জান্নাতের বিশেষ মর্যাদাপ্রাপ্ত দুনিয়ার ৪টি নদী

মুহাম্মাদ আরাফাত যামান 8 বার পঠিত

ভূমিকা : মহিমান্বিত মে‘রাজের সেই পুণ্যময় সফরে সিদরাতুল মুনতাহার পাদদেশ থেকে উৎসারিত চারটি রহস্যময় ঝর্ণাধারা অবলোকন করেছিলেন বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)। যা আমাদের ঈমানী চেতনাকে এক অপার্থিব প্রশান্তিতে ভরিয়ে দেয়। জান্নাতের গভীরে প্রবহমান দু’টি অভ্যন্তরীণ নদী যেমন মুমিনদের জন্য অনন্ত সুখের আগাম বার্তা দেয়, তেমনি পৃথিবীর বুকে বহমান নীল ও ফোরাত নদী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সৃষ্টির এই বিশাল ক্যানভাসে আমরা যা দেখি, তার শেকড় মিশে আছে রবের জান্নাতে। এছাড়া সাইহান ও জাইহানের মতো বরকতময় নদীগুলোর জান্নাতী পরিচয় আমাদের হৃদয়ে এই আকুলতাই জাগিয়ে তোলে যে, এই নশ্বর পৃথিবীর তৃষ্ণা মিটিয়ে আমাদের আসল গন্তব্য হ’ল সেই জান্নাতী ঝর্ণার পাশে, যেখানে কোনো অভাব নেই, নেই কোনো ক্লান্তি। নিম্নে জান্নাতের বিশেষ মর্যাদা প্রাপ্ত ৪টি নদীর বর্ণনা দেওয়া হ’ল।-

হাদীছের ব্যাখ্যা : বুখারীতে আনাস বিন মালেক হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সিদরাতুল মুনতাহার আলোচনাকালে বলেন,رُفِعْتُ إِلَى السِّدْرَةِ فَإِذَا أَرْبَعَةُ أَنْهَارٍ، نَهَرَانِ ظَاهِرَانِ، وَنَهَرَانِ بَاطِنَانِ، فَأَمَّا الظَّاهِرَانِ النِّيلُ وَالْفُرَاتُ، وَأَمَّا الْبَاطِنَانِ فَنَهَرَانِ فِى الْجَنَّةِ، ‘আমার সম্মুখে সিদরাতুল মুনতাহা তুলে ধরা হ’ল। তখন সেখানে চারটি নদী দেখলাম। দু’টি নদী হ’ল প্রকাশ্য। আর দু’টি নদী হ’ল অপ্রকাশ্য। প্রকাশ্য দু’টি হ’ল, নীল ও ফুরাত (পৃথিবীতে)। আর অপ্রকাশ্য দু’টি হ’ল, জান্নাতের দু’টি নদী।[1]

অন্যদিকে ছহীহ মুসলিমে আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,سَيْحانُ وجَيْحانُ، والْفُراتُ والنِّيلُ كُلٌّ مِن أنْهارِ الْجَنَّةِ ‘সায়হান (আমু দরিয়া) ও জায়হান (শির দরিয়া) এবং ফুরাত ও নীল সবগুলি জান্নাতের নদী’।[2]

ইবনু কাছীর (রহঃ) উক্ত হাদীছ দু’টির ব্যাখ্যায় আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে বলেন, ‘সম্ভবত এর দ্বারা পরিচ্ছন্নতা, স্বাদ ও প্রবাহের ক্ষেত্রে এ নদীগুলো জান্নাতের নদ-নদীর সাথে সাদৃশ্য রাখে বলে বুঝানো হয়েছে। তার এই কথার ব্যাখ্যা স্বরূপ তিনি একটি হাদীছ উল্লেখ করেন। যেখানে আজওয়া খেজুরকে জান্নাতী ফল বলা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা পৃথিবীতে উৎপাদিত একটি ফল। একইভাবে এই নদীগুলো জান্নাতী নামকরণ করা হলেও পৃথিবীতেই এর উৎস মূল রয়েছে। আল্লাহু আ’লাম’।[3]

১. নীল নদ : নীল নদ, আফ্রিকা মহাদেশে অবস্থিত। যা বিশ্বের দীর্ঘতম নদী। স্রোতের তীব্রতা, পানির স্বচ্ছতা এবং গতিপথের দৈর্ঘ্যের দিক থেকে গোটা পৃথিবীতে এটি অতুলনীয়। এর দু’টি উপনদী রয়েছে। শ্বেত নীল নদ ও নীলাভ নীল নদ। এর মধ্যে শ্বেত নীল নদ দীর্ঘতম। শ্বেত নীল নদ আফ্রিকার মধ্যভাগের ভিক্টোরিয়া হরদ অঞ্চল হ’তে উৎপন্ন হয়েছে। এটি তাঞ্জানিয়া, লেক ভিক্টোরিয়া, উগান্ডা ও দক্ষিণ সুদানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। নীলাভ নীল নদ ইথিওপিয়ার তানা হরদ হ’তে উৎপন্ন হয়ে পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে সুদানে প্রবেশ করেছে। দুইটি উপনদী সুদানের রাজধানী খার্তুমের নিকটে মিলিত হয়েছে।

উল্লেখ্য যে, মিশরে বসতি স্থাপনের জন্য নীল নদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নীল নদের আশেপাশের মাটি খুবই উর্বর। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন,أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّا نَسُوقُ الْمَاءَ إِلَى الْأَرْضِ الْجُرُزِ فَنُخْرِجُ بِهِ زَرْعًا تَأْكُلُ مِنْهُ أَنْعَامُهُمْ وَأَنْفُسُهُمْ أَفَلَا يُبْصِرُونَ- ‘তারা কি দেখেনা যে, আমরা শুষ্ক ভূমিতে পানি প্রবাহিত করি। অতঃপর তার মাধ্যমে শস্য উৎপাদন করি। যা থেকে ভক্ষণ করে তাদের গবাদিপশু ও তারা নিজেরা। এরপরেও কি তারা উপলব্ধি করবে না?’ (সাজদাহ ৩২/২৭)

নীল নদ বিষয়ক একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ইবনু কাছীর (রহঃ) আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া গ্রন্থে উল্লেখ করেন। আমর ইবনে ‘আস যখন মিসর জয় করেন, তখন সেখানের অধিবাসীরা বলেন, ‘সম্মানিত আমীর আমাদের নীল নদের একটি প্রথা আছে, যা পালন না করলে তা প্রবাহিত হয় না। আর সেই প্রথা হ’ল বু‘না (প্রাচীন কিবতী ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১০ম) মাসের ১২তারিখে এক কুমারী মেয়েকে সুসজ্জিত করে তাতে ফেলে দিতে হয়’। এই কথা শুনে তিনি তাদেরকে বলেন, إِنَّ هَذَا لَا يَكُونُ فِي الْإِسْلَامِ وَإِنَّ الْإِسْلَامَ يهدم ما قبله ‘ইসলামে এই প্রথা চলবে না। কেননা নিশ্চয়ই ইসলাম তার পূর্বের সকল কুসংস্কারকে নির্মূল করে দেয়’।[4]

কিন্তু দীর্ঘ ৩মাস অপেক্ষা করেও নীল নদে পানি প্রবাহিত না হওয়ায় তিনি আমীরুল মু‘মিনীন ওমর (রাঃ)-কে চিঠির মাধ্যমে তা জানান। এর জবাব ওমর (রাঃ) বলেন, ‘তুমি যা করেছ ঠিক করেছ। আর তোমার নিকট আরেকটি চিঠি পাঠাচ্ছি তুমি তা নীল নদে ফেলে দিও’। সেই চিঠিতে লিখা ছিল, ‘আমীরুল মু‘মিনীন ওমর-এর পক্ষ থেকে মিসরের নীল নদের প্রতি। হামদ ও ছালাতের পর! যদি তুমি নিজ ক্ষমতায় প্রবাহিত হও, তাহ’লে তুমি প্রবাহিত হয়ো না। আর যদি তোমাকে পরাক্রমশালী এক অদ্বিতীয় আল্লাহ প্রবাহিত করে, তাহ’লে তার কাছেই আমাদের প্রার্থনা, যেন তিনি তোমাকে প্রবাহিত করেন’। এই চিঠি নীল নদে ফেলার পর শনিবার সকালেই তাতে পানি প্রবাহিত হওয়া শুরু হয় এবং এই কুসংস্কার চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।

২. ফোরাত নদী : ফোরাত নদী বা ইউফ্রেটিস রিভার। যা ২,৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীটি তুরস্ক, সিরিয়া ও ইরাকের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ক্বিয়ামতের কিছু বড় আলামত এই নদীর সাথে জড়িত। আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, لاَ تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى يَحْسِرَ الْفُرَاتُ عَنْ جَبَلٍ مِنْ ذَهَبٍ يَقْتَتِلُ النَّاسُ عَلَيْهِ فَيُقْتَلُ مِنْ كُلِّ مِائَةٍ تِسْعَةٌ وَتِسْعُونَ وَيَقُولُ كُلُّ رَجُلٍ مِنْهُمْ لَعَلِّي أَكُونُ أَنَا الَّذِي أَنْجُ- ‘ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে না ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ না ফুরাত তার মধ্যস্থিত স্বর্ণের পাহাড় বের করে দেয়। লোকেরা এ নিয়ে যুদ্ধ করবে এবং একশ’ জনের মধ্যে নিরানববই জন মৃত্যুবরণ করবে। তাদের সকলেই বলবে, আমার মনে হয় আমি জীবিত থাকব’।[5]

আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে অপর বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, يُوشِكُ الْفُرَاتُ أَنْ يَحْسِرَ عَنْ كَنْزٍ مِنْ ذَهَبٍ فَمَنْ حَضَرَهُ فَلاَ يَأْخُذْ مِنْهُ شَيْئًا ‘নিকট ভবিষ্যতে ফোরাত নদী তার ভূগর্ভস্থ সোনার খনি বের করে দেবে। সে সময় যারা উপস্থিত থাকবে তারা যেন তা থেকে কিছুই গ্রহণ না করে’।[6]

এই হাদীছের ব্যাখ্যা হ’তে পারে (ক) নদীর স্থানে একটি পাহাড় উঠবে, যেখানে স্বর্ণেও খনি থাকবে। অথবা (খ) নদীর তলদেশে বিপুল পরিমাণের স্বর্ণের সন্ধান পাওয়া যাবে। সাম্প্রতিক সময় ফোরাত নদীর পানির স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা তুরস্ক, সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যে বাঁধ নির্মাণ ও পানির ব্যবহারের কারণেও হ’তে পারে। তবে নদীর স্বর্ণের পাহাড় প্রকাশের আলামত এখনো পূর্ণরূপে দেখা যায়নি। ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেছেন, এই ঘটনা ইমাম মাহদীর আগমনের ঠিক পূর্বে সংঘটিত হবে’।[7]

৩. তুরস্কের জায়হান নদী : জায়হান (Jayhan) নদীটি ভৌগোলিক এবং ধর্মীয় উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইসলামী ঐতিহ্যে একে জান্নাতের নদীগুলোর একটি হিসাবে গণ্য করা হয়। তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত তরাস পর্বতমালা (Taurus Mountains)-এর অন্তর্গত ‘নুরহাক’ পাহাড় থেকে এর উৎপত্তি। নদীটি তুরস্কের কাহরামানমারাস, ওসমানিয়ে এবং আদানা প্রদেশের মধ্য দিয়ে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে ভূমধ্যসাগরে মিলিত হয়। এটি প্রাচীনকাল থেকে একটি প্রাকৃতিক সীমানা এবং বিভিন্ন সভ্যতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসাবে পরিচিত ছিল। এটির আকারে প্রায় ফোরাতের সমান। একে ‘আমু দারিয়া’ নামেও ডাকা হয়। প্রাচীন গ্রীকরা একে ‘অক্সাস’ নামে ডাকত। প্রাচীনকালে ‘জায়হান’ নদীকে ইরান এবং তুরানের সীমানা হিসাবে বিবেচনা করা হ’ত। জায়হান নদীর প্রবাহ চেঙ্গিস খান এবং আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের পূর্ববর্তী সাম্রাজ্যের মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত।

৪. তুরস্কের সায়হান নদী : সাইহান (Seyhan) নদীটিও জায়হান নদীর মতোই ভৌগোলিক ও ধর্মীয় দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যা ‘শির দরিয়া’ নামেও পরিচিত। এটি মধ্য এশিয়ার একটি নদী। তুরস্কের কেন্দ্রীয় আনাতোলিয়া অঞ্চলের তরাস পর্বতমালা (Taurus Mountains) থেকে উৎপন্ন হয়েছে। যা প্রায় ৫৬০ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে ভূমধ্যসাগরে গিয়ে মিশে যায়। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান ইতিহাসে এই নদীটি ‘সারুস’ (Sarus) নামে পরিচিত ছিল।

উল্লেখ্য যে, বিংশ শতাব্দীতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ক্ষমতাসীন শক্তিতে পরিণত হয়। ১৯৬০-এর দশকে তারা মরুভূমিতে তুলা চাষের জন্য এই দু’টি নদীর পানি সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে সরিয়ে নেয়। ফলে নদী থেকে পানি নেওয়ার জন্য হাযার হাযার মাইল দীর্ঘ খাল খনন করা হয়। এতে আরাল সাগরে পানির প্রবাহ বন্ধ হওয়ায় ৬৮,০০০ বর্গকিলোমিটার ব্যাপী পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম হরদটি বর্তমানে প্রায় বিলুপ্ত। এই সময়ের আগে নদীর পানি কৃষিকাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল, কিন্তু এত বিশাল আকারে নয়’।[8]

উপসংহার : সিদরাতুল মুনতাহার পাদদেশ থেকে উৎসারিত এই চারটি নদী কেবল ভূ-প্রকৃতির অংশ নয়, বরং এগুলো স্রষ্টার অসীম কুদরত। এই নশ্বর পৃথিবীর যাবতীয় নে‘মত মূলত সেই অবিনশ্বর জান্নাতেরই প্রতিচ্ছবি। এই জান্নাতী নদীগুলোর প্রবাহ দেখে একজন মুমিনের সেই চিরস্থায়ী জান্নাতের প্রত্যাশায় ব্যাকুল হয়ে ওঠে। যেখানে রয়েছে অনাবিল প্রশান্তি এবং অফুরন্ত রিযিক। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই জান্নাতী ঝর্ণাধারার পাশে সমবেত হওয়ার তাওফীক দান করুন।-আমীন!

আরাফাত যামান

[কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ]


[1]. বুখারী হা/৫৬১০।

[2]. মুসলিম হা/২৮৩৯।

[3]. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ১/.৮২-৮৩ পৃ.।

[4]. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খ.১ পৃ. ৮৪ ।

[5]. মুসলিম হা/২৮৯৪।

[6]. বুখারী হা/৭১১৯।

[7]. ফাতহুল বারী, ১৩/৯৬ পৃ.।

[8]. উইকিপিডিয়া।



আরও