অধিক পাওয়ার আকাংখা

তাওহীদের ডাক ডেস্ক 35 বার পঠিত

আল-কুরআনুল কারীম :

১- أَلْهاكُمُ التَّكاثُرُ- حَتَّى زُرْتُمُ الْمَقابِرَ-

(১) ‘অধিক পাওয়ার আকাংখা তোমাদের (পরকাল থেকে) গাফেল রাখে। যতক্ষণ না তোমরা কবরস্থানে উপনীত হও’ (তাকাছুর-মাক্কী ১০২/১-২)

২-اعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَياةُ الدُّنْيا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَزِينَةٌ وَتَفاخُرٌ بَيْنَكُمْ وَتَكاثُرٌ فِي الْأَمْوالِ وَالْأَوْلادِ-

(২) ‘তোমরা জেনে রাখ যে, পার্থিব জীবন খেল-তামাশা, সাজ-সজ্জা, পারস্পরিক অহমিকা, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা ছাড়া কিছুই নয়’ (হাদীদ ৫৭/২০)

৩- الَّذِينَ يَسْتَحِبُّونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا عَلَى الْآخِرَةِ وَيَصُدُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ وَيَبْغُونَهَا عِوَجًا أُولَئِكَ فِي ضَلَالٍ بَعِيدٍ-

(৩) ‘যারা আখেরাতের উপর দুনিয়াবী জীবনকে অগ্রাধিকার দেয় এবং আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বাধা দেয় ও সেখানে বক্রতা তালাশ করে, তারা দূরবর্তী ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে’ (ইব্রাহীম ১৪/২)

৪- اللهُ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَقْدِرُ وَفَرِحُوا بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلَّا مَتَاعٌ-

(৪) আল্লাহ যাকে ইচ্ছা রূযী প্রশস্ত করেন ও সংকুচিত করেন। কিন্তু তারা পার্থিব জীবন নিয়েই উল্লসিত। অথচ পার্থিব জীবন পরকালের তুলনায় তুচ্ছ ভোগ্যবস্ত্ত ছাড়া কিছুই নয়’ (রা‘দ ১৩/২৬)

৫- يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا ضَرَبْتُمْ فِي سَبِيلِ اللهِ فَتَبَيَّنُوا وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ أَلْقَى إِلَيْكُمُ السَّلَامَ لَسْتَ مُؤْمِنًا تَبْتَغُونَ عَرَضَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا فَعِنْدَ اللهِ مَغَانِمُ كَثِيرَةٌ كَذَلِكَ كُنْتُمْ مِنْ قَبْلُ فَمَنَّ اللهُ عَلَيْكُمْ فَتَبَيَّنُوا إِنَّ اللهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا-

(৫) ‘হে মুমিনগণ! যখন তোমরা আল্লাহর রাস্তায় সফরে বের হও, তখন সব বিষয় যাচাই কর এবং যে তোমাদের সালাম করে তাকে বলো না যে তুমি মুমিন নও। তোমরা পার্থিব জীবনের সম্পদ কামনা কর। অথচ আল্লাহর নিকটে রয়েছে অঢেল সম্পদ। ইতিপূর্বে তোমরাও তো সম্পদহীন ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। অতএব সবকিছু যাচাই করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমরা যা কর সবই খবর রাখেন’ (নিসা ৪/৯৪)

৬- وَقَالَ مُوسَى رَبَّنَا إِنَّكَ آتَيْتَ فِرْعَوْنَ وَمَلَأَهُ زِينَةً وَأَمْوَالًا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا رَبَّنَا لِيُضِلُّوا عَنْ سَبِيلِكَ رَبَّنَا اطْمِسْ عَلَى أَمْوَالِهِمْ

وَاشْدُدْ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَلَا يُؤْمِنُوا حَتَّى يَرَوُا الْعَذَابَ الْأَلِيمَ-

(৬) আর মূসা বলল, হে আমাদের পালনকর্তা! তুমি ফেরাঊন ও তার পারিষদবর্গকে পার্থিব জীবনের জাঁকজমক ও সম্পদরাজি দান করেছ, হে আমাদের প্রতিপালক! যা দিয়ে তারা লোকদেরকে তোমার রাস্তা থেকে বিচ্যুত করে। অতএব হে আমাদের প্রভু! তুমি ওদের সম্পদরাজি ধ্বংস করে দাও এবং ওদের অন্তরগুলিকে শক্ত করে দাও যাতে ওরা ঈমান আনতে না পারে যতক্ষণ না ওরা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রত্যক্ষ করে (ইউনুস ১০/৮৮)

৭- مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لَا يُبْخَسُونَ- أُولَئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ إِلَّا النَّارُ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا فِيهَا وَبَاطِلٌ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ-

(৭) ‘যে ব্যক্তি পার্থিব জীবন ও তার জাঁকজমক কামনা করে, আমরা তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের ফল দুনিয়াতেই পূর্ণভাবে দিয়ে দিব। সেখানে তাদের কোনই কমতি করা হবে না’। ‘এরা হ’ল সেইসব লোক যাদের জন্য পরকালে জাহান্নাম ছাড়া কিছুই নেই’ (হূদ ১১/১৫-১৬)

হাদীছের বাণী :

৮- عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ- صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- مَا أَخْشَى عَلَيْكُمُ الْفَقْرَ وَلَكِنْ أَخْشَى عَلَيْكُمُ التَّكَاثُرَ وَمَا أَخْشَى عَلَيْكُمُ الْخَطَأَ وَلَكِنْ أَخْشَى عَلَيْكُمُ الْعَمْدَ-

(৮) আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, আমি তোমাদের দরিদ্রতার ভয় করি না; বরং ভয় করি তোমরা প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে। আর আমি তোমাদের অনিচ্ছাকৃত ভুলের ভয় করি না; কিন্তু আমি তোমাদের ব্যাপারে ইচ্ছাকৃত ভুল করার ভয় করি’।[1]

৯- عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ قَالَ كُنْتُ أَمْشِى مَعَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِى نَخْلٍ لِبَعْضِ أَهْلِ الْمَدِينَةِ فَقَالَ: يَا أَبَا هُرَيْرَةَ هَلَكَ الْمُكْثِرُونَ إِلاَّ مَنْ قَالَ هَكَذَا وَهَكَذَا وَهَكَذَا ثَلاَثَ مَرَّاتٍ حَثَى بِكَفِّهِ عَنْ يَمِينِهِ وَعَنْ يَسَارِهِ وَبَيْنَ يَدَيْهِ وَقَلِيلٌ مَا هُمْ-

(৯) হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি একদিন নবী করীম (ছাঃ)-এর সঙ্গে মদীনাবাসীদের এক খেজুরবাগানে হাঁটছিলাম। তখন তিনি বললেন, হে আবু হুরায়রা! অধিক সম্পদের অধিকারীরা ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে তারা ছাড়া, যারা এভাবে, এভাবে, এভাবে দান করে। রাবী বলেন, তিনি তখন ডান দিকে, বাম দিকে এবং সামনে হাত দিয়ে মুঠো ভরে দান করার ভঙ্গি করলেন। এরপর তিনি বললেন, আর এমন লোক খুবই অল্প’।[2]

(১০) عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ النَّبِىُّ- صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- قَالَ: لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى يَكْثُرَ فِيكُمُ الْمَالُ، فَيَفِيضَ حَتَّى يُهِمَّ رَبَّ الْمَالِ مَنْ يَقْبَلُهُ مِنْهُ صَدَقَةً، وَيُدْعَى إِلَيْهِ الرَّجُلُ فَيَقُولُ: لَا أَرَبَ لِي فِيهِ-

(১০) আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না তোমাদের মধ্যে সম্পদ বৃদ্ধি পেয়ে উপচে না পড়বে। এমনকি সম্পদের মালিকগণ তার ছাদাক্বা কে গ্রহণ করবে তা নিয়ে চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়বে। যাকেই দান করতে চাইবে সেই বলবে, প্রয়োজন নেই’।[3]

(১১) عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَوْ أَنَّ لاِبْنِ آدَمَ وَادِيًا مِنْ ذَهَبٍ أَحَبَّ أَنْ يَكُونَ لَهُ وَادِيَانِ وَلَنْ يَمْلأَ فَاهُ إِلاَّ التُّرَابُ وَيَتُوبُ اللهُ عَلَى مَنْ تَابَ-

(১১) আনাস বিন মালেক (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, যদি আদম সন্তানের স্বর্ণ পরিপূর্ণ একটা উপত্যকা থাকে, তথাপি সে তার জন্য দু’টি উপত্যকার কামনা করবে। তার মুখ মাটি ব্যতীত অন্য কিছুই ভরতে পারবে না। অবশ্য যে ব্যক্তি তওবা করে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন’।[4]

(১২) عَنْ عَمْرِو بْنِ عَوْفٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: فَوَاللهِ لَا الْفَقْرُ أَخْشَى عَلَيْكُمْ، وَلَكِنْ أَخْشَى عَلَيْكُمْ أَنْ تُبْسَطَ عَلَيْكُمُ الدُّنْيَا كَمَا بُسِطَتْ عَلَى مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ، فَتَنَافَسُوهَا كَمَا تَنَافَسُوهَا، وَتُهْلِكُكُمْ كَمَا أَهْلَكَتْهُمْ-

(১২) আমর ইবনু ‘আওফ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, আল্লাহর শপথ! আমি তোমাদের সম্পর্কে দরিদ্রতার ভয় করিনা। কিন্তু আমি ভয় করি যে, তোমাদের ওপর দুনিয়াকে প্রশস্ত করে দেওয়া হবে, যেমনি প্রশস্ত করে দেওয়া হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। আর তোমরা তা লাভ করার জন্য ঐরূপ প্রতিযোগিতা করবে, যেরূপ তারা করেছিল। ফলে এটা তোমাদেরকে ধ্বংস করবে, যেরূপ তাদেরকে ধ্বংস করেছিল’।[5]

(১৩) عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِىِّ- صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- قَالَ

تَعِسَ عَبْدُ الدِّينَارِ وَالدِّرْهَمِ وَالْقَطِيفَةِ وَالْخَمِيصَةِ، إِنْ أُعْطِىَ رَضِىَ، وَإِنْ لَمْ يُعْطَ لَمْ يَرْضَ-

(১৩) আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, ধ্বংস হোক দীনারের গোলাম, দিরহামের গোলাম ও উত্তম পোশাকের গোলাম (দুনিয়াদার)! যদি তাকে দেওয়া হয়, তাহ’লে সে সন্তুষ্ট হয়। আর না দেওয়া হ’লে অসন্তুষ্ট হয়’।[6]

(১৪) عَنْ كَعْبِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَا ذِئْبَانِ جَائِعَانِ أُرْسِلَا فِي غَنَمٍ بِأَفْسَدَ لَهَا مِنْ حِرْصِ الْمَرْءِ عَلَى الْمَالِ وَالشَّرَفِ لِدِينِهِ-

(১৪) কা‘ব বিন মালেক (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, দু’টি ক্ষুধার্ত নেকড়ে বাঘকে ছাগপালের মধ্যে ছেড়ে দেওয়া অত বেশী ধ্বংসকর নয়, যত না বেশী মাল ও মর্যাদার লোভ মানুষের দ্বীনের জন্য ধ্বংসকর’।[7]

মনীষীদের বক্তব্য :

(১) হযরত আলী (রাঃ) বলেন, আমি তোমাদের ব্যাপারে সবচেয়ে ভীত হই দু’টি বিষয়ে। দীর্ঘ আকাংখা ও প্রবৃত্তি পূজা। দীর্ঘ আকাংখা মানুষকে আখেরাত ভুলিয়ে দেয়। অতঃপর প্রবৃত্তি পূজা মানুষকে সত্য থেকে বিরত রাখে’।[8]

(২) হযরত সালমান ফারেসী (রাঃ) বলেন, ‘আমি আশ্চর্য হয়ে সেই ব্যক্তিকে দেখে, যে দীর্ঘ আশা-আকাংখা করে, কিন্তু মৃত্যুকে নিয়ে মোটেও চিন্তা করে না। অথচ মৃত্যু তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে’।[9]

(৩) আবুল লায়েছ সামারকান্দী (রহঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি পার্থিব আশা-আকাংখা কম করে, মহান আল্লাহ তাকে চারভাবে সম্মানিত করেন, ১. তাকে আল্লাহর অনুগত্যে অবিচলতা দান করেন। ২. তার পার্থিব দুশ্চিন্তা হ্রাস করে দেন। ৩. তাকে স্বল্প উপার্জনের উপর সন্তুষ্ট থাকার তাওফীক্ব দান করেন এবং ৪. তার অন্তরকে আলোকিত করে দেন’।[10]

সারবস্ত্ত :

(১) অধিক পাওয়ার আকাংখা এক ধ্বংসাত্মক লালসা, যা মানুষকে দুনিয়ার মোহে বন্দি করে অন্তর শূন্য করে দেয়। (২) যা আখিরাতের স্মরণ থেকে গাফেল করে এবং কবরের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে তার পরিসমাপ্তি ঘটায়। (৩) যে হৃদয় প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতায় নিমজ্জিত, তা ধীরে ধীরে অল্পে তুষ্টির বরকত হারিয়ে ফেলে। আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলা আমাদেরকে অধিক পাওয়ার আকাংখা ভুলে আখিরাতমুখী হওয়ার তাওফীক দান করুন।-আমীন!


[1]. আহমাদ হা/৮০৬০; ছহীহাহ হা/২২১৬।

[2]. আহমাদ হা/৮০৭০ সনদ ছহীহ; ছহীহুত তারগীব হা/৩২৬১।

[3]. বুখারী হা/১৪১২; মুসলিম হা/১৫৭।

[4]. বুখারী হা/৬৪৩৭, ৬৪৩৯; তিরমিযী হা/৩৮৯৮।

[5]. বুখারী হা/৩১৫৮; মুসলিম হা/২৯৬১; মিশকাত হা/৫১৬৩।

[6]. বুখারী হা/২৮৮৬, ৬৪৩৫।

[7]. তিরমিযী হা/২৩৭৬; দারেমী হা/২৭৩০; মিশকাত হা/৫১৮১।

[8]. ইমাম আহমাদ, ফাযায়েলুছ ছাহাবা ক্রমিক ৮৮১।

[9]. গাযালী, ইহয়াউ উলূমিদ্দীন ৪/৪৫৪; মিফতাহুল আফকার ১/১৩০।

[10]. আবুল লায়েছ সামারকান্দী, তাম্বীহুল গাফেলীন ২২৫ পৃ.।



আরও