ভোরের আলো ফোটার একটি সুযোগ দাও
নাজমুন নাঈম
এক প্রতারক ও তার স্ত্রী একটি শহরে প্রবেশ করল। শহরের লোকেরা ছিল সহজ-সরল বিশ্বাসের অধিকারী। অনেকটা বোকা ধরনের। প্রতারক ও তার স্ত্রী শহরের মানুষের সঙ্গে প্রতারণা ও জালিয়াতির সিদ্ধান্ত নিল।
প্রথম দিন প্রতারক একটি গাধা কিনল। সে জোর করে গাধার মুখে সোনার মুদ্রা ভরে দিল। তারপর গাধাটিকে বাজারে নিয়ে গেল। গাধার চারপাশে যখন কিছু লোক জড়ো হ’ল, সে গাধাটির পিঠে একটি আঘাত করল। গাধা ডেকে উঠতেই তার মুখ থেকে মুদ্রাগুলো পড়ে যেতে লাগল। সে বলল, গাধাটি যখনই ডাকে, তখনই তার মুখ থেকে সোনার মুদ্রা ঝরে পড়ে। লোকজন বিস্মিত হ’ল এবং কোনো কিছু না ভেবেই গাধাটি কিনতে আগ্রহী হ’ল। অবশেষে শহরের এক বড় ব্যবসায়ী চড়া দামে গাধাটি কিনে নিল।
বাড়ি ফেরার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ব্যবসায়ী বুঝতে পারল, সে এক প্রতারণার শিকার হয়েছে। তখন সে শহরের লোকদের নিয়ে প্রতারকের বাড়িতে গেল। দরজায় কড়া নাড়লে তার স্ত্রী জানাল, সে ঘরে নেই। তবে কুকুরটিকে পাঠালে সে তাকে ডেকে নিয়ে আসবে। সে কুকুরটিকে ছেড়ে দিল। কুকুরটি দৌড়ে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর প্রতারক ফিরে এলো। সঙ্গে আগের কুকুরটির মতোই দেখতে একটি কুকুর। লোকেরা কুকুরের চতুরতায় মুগ্ধ হ’ল। তারা কেন এসেছিল তা ভুলে গেল এবং কুকুরটি কেনার জন্য দর কষাকষি শুরু করল। অনেক দরদামের পর একজন মোটা দামে কুকুরটি কিনে নিল। বাড়ি গিয়ে সে তার স্ত্রীকে বলল, আমি বাইরে যাচ্ছি। কিছুক্ষণ পর কুকুরটিকে ছেড়ে দিও, সে আমাকে ডেকে নিয়ে আসবে। কিন্তু ছেড়ে দেওয়ার পর কুকুরটি আর ফিরে এলো না।
ব্যবসায়ীরা বুঝল তারা আবার প্রতারিত হয়েছে। তারা প্রতারকের বাড়িতে ঢুকে পড়ল। সেখানে শুধু তার স্ত্রী ছিল। তারা বসে তার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। সে ফিরে এসে স্ত্রীকে বলল, এত সম্মানিত অতিথিদের তুমি আপ্যায়ন করোনি? স্ত্রী বলল, তোমার অতিথিদের তুমি আপ্যায়ন করো। এতে প্রতারক ভীষণ রেগে গেল। সে পকেট থেকে একটি ভুয়া ছুরি বের করল, যার ফলাটি হাতলের ভেতরে ঢুকে যায়। সে ছুরি দিয়ে স্ত্রীর বুকে আঘাত করল। সেখানে লাল রঙে ভরা একটি বেলুন রাখা ছিল। রঙ রক্তের ন্যায় প্রবাহিত হ’ল। সাথে সাথে স্ত্রীও মৃতের ভান করল।
লোকেরা তাকে দোষারোপ করতে লাগল। সে বলল, চিন্তা করবেন না। আমি তাকে বহুবার হত্যা করেছি, আবার জীবিতও করেছি। সঙ্গে সঙ্গে সে পকেট থেকে একটি বাঁশি বের করল এবং বাজাতে লাগল। কিছুক্ষণ পর তার স্ত্রী উঠে দাঁড়াল, যেন আগের চেয়ে আরও বেশি প্রাণবন্ত। সে অতিথিদের জন্য কফি বানাতে চলে গেল।
লোকেরা আবার কেন এসেছিল তা ভুলে গেল। তারা বাঁশিটি কেনার জন্য দর কষাকষি শুরু করল। মোটা দামে বাঁশিটি বিক্রি হ’ল। যে ব্যক্তি এটি কিনেছিল, সে বাড়ি গিয়ে নিজের স্ত্রীকে আঘাত করল এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাঁশি বাজাল। কিন্তু স্ত্রী আর জেগে উঠল না। সকালে অন্য ব্যবসায়ীরা তাকে জিজ্ঞেস করলে, সে ভয়ে সত্য বলতে পারল না। সে বলল, বাঁশি কাজ করে এবং সে স্ত্রীকে জীবিত করেছে। ব্যবসায়ীরা বাঁশিটি ধার নিল এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ স্ত্রীকে হত্যা করল।
যখন ব্যবসায়ীদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল, তারা প্রতারককে ধরে একটি বস্তায় ভরে সমুদ্রে ফেলে দিতে নিয়ে গেল। পথে ক্লান্ত হয়ে তারা বিশ্রাম নিতে বসে ঘুমিয়ে পড়ল। বস্তার ভেতর থেকে প্রতারক চিৎকার করতে লাগল। এক রাখাল এসে তাকে বের করল এবং জিজ্ঞেস করল, কেন সে বস্তায় বন্দী। প্রতারক বলল, তারা তাকে এলাকার প্রধান ব্যবসায়ীর মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিতে চায়, কিন্তু সে কোনো ধনী ব্যক্তির মেয়েকে বিয়ে করতে চায় না। সে রাখালকে ফাঁদে ফেলল। রাখাল লোভে পড়ে তার জায়গায় বস্তায় ঢুকে গেল। প্রতারক তার ভেড়াগুলো নিয়ে শহরে ফিরে আসলো।
ব্যবসায়ীরা জেগে উঠে বস্তাটি সমুদ্রে ফেলে দিল এবং স্বস্তিতে শহরে ফিরল। কিন্তু দেখল, প্রতারক সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার সঙ্গে একপাল ভেড়া! তারা জিজ্ঞেস করলে সে বলল, সমুদ্রে ফেলার পর এক পরী তাকে উদ্ধার করেছে। তাকে কিছু সোনার মোহর ও একপাল ভেড়া দিয়েছে। আর পরী তাকে বলেছে, যদি তাকে তীর থেকে আরও দূরে ফেলা হ’ত, তবে তার ধনী বোন তাকে হাযার হাযার ভেড়া ও বস্তা ভর্তি সোনার মোহর দিত।
প্রতারকের চাটুকারিতাপূর্ণ কথাবার্তা শুনে শহরের ব্যবসায়ীরা সবাই সমুদ্রে ঝাঁপ দিল (নিজেদের সর্বনাশ ডেকে আনল)। পুরো শহর তখন প্রতারকের মালিকানায় চলে গেল। এভাবে শহরের প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা শহরের নিয়ন্ত্রণ হারালো; এমনকি জীবনও হারালো।
শিক্ষা : এরূপ অনেক প্রতারক ধর্মীয় নেতার বেশে বা রাজনৈতিক মুখোশের আড়ালে, টুপি-পাঞ্জাবি পরিহিত বা কোর্ট-প্যান্ট পরিহিত আমাদের চারপাশে বিদ্যমান। দৃষ্টিনন্দন সাজ-সজ্জায় বা চাতুর্যপূর্ণ বাকপটুতায় তারা আমাদের বারবার ধোঁকা দিয়ে যায়। এইসব প্রতারকদের থেকে সাবধান থাকতে হবে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বারবার যাচাই-বাছাই করতে হবে, যেন কোনো প্রতারক বা ছলনাকারীর ছলনার শিকার না হতে হয়।
মূল : মুহসিন জববার; অনুবাদ : নাজমুন নাঈম
[সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ, রাবি শাখা]