ঈমানের স্তম্ভে কাদিয়ানী আক্বীদা

মুহাম্মাদ আরাফাত যামান 122 বার পঠিত

ভূমিকা :الْحَمْدُ لِلَّهِ وَحْدَهُ، وَالصَّلاَةُ وَالسَّلاَمُ عَلَى مَنْ لاَ نَبِيَّ بَعْدَهُ أَمَّا بَعْدُ- সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি একক। ছালাত ও সালাম বর্ষিত হোক সেই নবীর উপর, যার পর আর কোন নবী নেই। সম্মানিত পাঠকবৃন্দ শুরুর এই বাক্যগুলো মুসলিম উম্মাহর আলেমগণ হাযার বছর ধরে তাদের লিখনী এবং বক্তব্যের শুরুতে উল্লেখ করে যাচ্ছেন আমরাও সেই ধারা দিয়ে শুরু করলাম। আর এই বাক্য গুলো দ্বারা মুহাম্মাদ (ছাঃ) শেষনবী হওয়ার ব্যাপারে তাদের সকলের আক্বীদা স্পষ্ট করে। যা কোন সন্দেহের অবকাশ থাকে না।

খতমে নবুঅত : আরব জাতির মাঝে ইসমাঈল (আঃ)-এর পর দীর্ঘ যুগ ধরে আর কোন নবী বা রাসূলের আবির্ভাব হয়নি। অতঃপর এই বিরতি ভেঙ্গে দিয়ে নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে আল্লাহ আরব জাতির নিকট প্রেরণ করেন। কিন্তু তার নবুঅতের এই ধারা তার পরে অন্য কোন আরবী নবীদের নতুন কোন ধারাকে আরম্ভ করেনি যেমনটি বনী ইস্রাঈলের নবী এবং রাসূলগণ পরবর্তী নবীর বিষয়ে জানিয়ে যেতেন। বরং তার আগমন পুরো মানবজাতির জন্য নবুঅতের ধারাকে সমাপ্ত করার ঘোষণা দেওয়ার জন্য হয়। অর্থাৎ তিনি খাতামুল আম্বিয়া বা শেষনবী। যা মহান আল্লাহ স্পষ্ট কুরআনে জানিয়ে দেন,مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَسُولَ اللهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ، ‘মুহাম্মাদ তোমাদের কোন পুরুষের পিতা নয়; তবে আল্লাহর রাসূল ও সর্বশেষ নবী’ (আহযাব ৩৩/৪০)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,إِنَّ مَثَلِى وَمَثَلَ الأَنْبِيَاءِ مِنْ قَبْلِى كَمَثَلِ رَجُلٍ بَنَى بَيْتًا فَأَحْسَنَهُ وَأَجْمَلَهُ إِلاَّ مَوْضِعَ لَبِنَةٍ مِنْ زَاوِيَةٍ فَجَعَلَ النَّاسُ يَطُوفُونَ بِهِ وَيَعْجَبُونَ لَهُ وَيَقُولُونَ هَلاَّ وُضِعَتْ هَذِهِ اللَّبِنَةُ قَالَ فَأَنَا اللَّبِنَةُ وَأَنَا خَاتِمُ النَّبِيِّينَ- ‘আমি ও আমার পূর্বেকার নবীগণের তুলনা ঐ ব্যক্তির ন্যায় যিনি একটি গৃহ নির্মাণ করেছেন। অতঃপর সেটিকে খুবই সুন্দর ও আকর্ষণীয় করেছেন। কিন্তু কোণায় একটি জায়গা খালি রেখেছেন। তখন লোকেরা ঐ স্থানটি ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে এবং বিস্ময় প্রকাশ করতে থাকে ও বলতে থাকে, কেন এখানে একটি ইট দেওয়া হয়নি? রাসূল (ছাঃ) বলেন, আমিই সেই ইট এবং আমিই শেষনবী’।[1]لاَ نَبِىَّ بَعْدِى ‘আমার পরে আর কোন নবী নেই’।[2] তিনি বলেন,بُعِثْتُ إِلَى الأَحْمَرِ وَالأَسْوَدِ، وَكَانَ النَّبِىُّ يُبْعَثُ إِلَى قَوْمِهِ خَاصَّةً وَبُعِثْتُ إِلَى النَّاسِ عَامَّةً- ‘আমি লাল ও কালো সকলের প্রতি প্রেরিত হয়েছি। অন্য নবীগণ নির্দিষ্টভাবে স্ব স্ব গোত্রের জন্য প্রেরিত হয়েছেন। কিন্তু আমি মানবজাতির সকলের জন্য প্রেরিত হয়েছি’।[3]

খতমে নবুঅত সম্পর্কে কাদিয়ানী আক্বীদা : খতমে নবুঅতের বিষয়টি স্পষ্ট থাকার পরও যুগে যুগে মিথ্যা নবুঅতের দাবীদারের কমতি ছিল না। বিশেষত আরবদের মাঝে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর নবুঅতের পরপরই প্রথম মুসায়লামা কাযযাব মিথ্যা নবীর আবির্ভাব ঘটে। মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর মৃত্যুর পর ছাহাবীরা তার বিরুদ্ধে জিহাদ করে, যা ইয়ামামার যুদ্ধ নামে পরিচিত। তবে সে প্রথম মিথ্যা নবুঅতের দাবীদার হলেও তারপরে আরও অনেকেই এই দাবী করেছে এবং করবে। যেমনটি মুহাম্মাদ (ছাঃ) ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন-لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى تَلْحَقَ قَبَائِلُ مِنْ أُمَّتِي بِالْمُشْرِكِينَ وَحَتَّى يَعْبُدُوا الْأَوْثَانَ وَإِنَّهُ سَيَكُونُ فِي أُمَّتِي ثَلَاثُونَ كَذَّابُونَ كُلُّهُمْ يَزْعُمُ أَنَّهُ نَبِيٌّ وَأَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّينَ لَا نَبِيَّ بَعْدِي ‘আমার উম্মতের একদল লোক মুশরিকদের সাথে মিলিত হওয়ার পূর্বে এবং মূর্তিপূজায় লিপ্ত হওয়ার পূর্বে ক্বিয়ামত প্রতিষ্ঠিত হবেনা। আর আমার উম্মতের মধ্যে ত্রিশজন মিথ্যুকের আগমণ ঘটবে। তারা সকলেই নবুঅতের দাবী করবে। অথচ আমি সর্বশেষ নবী। আমার পর ক্বিয়ামতের পূর্বে আর কোন নবী আসবেনা’।[4]

আর এমনই এক মিথ্যা নবুঅতের দাবীদার ‘মীর্যা গোলাম আহমাদ’। যদিও ইতিপূর্বে এইসব ভন্ড নবীদের অনুসারী সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য। কিন্তু এই কাদিয়ানী ফিরক্বার অনুসারী সংখ্যা অন্যান্য যুগের চেয়ে তুলনামূলক বেশি। এর প্রাথমিক কারণ ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ সাহায্য নিয়ে মীর্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী এ দলটি প্রতিষ্ঠা করে। এর ফলে ভারতবর্ষে এই ফিৎনা বিপুল হারে ছড়িয়ে পড়ে। কারণ ব্রিটিশ শাসনামলে কাদিয়ানীরা ধর্মীয় দল হিসাবে নিবন্ধিত হয়। তখন থেকে আজ পর্যন্ত তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার জন্য আলেম সমাজ আওয়াজ তুললেও কোন এক অদৃশ কারণে তা সম্ভব হয়ে উঠেনা। ফলে দিনে দিনে এই দলের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পর্যায়ে আমরা ঈমানের ৬টি রুকনে কাদিয়ানী আক্বীদা জেনে নেই। যার মাধ্যমে এই দলটি কাফের হওয়ার বিষয়ে আর কোন সংশয় বাকী থাকবে না।

(১) আল্লাহর সম্পর্কে কাদিয়ানী আক্বীদা : মীর্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী আশ-শির্ক ফির রুবূবিয়াত বা আল্লাহ তা‘আলার সাথে নিজেকেও সবকিছুর স্রষ্টা ও মালিক বলে দাবী করেছে। এ ব্যাপারে তার মতামত হ’ল সে এ মর্মে অহী বা বাণী পেয়েছে যে, তাকে বলা হচ্ছে : ‘আমার যেমন আকাশ ও ভূমন্ডলের মালিকানা রয়েছে, তেমনি তা তোমারও’ (নাঊযুবিল্লাহ)। এ কথা ঠিক রাখতেই সে তার উর্দু তাওযীহুল মারাম বইয়ে আল্লাহ তা‘আলাকে ভয়ঙ্কর সামুদ্রিক অক্টোপাস এর সাথে তুলনা করেছে’।[5] অনুরূপভাবে ইবাদত যে শুধুমাত্র আল্লাহকেই করতে হবে, তাতেও সে দ্বিমত পোষণ করেছে। বরং আল্লাহর সাথে তারও ইবাদত করার জন্য সে লোকদের আহবান করেছে। যেমন তার দাবী অনুযায়ী তার কাছে এই মর্মে বাণী এসেছে যে, ‘তোমার সাথে আমার সম্পর্ক হ’ল, তুমি আমার সাথে একত্রিত, আল্লাহ তোমার পবিত্রতা জপ করছে। আর যে কেউ আল্লাহর প্রকাশ্য রূপের (মীর্যা গোলাম) সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তার কাছে কোনো কল্যাণ নেই’।[6]

আল্লাহর নাম ও গুণাবলীসমূহ সম্পর্কে তার মতামত আরো জঘন্য। সে আল্লাহকে এমন কতক নাম ও গুণে উল্লেখ করেছে, যা কখনোই আল্লাহর মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হ’তে পারে না। বরং তা কেবল বান্দার গুণই হ’তে পারে। যেমন, সে বলছে ‘আল্লাহ তরবারী নির্মাতা’।[7] আরও বলছে ‘আমার রব চৌকিদারের মতো আমার সামনে সামনে হাঁটে’।[8] এছাড়া সে সর্বেশ্বরবাদ বা জগতের সবকিছু এক। সৃষ্টিজগত এবং স্রষ্টা একই বস্ত্তর দুইদিক-এই ভ্রান্ত বিশ্বাসের প্রবক্তা। তার আরবী গ্রন্থ আল-ইসতিসফার দাবী অনুযায়ী আল্লাহর সাথে কথোপকথনের সময় আল্লাহ তা‘আলা নাকি তাকে বলছে, ‘তুমি আমার থেকে, আর আমি তোমার থেকে’।[9]

অন্য এক স্থানে আল্লাহকে তার মহৎ গুণাগুণের বিপরীত গুণে ভূষিত করেছে। যেমন তার দাবী অনুসারে আল্লাহর সাথে কথোপকথনের সময় তার কাছে নাকি এ মর্মে অহি এসেছে যে, ‘তোমার সাথে আমার সম্পর্ক পিতা পুত্রের সম্পর্ক, তুমি আমার পুত্রতুল্য’।[10] এতেই শেষ নয় বরং অন্য স্থানে বলছে তার কাছে নাকি অহি এসেছে এই বলে যে, ‘হে আল্লাহর নবী! আমি তোমাকে চিনতে পারিনি’।[11]

(২) ফেরেশতা সম্পর্কে কাদিয়ানী আক্বীদা : ফেরেশতা জগত সম্পর্কে ভন্ড নবুঅতের দাবীদার গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীর আক্বীদা ও বিশ্বাস হ’ল, ফেরেশতা ও আল্লাহ একই বস্ত্ত। তাই সে তার আরবী গ্রন্থ হামামাতুল বুশর’-এর মধ্যে ফেরেশতাদের সম্পর্কে বলছে, ‘এদেরকে আল্লাহ তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ রূপে তৈরী করেছেন’।[12] এ থেকে বুঝা যায় যে, সে ফেরেশতাদের অস্তিত্বই মানে না। বরং ফেরেশতা বলতে আল্লাহর অঙ্গপ্রত্যঙ্গই বুঝে (নাঊযুবিল্লাহ)

(৩) আসমানী কিতাব সম্পর্কে কাদিয়ানী আক্বীদা : ভন্ড মীর্যা কাদিয়ানী তার আরবী গ্রন্থ আল-ইসতিসফাতে বলেছে, ‘আল্লাহ আমার সাথে কথা বলেছেন যেমন তার রাসূলদের সাথে বলেছেন! আর আমি আমার বলা এই কালেমাসমূহের সত্যতার বিশ্বাস রাখি যেমন আল্লাহর অন্যান্য কিতাবের ওপর রাখি’।[13] ফলে সে তার নিজ হাতে লিখিত বিভিন্ন ভাষার বিভিন্ন প্রবন্ধের সমষ্টি তাযকিরাতুল অহি আল-মুকাদ্দাস বা ঐশী বাণী স্মারক নামে যার নামকরণ করেছিল। সেটাকে আল্লাহর কাছ থেকে যথাযথ অবতীর্ণ অন্যান্য কিতাবাদীর সাথে তুলনা করেছে। যা থেকে সহজেই অনুমেয়, সে নিজেই আসমানী কিতাবওয়ালা দাবী করত।

(৪) রাসূলের সম্পর্কে কাদিয়ানী আক্বীদা : মুসলিমদের বিশ্বাস হ’ল যে, নবীগণ পবিত্র নসল ও নসব থেকে নির্বাচিত হয়ে থাকেন। সুতরাং তাদের নসবে কোনো প্রকার ব্যভিচারের নাম গন্ধও নেই। কিন্তু গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীর মতে নবীদের আসল নসব পবিত্র হ’তে হবে, এমন কোনো কথা নেই। বরং সে তার উর্দূ বই ‘কিসতিয়ে নূহে’ মারিয়াম (আঃ) সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলছে, ‘সে তার গর্ভসহ বিবাহ বসতে বাধ্য হয়েছিল। কারণ তার স্বজাতীয় মুরুববীরা তাকে বিবাহের জন্য পীড়াপীড়ি করছিল’।[14] তারপর তার নবুঅতের দাবীর দ্বিতীয় পর্যায়ে সে যখন নিজকে ঈসা (আঃ)-এর অনুরূপ বা সদৃশ্য বলে বর্ণনা করত এবং আরো আগ বাড়িয়ে বলত, ‘ঈসার সদৃশ ব্যক্তি ঈসা থেকেও উত্তম’।[15]

অতঃপর তার জীবনের তৃতীয় স্তরে যখন সে পূর্ণ নবুঅত দাবী করল, তখন সে স্পষ্টাক্ষরে নিজের নবুঅতের কথা না বলে প্রথমে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর শানে নাত-ক্বাছীদাহ লিখতে আরম্ভ করল। এ সমস্ত ক্বাছীদায় সে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর প্রশংসায় সীমালংঘন করে। যেহেতু রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর দুই নাম ছিল, (মুহাম্মাদ, আহমাদ) সেহেতু সে এসব ক্বাছীদায় দ্বিতীয় নামটির ব্যবহার বেশি করতে থাকে। তবে এসব কিছুতে পরোক্ষভাবে নিজের দিকেই ইঙ্গিত দিত। সে কি মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর প্রশংসা করছে, নাকি আহমাদ (নিজ নাম এর শেষাংশ) এর প্রশংসা করছে, তা অনেকেই বুঝতে পারত না।

অতঃপর সে সরাসরি আহমাদ দ্বারা নিজকে বুঝাবার এক চমৎকার পন্থা আবিষ্কার করে এবং বলে ‘আমার এ জুববায় (পোষাকে) আল্লাহর নূর ছাড়া আর কিছুই নেই। আছহাবে ছুফফা তোমার ওপর দরূদ পাঠ করছে। আর মুহাম্মাদ (ছাঃ) আসল রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। কিন্তু আহমাদ আত্মপ্রকাশ করেছে তার ছায়া রূপ নিয়ে’। এইভাবে সে এক সময় সরাসরি নবুঅতের দাবী করে বলে, ‘আমি যা কিছুই বলছি, সেটা আমার রবের পক্ষ থেকে। যিনি আমার নিত্য সঙ্গী’।[16] এটাই ছিল তার মিথ্যা নবুঅত দাবী করার যাত্রা।

(৫) আখিরাত সম্পর্কে কাদিয়ানী আক্বীদা : গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী এ ব্যাপারে ভিন্ন মত পোষণ করে। সে সর্বপ্রথম ১৮৯৩ সাল তথা ১৩১১ হিজরীতে ক্বিয়ামতের যে সমস্ত আলামত রয়েছে, সেগুলোকে অস্বীকার করে। যেমন তার আরবী বই ‘হামামাতুল বুশর’-য়ে সূরা আ‘রাফের ১৮৭ নং আয়াতের ব্যাখ্যা বিকৃত করে বলে, (بغطة) শব্দটি দ্বারা প্রকাশ্যভাবে বুঝায় যে, ক্বিয়ামতের যে সমস্ত আকাট্য প্রমাণ যা প্রকাশিত হবে বলে বলা হয়, তা কখনো অনুষ্ঠিত হবেনা’।[17]

দ্বিতীয় স্তরে এসে ১৩১৮ হিজরী মোতাবেক ১৯০১ সালে সে সরাসরি পরকাল অস্বীকার করে প্রথমে শব্দের নম্বর হিসাব করে গাণিতিক কায়দায় বলে, ‘আজকের দিনে কাল তার সর্বশেষ ঘুর্ণায়নে পৌঁছেছে। সূরা ফাতিহায় বর্ণিত ইহকালের নির্ধারিত সময় সাত হাযার চন্দ্র বছর এবং সূর্য বছর শেষ হ’তে চলেছে’।[18] এ কথার ব্যাখ্যায় তার ছেলে মাহমূদ বলে, ‘পরকাল মৃত্যুর পরেই শুরু হয়ে থাকে, মৃত্যু সময় থেকে পৃথক করে হাযার বছর পরে নির্দিষ্ট সময়ে পরকাল বলতে কিছু নেই’।[19]

মোট কথা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী যখন দাবী করল যে, সেই হ’ল প্রতিশ্রুত মসীহ, তখন থেকেই সে তার এ দাবীর সমর্থনে বলতে আরম্ভ করে, তার আবির্ভাবের পরবর্তী সময়টাই হ’ল ক্বিয়ামত। আর এ ব্যাপারে তার যুক্তি হ’ল, প্রতিটি শব্দের গোপন একটা নম্বর রয়েছে। সেই শুধুমাত্র তা জানে। আর সে অনুসারে হিসাব-নিকাশ করে সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, ইহকালীন বয়স যত হবার কথা তা শেষ হয়ে গেছে তার আবির্ভাবের সাথে সাথেই। সুতরাং তার আবির্ভাবের পরবর্তী জীবনটাকে পরকালীন জীবন হিসাবে মানতে হবে। এভাবেই সে তার সমস্ত প্রচেষ্টা ইহূদী নাছারাদের ক্বিয়ামত সম্পর্কিত বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত করতে চায়। কিন্তু যখন তার মারা যাওয়ার পরও দুনিয়ার অস্তিত্ব রয়ে গেল, তখন তার অনুসারীরা সেই বিশ্বাসটাকে নতুন করে সাজাবার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু হায়! তার সমস্ত পুস্তকাদি এব্যাপারে এত স্পষ্ট সাক্ষ্য প্রমাণবহ যে, সেটা কোনো ব্যাখ্যাই গ্রহণ করছে না।

(৬) তাক্বদীর বিষয়ে কাদিয়ানী আক্বীদা : গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী ঈমানের অন্যান্য পাচঁটি রুকদ-এর মত এখানেও ভ্রষ্ট হয়েছে। এ ব্যাপারে সে বলেছে, আল্লাহ নাকি তাকে প্রেমের অভিনয় করে বলছে ‘হে আল্লাহর নবী! আমি তোমাকে চিনতে পারিনি’[20](নাউযুবিল্লাহ)

এতে করে সে বুঝাতে চায়, আল্লাহ তার সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল। এ জন্যই অনেক দেরীতে তাকে নবুঅতের খবর দিয়েছে (নাউযুবিল্লাহ)। এসব দাবীর পিছনে যে রহস্যটা কাজ করেছে সেটা হ’ল, সে যে বারবার তার অবস্থান পরিবর্তন করত; সেটাকে টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ প্রচেষ্টা। কারণ, সে কখনো নিজেকে বলত প্রতিশ্রুত মসীহ, কখনো মাহদী। আবার কখনো মুজাদ্দিদ বা ধর্ম সংস্কারক। অবশেষে সে নিজেকে নবী দাবী করে। সে যখন দেখল, তার বিভিন্ন অবস্থান লোকের মনে প্রশ্নের উদ্রেক করবে, তখন সে এ দাবী করে।

অনুরূপভাবে আল্লাহ তাকে বলছে, ‘কোন কিছু করার ইচ্ছা করলে তোমাকে শুধুমাত্র হও বলতে হবে, তাতেই তা হয়ে যাবে’।[21] সে এটাকে তার গ্রহণীয় প্রার্থনা হিসাবে বর্ণনা করে বলেছে ‘কখনো কখনো আল্লাহ তার ইচ্ছাকে ত্যাগ করে তার বান্দার প্রার্থনা শুনেন’।[22] এতে বুঝা যায়, তার মতে আল্লাহর ইচ্ছা পরিবর্তনশীল। সুতরাং সে তাক্বদীরের উপর ঈমান রাখার প্রয়োজন মনে করে না।

আমরা যদি তার এ বিশ্বাসের মূল খুঁজতে যাই, তাহ’লে দেখতে পাব, সে এ কথাগুলো মথি লিখিত সু-সমাচার থেকে গ্রহণ করেছে। কারণ সেখানে ঈসা (আঃ)-এর দিকে সম্পর্কিত করে বলা হয়েছে, তিনি নাকি তার সাথী পিটারকে বলেছেন, ‘তুমি ধরাপৃষ্ঠে যা কিছু করবে, তাই উর্ধ্বাকাশে গৃহীত হবে। আর ভূপৃষ্ঠে যাই সংঘটিত হবে, উর্ধ্বাকাশেও তাই ঘটবে’।[23] সুতরাং যদি তার শিক্ষা ইসলামী ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী না হয়ে অন্যান্য মতবাদ থেকে নেওয়া হয়ে থাকে বা মনগড়া কিছু কার্যকলাপকে ধর্মের রূপে রূপায়িত করার চেষ্টা করে, তাহ’লে কিভাবে তার অনুসারীদেরকে মুসলিম বলা যাবে? সুতরাং তারা যতই নিজেদের মুসলিম দাবী করুক, তারা সুনিশ্চিতভাবে কাফের।

মীর্যা গোলাম আহমাদের পরিচয় : মীর্যা গোলাম আহমাদের জন্ম ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দে শিখ শাসনের শেষ আমলে বর্তমান ভারতের পূর্ব পাঞ্জাবের গুরুদাসপুর যেলার বাটালা মহকুমাধীন ‘কাদিয়ান’ নামক উপশহরে। তার বংশপরিচয় সম্পর্কে তার বক্তব্যে মারাত্মক বৈপরীত্য দেখা যায়। কখনো সে দাবি করে, তার পরিবার মোগলদের ‘বারলাস’ শাখা থেকে এসেছে; আবার কখনো বলে, তার বংশ ইরানী; কখনো দাবি করে, তার পরিবার চীনা বংশোদ্ভূত; কখনো নিজেকে রাসূল (ছাঃ)-এর কন্যা ফাতেমা (রাঃ)-এর বংশধর বলে। আবার কখনো বলে, তাদের পূর্বপুরুষ সামরকন্দ থেকে আগত; কখনো আবার নিজেকে বনু ইসহাকের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে দাবী করে। তার প্রপিতামহ মীর্যা কাল মুহাম্মাদ ছিলেন গ্রাম ও ভূমির মালিক এবং পাঞ্জাব অঞ্চলের একজন শাসক। কিন্তু শিখদের সঙ্গে সংঘটিত যুদ্ধে তিনি তার সেই রাজ্য হারান। এই বিপুল সম্পদ থেকে তার পরিবারের হাতে অবশিষ্ট ছিল মাত্র পাঁচটি গ্রাম।

শিক্ষা ও কর্ম : সে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করে নিজ গৃহে। যুক্তিবিদ্যা, ধর্মীয় ও সাহিত্যিক জ্ঞান অর্জন করে কয়েকজন শিক্ষকের কাছে। সে তার পিতার নিকট প্রাচীন চিকিৎসাশাস্ত্রও অধ্যয়ন করে। তার পিতা ছিলেন একজন দক্ষ চিকিৎসক। সে পড়াশোনায় আগ্রহী ছিল। তবে ধর্মীয় জ্ঞান সে কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকের কাছে অধ্যয়ন করেনি। কেবল বইপড়ার প্রতি তার ঝোঁক ছিল।

১৮৬৪ খৃষ্টাব্দে সে পাঞ্জাব প্রশাসনের আদালতে কাজ শুরু করে, যেখানে তার বেতন ছিল পনেরো রূপী। এই সময় সে ইংরেজিতে দু’টি বই পড়ে এবং আইন বিষয়ে একটি পরীক্ষায় অংশ নেয়। কিন্তু তাতে ব্যর্থ হয়। চার বছর পর সে চাকুরী থেকে ইস্তফা দেয় এবং পিতার সঙ্গে মামলা-মোকদ্দমা ও বিচারিক কার্যক্রমে অংশ নেয়। তবে নিজের দাবী অনুযায়ী এই সবের পাশাপাশি সে তাফসীর ও হাদীছের গ্রন্থ অধ্যয়ন এবং কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনায় সময় দিত।

কাদিয়ানীর শুরুর দিকের জীবন সম্পর্কে জানা যায়, সে ছিল অত্যন্ত সরল, কম বুদ্ধিসম্পন্ন ও ভাবুক প্রকৃতির। সময়ের হিসাব রাখতে সে অপারগ ছিল। ঘড়ির সময় জানার জন্য সে আঙুল দিয়ে ঘড়ির ডায়ালে সংখ্যা গুনত। নতুন ইউরোপীয় জুতা পরতেও সে অক্ষম ছিল; ডান ও বাম জুতা আলাদা করতে না পেরে কালি দিয়ে চিহ্ন এঁকে রাখত। তবু ভুল করত। ড. আওয়াজী মনে করেন, সে এসব আচরণ ইচ্ছাকৃতভাবে প্রদর্শন করত, যাতে মানুষের মনে বিশেষ এক ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করা যায়’।[24]

কাদিয়ানিয়াত প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট : ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর মাধ্যমে ইংরেজরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য কায়েম করে এবং বিপুল সংখ্যক খৃষ্টান মিশনারী পাঠিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় আগ্রাসন চালায়। এর ফলে মুসলমানরা ক্ষুব্ধ হয়ে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ সংঘটিত করে, যা ইংরেজরা দমন করে। এরপর ইংরেজরা উপলব্ধি করে যে, মুসলমানদের জিহাদের আক্বীদাই তাদের প্রতিরোধের মূল শক্তি। এজন্য ইংরেজ কর্মকর্তা ‘হান্টার’ প্রস্তাব দেন, মুসলমানদের মধ্যে এমন একজন ব্যক্তিকে দাঁড় করাতে হবে, যে নিজেকে মাহদী বা মসীহ বলে দাবি করবে, যাতে মুসলমানদের চিন্তাধারা বিভ্রান্ত হয়। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, ইংরেজরা তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য মীর্যা গোলাম আহমাদকে নির্বাচন করে এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা পার্সি কক্স (ইহূদী বংশোদ্ভূত) এ আন্দোলন পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে’।

এর প্রেক্ষিতে ১৮৭৬ খৃষ্টাব্দে কাদিয়ানী আন্দোলনের সূচনা হয়। ১৮৮৯ সালের ২৩শে মার্চ তারিখে তার নিজ নামানুসারে প্রতিষ্ঠিত দলের নাম রাখা হয় ‘আহমাদিয়া জামা‘আত’। বর্তমানে এরা বলছে, ‘আহমাদিয়া মুসলিম জামাত’। ভন্ডনবী মির্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী ১৮৯১ সালের ২২শে জানুয়ারী নিজেকে ‘প্রতিশ্রুত মাসীহ’ দাবী করেন। এরপর ১৮৯৪ সালের ১৭ই মার্চ ‘ইমাম মাহদী’ এবং ১৯০৮ সালের ৫ই মার্চ তারিখে নিজেকে ‘নবী’ হিসাবে ঘোষণা দেন।[25]

গোলাম আহমাদের শেষ পরিণতি : অল ইন্ডিয়া আহলেহাদীছ কনফারেন্স-এর সেক্রেটারী ও সাপ্তাহিক ‘আখবারে আহলেহাদীছ’ পত্রিকার সম্পাদক আবুল অফা ছানাউল্লাহ অমৃতসরী (রহঃ) অনেকগুলি মুনাযারায় তাকে পরাজিত করেন। মাওলানা ছানাউল্লাহর আগুনঝরা বক্তৃতা ও ক্ষুরধার লেখনীতে অতিষ্ঠ হয়ে গোলাম আহমাদ ১৯০৭ সালের ১৫ই এপ্রিল তারিখে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে মাওলানা ছানাউল্লাহকে ‘মুবাহালা’ করার আহবান জানিয়ে বলেন, আমাদের দু’জনের মধ্যে যে মিথ্যাবাদী, তাকে যেন আল্লাহ সত্যবাদীর জীবদ্দশায় মৃত্যু দান করেন’। আল্লাহ মিথ্যুকের দো‘আ কবুল করেন এবং বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ১৩ মাস ১০ দিন পর ১৯০৮ সালের ২৬ মে কঠিন কলেরায় আক্রান্ত হয়ে নাক-মুখ দিয়ে পায়খানা বের হওয়া অবস্থায় এই ভন্ডনবী ন্যাক্কারজনকভাবে লাহোরে নিজ কক্ষের টয়লেটে মৃত্যুবরণ করেন। অথচ মুবাহালা গ্রহণকারী সত্যসেবী আহলেহাদীছ নেতা আল্লামা ছানাউল্লাহ অমৃতসরী মৃত্যুবরণ করেন মিথ্যাবাদীর মৃত্যুর প্রায় ৪০ বছর পরে ১৯৪৮ সালের ১৫ই মার্চ তারিখে। ফালিল্লাহিল হাম্দ[26]

-মুহাম্মাদ আরাফাত যামান

[লেখক : কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ]


[1]. বুখারী হা/৩৫৩৫; মুসলিম হা/২২৮৬; মিশকাত হা/৫৭৪৫।

[2]. বুখারী হা/৩৪৫৫; মুসলিম হা/১৮৪২; মিশকাত/৩৬৭৫, ৫৪০৬ ।

[3]. আহমাদ হা/১৪৩০৩; বুখারী হা/৩৩৫; মুসলিম হা/৫২১; মিশকাত হা/৫৭৪৭।

[4]. আবুদাঊদ হা/৪২৫২; তিরমিযী হা/২২১৯; মিশকাত হা/৫৪০৬।

[5]. তাওযীহুল মারাম ৬৮-৬৯ পৃ.।

[6]. আল-ইসতিসফা ৫, ২৮, ৮৮, ৮৯, ৯৪ পৃ.।

[7]. আল-ইসতিসফা ৪৬ পৃ.।

[8]. মুওয়াহিবুর রহমান ২৩ পৃ.।

[9]. আল-ইসতিসফা ৮১ পৃ.।

[10]. আল-ইসতিসফা ৯১ পৃ.।

[11]. আল-ইসতিসফা ৯৫ পৃ.।

[12]. হামামাতুল বুশর ২২১ পৃ.।

[13]. আল-ইসতিসফা ২২, ৮৬ পৃ.।

[14]. কিসতিয়ে নূহ ২১ পৃ.।

[15]. Our teaching 17 p.

[16]. আল-ইসতিফতা ১৮, ৮৮-৯৪ পৃ.।

[17]. হামামাতুল বুশর ২৮৩ পৃ.।

[18]. তাফসির উম্মুল কিতাব ২৯ পৃ.।

[19]. আহমাদিয়া আন্দোলন ১০৩ পৃ.।

[20]. আল-ইসতিসফা ৯৫ পৃ.।

[21]. আল-ইসতিসফা ৯৬ পৃ.।

[22]. সাফিনাতুন নূহ ২৪ পৃ.।

[23]. মথি ১৬/১৯ পৃ.।

[24]. আল-মু‘জেযাতু ইন্দাল ক্বাদিয়ানিয়াত, সিমাহ ওয়েল মুছতফা, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, গাযা, (প্রকাশকাল : রামাযান ১৪৩৮ হি./জুন ২০১৭ ইং), ২৩-২৫ পৃ.।

[25]. মাওক্বিফুল উম্মাহ আল-ইসলামিয়াহ মিনাল ক্বাদিয়ানিয়াহ ১১২ পৃ.।

[26]. মাসিক আত-তাহরীক অক্টোবর ২০১০, প্রশ্নোত্তর ক্রমিক. ১৫/১৫।



আরও