জাহেলিয়াতের আহবান : ব্যর্থ ছালাত ও ছিয়াম

মুহাম্মাদ আব্দুন নূর 281 বার পঠিত

উপস্থাপনা : ইসলাম মানুষের জীবনের আলোকস্তম্ভ, যা অন্তরের শান্তি, আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ নিশ্চিত করে। কিন্তু ইসলাম থেকে মুখ ফিরিয়ে শিরক, বিদ‘আত, কুসংস্কার ও অনৈতিকতার আধুনিক ও প্রাচীন রূপ, যা আমরা জাহেলিয়াত বলি তা মুসলিম সমাজকে ক্রমশ বিপন্ন করছে। মানুষের দাসত্ব, মদ্যপান ও মাদকাসক্তি, অশ্লীলতা, শিক্ষাব্যবস্থার বস্ত্তবাদ, মানবরচিত আইন ও রাজনীতি সবই আধুনিক জাহেলিয়াতের প্রকাশ। যদি কেউ এই জাহেলিয়াতের পথ অবলম্বন করে, তবে ছালাত ও ছিয়াম পালন করলেও তার আমল কোনো কাজে আসবে না। প্রকৃত অর্থে ইসলামের শক্তি তখনই কার্যকর হয়, যখন বিশ্বাস, কর্ম এবং জীবন-যাপন সবই ইসলামের আলোকে হয়। ইসলামের সত্যিকারের আলোকস্তম্ভ হ’ল বিশ্বাস ও কর্মের একাত্মতা যেখানে ছালাত, ছিয়াম, জ্ঞান, নৈতিকতা ও সমাজকর্ম সবই ইসলামের নীতি অনুসারে পরিচালিত হয়। এটি একমাত্র শক্তি, যা আধুনিক ও প্রাচীন জাহেলিয়াতের অন্ধকার ভেঙে মুসলিম সমাজকে আলোকিত করতে পারে। আলোচ্য প্রবন্ধে আমরা জাহেলিয়াতের আহবানের ফলে ব্যর্থ ছালাত-ছিয়ামের স্বরূপ তুলে ধরার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।

পরকালীন মুক্তির দু’টি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম :

(১) ছালাত : ছালাত এমন একটি ইবাদত, যা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, অন্তরের প্রশান্তি এবং পাপ কাজ থেকে মুক্তির সবচেয়ে বড় মাধ্যম। আর এই ছালাতের উপরেই নির্ভর করবে পরকালীন জীবনে সফলতা ও ব্যর্থতার। কেননা হাদীছে এসেছে, ক্বিয়ামতের দিন বান্দার সর্বপ্রথম হিসাব নেওয়া হবে তার ছালাতের। ছালাতের হিসাব সঠিক হ’লে তার জীবনের সব আমল সঠিক হবে। আর ছালাতের হিসাব বেঠিক হ’লে তার জীবনের সব আমল বরবাদ হবে’।[1]

(২) ছিয়াম : ছিয়াম এমন একটি ইবাদত, যা মুমিনের জন্য শাফা‘আতকারী হিসাবে আল্লাহর নৈকট্যে পেŠঁছে দেয়, গুনাহ থেকে মুক্ত করে এবং তাক্বওয়ার পথে পরিচালিত করে’।[2] আমলের মধ্যে ছিয়ামের তুলনীয় কোন আমল নেই’।[3] এজন্য আল্লাহ এই ছিয়ামের প্রতিদান স্বয়ং প্রদান করবেন’।[4]

জাহেলিয়াত বনাম ছালাত-ছিয়াম :

ছালাত ও ছিয়াম শুধুমাত্র বাহ্যিক আচার নয়; এগুলো হ’ল অন্তরের বিশ্বাস ও আনুগত্যের প্রকৃত প্রকাশ। বাহ্যিক ইবাদত যত নিখুঁত হোক, যদি অন্তর আল্লাহর পথে না থাকে, তা কখনো সত্যিকারের ছালাত বা ছিয়ামে রূপান্তরিত হয় না। জাহেলিয়াতের প্রতি আনুগত্য ও ছালাত-ছিয়ামের বাহ্যিক আচার একসাথে থাকতে পারে না। যে ব্যক্তি জাহেলিয়াতের আহবান মেনে চলে, সে যতই ছালাত পড়ুক বা ছিয়াম রাখুক, তার ইবাদত সত্যিকারের অর্থে আল্লাহর নৈকট্য ও পুণ্য অর্জন করতে সক্ষম নয়। আর এজন্য রাসূল (ছাঃ) বলেন, مَنْ دَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ فَهُوَ مِنْ جُثَى جَهَنَّمَ وَإِنْ صَامَ وَصَلَّى وَزَعَمَ أَنَّهُ مُسْلِمٌ ‘যে ব্যক্তি জাহিলী যুগের রসম-রিওয়াজের দিকে আহবান করে, সে জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত। যদিও সে ছিয়াম পালন করে, ছালাত আদায় করে এবং নিজেকে মুসলিম বলে দাবী করে’।[5]

জাহেলিয়াত : ‘জাহেলিয়াত’ আরবী শব্দ। যার অর্থ অজ্ঞতা বা মূর্খতা। ‘জাহেলিয়াত’ বলতে ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বেকার আরব সমাজের অবস্থা বুঝানো হয়। জাহেলিয়াত মানে শুধু প্রাক-ইসলামী আরব সমাজ নয়। বরং যে কোন সময় ও সমাজে মানুষ যখন ইসলাম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সত্যকে অস্বীকার করে, তখনই সেখানে জাহেলিয়াতের পুনরাবৃত্তি ঘটে। অর্থাৎ জাহেলিয়াত কোন যুগের জন্য সুনির্দিষ্ট নয়। বরং যখনই কোন পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় শিরক, বিদ‘আত, কুসংস্কার, অনিয়ম, অবিচার, অনৈতিকতা লক্ষ্য করা যাবে, তখনই তাকে জাহেলিয়াত বলা হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাওহীদের বিপরীত শিরক, সুন্নাতের বিপরীত বিদ‘আত, ঈমানের বিপরীত কুফর ঠিক তেমনই ইসলামের বিপরীত জাহেলিয়াত। অর্থাৎ যেখানে তাওহীদ আছে সেখানে শিরক নেই, যেখানে সুন্নাত আছে সেখানে বিদ‘আত নেই, যেখানে ঈমান আছে সেখানে কুফর নেই। ঠিক তেমনই যেখানে ইসলাম আছে, সেখানে জাহেলিয়াত নেই। আর যেখানে জাহেলিয়াত আছে সেখানে ইসলাম নেই।

আধুনিক জাহেলিয়াতের স্বরূপ

১. মানুষের দাসত্বের জাহেলিয়াত : জাহেলী যুগের মানুষ আল্লাহকে রব মনে করলেও মূর্তিপূজা, মৃত নেককার মানুষের কাছে প্রার্থনা, মানুষের দাসতব করত। আধুনিক যুগেও মানুষ মানুষের দাসত্ব করছে, জড়বস্ত্তর কাছে মাথা নত করছে, নীরবতা পালন করছে, কবরে ও মাযারে গিয়ে সিজদা করছে। আধুনিক জাহেলিয়াত তো সেই যুগের জাহেলিয়াতকেও হার মানাচ্ছে। অথচ বৃহৎ সংখ্যক মানুষ সেই জাহেলিয়াতের দিকেই আহবান করছে।

২. শিক্ষা ব্যবস্থায় পশ্চিমাদের জাহেলিয়াত : বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা পশ্চিমা বস্ত্তবাদের জাহেলিয়াতে ভরপুর। জাহেলী যুগে যেমন বস্ত্তবাদী শিক্ষা ছিল ‘খাও দাও ফুর্তি করো’। যার কারণে সমাজ ব্যবস্থায় জাহেলিয়াতের সমস্ত অপরাধ প্রকাশ পেয়েছিল। আজকের সমাজ ব্যবস্থাতেও জাহেলিয়াতের সমস্ত অপরাধ প্রকাশ পেয়েছে। যেমন চুরি, ডাকাতি, খুন, রাহাজানি, হত্যাসহ মানব ঘটিত যাবতীয় অন্যায়। এগুলোর প্রধান কারণ হচ্ছে ধর্মহীন আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার জাহেলিয়াত। ইসলামী শিক্ষার ভিত্তি হ’ল তাওহীদ, রিসালাত এবং আখিরাত। মৃত্যুর পরের জীবনকে আখিরাত বলে। তাই শিক্ষা ব্যবস্থাকে আখিরাতের জবাবদিহিতার আলোকে ঢেলে সাজাতে হবে। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার জাহেলিয়াত থেকে বাঁচতে ইসলামী শিক্ষার বিকল্প নেই।

৩. মদ্যপান ও মাদকাসক্তি :  জাহেলী যুগে মানুষ মাদকাসক্ত ছিল। বর্তমান যুগেও মদের আমদানি, বিক্রি বৈধ করা হচ্ছে। এছাড়া মদের বার, পাব, ফাইভ স্টার হোটেল সহ সরকার অনুমোদিত অনেক মদের দোকান আছে। মদ বিক্রির টাকার ভ্যাট ট্যাক্স আমাদের রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসাবে এই জাহেলিয়াত কিভাবে চলছে আমরা কি ভেবে দেখেছি?

৪. যেনা-ব্যভিচার ও ধর্ষণ : জাহেলী যুগে যেনা ব্যভিচার ও ধর্ষণ ছিল ব্যাপক। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী যেনা ব্যভিচারের ব্যাপকতা স্বীকৃত একটি বিষয়। এমনকি এখন তো বাংলাদেশেও কোন যুবতী দেহ ব্যবসা করতে ইচ্ছুক হলে সরকার অনুমোদিত পতিতালয়ে গিয়ে, দেহ ব্যবসা করতে পারে। গুগলে সার্চ দিয়ে যদি প্রশ্ন করেন এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে বড় পতিতালয় কোথায় ? আপনি উত্তর পেয়ে যাবেন তা হ‘ল ভারতের কলকাতার সোনাগাছি যৌনপল্লি। আর আমাদের স্বদেশের সবচেয়ে বড় যৌনপলি হ’ল দেŠলতদিয়া যেŠনপল্লি। আরও অবাক করার বিষয় হ’ল গোপনে না বরং নায়কের সাথে অবৈধ যেনায় জারজ সন্তান জন্ম দিয়েও প্রকাশ্যে জনসমক্ষে থাকতে তাদের এতটুকু লজ্জাবোধও হয় না। এ সকল নায়ক-নায়িকাদের ইনকাম ট্যাক্সের টাকাও আমাদের রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়। নায়ক নায়িকাদের যেনার কোন বিচার নেই। অন্যদিকে বাংলাদেশে ধর্ষণ একটি ক্রম বর্ধমান সামাজিক জাহেলিয়াত। বাংলাদেশে প্রতি ১ লাখ নারীর মধ্যে প্রায় ১০ জন ধর্ষণের শিকার হন’ (উইকিপিডিয়া)

৫. অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা : জাহেলী যুগে অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা প্রকাশ্যে বিদ্যমান ছিল। কাবাঘরে নারী-পুরুষ উলঙ্গ তওয়াফ করা ছিল তাদের সচরাচর পালনীয় কাজ। আল্লাহ বলেন, وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا-‘তোমরা যেনার নিকটবর্তী হয়োনা, ওটা অশ্লীলতা ও নিকৃষ্ট আচরণ’ (বনু ইস্রাঈল ১৭/৩২)

অথচ বর্তমান যুগে বিশ্বব্যাপী অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা আধুনিক রূপে আবির্ভাব হয়েছে। উলঙ্গপনা এখন সবার পকেটের মোবাইলেই। পত্রিকা-ম্যাগাজিন যেন অর্ধনগ্ন নারীদের ছবি ছাড়া চলেই না। সাধারণভাবে নায়ক নায়িকাদেরকে যুবক যুবতীরা অনুসরণ করে থাকে। আর তাদেরকে তারা সেলিব্রেটি হিসাবেই জানে। তাদের মধ্যে যে নায়িকা যত উলঙ্গ হ’তে পারে বর্তমানে সে তত হিট নায়িকা। একেবারে উলঙ্গ হয়ে চললে দেখতে কিছুটা দৃষ্টিকটু ও অস্বাভাবিক লাগে, তাই অশ্লীলতা আধুনিক ফ্যাশনের নামে আধুনিকভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে। বিভিন্ন দেশের সী-বিচ তথা সমুদ্র উপকূলে অশালীন এ সকল নারীদের শুয়ে থাকার দৃশ্য যেন দোষনীয় কোন বিষয় নয়।

৬. মারামারি, হানাহানি ও যুদ্ধ-বিগ্রহ : জাহেলী যুগে ছিল গোত্রীয় স্বার্থের উন্মত্ততা; তুচ্ছ বিষয়েও গোত্রে গোত্রে সংঘর্ষ বেধে যেত। একে অপরের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার নেশায় তারা রক্তপাতকে গৌরব মনে করত। সামান্য অপমান বা অযথা প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে বছরের পর বছর যুদ্ধ চলত, আর অসংখ্য নিরপরাধ প্রাণ ঝরে পড়ত। আজকের যুগে সেই জাহেলিয়াত নতুন মুখে ফিরে এসেছে রাজনৈতিক পরিচয়ের নামে। এক দল অন্য দলের বিরুদ্ধে হিংসা, বিদ্বেষ ও প্রতিশোধে উন্মত্ত হয়ে পড়ে। ক্ষমতার লোভে ও আধিপত্যের প্রতিযোগিতায় মিথ্যা অজুহাতে সংঘর্ষ, হানাহানি ও হত্যাযজ্ঞ ঘটছে প্রায়ই। শুধু তাই নয়, বৈশ্বিক অঙ্গনেও বড় বড় শক্তিগুলো নানা জোট ও স্বার্থের লড়াইয়ে লিপ্ত হয়ে বিশ্বকে অস্থিরতার আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছে। এই আধুনিক জাহেলিয়াত মানবতার শান্তি কেড়ে নিচ্ছে, মানুষকে পরস্পরের শত্রু বানিয়ে দিচ্ছে, আর সমাজ ও রাষ্ট্রকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

৭. ধর্মীয় জীবনে তাক্বলীদের জাহেলিয়াত : জাহেলী যুগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল অন্ধ অনুসরণ বা তাক্বলীদ। যেখানে মানুষ যুক্তি, সত্য ও প্রমাণের পরিবর্তে পূর্বপুরুষদের ভুল প্রথা আঁকড়ে ধরত। তারা বলত, ‘আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের পথে আছি, তাই আমরা ঠিক আছি’। যদিও সেই পথ ছিল বিভ্রান্তি ও কুসংস্কারে ভরা। আজকের যুগেও সেই জাহেলিয়াত নতুন রূপে ফিরে এসেছে ধর্মীয় জীবনের মধ্যে। কেউ সুনির্দিষ্ট একটি মাযহাব বা মতবাদকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরেছে যে, কুরআন ও ছহীহ হাদীছের দলীল তার কাছে গৌণ হয়ে পড়েছে।

এই তাক্বলীদের জাহেলিয়াত এমনভাবে বিস্তৃত হয়েছে যে, অনেকেই ধর্মের নামে এমনসব আমল করছে যার কোনো শারঈ প্রমাণ নেই। যেমন ঈদে মিলাদুন্নবী, কুলখানী, চল্লিশা, বা নির্দিষ্ট তারিখে দো‘আর আয়োজন যেগুলোর কোনো ভিত্তি কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহতে নেই। এসব কর্ম কেবল ইসলামী চেতনার বিকৃতি নয় বরং জাহেলিয়াতের পুনরুজ্জীবন।

ইসলাম মানুষকে অন্ধ অনুসরণের নয়, বরং প্রমাণ ও জ্ঞানের আলোকে সঠিক পথ বেছে নেওয়ার শিক্ষা দেয়। আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে বলেন,وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنْزَلَ اللهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا أَلْفَيْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا أَوَلَوْ كَانَ آبَاؤُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ شَيْئًا وَلَا يَهْتَدُونَ- ‘যখন তাদের বলা হয়, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তোমরা তার অনুসরণ কর, তখন তারা বলে, বরং আমরা তারই অনুসরণ করব যার উপরে আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের পেয়েছি। যদিও তাদের বাপ-দাদারা কিছুই জ্ঞান রাখতো না এবং তারা সুপথপ্রাপ্ত ছিল না’ (বাক্বারাহ ২/১৭০)। অতএব তাক্বলীদের এই আধুনিক জাহেলিয়াত প্রকৃত ইসলামী চেতনা ও রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর প্রদত্ত সরল পথ থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

৮. মানব রচিত আইন, বিচার ও শাসন ব্যবস্থা : জাহেলী যুগে আল্লাহর দেওয়া আইন অমান্য করে গোত্র শাসকরা তাদের সুবিধা মত মনগড়া আইনে গোত্র শাসন করত। আহলে কিতাবরা তাদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাত ও ইঞ্জিলের বিধান সুবিধা মত পরিবর্তন করে বিকৃত করেছিল। বর্তমান যুগে এসেও এইসব জাহেলিয়াত নতুন কিছু না। আল্লাহর দেওয়া আইন ও রাসূল (ছাঃ)-এর সুনণাহ তথা বিচার ও শাসন ব্যবস্থা বাদ দিয়ে সংসদে মনগড়া আইন বানিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করার ব্যর্থ চেষ্টা চলমান। আর সেই জাহেলী আইনের অধিকাংশ অমুসলিম বৃটিশ-মার্কিনীদের নিকট থেকে নেওয়া।

৯. অর্থনীতিতে পুঁজিবাদী ও সুদী অর্থব্যবস্থার জাহেলিয়াত :

জাহেলী যুগে অর্থনৈতিক অন্যায়ের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ ছিল সূদ। ধনী শ্রেণি দরিদ্রদের উপর সুদের বোঝা চাপিয়ে তাদের সর্বস্ব কেড়ে নিত। কেউ ঋণ পরিশোধে অক্ষম হলে তার সম্পদ ও স্বাধীনতা পর্যন্ত হারাতে হ’ত। এইভাবে সমাজে শ্রেণিবৈষম্য, শোষণ ও মানবতার অবক্ষয় সৃষ্টি হয়েছিল। আজকের তথাকথিত আধুনিক যুগেও সেই পুরনো জাহেলিয়াত নতুন পোশাকে ফিরে এসেছে পুঁজিবাদ ও ব্যাংকভিত্তিক সূদী অর্থনীতি হিসেবে।

বর্তমান ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যে সূদের নামে অর্থ লেনদেন চলে, তা মূলত জাহেলী যুগের রিবা বা সূদী কারবারেরই আধুনিক সংস্করণ। তখন সূদ নেওয়া হ’ত সরাসরি হাতে হাতে। আর আজ তা নেওয়া হচ্ছে চেক, লেনদেন বা ডিজিটাল হিসাবের মাধ্যমে। কিন্তু অন্যায় ও শোষণের প্রকৃতি অপরিবর্তিত। ইসলাম এই সূদী ব্যবস্থাকে স্পষ্টভাবে হারাম ও জাহান্নামের কারণ ঘোষণা করেছে। আল্লাহ বলেন, وَأَحَلَّ اللهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا ‘আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন ও সূদকে হারাম করেছেন’ (বাক্বারাহ ২/২৭৫)

অতএব আজকের পুঁজিবাদী বিশ্বে যে সূদনির্ভর অর্থনীতি চলছে, তা আসলে প্রাচীন জাহেলিয়াতের পুনর্জাগরণ। যেখানে ধনী আরও ধনী হয়, গরিব আরও নিঃস্ব হয়। আর মানবতার জায়গায় বসে যায় মুনাফার লালসা। ইসলাম এই অন্যায় ব্যবস্থার পরিবর্তে ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছে, যাতে সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন, সহযোগিতা ও সামাজিক ভারসাম্য বজায় থাকে।

১০. রাজনীতিতে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও জাতীয়তাবাদের জাহেলিয়াত : আধুনিক বিশ্বে মুসলিম উম্মাহকে বিভ্রান্ত করার জন্য বিভিন্ন মতবাদ হাযির করা হচ্ছে। যেমন গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (সেক্যুলারিজম) ও জাতীয়তাবাদ (ন্যাশনালিজম) ও অন্যান্য ইজমসমূহ। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো জাহেলিয়াতের আধুনিক রূপ। গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও জাতীয়তাবাদ সবই মানুষের তৈরি মতবাদ, যা আল্লাহর শরী‘আতের বিপরীতে দাঁড় করানো হচ্ছে। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো জাহেলিয়াতের আধুনিক সংস্করণ।

বাস্তবতা : আধুনিক যুগের জাহিলিয়াত মানুষের জীবনকে গ্রাস করে ফেলেছে। বর্তমান মানব জীবনে এমন কোন একটি দিক নেই, যা এই জাহিলিয়াতের প্রভাব থেকে মুক্ত রয়েছে। এসব জাহিলিয়াতে হাবুডুবু খাওয়া লোকেরা ইসলামী জীবনে নিজেদের স্বার্থান্ধতা, লোভ-লালসার অন্ধ অনুসরণ এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতার অপমৃত্যু দেখতে পায়। সেই জন্য তারা ইসলামী জীবন বিধানের প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে চায়। জাহেলিয়াত তার সকল শক্তি ও অস্ত্র দিয়ে ইসলামের অগ্রগতি বাধাগ্রস্থ করার চেষ্টা করছে। বস্ত্তবাদে বিশ্বাসীরা দুনিয়ার ভোগ বিলাসকেই তাদের জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে ফেলে। তাদের দর্শন হলো 'EAT, DRINK AND BE MERRY'- ‘খাও, পান করো আর আনন্দে মাতো’। পক্ষান্তরে আল্লাহর জন্যে নিবেদিতপ্রাণ মুমিনগণ আল্লাহর পথে স্বেচছায় জীবন দিতে সর্বদা ব্যাকুল থাকে।

আমাদের করণীয় :

১. বিশুদ্ধ ইসলামের জ্ঞানার্জন, ২. বিশুদ্ধ জ্ঞানার্জনের আলোকে আমল, ৩. বিশুদ্ধ জ্ঞানার্জন ও আমলের দিকে দাওয়াত এবং ৪. জান ও মাল দিয়ে প্রকৃত দ্বীনের পথে জিহাদ। সর্বোপরি সকল সমস্যায় ইসলামকেই একমাত্র সমাধান হিসাবে পরিগ্রহণ করা ও ইসলামে পরিপূর্ণভাবে প্রবেশ করা এবং মানুষকে সেদিকেই আহবান করার পাশাপাশি নববী পদ্ধতিতে ইসলামী রেনেসাঁ ঘটানোর চেষ্টা করা। তাছাড়া অন্য কোন গত্যন্তর নেই।

উপসংহার : আইয়ামে জাহেলিয়াত বা অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগকে যে আলো দিয়ে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর মাধ্যমে মহান আল্লাহ আলোকিত করেছিলেন তার নাম হ‘ল ‘ইসলাম’। সেদিন দূরে নয়, যেদিন জাহেলিয়াতের সমস্ত জঞ্জাল চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিয়ে ইসলামী বিপ্লব ঘটবে। বর্তমান সময়ের মানুষ যতই শিরক কুফরীতে নিমজ্জিত থাকুক না কেন, ইসলামী সমাজ বিপ্লবের সাথে সাথে সব কিছুই বিলীন হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ। সর্বশেষ আমরা বলতে চাই এই বিপ্লবে বাধা সৃষ্টিকারী মিথ্যুক, ওয়াদাভঙ্গকারী, খেয়ানতকারী তথা মুনাফিকের আলামত বহনকারীরা যদি ছালাত, ছিয়াম পালন করে এবং নিজেকে মুসলিম হিসাবে পরিচয়ও দেয় তবুও সে মুনাফিক।[6] আল্লাহ আমাদের হেফাযত করুক এবং আমাদের দ্বারা এই বিপ্লব সাধিত করুক। একজন প্রকৃত মুসলিম হিসাবে আল্লাহ আমাদেরকে ছালাত ও ছিয়ামের দ্বারা জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ এবং অফুরন্ত নে‘মতপূর্ণ জান্নাত পেতে জাহেলিয়াতের মত ও পথ থেকে নিজেদেরকে নিবৃত্ত রাখার তওফীক দান করুন।-আমীন!

-মুহাম্মাদ আব্দুন নূর

[কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ]


[1]. তিরমিযী হা/৪১৩, মিশকাত হা/১৩৩০।

[2]. সূরা আল-বাকারা ০২/১৮৩, বুখারী হা/২০১৪, মিশকাত হা/১৯৬৩।

[3]. নাসাঈ হা/২২২৪, হাদীছ সম্ভার হা/১০৩৬।

[4]. বুখারী হা/১৯০৪; মুসিলম হা/১১৫১; মিশকাত হা/১৯৫৯।

[5]. তিরমিযী হা/২৮৬৩, মিশকাত হা/৩৬৯৪

[6]. মুসলিম হা/১১৬-১১৭, মিশকাত হা/৫৫।



বিষয়সমূহ: ছালাত
আরও