তারুণ্যের প্রথম ভোট-ঈমানের তরে বর্জন হোক

ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব 106 বার পঠিত

দেশে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শুরুর পর থেকে একটা শ্লোগান নিয়মিত শোনা যাচ্ছে যে, তারুণ্যের প্রথম ভোট, অমুক দলের পক্ষে হোক। দীর্ঘ ১৬ বছর যাবৎ ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ অকার্যকর থাকায় বর্তমান সময়ের তরুণরা অধিকাংশই পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোতে ভোট দিতে পারেনি। এজন্য তারা এই নির্বাচনের প্রধান টার্গেট হবে, সেটাই স্বাভাবিক। এজন্য তরুণরা হয়েছে এবারের নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দু এবং তারাও উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছেন তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য। ভিন্ন পিঠে যারা সচেতন মুসলিম তরুণ, যারা ঈমানকে তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ মনে করেন, তারা প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং এর সাথে তাওহীদী মূল্যবোধের সামঞ্জস্য নিয়ে যথেষ্ট স্পষ্ট অবস্থানে এসেছেন। তারা বুঝতে শিখেছেন ঈমান ও আমল সুরক্ষার স্বার্থে প্রচলিত গণতান্ত্রিক ভোট ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ না করাই ঈমানের দাবী। তাই তাদের কাছে এই নির্বাচন বিশেষ কোন গুরূত্ব বহন করে না। তাদের কাছে এই ভোট বর্জন কেবল রাজনৈতিক অনীহার বিষয় নয়, বরং এটি একটি আদর্শিক ও ঈমানী অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ। চূড়ান্ত সার্বভৌমত্ব যখন একমাত্র মহান আল্লাহর। সেই জায়গা থেকে মানবরচিত কোন শাসনব্যবস্থাকে সমর্থন করা বা সেখানে অংশগ্রহণ করা নিঃসন্দেহে ঈমানী চেতনার পরিপন্থী। এজন্য ঈমান সুরক্ষার প্রথম ধাপ হ’ল এমন কোন ব্যবস্থার অংশ না হওয়া যা আল্লাহর বিধানের সাথে সমান্তরাল অবস্থান নেয়।

প্রিয় পাঠক, তারুণ্যের প্রথম ভোট-এটি কেবল একটি ব্যালটে সীল মারা নয়; এটি একজন তরুণের আক্বীদাহ ও চেতনার বহিঃপ্রকাশ। জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে একজন তরুণ যে সিদ্ধান্ত নেয়, তা তার ব্যক্তিগত জীবন কেবল নয়, বরং তার সামাজিক পথচলাকেও প্রভাবিত করে। তাই প্রশ্ন ওঠে- এই প্রথম ভোট কী আবেগের বশে হবে, নাকি ঈমান ও বিবেকের আলোকে?

বর্তমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটকে অনেকেই নাগরিক দায়িত্বের একটি মানদন্ড হিসাবে উপস্থাপন করেন। কিন্তু একজন সচেতন মুসলিম তরুণের কাছে দায়িত্বের পরিধি এখানেই শেষ নয়। তার প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আল্লাহর সন্তুষ্টি, ছিরাতুল মুস্তাকীমের অনুসন্ধান এবং পরকালীন জবাবদিহিতা। যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্পষ্টভাবে আল্লাহর বিধানের বিরোধিতা করা হয়, যেখানে যুলুম, দুর্নীতি ও নৈতিক অবক্ষয়কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়, যেখানে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি এবং ক্ষমতার লড়াই অপরিহার্য, যে ব্যবস্থার মাধ্যমে পৃথিবীর কোন দেশে ইসলামী শাসন কায়েম হয়নি; বরং দুর্বলতর হয়েছে- সেই ব্যবস্থাকে সমর্থন করা বা তার অংশীদার হওয়া কি ঈমানের দাবী হ’তে পারে? বরং ভোট বর্জনের মাধ্যমে এই ঘুণে ধরা ব্যবস্থার প্রতি জাতীয় অনাস্থা প্রকাশ করাই একজন মুসলিম তরুণের অপরিহার্য নৈতিক দায়িত্ব।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, মুসলিম উম্মাহ কখনো সংখ্যার জোরে নয়, বরং আদর্শের দৃঢ়তাতেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। বদর থেকে খেলাফতের সোনালী যুগ-সব ক্ষেত্রেই কেন্দ্রবিন্দু ছিল আক্বীদাহ ও ইনছাফের আহবান। আজকের তরুণ সমাজ যদি সেই গৌরবময় ঐতিহ্য ভুলে গিয়ে কেবল প্রচলিত স্রোতে গা ভাসায়, তাতে দুনিয়াবী সাময়িক ক্ষমতার হাতছানি থাকবে বটে, তবে হারাবে আদর্শ, হারাবে ছিরাতুল মুস্তাকীম তথা হেদায়াতের আলোকোজ্জ্বল রাজপথ; সমঝোতার নামে প্রতি পদে বিসর্জন দিতে হবে জীবনের মৌলিক সম্পদ ঈমানের মযবূত খুটিগুলো।

ঈমান রক্ষার্থে তথাকথিত এই গণতান্ত্রিক ভোট বর্জন মানে দায়িত্বহীনতা কিংবা নিষ্ক্রিয়তা নয়, বরং অন্যায়কে সমর্থন না করা, বাতিল ব্যবস্থার অংশীদার না হওয়ার একটি সাহসী অবস্থান। যখন কোন পদক্ষেপ ঈমান, নৈতিকতা ও ন্যায়বিচারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তখন তা বর্জন করা নিজেই একটি উচ্চতর প্রতিবাদে পরিণত হয়। তাই আমাদের তরুণদের জীবনের প্রথম সিদ্ধান্ত যেন ঈমানের বিরুদ্ধে না যায়, রাসূল (ছাঃ)-এর আদর্শের বিপরীত না হয়; বরং তা যেন হয় পুরোপুরি আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সামনে রেখে। তারা এমন কোন ব্যবস্থার অংশীদার হবে না, যা তাদের দ্বীন, আক্বীদা-মানহাজ এবং উম্মতের ভবিষ্যতকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই সক্রিয় প্রতিরোধ যখন ঐক্যবদ্ধভাবে হবে, যখন লক্ষ লক্ষ তরুণ গণতন্ত্রকে না বলবে, এই ভোটব্যবস্থা বর্জন করবে, তখনই প্রকৃত সংস্কারের পথ খুলে যাবে। আর সেটিই হবে ঈমানের জয়, ন্যায়ের জয় ইনশাআল্লাহ।

সুতরাং তারুণ্যের প্রথম ভোটকে না বলা হোক - তার তাওহীদী আত্মপরিচয়ের ঘোষণা। হোক শিরকের বিরুদ্ধে দৃপ্ত ঈমানী অবস্থানের প্রকাশ। হোক মানবরচিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নীরব কিন্তু শক্ত প্রতিবাদ।

আমাদের মনে রাখতে হবে যেন ভোট বর্জন মানে সমাজবিচ্ছিন্ন হওয়া নয়, যা অনেকে চিন্তা করেন। বরং আমাদের লক্ষ্য হ’ল সমাজ সংস্কারের নববী পথ তথা দাওয়াত ও জিহাদের পথকে জাতির সামনে উপস্থাপন করা। ভোট না দিলেও ঈমানী চেতনা নিয়ে দাওয়াতী কাজ, শিরক-বিদ‘আতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, চারিত্রিক উন্নয়ন, ন্যায়-ইনছাফের সমাজ গড়ার আহবান এবং সার্বিক জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে দ্বীনের আদর্শকে সমুন্নত করার দৃপ্তপদক্ষেপ। ব্যালট বক্সের মাধ্যমে নেতা বা রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন করার চেয়েও নীতির পরিবর্তন, ব্যক্তি ও সমাজের গুণগত পরিবর্তনই বড় জিহাদ। তাই আমাদের লক্ষ্য কেবল ভোট বর্জন নয়, বরং একটি পরিপূর্ণ ইসলামী সমাজ গঠনের পথ সুগম ও ত্বরান্বিত করা।

সর্বোপরি ঈমানের দাবীই হ’ল সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো এবং অন্যায়কে আপোসহীনভাবে প্রতিরোধ করা। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘যখন তোমরা কোন অন্যায় দেখবে, তা হাত দিয়ে বন্ধ কর; তা না পারলে জিহবা দিয়ে; তা না পারলে অন্তর দিয়ে ঘৃণা কর-এটি ঈমানের সবচেয়ে দুর্বল অংশ (মুসলিম)

সুতরাং আসুন, আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করি, ঈমানের তরে আমরা গণতন্ত্রকে বর্জন করব, ভোটভিত্তিক গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থা বর্জন করব। ঈমানের তরে এই বর্জনই হোক আমাদের তরুণ প্রজন্মের শপথ। এই শিরক বর্জনের শক্তিই আমাদের আগামীর উম্মাহকে আরো শক্তিশালী করবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইকে অর্থবহ করবে। সংখ্যায় যতই আমরা অল্প হই, আমাদের উৎসর্গিত প্রাণের আদর্শিক শক্তিই আমাদের মূল সম্বল হবে। এই আপোসহীন তাওহীদী পথই চিরবিজয়ের পথ। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন- আমীন!



আরও