খালেছ নিয়তের প্রতিদান

সাবিহ যামান 254 বার পঠিত

গত বছর হজ্জের সময় এক আত্মীয়ের সাথে আশকোনা হজ্জ ক্যাম্পে গিয়েছিলাম। রিক্সা থেকে নেমে ভাড়ার টাকা এগিয়ে দিতেই রিক্সাওয়ালা মামা বললেন, লাগব না।

ভাবলাম ভাড়া কী কম হয়ে গেলো নাকি! তাড়া ছিল তাই ভাড়া ঠিক না করেই উঠে পড়লাম। যদিও এখানকার ভাড়া মোটামুটি ফিক্সড, তবু একটা ভাল কাজে এসেছি, তর্কাতর্কি না করে, পকেট হাতড়ে আরো কিছু টাকা মিলিয়ে বাড়িয়ে দিলাম মামার দিকে। কিন্তু মামা এবারেও সলজ্জ বদনে টাকাটা ফিরিয়ে দিলেন।

বললাম, কী সমস্যা মামা, এই ভাড়ায় পোষাচ্ছে না? উনি লজ্জায় জিভ কামড়ে বললেন, ছি ছি মামা! আপনে তো ম্যালা টাকা দিছেন। কিন্তু আমি ভাড়াটা নিতাম না। বললাম, কেন নিবেন না? আসলে মামা, কোনো হজ্জ যাত্রীর ভাড়া আমি নিই না।

আমি খুব অবাক হয়ে বললাম, সে কী কথা! রিক্সা চালানো তো আপনার পেশা। ভাড়া না নিলে আপনার চলবে কীভাবে? আপনার বাড়ি কোথায়? -গাইবান্ধা। উত্তর বঙ্গের লোক বোকাসোকা, ভাল মানুষ হয় জানতাম। কিন্তু এতো ভালমানুষি করলে তো আর পেট ভরবে না। সংসার চলে কীভাবে?

আসলে মামা, আমি দিনমজুর। দিন আনি দিন খাই। ঢাকায় আইছি এই কয়দিন হইলো। দ্যাশের বাড়িতে ভ্যান চালাইয়া সংসার চালাই। টানাটানির সংসারে টাকা জমানো খুবই কঠিন। তবু চেষ্টা করি কিছু কিছু করে জমানোর। বাকীটা আল্লাহই সহজ কইরা দ্যান। প্রতি বছর হজ্জের মৌসুমে আমি যখন ঢাকায় আসি তখন পরিবারের হাতে জমানো টাকাডি দিয়া আসি। তাই তেমন সমস্যা হয় না।

আমি বললাম, আর ঢাকায় আপনার থাকা খাওয়া? বললেন, হজ্জ যাত্রী ছাড়া বাকী সবার থিইকা তো ভাড়া নিই। তাতেই আল্লাহ একটা ব্যবস্থা কইরা দ্যান। ট্যাকায় বরকত আইসা পড়ে। বুঝলাম, কিন্তু আপনার এরকম বিনা পয়সায় হজ্জযাত্রী সার্ভিস দেওয়ার কারণটা কি জানতে পারি? -কী বলব মামা, শুনলে লোকে হাসে। কখনও টিটকারি মারে। বললাম, আপনি নির্দ্বিধায় বলেন মামা, আমি শুনব।

আসলে মামা আমার ম্যালা বছরের শখ, বলতে পারেন অন্তরের খায়েশ, জীবনে একবার হইলেও আমি মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর দ্যাশে যাবো। যেইখানে আল্লাহর ঘর আছে, সেই ঘর তওয়াফ করব। জান্নাতী কালা পাথরে চুমা খাব। ছাফা- মারওয়া পাহাড় সা‘ঈ করব। আহা! কতো নবী-রাসূলের পাও মুবারক পড়ছে সেই যমীনে!

কথা বলতে বলতে আবেগে মামার চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। কাঁধে ঝুলানো গামছাটা দিয়ে চোখ জোড়া কচলে মুছে নিলেন। আমি বললাম, মাশাআল্লাহ, খুবই ভাল শখ। কিন্তু ওখানে যেতে হলে তো অনেক টাকা লাগে মামা। এইভাবে ফ্রী সার্ভিস দিলে টাকা জমাবেন কীভাবে। কত টাকা জমিয়েছেন এই পর্যন্ত? এট্টা টাকাও না।

এক টাকাও না জমিয়ে আপনি কীভাবে ঐ দেশে যাওয়ার ইচ্ছা পূরণ করবেন? ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখার মতো হয়ে গেল না বিষয়টা!

কীভাবে যাব ঐটা আমি জানিনা, জানেন ঐ একজন। বলে হাতের তর্জনী উঁচিয়ে আসমানের দিকে ইশারা করলেন। তয় একদিন যাবই ইনশাআল্লাহ। মালিকের উপরে আমার পুরা ভরসা আছে। পয়সার জোগাড় নাই অথচ স্বপ্ন দেখে হজ্জে যাবার! ওখানে যেতে হ’লে যে পরিমাণ টাকার প্রয়োজন, সে হয়তো সারাজীবনেও সে পরিমাণ টাকা চোখে দেখবে না!

মামার মূর্খতা দেখে হাসি পেল। তবে চেপে গেলাম। বললাম, চেষ্টা না করে শুধু আল্লাহর ভরসায় চুপচাপ বসে থাকলে যদি কাজ হ’ত, তাহ’লে কতই না ভাল হ’ত। জানেন মামা, আমারও কাজ-কাম করতে ভাল লাগে না। আল্লাহর উপর ভরসা করে লেপ মুড়িয়ে শুয়ে থাকলাম। আর আসমান থেকে টুপ করে খাবার পড়ল। কী মজা হ’ত তাই না!

আপনেও মজা লইলেন মামা! চেষ্টা করি না কে বলল? করি তো! বললাম, আপনি যে ব্যাগার খাটছেন। যাত্রীর থেকে ভাড়া নিচ্ছেন না। তাহ’লে টাকা জমাবেন কীভাবে? আর সেই দেশেই বা যাবেন কীভাবে?

এবার মামা শব্দ করে হেসে উঠে বললেন, মামা আপনারা শিক্ষিত মানুষ, অনেক বেশি জানেন। তয় আমি ছোট মুখে একখান বড় কথা কই। শুনছি হাদীছে আছে, কোনো মানুষ তার আমলের দ্বারা জান্নাতে যাইব না। যাইতে পারব একমাত্র আল্লাহর দয়ায়। মানে হইল গিয়া, একজন মানুষ অনেক আমল করে হাশরের ময়দানে দাঁড়াইল। কিন্তু আললাহ যদি দয়া না করেন, তাইলে কিন্তু ঐ নেকীর পাহাড় কোনই কাজে লাগত না। সেই জন্য মালিকরে খুশি করার চেষ্টা করতেছি।

মালিকরে যদি একবার সন্তুষ্ট করতে পারি, তাইলে আমারে আর ঠেকায় কে! তিনি আমারে কীভাবে কার মাধ্যমে নিবেন তিনিই ভাল জানেন। আমার কাজ খালি মালিকরে খুশি করা। আর সেই উদ্দেশ্যেই আমি হজ্জ যাত্রী পাইলে তাদের থিইকা টাকা নিই না, তাদের বোঝা টাইনা দিই। যতদূর সম্ভব খেদমত করার চেষ্টা করি। মানুষ নানান তরীকায় মালিকরে খুশি করার চেষ্টা করে, আমার তরীকা এইডা। হাজী সাবদের দো‘আর অসীলায় যদি মালিক আমার নিয়ত কবুল করেন এই আশা মনে।

খুব ভাল কথা বলেছেন মামা। তবে একটা কথা আছে না, দো‘আর সাথে দাওয়াও লাগে। আপনি টাকার ব্যবস্থা না করে খালি হাতে কীভাবে ইচ্ছা পূরণ করবেন, সে ব্যপারে কিছু ভেবেছেন? মামা আবারও শব্দ করে হেসে উঠে বললেন, মামায় যে কী কন! ট্যাকার কোনো ক্ষেমতা আছে নি! কত্তো মানুষ ট্যাকার গাট্টি নিয়া বইসা আছে। সবাই কী ঐখানে যাইবার পারে? নছীবে থাকতে হয়। যেইখানে আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া একটা গাছের পাতাও নড়ে না, সেইখানে ট্যাকার কী দাম বলেন!

রিক্সাওয়ালা মামার এসব দার্শনিক কথাবার্তা আমার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছিল। তাই আর কথা বাড়ালাম না। বললাম, চলি মামা, অনেক কথা হ’ল। ভাল লাগল। আপনার সাথে একটা সেলফি তুলি, কী বলেন? ফেসবুকে দিবেননি মামা? বিগলিত হাসি দিয়ে মামা হাতের আঙুলের সাহায্যে চুলগুলো ঠিকঠাক করে নিলেন।

আমি বললাম, আরে না মামা। আমার ওসব বাতিক নাই। আপনার কথাগুলো মনে ধরেছে। তাই স্মৃতি হিসেবে একটা ছবি থাকুক, এই আরকি। আর আমার মোবাইল নম্বরটা রাখেন। যদি কোনোদিন আপনার ইচ্ছা পূরণ হয়, দয়া করে আমাকে একটু জানাবেন। সামর্থ্য মতো সহযোগিতা করব ইনশাআল্লাহ।

ঐদিন মামার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম। তবে তার কথাগুলো অনেকদিন পর্যন্ত মাথায় ঘুরতো। একজন আধা শিক্ষিত মানুষ, অথবা কে জানে হয়তো তিনি কোনোদিন স্কুলের বারান্দায় পা রাখেননি, আমার ভাবনার জগতকে বেশ প্রভাবিত করল। সময়ের পরিক্রমায় তারপর একদিন সব ভুলে গেলাম।

কয়েকদিন আগে একটা আননোন নম্বর থেকে কল এলো। অচেনা নম্বরের কল আমি সাধারণত রিসিভ করি না। কিন্তু সেদিন কী মনে করে ধরলাম। হ্যালো বলতেই ও পাশ থেকে সেই মামার কণ্ঠ শোনা গেল, মামা আমারে চিনতে পারছেন? ঐ যে গত বছর হজ্জ ক্যাম্পের সামনে অনেক কথা হইল। আমি আরীফুল।

জ্বী জ্বী, কেমন আছেন? জ্বে আপনেদের দো‘আয় ভালই আছি। মামা, কাইল ইট্টু দেখা করতে চাই। হজ্জ ক্যাম্পে আসতে পারবেননি?

যদিও ফোনে কিছু বলেননি, তবে ধারণা করলাম হয়তো টাকার বিশেষ প্রয়োজন হয়েছে। কাছে সামান্য যতটুকু টাকা ছিল, গুছিয়ে নিয়ে চলে গেলাম। এক বছরের ব্যবধানে মামাকে দেখে প্রথমে চিনতেই পারিনি। না, উনার চেহারা, শরীর-স্বাস্থ্য আগের মতোই আছে। তবে বেশ-ভূষা বদলে গেছে। ধবধবে সাদা ইহরামের চাদরে জড়ানো মামাকে দেখে বুকের ভেতর ধক করে উঠল। তবে কী তার নিয়ত কবুল হয়ে গেল? কিন্তু কীভাবে সম্ভব?

কাছে যেতেই দৌড়ে এসে মুছাফাহা করে বললেন, জানেন আমার মালিক আমারে ডাইকা পাঠাইছেন। আইজ রাততিরে আমার ফেলাইট। আমি নবীজীর দ্যাশে যাইতাছি!

আমি শক্ত মনের মানুষ, তবু মামার আনন্দোচ্ছ্বাস দেখে আমার চোখে ভিজে এল। বললাম, মাশাআল্লাহ দারুণ খবর! কিন্তু এত্তসব কীভাবে হ’ল মামা?

আর বইলেন না মামা, একদিন রিসকা টানতে টানতে গল্পসল্প করতেছিলাম। হঠাৎ যাত্রী বললেন, তিনি তার পুরা পরিবার নিয়া হজ্জে যাইতেছেন। কিন্তু একটা সমস্যায় পড়ছেন। তার বৃদ্ধ অসুস্থ পিতা একলা চলাচল করতে পারেন না। তার পিতারে ধইরা ওঠানামা করা আর চেয়ারে করে ঠেলার জন্য একজন শক্ত সামর্থ্য মানুষ দরকার। আমি যদি রাযী থাকি, তাইলে পুরা খরচ দিয়া আমারে তিনি সাথে নিয়া যাইবেন। কাকার কথা শুইনা আমি তক্ষণই চিৎকার দিয়া কাইন্দা উঠছি আর বলতে থাকি ‘আল্লাহ তুমি আছো, আল্লাহ তুমি আছো’। কাকা নিজেই আমার পাসপুট, ভিসা করাইলেন, কাপড়-চুপুড় যা লাগে সবই কিন্না দিলেন। বলছিলাম না মামা, আল্লাহই চাইলে কী না হয়!

মামার কথা শুনে আমার সারা শরীর শিউরে উঠল, সুবহানআল্লাহ! সাথে নিয়ে আসা টাকার প্যাকেট মামার হাতে দিয়ে বললাম, এটা রাখেন, যদি কোন কাজে লাগে। মামা এবারেও ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, লাগব না মামা। আপনে খালি আমার জন্য দো‘আ কইরেন। মালিক যেন আমার হজ্জ, ওমরাহ কবুল করেন।

আমি পুনরায় টাকাটা এগিয়ে দিয়ে বলি, অবশ্যই দো‘আ করি মামা। তবে এই টাকাটা আপনাকে নিতেই হবে। নিয়ত করে নিয়ে আসছি, ফেরত নিয়ে যাব না। যে কোনো ভাল কাজে খরচ কইরেন। নিজে তো যেতে পারলাম না, অন্তত একটা ছওয়াবের কাজে শরীক হ’লাম।

খালেছ নিয়ত রাখেন মামা, একদিন আপনেও যাইতে পারবেন ইনশাআল্লাহ। দূর থেকে দেখছি ‘লাববাইক আল্লাহুম্মা লাববাইক’ ধ্বনিতে সুর তুলে সম্মানিত হাজীগণের সাথে এক কাতারে এগিয়ে চলেছেন একজন অর্থ-বিত্তহীন রিক্সাচালক আরীফুল মামা। তিনি শিক্ষিত নন, নেই একাডেমিক সার্টিফিকেট। সহায়- সম্পত্তি, খ্যাতি কিছুই নেই তার। সমাজে কেউ তাকে চেনে না। তবে যিনি চেনার তিনি ঠিকই চিনেছেন এবং পুরস্কারও এই দুনিয়ায় দিয়ে দিলেন। ভাবছি মামার নিয়তের কত শক্তি! অথচ আমি কেমন ইলম অর্জন করলাম যে রবের প্রতি পূর্ণ তাওয়াক্কুল রাখতে পারি না।

কোথায় যেন শুনেছিলাম, আল্লাহ বান্দার সাথে তার ধারণা অনুযায়ী আচরণ করেন। দো‘আ করার সময় বান্দা যদি পূর্ণ আস্থা রাখে, তাহ’লে রব তাকে সত্যিই ফিরিয়ে দেন না। যার সংকল্প যত দৃঢ়, তার দো‘আ কবুলের সম্ভাবনা ততো বেশী। নিজেকে প্রবোধ দিলাম, সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি, সংশোধন হ’তে হবে। অবশেষে প্রশান্ত চিত্তে মামাকে বিদায় জানিয়ে বাড়ির পথ ধরলাম। আল্লাহ আমাদের সকলের সমস্ত খালেছ নিয়ত কবুল করুন।- আমীন!

-সাবিহ যামান



আরও