এক পথহারা বাবার তওবা

তাওহীদের ডাক ডেস্ক 7 বার পঠিত

পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জীবনে হয়তো এমন একটা ক্ষণ আসে, যখন আল্লাহ তা‘আলা তাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন, সে কতটা অন্ধ ও কতটা পথভ্রষ্ট। আমার জীবনেও সেই অমোঘ মুহূর্তটি এসেছিল। তবে তা কোনো বজ্রপাত কিংবা মহা প্রলয় হয়ে নয়; এসেছিল আমার কলিজার টুকরো আমার পাঁচ বছরের ছোট্ট মেয়েটির নিষ্পাপ শাসন আর পাহাড়সম চারিত্রিক দৃঢ়তার মধ্য দিয়ে। কিন্তু আমার ঘরে যে এক টুকরো জান্নাত ছিল, তার খবর আমি রাখতাম না।

আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন যারা চাকচিক্য আর মিথ্যা আভিজাত্যের মোহে পড়ে ভুলেই যান জীবনের আসল উদ্দেশ্য, কে তাকে সৃষ্টি করেছেন এবং কেন তিনি সৃষ্ট? আমি ছিলাম তেমনই একজন।

ঢাকার এই ব্যস্ত শহরে আমার একটা পরিচয় ছিল। আমার প্রচুর টাকা ছিল। আর ছিল একদল তথাকথিত ‘বন্ধু’। ইট-পাথরের কৃত্রিম জৌলুস আর নিয়ন আলোর নিচে আমি ছিলাম এক অন্ধকার পথের পথিক। টাকা, আভিজাত্য আর পাপাচারই ছিল আমার জগৎ। 

আমার দিন শুরু হ’ত দুপুরের কিছু পূর্বে। আর রাতের সিংহভাগ সময় কাটত ক্লাব, ডিজে পার্টি কিংবা কোনো অন্ধকার আড্ডায়। টানা সাতটি বছর আমি আযানের ধ্বনি শুনেছি মাত্র। কিন্তু সেই পবিত্র সুর আমার পচে যাওয়া কলিজায় কোনো আঘাত হানতে পারেনি। কারণ আযানের ধ্বনি কানে ভাসতেই আমি গানের ভলিউম বাড়িয়ে দিতাম, যেন আমার ভেতরের জেগে থাকা শয়তানটি অস্বস্তি বোধ না করে।

আমার স্ত্রী, যার নাম শুনলে আজও আমার চোখ ভিজে ওঠে। যে ছিল অত্যন্ত পর্দানশীন এবং আল্লাহর ওপর দৃঢ় বিশ্বাসী এক মহিয়সী নারী। সে দিনের পর দিন জায়নামাযে বসে আমার জন্য চোখের পানি ফেলত। আমি যখন গভীর রাতে মাতাল হয়ে ঘরে ফিরতাম, তখন সে আমায় গালি দেয়নি। বরং পরম মমতায় আমার নোংরা কাপড় বদলে দিত। আমি তার সেই অসীম ধৈর্যকে দুর্বলতা মনে করতাম। তাকে অবজ্ঞা করতাম, অপমান করতাম। কিন্তু সে শুধু কাঁদত আর বলত, ‘তুমি কার কাছে যাবে জানি না, তবে একদিন তোমার রবের কাছে তোমাকে ফিরতেই হবে’।

আমার পাঁচ বছরের ছোট্ট মেয়ে, ‘মারিয়াম’। তার ডাগর ডাগর চোখগুলোর দিকে তাকালে আমি মাঝেমধ্যে কুঁকড়ে যেতাম। পাপী মানুষেরা বোধহয় পবিত্রতার তীব্র ছোঁয়া সইতে পারে না। তাই আমি সন্তর্পণে নিজেকে ওর থেকে দূরে সরিয়ে রাখতাম।

ফেব্রুয়ারীর এক হাড় কাঁপানো শীতের রাত। তখন প্রায় ৩-টা বাজে। ঢাকার আকাশ তখন কুয়াশাচ্ছন্ন আর নিস্তব্ধ। আমি বন্ধুদের সাথে নরক গুলজার সেরে বাসায় ফিরলাম। ঘরে ঢুকে দেখলাম, স্ত্রী আর মেয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। শয়তান তখনও আমার ওপর সওয়ার হয়ে আছে। আমি পাশের রুমে গিয়ে মোবাইলে ভিডিও দেখতে শুরু করলাম। তখন রাতের সেই শেষ প্রহর, যখন মহান আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং বলতে থাকেন, কে আছো আমার কাছে প্রার্থনা করবে, আমি তার প্রার্থনা কবুল করব? কে আছো আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব? কে আছো আমার কাছে কিছু চাইবে, আমি তাকে দান করব? (বুখারী হা/১১৪৫)

ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ অস্ফুট এক শব্দে দরজার দিকে তাকালাম। তাকিয়ে দেখি ছোট্ট মারিয়াম দাঁড়িয়ে আছে। তার গায়ে একটা উলের সোয়েটার, উসকো-খুসকো চুল। কিন্তু তার দৃষ্টি প্রখর! সেই পাঁচ বছরের শিশুর চোখে আমি বাবার প্রতি কোনো মমতা দেখলাম না। দেখলাম এক প্রচন্ড অবজ্ঞা আর তীব্র ঘৃণা। ও গুটি গুটি পায়ে আমার কাছে আসল। তার ছোট্ট আঙুলটা আমার দিকে তুলে সেই চিরচেনা ভাষায় বলল, আববু! তুমি কি জানো আল্লাহ এখন ওপর থেকে দেখছেন? তোমার কি একটুও লজ্জা লাগে না? ছিঃ! আমি ভাবতাম তুমি আমার মডেল, কিন্তু তুমি তো অনেক পচা কাজ করো! আববু, আল্লাহকে একটু ভয় করো, আল্লাহ সব দেখছেন...’

পাঁচ বছরের এক শিশুর মাঝে সেদিন আমি এক অসীম ব্যক্তিত্ব দেখতে পেলাম। তার কণ্ঠে কোনো রাগ ছিল না। ছিল এক অদ্ভুত করুণা। এরপর সে রুম থেকে যাওয়ার সময় তিনবার বলল, বাবা! তোমার লজ্জা হওয়া উচিত। আল্লাহকে ভয় কর’! তারপর সে গুমরে কেঁদে উঠে দরজাটা বন্ধ করে চলে গেল। কোনো গালি নয়, কোনো চিৎকার নয়; কেবল এক স্বর্গীয় সতর্কবাণী।

আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। ভিডিও বন্ধ করে দিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে রইলাম। আমার মনে হ’ল পৃথিবীর মাটি ফেটে যাচ্ছে, আর আমি অতলে তলিয়ে যাচ্ছি। তার কথাগুলো কানে বাজছিল এবং আমাকে ভেতর থেকে মেরে ফেলছিল। আমি তার পিছু পিছু গিয়ে দেখলাম, সে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়েছে। আমি পাগলের মতো হয়ে গেলাম। এর কিছুক্ষণ পরেই রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে পাশের মসজিদ থেকে মুয়ায্যিনের আযান ভেসে এল, ‘আছছালাতু খায়রুম মিনান নাউম’ (ঘুমের চেয়ে ছালাত উত্তম)। মনে হ’ল, আযানটা যেন আজ অন্য কারো জন্য নয়, কেবলমাত্র আমার জন্য।

আমি কাঁপতে কাঁপতে বাথরুমে গেলাম। দীর্ঘ দিন পর আমি ওযূ করলাম। ট্যাপের ঠান্ডা পানি যখন আমার মুখে লাগল, মনে হ’ল আমার পাপের উত্তাপ একটু কমছে। আমি মসজিদে গিয়ে জামা‘আতের পেছনের কাতারে দাঁড়ালাম। ইমাম ছাহেব যখন সূরা তেলাওয়াত করছিলেন, আমার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছিল। যখন তিনি সিজদায় গেলেন, আমিও তখন সিজদায় মাথা অবনমিত করলাম। আর সাথে সাথে আমার মনে হ’ল এই তো আমার আসল জায়গা! দীর্ঘ সাত বছর পর আমি আমার মালিকের নিকট আশ্রয় পেলাম। আমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলাম। আমার দীর্ঘ দিনের জমে থাকা সব ময়লা চোখের পানিতে যেন বেরিয়ে যাচ্ছিল। আমি আমার হৃদয়ের প্রকৃত প্রশান্তি খুঁজে পেলাম।

আমি শুধু বলছিলাম, প্রভু! তুমি কি আমায় মাফ করবে? তুমি কি আমায় তোমার পথে ফিরিয়ে নেবে? সিজদাহ থেকে যখন মাথা তুললাম, মনে হ’ল আমার পাহাড়সম পাপের বোঝা কেউ এক নিমিষেই নামিয়ে নিয়েছে। আমার বুকটা হালকা হয়ে গেল।

সকালে অফিসে গেলাম। বসের সাথে আমার সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। তিনি আমাকে দেখে অবাক হলেন। কারণ আমি কোনোদিন বেলা ১২-টার আগে অফিসে আসতাম না। আমি যখন তাকে সব খুলে বললাম, তিনি আমার হাত ধরে বললেন, ভাই! আপনি সৌভাগ্যবান। আপনার মেয়ে আপনার জন্য জান্নাতের ডাক নিয়ে এসেছিল।

আমি আর কাজে মন দিতে পারলাম না। আমার মনটা ছটফট করছিল মারিয়ামকে দেখার জন্য। ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে মাফ চাইতে ইচ্ছা করছিল। দুপুর নাগাদ আমি অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বাসার দিকে রওনা হলাম। যাওয়ার পথে মারিয়ামের প্রিয় চকলেট আর কিছু প্রিয় খাবার কিনলাম। ভাবলাম, আজ থেকে আমি এক নতুন বাবা। ওর সব আবদার পূরণ করব।

বাসার সামনে আসতেই দেখলাম মানুষের জটলা। আমার হৃৎপিন্ডটা যেন থমকে গেল। ভেতর থেকে কান্নার রোল ভেসে আসছে। আমি দৌড়ে ভেতরে গেলাম। দেখলাম, বিছানায় আমার মারিয়াম শুয়ে আছে শান্ত, নিথর। ডাক্তার এসে বললেন, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট।

যে মেয়েটি কয়েক ঘণ্টা আগে আমাকে জাহান্নাম থেকে টেনে তুলল, সে নিজেই জান্নাতে পাড়ি জমাল? আমি ওর নিথর দেহটা জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বললাম, মারিয়াম! কথা বল মা! দেখো তোমার আববু আজ ছালাত পড়ে এসেছে। তোমার আববু আর পচা কাজ করবে না। কথা বল মা! কিন্তু মারিয়াম আর কথা বলেনি। ও শুধু আমার জীবনটা বদলে দিয়ে চিরদিনের জন্য পরপারে পাড়ি দিয়েছে।

আমি নিজের হাতে মারিয়ামকে গোসল করালাম। কাফনের কাপড় পরিয়ে দিলাম। শেষবারের মতো যখন ওর মুখটা দেখলাম, মনে হ’ল ও যেন আমাকে বলছে, আববু, আমি তোমায় রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছি, এখন বাকি পথটা তোমাকে একা চলতে হবে।

নিথর দেহে সাদা কাফনে মোড়ানো লাশের খাটিয়া আমি নিজ কাঁধে বহন করে কবরস্থানে পৌঁছালাম। নিজ হাতে আমার হেদায়াতের অসীলাটিকে কবরে শুইয়ে দিলাম। অন্ধকার মাটির গর্তে ওকে নামিয়ে দেওয়ার সময় আমার মনে হ’ল আমি আমার মেয়েকে দাফন করছি না, বরং আমি আমার পচে যাওয়া অতীতকে দাফন করছি। ও ছিল সেই মোমবাতি, যে নিজে জ্বলে আমাকে অন্ধকার ঘর থেকে বের করে দিয়ে নিজে নিভে গেছে।

আমার মারিয়াম হয়তো আজ নেই, কিন্তু ও আমার হৃদয়ে যে নূর জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে, তা আমায় প্রতিদিন সিজদার দিকে টেনে নিয়ে যায়। আমার ঘরে এখন কুরআনের আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হয়। আমি জানি, আল্লাহ আমাকে মাফ করেছেন বলেই আমাকে সিজদাহ করার তাওফীক দিয়েছেন। আমি আল্লাহর কাছে দো‘আ করি, তিনি যেন এই মেয়েটিকে আমার জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে ঢাল বানিয়ে দেন এবং আমার ধৈর্যশীল স্ত্রীকে উত্তম প্রতিদান দান করেন।

শিক্ষা : আপনার জীবন যতই অন্ধকারে ডুবে থাকুক না কেন, মনে রাখবেন, হেদায়াতের জন্য বিশাল কোনো অলৌকিক ঘটনার প্রয়োজন নেই। মাঝেমধ্যে আপনারই কোন আপনজনের একটা তুচ্ছ কথাই হ’তে পারে আপনার জীবনের মোড় ঘোরানোর অসীলা। আল্লাহ আপনাকে সুযোগ দেবেন। কিন্তু সেই সুযোগটা ধরার দায়িত্ব আপনার। পাপের গর্তে ডুবে থাকলেও হতাশ হবেন না। কারণ স্রষ্টার রহমত আপনার পাপের সাগরের চেয়েও বড়। পাপের সাগরে ডুবে যাওয়ার আগে একবার সিজদায় লুটিয়ে পড়ুন। সেই এক মুহূর্তের কান্না আপনার পুরো পাপের জগৎ থামিয়ে দিতে পারে।

আপনি হয়তো ভাবছেন আরও সময় আছে, পরে তওবা করবেন। কিন্তু মনে রাখবেন, মালাকুল মাউত আপনার দরজায় কড়া নাড়ার আগে আপনাকে হেদায়াতের সুযোগ দিবে না। আল্লাহ আপনাকে সর্বদা সুযোগ দিচ্ছেন আপনার বন্ধুদের মাধ্যমে, আপনার প্রিয়জনদের মাধ্যমে বা যে কোন অচেনা উপদেশদাতার মাধ্যমে। সেই সুযোগটা হেলায় হারাবেন না। আর আপনার চারপাশের মানুষগুলোকে অবহেলা করবেন না, হয়তো তাদের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আপনার জান্নাতের চাবিকাঠি।

[সংকলিত ও পারিমার্জিত]



আরও