উপকারী জ্ঞান : দুনিয়া ও আখেরাতের আলোকবর্তিকা

মামূন বিন হাসমত 12 বার পঠিত

ভুমিকা : উপকারী জ্ঞান হ’ল সেই ইলাহী নূর, যা মানুষের আত্মার গহীন অাঁধার দূর করে সেখানে হেদায়াতের আলোকবর্তিকা প্রজ্বলিত করে। এটি কেবল কিতাব কিংবা তথ্যের স্তূপ নয়। এটি এমন এক প্রজ্ঞা যা মানুষকে প্রকৃত কল্যাণের পথ দেখায়। অমঙ্গল ও ধ্বংসের প্রতিটি পিচ্ছিল পথ থেকে আগলে রাখে। অতঃপর আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে গড়ে তোলে এক প্রশান্ত হৃদয়। তাই এই উপকারী জ্ঞান হ’ল মানবতার জন্য সেই সঞ্জীবনী সুধা। যা প্রতিটি যুগে ও প্রতিটি স্থানে দ্বীন, দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় কল্যাণের অকাট্য নিশ্চয়তা প্রদান করে ও অন্তহীন সৌভাগ্যের দুয়ার খুলে দেয়। আলোচ্য প্রবন্ধে সেই বিষয়ে আলোকপাত করা হ’ল।-

জ্ঞানের প্রকারভেদ : শরী‘আতের সুক্ষ্ম বিচার বিশ্লেষণে ইলম বা জ্ঞানকে প্রধানত দুই ভাগে বিন্যস্ত করা হয়েছে। যথা :

(১) উপকারী জ্ঞান : যখন কোনো জ্ঞান অর্জনকারী ব্যক্তি নিজে সেই জ্ঞান অনুযায়ী আমল করে নিজের জীবনকে আলোকিত করে এবং এর সুধা বিলিয়ে অন্যকেও উপকৃত করে, তখন তাকেই বলা হয় ‘উপকারী জ্ঞান’। এটিই হ’ল মুমিনের প্রকৃত সম্পদ এবং জান্নাতের সোপান।

(২) অনুপকারী জ্ঞান : যদি কোনো ব্যক্তি শরী‘আতসম্মত জ্ঞান অর্জন করার পরও আলস্য কিংবা অবহেলার কারণে তা আমল না করে এবং নিজের ও অন্যের কোনো উপকারে না আসে, তবে সেই জ্ঞান তার জন্য ‘অনুপকারী’ হিসাবে গণ্য হবে। এই জ্ঞান ক্বিয়ামতের কঠিন দিনে তার জন্য রহমত হওয়ার পরিবর্তে এক দুঃসহ বোঝা এবং তার বিরুদ্ধেই আল্লাহর আদালতে এক অকাট্য দলীল হিসাবে উপস্থাপিত হবে।

আল্লাহর নিকট রাসূল (ছাঃ)-এর উপকারী জ্ঞান প্রার্থনা : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর হাদীছসমূহেও ইলম বা জ্ঞানকে ‘উপকারী’ ও ‘অনুপকারী’-এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। সেখানে যেমন অনুপকারী জ্ঞান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়েছে। তেমনি উপকারী জ্ঞানের জন্য তাঁর কাছে আরয করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জাবের (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ইরশাদ করেছেন,سَلُوْا اللهَ عِلْمًا نَافِعًا، وَتَعَوَّذُوْا بِاللهِ مِنْ عِلْمٍ لَا يَنْفَعُ- ‘তোমরা আল্লাহর কাছে উপকারী জ্ঞান প্রার্থনা করো এবং অনুপকারী জ্ঞান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাও’।[1]

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর অন্যতম একটি দো‘আ ছিল-اللَّهُمَّ انْفَعْنِي بِمَا عَلَّمْتَنِي، وَعَلِّمْنِي مَا يَنْفَعُنِي، وَزِدْنِي عِلْمًا- ‘হে আল্লাহ! আপনি আমাকে যা শিখিয়েছেন তা দিয়ে আমাকে উপকৃত করুন, আর যা আমার জন্য উপকারী হবে তা আমাকে শিখিয়ে দিন এবং আমার জ্ঞান আরও বাড়িয়ে দিন’।[2] 

অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, وارزقْنِيْ عِلْماً تَنْفَعُنِيْ بِه ‘আর আমাকে এমন জ্ঞান দান করুন যা দিয়ে আপনি আমাকে উপকৃত করবেন’।[3] তিনি আরও বলতেন,اللهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عِلْمٍ لَا يَنْفَعُ، ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান প্রার্থনা করছি এবং আপনার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি এমন জ্ঞান থেকে যা কোনো উপকারে আসে না’।[4]

উপকারী জ্ঞানের প্রয়োজনীতা : ইসলাম এমন একটি ধর্ম, যার প্রতিটি ইবাদত জ্ঞানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। অজ্ঞতা মানুষকে পথভ্রষ্ট করে। আর জ্ঞান মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। আল্লাহ বলেন,قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُوْنَ وَالَّذِيْنَ لَا يَعْلَمُوْنَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُوْلُوْ الْأَلْبَابِ- ‘তুমি বল, যারা বিজ্ঞ এবং যারা অজ্ঞ, তারা কি সমান? বস্ত্তত জ্ঞানীরাই কেবল উপদেশ গ্রহণ করে থাকে’ (যুমার ৩৯/৯)

জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্য : উপকারী জ্ঞান হ’ল সেই জ্ঞান, যা অর্জনকারীর অন্তরে আল্লাহর ভয় ও পরম ভক্তি জাগ্রত করে। জ্ঞান অর্জনের প্রথম উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আল্লাহকে চেনা, তাঁর বিধান জানা এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন। কারণ প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তিরা আল্লাহকে ভয় করে। আল্লাহ বলেন,إِنَّمَا يَخْشَى اللهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ- ‘আল্লাহকে সবচেয়ে বেশী ভয় করে তাঁর জ্ঞানবান বান্দারা’ (ফাতির ৩৫/২৮)

উপকারী জ্ঞানের উৎস : শরী‘আতের দৃষ্টিতে প্রশংসিত সেই ‘উপকারী জ্ঞান’ হ’ল মূলত নবীগণের নিকট থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জ্ঞান। যা আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর রাসূলের সুনণাহ থেকে গৃহীত। ইমাম ইবনে তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেছেন, সকল কল্যাণের মূল হ’ল ইলম বা জ্ঞান। যা অর্জনের ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা। বিশেষ করে সেই ইলম যা নবী করীম (ছাঃ) থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। কারণ এটিই একমাত্র জ্ঞান যা প্রকৃত অর্থে ‘ইলম’ হিসাবে অভিহিত হওয়ার যোগ্য। এছাড়া অন্য যা কিছু আছে, তা কোন উপকারী জ্ঞান নয়, অথবা তা আদেŠ কোনো জ্ঞানই নয়’।[5]

উপকারী জ্ঞানের প্রকৃত মানদন্ড : আজকাল মানুষ বিজ্ঞান বা তথ্যপ্রযুক্তি সহায়তায় অনেক কিছু জানে। কিন্তু তার সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সম্পর্কে কিছুই জানে না। পবিত্র কুরআন এই একপাক্ষিক জ্ঞানকে ‘প্রকৃত জ্ঞান’ বলে স্বীকৃতি দেয়নি। যে জ্ঞান আপনাকে আপনার রবের কথা মনে করিয়ে দেয় না, তা কেবলই ‘বাহ্যিক রূপ’ যার কোনো স্থায়িতব নেই। আল্লাহ তা‘আলা সেই ব্যক্তিদের কাছ থেকে ‘প্রকৃত জ্ঞানের’ তকমা ছিনিয়ে নিয়েছেন, যারা পার্থিব জ্ঞান-বিজ্ঞানের চাকচিক্য ও জেŠলুস অর্জন করেছে ঠিকই, কিন্তু পরকাল সম্পর্কে চরম উদাসীন। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُوْنَ- يَعْلَمُوْنَ ظَاهِرًا مِنَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ عَنِ الْآخِرَةِ هُمْ غَافِلُوْنَ- ‘কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না’। ‘তারা তো পার্থিব জীবনের বাহ্যিক দিকের সামান্য কিছু জানে। কিন্তু আখেরাত বিষয়ে তারা উদাসীন’ (রূম ৩০/৬-৭)

এই আয়াতের মর্মার্থ ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে ইমাম গাযালী (রহঃ) কতই না চমৎকার বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি উপকারী জ্ঞান এবং ক্ষতিকর জ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য করতে জানে না, সে মানুষের ভিড়ে সেই সব চাকচিক্যময় বিদ্যায় মগণ হয়ে পড়ে। যা কেবল দুনিয়া অর্জনের মাধ্যম। প্রকৃতপক্ষে এই বস্ত্তবাদী শিক্ষাই হ’ল মূর্খতার মূল উপাদান এবং জগতের যাবতীয় ফিৎনা-ফাসাদের উৎস’।[6]

যখন কোনো জাতি কেবল দুনিয়া কামানোর শিক্ষাকেই সর্বস্ব মনে করে, তখন তারা প্রকৃতপক্ষে মূর্খতার কারখানায় পরিণত হয়। কারণ সেই জ্ঞান মানুষকে চতুর বানাতে পারে, কিন্তু মানুষ বানাতে পারে না। এটিই বর্তমান বিশেবর অশান্তির মূল কারণ।

তাই হে জ্ঞান অন্বেষী! আল্লাহর সেই বিশেষ নে‘মত ও অনুগ্রহকে অন্তরে লালন করুন। যিনি পৃথিবীর বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে কেবল আপনাকে এই হেদায়াতের জ্ঞানের জন্য বেছে নিয়েছেন। তাই তাঁর বেশি বেশি শুকরিয়া আদায় করুন, যিনি বলেছেন,وَعَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُنْ تَعْلَمُ وَكَانَ فَضْلُ اللهِ عَلَيْكَ عَظِيْمًا، ‘আর তোমাকে শিক্ষা দিয়েছেন যা তুমি জানতে না। বস্ত্তত তোমার উপর আল্লাহর করুণা অসীম’ (নিসা ৪/১১৩)

একবার ভাবুন তো! কোটি কোটি মানুষ আজ কেবল ক্যারিয়ার, টাকা আর জেŠলুসের পেছনে ছুটছে। তাদের মাঝে আল্লাহ আপনাকে তাঁর দ্বীন শেখার, তাঁর কুরআন বুঝার এবং পরকালের প্রস্ত্ততি নেওয়ার তাওফীক দিয়েছেন। এটি কোনো ছোট বিষয় নয়! এটি আল্লাহর এক বিশাল অনুগ্রহ।

উপকারী জ্ঞানের মহিমা : প্রকৃত উপকারী জ্ঞানের মহিমা হ’ল তাই যা মহান আল্লাহর প্রতি আপনার ভয় ও আনুগত্য বাড়িয়ে দেয়। যা নিজের দোষ-ত্রুটিগুলো চিনে নেওয়ার জন্য আপনার অন্তর্দৃষ্টি খুলে দেয়। যা আপনার রবের ইবাদত ও দাসতেবর নিগূঢ় রহস্য সম্পর্কে আপনার জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে।

এই জ্ঞান দুনিয়ার প্রতি আপনার আসক্তি কমিয়ে দেয় এবং আখেরাতের প্রতি ব্যাকুলতা বাড়িয়ে দেয়। এটি আপনার আমলের ভেতরের সূক্ষ্ম ত্রুটিগুলো চেনার জন্য আপনার চোখ খুলে দেয়। যাতে আপনি তা থেকে বাঁচতে পারেন। এমনকি শয়তানের সূক্ষ্ম প্রতারণা ও ধোঁকাগুলোও এই জ্ঞান আপনার সামনে উনেমাচিত করে দেয়।

মনে রাখবেন, উপকারী জ্ঞান মানেই কেবল প্রচুর কুরআন-হাদীছ মুখস্থ করা কিংবা বাগিমতায় পারদর্শিতা নয়। এটি হ’ল একটি ঐশী আলো, যা আল্লাহ বানদার হৃদয়ে ঢেলে দেন। এই আলোর সাহায্যেই বানদা সত্যকে বুঝতে পারে এবং সত্য ও মিথ্যার মাঝে পার্থক্য করতে পারে।

জ্ঞানের প্রচার ও তার শ্রেষ্ঠত্ব : সম্পদের যেমন যাকাত দিতে হয়, জ্ঞানের যাকাত হ’ল তা মানুষকে শেখানো। আপনি যা জানেন, তা যদি আমানত হিসাবে অন্যের কাছে পেঁŠছে দেন, তবেই আপনার জ্ঞান সার্থকতা পায় এবং তা আপনার জন্য ছাদাক্বায়ে জারিয়া হিসাবে কবরেও ছওয়াব পেŠঁছে দেয়। প্রকৃত জ্ঞানীরা সবসময়ই উপকারী জ্ঞান প্রচার ও প্রসারের সুমহান মর্যাদার ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন।

আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহঃ) এ প্রসঙ্গে বলেছেন, নবুঅতের মর্যাদার পর ইলম বা জ্ঞান প্রচার করার চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কোনো কাজ আছে বলে আমার জানা নেই’।[7] শায়খুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়াহ (রহঃ) আরও একধাপ এগিয়ে বলেছেন, ‘মানুষ যখন সত্য-মিথ্যার গোলকধাঁধায় পড়ে বিভ্রান্ত ও সংশয়াচ্ছনণ হয়ে যায়, তখন তাদের সামনে সঠিক জ্ঞান ও দ্বীনের স্বরূপ ব্যাখ্যা করে দেওয়া হ’ল আল্লাহর ইবাদতসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম ইবাদত’।[8]

হারিয়ে যাওয়া নূর : আজ আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় হাযারো লেকচার আর তর্কের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছি। আজকাল আমাদের বক্তৃতার মঞ্চ কাঁপানো বক্তা অনেক, লাইক-শেয়ার পাওয়া পোস্ট অনেক, কিন্তু সেই কথার পেছনে যে ‘নূর’ বা মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার শক্তি থাকা দরকার, তা হারিয়ে যাচ্ছে। কারণ আমরা কথা জমা করছি, তথ্য জমা করছি, ইলম নয়। প্রকৃত ‘উপকারী জ্ঞান’ বা অন্তরের সেই ঐশী আলো থেকে বিচ্যুতি শুরু হয়েছিল অনেক আগেই।

একবার হাম্মাদ বিন যায়েদ বাছরী (৯৮-১৭৯ হি.) প্রখ্যাত তাবেঈ আইয়ুব সাখতিয়ানী বাছরী (৬৬-১৩১ হি.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইলম বা জ্ঞান কি বর্তমান যুগে বেশি, নাকি আগের যুগে বেশি ছিল? আইয়ুব সাখতিয়ানী উত্তর দিলেন, ‘আজকের যুগে কথার জেŠলুস আর বাচালতা বেড়েছে সত্য, কিন্তু প্রকৃত জ্ঞান তো সেই আগের যুগেই ছিল বেশি’।[9]

সময়ের আবর্তে এই শূন্যতা আরও গভীর হয়েছে। ইমাম গাযালী (৪৫০-৫০৫ হি.) বলেন, ‘ইসলামের প্রথম যুগে ‘ফিক্বহ’ বা প্রজ্ঞা শব্দটি ব্যবহৃত হ’ত পরকালের গন্তব্য চেনার আলোকবর্তিকা হিসাবে। অথচ আজ তা পরিণত হয়েছে কেবল তর্ক-বিতর্ক আর মতপার্থক্য নিয়ে লড়াই করার হাতিয়ারে, যেখানে পরকালের সেই ব্যাকুলতাটুকু আর অবশিষ্ট নেই’।[10] 

ইমাম ইবনুল জাওযী (৫১০-৫৯৭ হি.) আরও একধাপ এগিয়ে বললেন, ‘আমি অধিকাংশ আলেমকে দেখেছি তারা কেবল জ্ঞানের কঙ্কাল বা বাহ্যিক কাঠামো নিয়ে মেতে আছেন, এর প্রাণভোমরা এবং প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝার মতো সময় বা তৃষ্ণা তাঁদের নেই।[11]

কালক্রমে এই দূরতব এতটাই বেড়ে গেল যে, জ্ঞানের সেই পবিত্র চিহ্নগুলোও হারিয়ে যেতে লাগল। পরিশেষে ইমাম যাহাবী (৬৭৩-৭৪৮ হি.) অত্যন্ত দুঃখ ও ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘আল্লাহর কসম! এক সময় ইলম ও আমলের জগতটি এমনই ছিল, যেখানে হাদীছ বিশারদদের জীবন ছিল গভীর জ্ঞান আর একনিষ্ঠ ইবাদতের এক অপূর্ব সমন্বয়। কিন্তু আজ আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে না আছে সেই গভীর ইলম, আর না আছে সেই প্রাণবন্ত ইবাদত’।[12]

সালাফদের যুগে একজন মুহাদ্দিছ মানে কেবল হাযার হাযার হাদীছ মুখস্থ রাখা কোনো ব্যক্তি ছিলেন না; তাদের কলমের কালি আর চোখের পানি মিলিত হ’ত একই মোহনায়। তারা কিতাব পড়তেন অন্তর দিয়ে। আর আমল করতেন সমস্ত সত্তা দিয়ে। তাদের কাছে ইলম বা জ্ঞান ছিল একটি পবিত্র আমানত। যা কেবল আমলের মাধ্যমেই পরিশুদ্ধ হ’ত। আজ আমাদের আলমারি বইয়ে ভরে গেছে ঠিকই, কিন্তু সালাফদের সেই বিনয় আর রাতের নিস্তব্ধতায় রবের সামনে কান্নার সেই ‘নূর’ আজ বড় প্রয়োজন। আসুন আমরা কেবল কিতাব পড়ুয়া আলেম না হয়ে সালাফদের মতো আল্লাহ ওয়ালা হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করি।

যখন জ্ঞান আপনাকে ‘রববানী’ হিসাবে গড়ে তোলে : জ্ঞান অর্জনের সফরটি কেবল তথ্যের সমুদ্রে সাঁতার কাটা নয়। বরং নিজের চরিত্রকে আল্লাহর রঙে রাঙানোর এক মহান সংগ্রাম। তাই দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ পদবী হ’ল ‘রববানী’ বা আল্লাহওয়ালা হওয়া। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সবাই আল্লাহওয়ালা হয়ে যাও’ (আলে ইমরান ৩/৭৯)। এর অর্থ হ’ল আপনার জ্ঞান কেবল মস্তিষ্কে নয়, বরং আপনার আচরণে। আপনার কথা বলায় এবং আপনার প্রতিটি পদক্ষেপে প্রকাশ পাবে। যদি এই শিক্ষা আমাদের ছালাতের একাগ্রতা না বাড়ায় বা আমাদের নৈতিকতাকে উন্নত না করে, তবে তা কখনই উপকারী জ্ঞান নয়।

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় যামাখশারী (রহঃ) বলেন, ‘সেই ব্যক্তির শ্রম ও প্রচেষ্টার ব্যর্থতা প্রমাণের জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে তার জীবন ও আত্মাকে ইলম বা জ্ঞান জমা করার পেছনে বিলিয়ে দিল ঠিকই, কিন্তু সেই জ্ঞানকে নিজের জীবনে প্রয়োগের মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করল না’।[13]

ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহঃ) বলেছেন, ‘কোন আলেমকে ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত রববানী বলা যাবে না, যতক্ষণ না তিনি নিজের অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী আমল করেন এবং তা অন্যদের কাছে পৌঁছে দেন’।[14]

নবাব ছিদ্দীক হাসান খান ভূপালী (রহঃ) বলেন, ‘যিনি জ্ঞান অর্জন করেছেন তাঁর জন্য আমলমুখী হওয়ার ক্ষেত্রে মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হ’ল আল্লাহর এই একটি নির্দেশ ‘রববানী বা আল্লাহওয়ালা হও’।[15]

উপসংহার : বতর্মান যুগে যখন তথ্যের জেŠলুস আর বাচালতা ইলমের প্রকৃত প্রাণকে গ্রাস করে ফেলছে, তখন আমাদের ফিরে তাকাতে হবে সেই ‘সালাফ’-দের সোনালী যুগে, যাদের কাছে জ্ঞান ছিল আল্লাহর পরিচয় লাভ এবং পরকালের পাথেয় সংগ্রহের প্রধান মাধ্যম। পার্থিব জ্ঞানের চাকচিক্যে মগণ হয়ে পরকালকে ভুলে যাওয়া মূলত এক প্রকার সুসজ্জিত মূর্খতা, যা ইহকাল ও পরকাল উভয়কেই অন্ধকারাচ্ছনণ করে দেয়।

অতএব, দ্বীনী শ্রেষ্ঠতব যাহির কিংবা দুনিয়াবী স্বার্থ অর্জনের হীন বাসনা বিসর্জন দিয়ে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে ‘উপকারী জ্ঞান’ অন্বেষণ করাই হোক আমাদের জীবনের ব্রত। এই অর্জিত জ্ঞান যখন আমাদের চরিত্রে মাধুর্য আনবে, আমলকে বিশুদ্ধ করবে এবং অন্যকে সঠিক পথ দেখাবে, তখনই তা ‘নবুঅতের উত্তরাধিকার’ হিসাবে সার্থকতা পাবে। মহান আল্লাহ আমাদের সেই উপকারী জ্ঞানের অধিকারী করুন, যা ক্বিয়ামতের কঠিন দিন নাজাতের অসীলা হবে এবং জানণাতের পথকে সুগম করবে।-আমীন!

-মামূন বিন হাসমত

[সহ-সভাপতি, কুষ্টিয়া পশ্চিম সাংগঠনিক, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ ও এমফিল গবেষক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া]


[1]. ইবনু মাজাহ হা/৩৮৪৩ হাসান; ছহীহাহ হা/১৫১১।

[2]. তিরমিযী হা/৩৫৯৯; ইবনু মাজাহ হা/২৫১; মিশকাত হা/২৪৯৩।

[3]. হাকেম হা/১৮৭৯; ছহীহাহ হা/৩১৫১।

[4]. মুসলিম হা/২৭২২; নাসাঈ হা/৫৪৭০।

[5]. মাজমূ‘উল ফাতাওয়া ১০/৬৬৪ পৃ.।

[6]. ইয়াহইয়াউ উলূমুদ্দীন ৪/৩৬৯ পৃ.।

[7]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ৮/৩৮৭ পৃ.।

[8]. আর-রদ্দু আলাস সুবকী ২/৬৭৮ পৃ.।

[9]. আল-ফাওয়ায়েদ ১/১৫২ পৃ.।

[10]. ইয়াহইয়াউ উলূমুদ্দীন ১/৩৩ পৃ.।

[11]. ছয়দুল খাত্বির ৪৪৯ পৃ.।

[12]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ১/১৩৪ পৃ.।

[13]. তাফসীরে কাশশাফ ১/৩৭৮ পৃ.।

[14]. মিফতাহু দারিস সা‘আদাহ ১/৩৫৬ পৃ.।

[15]. ফৎহুল বায়ান ২/২৭৩ পৃ.।



বিষয়সমূহ: শিক্ষা-সংস্কৃতি
আরও