মায়ের নিকট চিঠি

তাওহীদের ডাক ডেস্ক 374 বার পঠিত

মা! কিছু দিন যাবত তোমাকে লিখতে না পারার কারণে আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আমার সাথে ঘটে যাওয়া সকল বিশেষ ঘটনা তোমাকে শোনাই। তবে শোনানো হয়নি এ জীবনের সবচেয়ে বেদনাময় ঘটনাটি। এটা সেই ঘটনা যা প্রতি মুহূর্তে আমাকে কুরে কুরে খায়। দিনগুলা আমি কেমন করে কাটাতাম সেটা তোমার খুব জানাতে ইচ্ছা হ’ত। তুমি তো জানতে, ছোটবেলা থেকে ভার্সিটিতে পড়ার প্রতি আমার কেমন তীব্র বাসনাই না ছিল। শুনেছিলাম ভার্সিটির লাইফ একেবারেই অন্যরকম। এখানে পড়েই নাকি জীবনের মর্ম বোঝা যায়।

এস.এস.সির পর তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমার লক্ষ্য কেবল ভার্সিটি। তবে এইচ.এস.সিতেও গোল্ডেন পাওয়ায় অন্য ভাল স্টুডেন্টদের বাবা-মায়ের মত তোমরাও আমাকে মেডিকেলে পড়ানোর ইচ্ছা পোষণ করলে। আমি তখন হতাশ হয়ে পড়ি। তবে বড় ভাইদের মুখে বলতে শুনেছিলাম, নিজের ইচ্ছাকে অন্য কারোর জন্য বলি না দিতে। তাহ’লে নাকি সারা জীবনটাই বরবাদ হয়ে যাবে! আর এই চেতনা থেকেই সম্পূর্ণভাবে ভার্সিটিতে পড়ার আকাংখা আর লক্ষ্য নিয়ে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করি। তোমাদেরকে বুঝাতে চেষ্টা করেছিলাম, মেডিকেলে চান্স পাওয়াটা খুব কঠিন ব্যাপার। আর আমার মত স্টুডেন্টদের দ্বারা তো কখনোই সম্ভব নয়। আর তুমি মানতে চাইলে না। বললে, তোর দ্বারা অবশ্যই সম্ভব। তুই পারবি আমি জানি। এভাবে অনেক বুঝিয়ে জোর করে আমাকে হার মানিয়ে পাঠিয়ে দিলে ঢাকায় কোচিং করতে। যাওয়ার আগে তুমি বলেছিলে, আমি যেন নিয়মিত তোমাকে চিঠি লিখি। তাই আমি সেখানে গিয়ে তোমাকে প্রথম ১৫ দিন পর পর চিঠি লিখতাম।

প্রত্যেকদিনের ঘটে যাওয়া বিশেষ ঘটনা গুলো উল্লেখ করতাম। আর ১৫ দিন পরপর আমার চিঠি পেয়ে তুমি হয়ত কি খুশিই না হ’তে। তবে আমি সেখানে গিয়ে তোমাদের ইচ্ছা আকাংখা সাথে বেইমানী করেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার নেশা আমাকে পাগল করে দিয়েছিল। আর তাই আমি মেডিকেলের প্রস্ত্ততি নেইনি। তোমাদেরকে মিথ্যা বলে মেডিকেলের কোচিং না করে ভার্সিটি কোচিং-এ ভর্তি হই। মেডিকেল এডমিশনের সময় আসলে আমি ফর্মও তুলিনি। তাই মেডিকেলে পরীক্ষা দেওয়ার প্রশ্নই আসেনা। মেডিকেলের রেজাল্ট দিলে আমি এটুকুই মিথ্যা লিখেছিলাম, ‘আমি চান্স পাইনি। আর ভার্সিটিতে এডমিশনের প্রস্ত্ততি নিচ্ছি’।

প্রথমদিকে আমি ঠিকমত পড়িনি। তাই এ সময় মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা শুরু করেছিলাম। তবে তোমার সাথে এত কিছু ঘটে গেল আমাকে কিছুই জানালে না। জীবনের এই আফসোসটা সারাটা জীবন আমায় ভুগতে হবে। যেদিন বাবা চিঠি পাঠাল, তার পরের দিনই আমার ভার্সিটিতে এক্সাম। তাই টেনশনে চিঠিটা খুলেও দেখিনি। পরের দিন পরীক্ষা শেষ করে রুমে এসে যখন চিঠিটা খুললাম, যেন আকাশটা আমার মাথার উপর ভেঙে পড়ল। সবকিছু স্বপ্নের মত লাগছিল। বারবার ভাবছিলাম, এটা যেন কোন স্বপ্ন হয়। তবে আমার সময় পার হয়ে যাচ্ছে কিন্তু স্বপ্ন ভাংছে না।

চিঠিতে লেখা ছিল, গত মাসে তুমি বড় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলে। পরে চেকআপ করে তোমার ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়ল। ৫ দিন পর আমার অ্যাডমিশন মেডিকেলে। তাই মা তুমি চিঠি লিখতে দাওনি। পরে যখন জানলে আমি চান্স পায়নি, বাবা আমাকে চিঠি লিখতে চাইলে তবুও তুমি লিখতে দাও নি। কারণ আমি যেন অন্তত ভার্সিটিতে চান্স পাই। তবে ১২ তারিখ তুমি খুব অসুস্থ হয়ে পড়লে আর বাবা না পেরে আমাকে চিঠি লিখল তোমাকে না জানিয়ে। প্রতিটা নিঃশ্বাসই প্রতিনিয়ত ভার হতেই চলেছে। ভাবলাম আসলেই কি আমি স্বপ্ন দেখছি না তো! অনেক আগে ছোটবেলায় এমন স্বপ্ন দেখতাম আর উঠে কান্না করতাম। তবে আমার সময় পার হয়ে যাচ্ছে স্বপ্ন ভাঙছে না। আমি সাথে সাথেই উঠে ব্যাগ গোছানো শুরু করলাম। হাতের কাছে যা পেলাম তাই ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়ে চোখ মুছতে মুছতে কাউকে না জানিয়েই বেরিয়ে পড়লাম।

হোস্টেল থেকে বাস স্ট্যান্ড ৫ মিনিটের পথ। এসে একটা ঢাকা-মাগুরাগামী বাস পেয়ে কিছু না ভেবেই উঠে পড়লাম। বাসটি আল্লাহর রহমতে যাত্রী বোঝাই ছিল। আর তাই সাথে সাথে যাত্রা শুরু করল। আমার ভেতরে যেন একটা পাগলা ঘোড়া ছুটে চলেছে অজানা গন্তব্যের দিকে। যতই ছুটছে হয়ত পথ আগাচ্ছে। তবে মনের ভিতর একটা অজানা আশঙ্কা বিরাজ করছে। আজ ভার্সিটিতে এক্সাম ছিল। তবুও ফেরিঘাটে তেমন জ্যাম ছিল না। তিন ঘন্টার পর আরিচা ফেরী ঘাটে বাস পৌঁছাল। যাইহোক আধাঘন্টা পর ফেরি ছেড়ে দিল। দুই ঘন্টার মধ্যেই নদী পার হয়ে আমাদের বাস মাগুরা বাস স্ট্যান্ডে এসে পৌঁছাল।

বারবার মনে পড়ছিল যখন প্রথমবার ঢাকায় যাচ্ছিলাম মা তুমি আমাকে বলছিলে, বাবা সাবধানে যাবি। টাকা-পয়সা সাবধানে রাখবি। দো‘আ পড়ে গাড়িতে উঠবি। কেউ কিছু দিলে খাবি না। প্রত্যেকটি কথা ভাবতে ভাবতে আমার সময় পার হচ্ছিল। আমি ভাবছিলাম মা তোমার প্রত্যেকটি বাণী প্রত্যেকটি উপদেশ প্রত্যেকটি কথা কত মধুর! কত মূল্যবান! তুমি যে আমার জীবনে যে কি তা আমি ছাড়া আর কেউ জানে না।

যশোর চাচড়া স্টেশনে পৌঁছে ব্যাকুল হয়ে রাস্তার পাশে টেলিফোনের দোকান থেকে বাসায় একটা কল দিলাম। চাচাত ভাই মুঈন কল ধরল। বললাম, মা কেমন আছে? ও কিছু বলল না। বলল, তুই কোথায়? আমি বললাম, আমি এখন যশোর বাস স্ট্যান্ডে আছি, বাস এখনই ছেড়ে দিবে। ও আমাকে কিছুই বলল না, বলল আমি সাতক্ষীরা বাস স্ট্যান্ডে তোকে রিসিভ করতে আসছি এক্ষুনি। বলেই ফোনটা কেটে দিল। হয়তো মা তোমার শরীর আরো বেশি খারাপ করেছে। তাই আমি শুধু কাঁদছিলাম আর কাছে দো‘আ করছিলাম আর কাঁদছিলাম। ওর কথা শুনে আমার টেনশন অনেক বেড়ে গেল। এটি লোকাল বাস ছিল। তাই এখানে-সেখানে থামছিল। আর আমি ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছিলাম।

সাতক্ষীরা বাস স্ট্যান্ডে এসে দেখি ওর সাথে রাকিব আর রিফাতও আমাকে নিতে এসেছে। ওদের চোখগুলো ভেজা দেখাচ্ছিল। ওরা কি কাঁদছে! আমি ভাবছিলাম হয়ত কিছু না কিছু তো হয়েছে। ওদের কাছে যখন তোমার সম্পর্কে জানতে চাইলাম, তখন ওরা কোনো রকম উত্তর দিল না। শুধু বলল, বাসায় চল। বলেই আমাকে বাইকে তুলে নিল আমি। মনে মনে বলছিলাম, শুধু বাসায় গিয়ে নিই... তোমাকে এমন করে যত্ন করব। এমন সেবা করব। আর সারাদিন ধরে আল্লাহর কাছে এমন করে দু’হাত পেতে চাইব। যেন তিনি কখনোই তোমাকে আমার কাছ থেকে আলাদা না করেন’।

আমি বাসায় গেটের সামনে আসতেই দেখি, লোক আর লোক। আমার মনটা হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠল। আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না যে এত লোক কেন? সবাই বলাবলি করছে, ফাহিম চলে এসেছে। আমার কাঁধে হাত রেখে আমাকে ধরে মুঈন ভিতরে নিয়ে যাচ্ছে। ভিতরে ঢুকেই দেখলাম, বাবা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। পিঠে হাত ঘষে ঘষে বলল, বাবা তুই বড্ড দেরি করে ফেললি রে! তুই বড্ড দেরি করে ফেললি! আমি হাউমাউ করে কেঁদে ফেললাম। খানিক পরে হেঁটে হেঁটে সিড়ি দিয়ে ভিতরে ঢুকে দেখি, দরজার সামনে সাদা কাপড়ের মধ্যে কেউ শুয়ে আছে। আমি মুখটা খুলে দেখি তোমার মুখটা সাদা ধবধব করছে আর কাপড়ে কিছুটা রক্ত লেগে আছে। আমার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে পড়তে ঝাপসা হয়ে গেল। কাপড়টা আবার ঢেকে দিয়ে তোমার পাশে বসে পড়লাম। জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে এক এক করে তোমার সাথে কাটানো মধুর সব মুহূর্তগুলোর কথা ভাবছিলাম। ছোটবেলার কথা, এডমিশনের যাওয়ার আগের কথা। আর আমার মনটা নতুন যন্ত্রণায় মেতে উঠছিল। আর তোমার জন্য হৃদয় নিংড়ানো দো‘আ বের হচ্ছিল ‘রবিবর হামহুমা কামা রববাইয়ানী ছগীরা’

সন্ধ্যার পূর্বেই তোমাকে নিয়ে ঈদগাহে যাওয়ার পর তোমার ব্যর্থ সন্তান তাকবীর দিয়ে জানাযার ছালাত শুরু করল। সূরা ফাতেহা পড়ার পর জানাযার দো‘আ আল্লাহুম্মাগফির হাইয়িনা...। দু’চোখের অঝোর কান্নায় জানাযার দো‘আর শব্দগুলি যেন মুখ দিয়ে বের হচ্ছিল না। ছালাত শেষে অন্ধকার কবরে তোমাকে নিজ হাতে শুইয়ে দিয়ে আসলাম। জানাযা শেষে যে যার মত চলে গেলেও আমি পারিনি। দাফন শেষে মাইয়েতের জন্য বিশেষ দো‘আ আহুম্মাগফিরলী লাহা ওয়া ছাবিবতহা পড়ছিলাম। কখনও পড়ছিলাম আল্লাহুম্মা ছবিবতহা বিলক্বাউলিছ ছাবিত

দাফন শেষে বাবা আমাকে ডাকল। আমি গেলাম। বাবা তোমার স্বপ্নের কথা আমাকে জানাল। আমি যখন ঢাকায় ছিলাম, তখন নাকি তুমি রাতের বেলা বাবাকে গল্প করে বলতে, দেখবে আমার ছেলে বড় ডাক্তার হবে। গরীব মানুষদেরকে ফ্রিতে চিকিৎসা করবে...। বাবা আমাকে অনেক কথা বলল, আর আমি শুধু নিরবে চোখের পানি ঝরিয়ে গেলাম। নিজের প্রতি ঘৃণা হচ্ছিল আমার। আমার মনটাও কত ছোট। তোমার সন্তান হওয়ার কোনো যোগ্যতা আমার নেই। 

তারপর খালামণি এসে আমাকে আগের দিনের কথা বলতে লাগল। তুমি নাকি গতকাল যন্ত্রণায় খুব ছটফট করেছিলে আর আমাকে বারবার দেখতে চাচ্ছিলে। বাবা বলছিল, আমি চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছি। দেখ, ও খুব তাড়াতাড়ি চলে আসবে। দুপুর গড়িয়ে রাত হয়ে গেল। আমি আসলাম না। আজ সকালে অনেকক্ষণ অজ্ঞান ছিলে তুমি। তারপর জ্ঞান ফিরলে আমাকে আবার দেখতে চেয়েছিলে। এরপর আসতে আসতে তোমার দু’চোখ চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর খালামণি তোমার আলমারি থেকে কয়েকটা খাম বের করে আনল। এগুলো খুলে দেখলাম, এর মধ্যে আমার পাঠানো চিঠিগুলো ছিল। আমার চিঠি এত যত্ন করে রেখে দিয়েছ, আমার চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারলাম না। খালামণি বলল, তুমি চলে যাওয়ার পর আমি একবার এসেছিলাম তোমাদের বাসায়। তোমার পাঠানো প্রথম দুইটা চিঠি আমাকে দেখিয়েছিল। দেখতাম বড় আপু মাঝে মধ্যেই তোমার চিঠিগুলো খুলে পড়ত আর চোখের পানি মুছত। তখন তোমার মায়ের ক্যান্সার ধরা পড়েছিল।

মাগো তুমি আমাকে কেন এত বেশি ভালবাস? এই চিঠিগুলো কেন আমাকে দেখতে রেখে দিলে? এগুলো দেখলে তো আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারব না। যদিও এখন থেকে এগুলো আমার কাছে তোমার চিহ্ন। আজ আর লেখার শক্তি আর ধৈর্য আমার নাই। আর আমি পারছি না। চিঠিটা আমি আলমারিতে তুলে রাখছি। সারাটা জীবন তোমার জন্য প্রাণখোলা দো‘আ করব ও ছাদাক্বায়ে জারিয়া অব্যাহত রাখব। যা তোমার কবরে পৌছাবে। হয়ত আজ তুমি আমার কাছে নেই। তবে আছ আমার বুকের মাঝে। এই লেখা তোমাকে আমার মাঝে সারাটি জীবন বাঁচিয়ে রাখবে। এই অধমের পক্ষ থেকে হাযারও দো‘আ মহান প্রভুর দরবারে। মৃত্যুর পর দেখা হবে একসাথে ইনশাআল্লাহ।




আরও