গেলে সে চিরতরে বিধবা হয়ে যেত। কখনো দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারত না। তার জীবন হয়ে উঠত লাঞ্ছনা-যন্ত্রণাময়। সে মৃত স্বামীর বাড়িতে দাসী হিসাবে থাকত এবং স্বামীর ভাইবোনদের সেবা করে জীবন কাটাত। কখনো আবার কিছু নারী এই পার্থিব জীবনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় মৃত স্বামীর সঙ্গে চিতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজেকে পুড়িয়ে ফেলে আত্মাহুতি দিত’।[6]

ইসলামের পূর্বে এমনই ছিল ভারতীয় সভ্যতা। এমন লজ্জাজনক, অজ্ঞতা, নিকৃষ্ট পৌত্তলিকতা এবং সামাজিক অন্যায়-অবিচারের দৃষ্টান্ত পৃথিবীর আর কোনো জাতির মধ্যে ছিল না। ইতিহাসেও এর কোনো দৃষ্টান্ত নেই।

৩. পারস্য সভ্যতা : পারসিকরা বিপুল বিস্তৃত সাম্রাজ্য এবং দীর্ঘস্থায়ী সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করেছিল। সভ্য বিশ্বের কর্তৃত্বে ও নেতৃত্বে তারা ছিল রোমানদের সমান। রাজনীতি, প্রশাসন, যুদ্ধজয়, বিলাসব্যসন ও সুখস্বাচ্ছন্দ্যে তারা উৎকর্ষ সাধন করে। তাদের পতনের কিছু কারণ নিচে উল্লেখ করা হ’ল।-

ক. অগ্নি পূজা : প্রাচীন যুগে তারা আল্লাহর ইবাদত করত এবং তাঁর উদ্দেশ্যে সিজদা দিত। এরপর তারা পূর্বসূরিদের মত সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্ররাজি ও জ্যোতিষ্কমন্ডলীকে মর্যাদা দিতে শুরু করে। এরপর সমাজ সংস্কারক রূপে জরথুষ্ট্রের (খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ৬৬০-৫৮৩) আবির্ভাব ঘটে। তিনি উপাসনার সময় সূর্য ও আগুনের প্রতি নিবিষ্টচিত্ত হ’তে নির্দেশ দেন এবং চারটি উপাদানের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করতে নিষেধ করেন। উপাদান চারটি এই : আগুন, বায়ু, মাটি ও পানি। কিন্তু এই নির্দেশনাগুলোকেই তার পরবর্তী মনীষীরা বাড়াবাড়ি করে চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়। তারা তাদের জন্য এমনসব বিষয়ে লিপ্ত হওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করে যেগুলোর জন্য আগুন অনিবার্য। কারণ এতে আগুনের সম্মান বিনষ্ট হয়। ফলে তাদের কর্মকান্ড কৃষিকাজ ও ব্যবসায়ে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে’।[7]

খ. চারিত্রিক অবনতি : অতি প্রাচীন কাল থেকেই তাদের নৈতিকতা ও চরিত্রের ভিত্তি ছিল নড়বড়ে ও ভঙ্গুর। এমনকি আত্মীয়তার পবিত্র (মাহরাম) সম্পর্কগুলোকেও ধবংস করে। দ্বিতীয় ইয়াযদিগারদ, যিনি খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর শেষের দিকে সাসানীয় সম্রাট ছিলেন, নিজের কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন, তারপর তাকে খুনও করেছিলেন। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর সাসানীয় সম্রাট বাহরাম চুবিন নিজের বোনকে বিয়ে করেছিলেন। ডেনমার্কের বলেন, পারসিকদের কাছে এ ধরনের বিবাহ অপরাধ বা পাপ বলে পরিগণিত হ’ত না। বরং এটা ছিল একটি পুণ্যময় কাজ, যার দ্বারা তারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে চাইত’।[8] এইসব ঘৃণিত কাজের বিরোধিতা করায় শাসক শ্রেণী এই সংস্কারক মানিকে হত্যা করেছিল। মানির মৃত্যু ঘটেছিল বটে, কিন্তু পারসিক সমাজে তার শিক্ষার প্রভাব ইসলামের বিজয়ধারার পরও টিকে ছিল’।[9]

গ. মাযদাকের আহবান : পারস্যে ৪৭৮ খ্রিষ্টাব্দে জন্ম নেওয়া মাযদাকের ঘোষণা ছিল যে, মানুষ সমতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে, তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। সুতরাং তাদের উচিত সমতার সঙ্গে বসবাস করা, যাতে তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য না থাকে। তাই পানি, আগুন ও ঘাসে যেমন মানুষের যৌথ মালিকানা রয়েছে তেমনই নারী ও সম্পদের ক্ষেত্রেও সবাইকে যৌথ অংশীদার বানিয়ে দিয়েছিলেন’।[10]

ঘ. সম্রাটগণের পবিত্রতার দাবী : পারস্য সম্রাটগণ (কায়সারগণ) দাবী করতেন যে, তাদের ধমনিতে ঐশী রক্ত প্রবহমান এবং তাদের স্বভাব চরিত্রে রয়েছে ঊর্ধ্বজাগতিক পবিত্র উপাদান। পারস্যবাসীরাও তাদের এই দাবী মেনে নিয়েছিল। তাদেরকে তারা ঈশ্বর ও উপাস্যের স্থানে বসিয়েছিল। তাদের উদ্দেশে তারা প্রাণী উৎসর্গ করত’।[11]

৪. রোমান সভ্যতা : গ্রীক সভ্যতার পর রোমান সভ্যতাকে ইউরোপের সবচেয়ে বড় সভ্যতা মনে করা হয়। এই সভ্যতা প্রশাসনিক শৃংখলা ও নতুন নগর কেন্দ্রিতার সঙ্গে মানুষকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। রোমানরা সভ্যতা ও অগ্রগতির উঁচু পর্যায়ে পৌছেছিল এবং শক্তি ও প্রতাপের সঙ্গে সভ্য পৃথিবীকে শাসন করার ক্ষেত্রে তারা পারসিকদের অংশীদার হয়ে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর নবুঅতের পূর্বে তা গভীর খাদে পৌঁছার কারণ সমূহ নিম্নরূপ।-

ক. ধর্মীয় কারণ : রোমানরা খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম ও দ্বিতীয় শতকে আক্রমণ চালিয়ে ইউরোপে আধিপত্য বিস্তার করে। ফলে ইউরোপের ও প্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতাঞ্চলগুলো রোমানদের কর্তৃত্বাধীনে চলে যায়। আর রোমানরা ছিল অগ্নি পূজারী। হযরত ঈসা মাছীহ (আঃ)-এর আবির্ভাবের পরও সম্রাট কনস্টান্টাইনের (২৭২-৩৩৭ খ্রিষ্টাব্দ) শাসনকাল পর্যন্ত দীর্ঘকাল রোমানদের রাষ্ট্রীয় নীতিতে পৌত্তলিকতা থেকে গিয়েছিল। সম্রাট কনস্টান্টাইন ৩০৬ থেকে ৩৩৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রোমান সাম্রাজ্য শাসন করেছেন। এই সম্রাট কিছু নীতি ও কার্যাবলি গ্রহণ করেছিলেন যার দ্বারা মাসীহী ধর্মের (খ্রিষ্টধর্মের) কোমর মযবুত হয়েছিল। কিন্তু তার মৃত্যুর পর যাজকরা তার নামে নাম দিয়ে একটি দলীল তৈরি করে। এই দলীল ঘোষণা করে যে, সম্রাট পোপকে পোপতন্ত্রের ক্ষেত্রে প্রভৃত পার্থিব ক্ষমতা দিয়েছেন। এই পোপতন্ত্র ছিল মূলত পোপদেরই তৈরি। আর এর মাধ্যমেই শুরু হয় এই সভ্যতার পতন। তাদের বানানো কিছু নিয়ম ছিল।-

(১) দুনিয়া ও আখিরাতে মানুষের জন্য যা কিছু প্রয়োজন তার সব পবিত্র গ্রন্থের (বাইবেলের) দুই মলাটের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সুতরাং এ পবিত্র গ্রন্থই সমস্ত বিশ্বাস ও চিন্তাধারার ভিত্তি এবং কেবল গীর্জার ধর্মগুরুরাই এ গ্রন্থের বাণীসমূহ ব্যাখ্যার অধিকার রাখেন।

(২) উল্লিখিত বক্তব্য অনুসারে লোকদের প্রধান বিশ্বাস ছিল এই যে, পবিত্র কিতাব (বাইবেল) ব্যতীত সবকিছু সম্পূর্ণরূপে বাতিল। সুতরাং বিজ্ঞান বা দর্শন চর্চা বৈধ নয়। আর যারা করবে তাদের শাস্তি দেওয়া হবে।

(৩) গীর্জার ধর্মগুরুরা এই পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি ও তাঁর আইন বাস্তবায়নকারী। সুতরাং যারা তাদের চিন্তাধারার বিরোধিতা করবে, তাদের শাস্তি প্রদান এবং যারা তাদের আনুগত্য করবে, তাদের পুরস্কার প্রদানের অধিকার গীর্জার ধর্মগুরুদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।

(৪) খ্রিষ্টধর্ম ঈসা মাসীহ (আঃ) কর্তৃক আনীত মু‘জিযা ও অলৌকিক বিষয়াবলীর ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। স্বাভাবিকভাবেই মু‘জিযা ও অলৌকিক বিষয়াবলী প্রাকৃতিক নিয়মনীতি ও জ্ঞানগত মৌলিকতার বিপরীত ও বিরোধী হয়ে থাকে। আর খ্রিষ্টান ধর্মগুরুরা যেহেতু মু‘জিযা ও অলৌকিক বিষয়াবলী একনিষ্ঠভাবে বিশ্বাস করত, সেহেতু তারা এর পক্ষ নিয়ে জ্ঞানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। কেননা জ্ঞান অলৌকিকতার বিপরীত বিষয়।

এই নিয়মগুলো দ্বারা তারা অসংখ্য চিন্তাধারার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, এমনকি তারা চিকিৎসাশাস্ত্র, গণিতশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিদ্যার বিরোধী ছিল। তাই গীর্জা এসব জ্ঞানধারার কিছু গ্রন্থকে পুড়িয়ে ফেলে এবং নষ্ট করে। ফলে কেউ তার খোঁজ পায়নি, সবই কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়’।[12] অনেক বিজ্ঞানীকে তারা হত্যা করে। অনেক শাসক যারা তাদের বিরোধিতা করেছিল তাদের নাস্তিক বলে শাসনকার্য থেকে নামিয়ে দেয়। বহু নারী তাদের দ্বারা শাস্তি ও হত্যার শিকার হয়। এই ছিল ধর্মের নামে যাজকের অত্যাচারসমূহ।

অন্যদিকে খ্রিষ্টধর্মের পারিপার্শ্বিক বিষয়াবলিতে, এমনকি মৌলিক বিষয়সমূহে কূটতর্ক, গভীর বিবাদ বিসংবাদের ঝড় শুরু হয়েছিল। তা জাতির চিন্তাকে বিমূঢ় করে দিয়েছিল, জাতির সন্তানদের বুদ্ধি-বিবেচনাকে বিনষ্ট করে দিয়েছিল এবং তার জ্ঞানগত শক্তিকে গিলে ফেলেছিল। এসব বিষয় অনেক সময় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, হত্যা, বিনাশ, উৎপীড়ন, আক্রমণ, লুণ্ঠন ও গুপ্তহত্যার রূপ নিয়েছিল। শিক্ষালয়, উপাসনালয়, বাড়িঘর সবকিছু ধর্মীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের সমরশিবিরে পরিণত হয়েছিল। গোটা দেশ গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত হয়েছিল। এই ধর্মীয় বিরোধের ভয়াবহ প্রকাশ ঘটেছিল সিরিয়া ও রোমান সাম্রাজ্যের খ্রিষ্টানগোষ্ঠী এবং মিশরের খ্রিষ্টানগোষ্ঠীর মধ্যে।

খ. ইহূদী ও খ্রিষ্টান বিবাদ : মানিবাদীরা বিশ্বাস করত যে, যিশুখ্রিষ্টের একটিমাত্র সত্তা রয়েছে, তা হ’ল ঐশ্বরিক সত্তা, তার ঐশ্বরিক সত্তায় তার মানবিক সত্তা বিলীন হয়ে গেছে। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকে এই গোষ্ঠী দু’টির বিরোধ ও সংঘাত চরম পর্যায়ে পৌছেছিল। এমনকি তা যেন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দু’টি ভিন্ন ধর্মের মধ্যে তুমুল লড়াই নাছারাদের মধ্যকার বিবাদ। যেখানে ইহূদীদের দাবী নাছারারা কোনো ধর্মের ওপর নেই এবং নাছারাদের দাবী ইহূদীরা কোনো ধর্মের ওপর নেই’।[13]

গ. শ্রেণী প্রথা : সামাজিক দিক বিবেচনা করতে গেলে রোমান সমাজ দু’টি স্তরে বিভক্ত ছিল, অভিজাত শ্রেণী ও দাস শ্রেণী। যাবতীয় অধিকার ছিল অভিজাত শ্রেণীর জন্য। আর দাস শ্রেণীর জন্য কোনো ধরনের নাগরিক অধিকার ছিল না। রোমান অভিজাত শ্রেণীর লোকেরা দাসদেরকে ‘পণ্য’ গণ্য করত। মনীবরা দাসদের প্রহার করত, বন্দি করে রাখত, বনে-জঙ্গলে হিংস্র জন্তু জানোয়ারদের বিরুদ্ধে লড়াই করার নির্দেশ দিত, ক্ষুধায় মৃত্যুবরণ করতে বাধ্য করত, কোনো অযুহাতে বা অযুহাত ছাড়াই তাদের হত্যা করত। কোনো দাস পালিয়ে যাওয়ার পর তাকে আটক করতে পারলে মনীবের অধিকার ছিল ওই দাসকে আগুনে ঝলসানোর অথবা শূলবিদ্ধ করে হত্যা করার। সম্রাট অগাস্টাস গর্ববোধ করতেন যে তিনি ত্রিশ হাযার পলাতক দাসকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছিলেন এবং দাবী করার মতো মালিক না পেয়ে তাদের শূলবিদ্ধ করে হত্যা করেছিলেন। এই নির্যাতনের ভয়ে বা অন কোন কারণে ভীত-সন্ত্রস্ত কোন দাস যদি তার মনীবকে হত্যা করত, তবে রোমান আইন ওই মনীবের সকল দাসকে মৃত্যুদন্ড দেওয়ার নির্দেশ দিত’।[14]

ঘ. নারী সমাজ : রোমান সমাজে নারীদের অবস্থা ছিল আরও শোচনীয়। ওই যুগের নারীদের অবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছেন এমন সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যক্তি এই সিদ্ধান্তে পৌছেছেন যে, নারী ছিল আত্মাহীন কাঠামো। এ কারণে নারীর পরকালীন জীবন বলতে কিছু নেই। নারী ছিল অপবিত্র। তাই তাদের গোশত খাওয়ার অধিকার ছিল না, হাসারও অধিকার ছিল না। এমনকি কথা বলার অধিকারও ছিল না। তারা নারীর মুখে লোহার তালা লাগিয়ে দিয়েছিল’।[15]

এই ছিল রোমান সভ্যতার সামগ্রিক অবস্থা। তাই তো এডওয়ার্ড গীবন তার লেখায় এসব বিষয় উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষের দিকে রোমান সাম্রাজ্য তার বিনাশ ও অধঃপতনের শেষ ধাপে পৌঁঁছে গিয়েছিল’।[16]

উপসংহার : বিশ্ব যখন এইসব সভ্যতার জাহেলিয়াতে অন্ধকারাচ্ছন্ন, তখনই আলোর মশাল নিয়ে আসে ইসলাম। যা ছড়িয়ে পড়ে পুরো বিশ্বে। বিশেষত ইউরোপের স্পেনের কর্ডোভা শহর। তারপর এই শহরের আলোতেই আলোকিত হয় পুরো ইউরোপ। মুসলিমদের লিখিত বইসমূহ অনূদিত হয় ল্যাটিন ও গ্রিক ভাষায়। আর এই অনূদিত জ্ঞানকে ধারণ করে তৈরি হয়েছে আজকের এই আধুনিক সভ্যতা। এইভাবেই ইসলাম আগমনের মাধ্যমেই বিশ্ব সভ্যতার রূপরেখা পরিবর্তন হয়ে যায়।

-আরাফাত যামান

[কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ]

 

[1].আহমাদ শালাবী, মাউসুআতুল হাযারাতিল ইসলামিয়াহ, ১/৫৪ পৃ.।

[2]. গানিম মুহাম্মাদ ছালেহ, আল-ফিকরুস সিয়াসিয়াল কাদিমু ওয়াল-ওয়াসিত ১০৯-১১০পৃ.।

[3]. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাযারাহ, ৭/৯৩ পৃ.।

[4]. শাওকী আবু খলীল, আল-হাযারাতুল আরাবিয়াতুল ইসলামিয়াহ ওয়া মুজাযু আনিল হাযারাতিস সাবিকা ৮৬ পৃ.।

[5]. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাযারাহ,৩/১৬৪-১৬৮ পৃ.।

[6]. আবুল হাসান আলী নদভী, মা-যা খাসিরাল আলামু বি ইনহিতাতিল মুসলিমীন, ৬৮-৭৬ পৃ.।

[7]. Shahin Makarios, তারিখে ইরান ২২১-২২৪পৃ.।

[8]. দ্বিতীয় ইয়াযদিগারদ (Yazdegerd II): পারস্যের ষোড়শ সাসানীয় সম্রাট।

[9]. মানি: মানিবাদের প্রবক্তা। জন্ম ইরানে, ২১৬ খ্রিষ্টাব্দে। ২৭৬ খ্রিষ্টাব্দে তাকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। তার অনুসারীরা তাকে নবী মনে করে।

[10]. ইমাম শাহরাস্তানি, আল-মিলাল ওয়ান-নিহাল, খ. ১, পৃ. ২৪৮।

[11]. মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন৫৯-৫৮ পৃ.।

[12].ইবনু নুবাতা আল-মিসরি, সাহরুল উয়ুন ফি শরহি রিসালাত ইবনে যায়দুন, ৩৬পৃ.; ইবনু নাদিম, আল-ফিহরিসত, ৩৩৩ পৃ.।

[13].মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন ৪৩পৃ.।

[14].উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ ১০/৩৭০-৩৭১; আহমাদ শালবি, মুকারানাতুল আদইয়ান, ২/১৮৮পৃ.; আফিফ তাইয়ারাহ, আদ-দ্বীনুল ইসলামী ২৭১পৃ. ।

[15].আহমাদ শালবি, মুকারানাতুল আদইয়ান, খ. ২, পৃ. ১৮৮; আফিফ তাইয়ারাহ, আদ-দ্বীনুল ইসলামি, পৃ. ২৭১।

[16].ড. রাগিবসারজানি, মুসলিম জাতি বিশ্বকে কি দিয়েছে ১/৫৭-৫৮ পৃ.।



আরও