মুসলিম যুবকের সফলতার সোপান
দেলোয়ার হোসাইন
মুহাম্মাদ আব্দুন নূর 7 বার পঠিত
ভূমিকা : মানুষের জীবনে সুখ, নিরাপত্তা ও তৃপ্তির আকাংখা চিরন্তন ও স্বাভাবিক। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ খুঁজে ফেরে এমন এক প্রশান্তির সন্ধান, যা তার হৃদয়কে নিশ্চিন্ত করবে এবং জীবনের অনিশ্চয়তাকে সহনীয় করে তুলবে। কিন্তু বাস্তবতা হ’ল এই কাংখিত সুখ কখনোই দুনিয়ার বাহ্যিক প্রাচুর্য, বিপুল সম্পদ, ক্ষমতার মোহ কিংবা ভোগবিলাসের চাকচিক্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এসব প্রাচুর্য অনেকের জীবনেই এসেছে, অথচ অন্তরের শূন্যতা দূর হয়নি। বরং অস্থিরতা, ভয় ও হতাশাই আরও গভীর হয়েছে। ফলে একজন মুমিনের প্রকৃত শান্তি নিহিত রয়েছে তার অন্তরের সেই গভীর ও অটল সন্তুষ্টিতে, যা জন্ম নেয় ঈমানের মৌলিক ভিত্তিগুলোকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করার মাধ্যমে। এই সন্তুষ্টি এমন এক আলোকবর্তিকা, যা হৃদয়ের অন্ধকার দূর করে, চিন্তার জট খুলে দেয় এবং জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। এই সন্তুষ্টি কেবল মুখে উচ্চারিত কোন স্বীকৃতি বা বুদ্ধিবৃত্তিক ধারণা নয়; বরং এটি এক গভীর আত্মিক অবস্থা। নিম্নে সেই সন্তুষ্টির আলোচনার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।
জান্নাত অপরিহার্যে ৩টি সন্তুষ্টি : তিনটি বিষয় সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেওয়ার মাধ্যমে নিশ্চিত জান্নাতের গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে। আর তাহ’ল (১) আল্লাহকে রব হিসাবে (২) ইসলামকে দ্বীন হিসাবে এবং (৩) মুহাম্মদ (ছাঃ)-কে নবী হিসাবে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেওয়া। আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ‘হে আবু সাঈদ! যে ব্যক্তি আল্লাহকে রব হিসাবে, ইসলামকে দ্বীন হিসাবে এবং মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে নবীরূপে গ্রহণ করে সন্তুষ্ট, তার জন্য জান্নাত অবধারিত হয়ে গেল। আবু সাঈদ (রাঃ) তাতে অবাক হয়ে গেলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার জন্য কথাটি আবার বলুন। তিনি তাই করলেন। তারপর বললেন, আর একটি আমল এমন রয়েছে, যার দ্বারা বান্দা জান্নাতে এমন একশটি মর্যাদার স্তর লাভ করবে যার দু’টি স্তরের মধ্যে ব্যবধান হবে আসমান ও যমীনের ব্যবধান তুল্য। তখন তিনি বললেন, ঐ আমলটি কী হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ, আল্লাহর পথে জিহাদ’।[1]
তিনি আরো বলেন, যে ব্যক্তি আযান শুনে বলে,أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، رَضِيتُ بِاللهِ رَبًّا وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا- ‘আমিও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এক আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নেই। তাঁর কোন শরীক নেই। মুহাম্মাদ (ছাঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল। আমি আল্লাহকে রব হিসাবে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে রাসূল হিসাবে এবং ইসলামকে দীন হিসাবে পেয়ে সন্তুষ্ট। তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে’।[2]
আখিরাতের প্রথম মনযিলে সফলতা : আখেরাতের মনযিল সমূহের মধ্যে কবর হ’ল প্রথম মনযিল। এখান থেকে যদি কেউ মুক্তি পায়, তবে তার জন্য পরবর্তী মনযিলগুলোতে মুক্তি পাওয়া খুব সহজ হয়ে যাবে। আর সে যদি এখানে মুক্তি না পায়, তবে তার জন্য পরবর্তী মনযিলগুলো আরো বেশী কঠিন হবে। আমরা জানি, প্রত্যেক ব্যক্তিকেই কবরে প্রথমে তিনটি প্রশ্ন করা হবে। তোমার রব কে? তোমার দ্বীন কি? এবং নবী (ছাঃ)-কে দেখিয়ে প্রশ্ন করা হবে উনি কে? যদি সে তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, তাহ’লে আকাশ থেকে একজন আহবানকারী ঘোষণা দিয়ে বলবেন,فَيُنَادِي مُنَادٍ مِنَ السَّمَاءِ: أَنْ قَدْ صَدَقَ عَبْدِي، فَأَفْرِشُوهُ مِنَ الْجَنَّةِ، وَافْتَحُوا لَهُ بَابًا إِلَى الْجَنَّةِ، وَأَلْبِسُوهُ مِنَ الْجَنَّةِ قَالَ: فَيَأْتِيهِ مِنْ رَوْحِهَا وَطِيبِهَا قَالَ: وَيُفْتَحُ لَهُ فِيهَا مَدَّ بَصَرِهِ ‘আমার বান্দা সত্য বলেছে। সুতরাং তার জন্য জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দাও। তাকে জান্নাতের পোষাক পরিয়ে দাও। আর তার জন্য জান্নাতের দিকে একটি দরজা খুলে দাও। অতএব তার জন্য জান্নাতের দিকে একটি দরজা খুলে দেয়া হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ফলে তার দিকে জান্নাতের বাতাস ও সুগন্ধি দোলা দিতে থাকবে এবং দৃষ্টির শেষ সীমা পর্যন্ত তার কবরকে প্রশস্ত করে দেওয়া হবে’।[3]
আল্লাহকে রব হিসাবে সন্তুষ্টির স্বরূপ
আল্লাহকে রব হিসাবে স্বীকার করা মানে শুধুমাত্র আল্লাহ আছেন এতটুকু স্বীকার করে সন্তুষ্ট থাকা নয়। তাকে পালনকর্তা, রিযিকদাতা এবং বিধানদাতা হিসাবে মেনে নেওয়া। তিনি জীবন-মৃত্যু, সুখ ও দুঃখ, সম্মান প্রভৃতির নির্ধারক। যে বান্দা গভীরভাবে এ সত্যকে উপলব্ধি করে, তার অন্তরে আল্লাহ ছাড়া আর কারো প্রতি প্রকৃত নির্ভরতা থাকে না। তার হৃদয়ে আল্লাহর ভয় এবং ভালবাসা সর্বোচ্চ স্থান দখল করে। তখন সে মানুষের সন্তুষ্টির জন্য নয়, প্রতিটি মূহুর্তে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করে। যেমন,
(ক) আললাহর বিধানের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা : আল্লাহ তা‘আলা বলেন,فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا- ‘অতএব তোমার প্রতিপালকের শপথ! তারা কখনোই (পূর্ণ) মুমিন হ’তে পারবে না, যতক্ষণ না তারা তাদের বিবাদীয় বিষয় সমূহে তোমাকে বিচারক রূপে মেনে নিবে। অতঃপর তোমার দেওয়া ফায়ছালায় তাদের মনে কোনরূপ দ্বিধা না রাখবে এবং সর্বান্তঃকরণে তা মেনে নিবে’ (নিসা ৪/৬৫)। অত্র আয়াতে আল্লাহ কসম করে বলেছেন, আমরা কখনোই প্রকৃত মুমিন হ’তে পারব না, যতক্ষণ না আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সিদ্ধান্তকে আমরা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেই।
অন্য আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَمَنْ يُسْلِمْ وَجْهَهُ إِلَى اللهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى وَإِلَى اللهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ- ‘আর যে ব্যক্তি তার চেহারাকে সমর্পণ করল আল্লাহর দিকে সৎকর্মশীল (মুমিন) অবস্থায়, সে দৃঢ়ভাবে ধারণ করল এক মযবুত হাতল। বস্ত্তত আল্লাহরই দিকে সকল কর্মের পরিণাম’ (লোকমান ৩১/২২)।
যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে (অর্থাৎ তাঁর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকে), সে মযবুত হাতল আঁকড়ে ধরে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,ذَاقَ طَعْمَ الْإِيْمَانِ مَنْ رَضِيَ بِاللهِ رَبًّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا- ‘সেই ব্যক্তি ঈমানের স্বাদ লাভ করেছে, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা’আলাকে প্রতিপালক হিসাবে, ইসলামকে দ্বীন হিসাবে এবং মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে নবী হিসাবে খুশী মনে মেনে নিয়েছে’।[4]
(খ) আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকা : মানুষের জীবনে কখনো সুখ আসে, কখনো দুঃখ; কখনো সফলতা, কখনো ব্যর্থতা; আবার কখনো নে‘মত, কখনো পরীক্ষা। মুমিন সকল পরিস্থিতিকে উত্তম বলে মনে করে। তাই বিপদে সে ধৈর্যশীল, এবং প্রতিটি বিরূপ অবস্থায় আল্লাহর উপর নির্ভরশীল। তার মুখ থেকে অভিযোগ, হতাশা বা ঈমানবিরোধী বাক্য বের হয় না। বরং সে বলে, ‘আমার রব যা নির্ধারণ করেছেন তাতেই মঙ্গল’। মানুষ বুঝুক বা না বুঝুক, আল্লাহর ফায়ছালার মধ্যেই কল্যাণ নিহিত রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ وَعَسَى أَنْ تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَكُمْ وَاللهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ- ‘আর অবশ্যই তোমরা এমন বহু কিছু অপসন্দ কর, যা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর অবশ্যই তোমরা এমন বহু কিছু পসন্দ কর, যা তোমাদের জন্য ক্ষতিকর। বস্ত্তত আল্লাহ সবকিছু জানেন, কিন্তু তোমরা জানো না (বাক্বারাহ ২/২১৬) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ، وَلَيْسَ ذَاكَ لِأَحَدٍ إِلَّا لِلْمُؤْمِنِ، إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ، وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ، صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ- ‘ঈমানদারের ব্যাপারটাই অদ্ভূত। বস্ত্তত ঈমানদারের প্রতিটি কাজই তার জন্য কল্যাণকর। আর এটা একমাত্র মুমিনদেরই বৈশিষ্ট্য। তার সচ্ছলতা অর্জিত হ’লে সে শুকরিয়া আদায় করে, এটা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর তার উপর কোন বিপদ আসলে সে ধৈর্যধারণ করে, ফলে এটাও তার জন্য কল্যাণকর হয়’।[5]
(গ) আল্লাহর বিধান অনুসরণে আনন্দিত হওয়া : কোন মুমিন সত্যিকার অর্থে আল্লাহকে রব হিসাবে মেনে সন্তুষ্ট হলে আল্লাহর বিধান অনুসরণে আনন্দিত হন। ছালাত, ছিয়ামসহ অন্যান্য ফরয ও সুন্নাত ইবাদত পালন করাকে বোঝা মনে করে না এবং সকল প্রকার হারাম কাজ বর্জনে সে আনন্দিত হয়। তার কাছে আল্লাহর বিধান অনুসরণ মানেই জীবনের সৌন্দর্য। আল্লাহ বলেন, آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مِنْ رَبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ كُلٌّ آمَنَ بِاللهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْ رُسُلِهِ وَقَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ- ‘রাসূল বিশ্বাস রাখেন ঐসকল বিষয়ে যা তার পালনকর্তার পক্ষ হ’তে তার প্রতি নাযিল হয়েছে এবং মুমিনগণও। তারা সকলেই বিশ্বাস পোষণ করে আল্লাহর উপর, তাঁর ফেরেশতাগণের উপর, তাঁর প্রেরিত কিতাব সমূহের উপর এবং তাঁর রাসূলগণের উপর। (তারা বলে) আমরা তাঁর রাসূলগণের মধ্যে কাউকে পার্থক্য করি না। আর তারা বলে, আমরা শুনলাম ও মান্য করলাম। আমরা তোমার নিকট ক্ষমা চাই হে আমাদের প্রতিপালক! আর তোমার নিকটেই তো আমাদের প্রত্যাবর্তন’(বাক্বারাহ ২/২৮৫)।
আল্লাহর বিধান পালনে ও স্মরণে মুমিনের অন্তর প্রশান্ত হয়। যেমন তিনি বলেন,الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُمْ بِذِكْرِ اللهِ أَلَا بِذِكْرِ اللهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ- ‘যারা আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আল্লাহকে স্মরণ করলে যাদের অন্তরে প্রশান্তি আসে। মনে রেখ, আল্লাহর স্মরণেই কেবল হৃদয় প্রশান্ত হয়’ (রা‘দ ১৩/২৮)। যখন বিশ্বাস ও সন্তুষ্টির ভিত্তি দৃঢ় হয়, তখন হাদীছের সুসংবাদ বান্দার জন্য প্রযোজ্য হয়ে যায়।
(ঘ) শুধুমাত্র আল্লাহর নিকট মাথা নত করা এবং যাবতীয় শিরকমুক্ত থাকা : সর্বাবস্থায় আমাদেরকে শুধুমাত্র আল্লাহর বিধানের কাছে মাথা নত করতে হবে। কোন অবস্থায় মানুষের কাছে বা মানব রচিত কোন বিধানের কাছে মাথা নত করা যাবে না। মহান আল্লাহ বলেন,وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ ‘তাদেরকে এ ছাড়া অন্য কোন নির্দেশ দেয়া হয়নি যে, তারা আল্লাহর ইবাদাত করবে খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমে’ (বাইয়েনাহ ৯৮/৫)। আমরা প্রতি ছালাতে সূরা ফাতিহায় পাঠ করি,إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ ‘আমরা কেবল তোমারই ইবাদাত করি এবং কেবলমাত্র তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি’ (ফাতিহা ১/৫)। এর বিপরীতে যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করবে, তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেওয়া হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللهِ فَقَدْ حَرَّمَ الَهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অন্যকে শরীক করে, আল্লাহ অবশ্যই তার উপরে জান্নাতকে হারাম করে দেন’ (মায়েদাহ ৫/৭২)।
ইসলামকে দ্বীন হিসাবে সন্তুষ্টির স্বরূপ
মানুষের জীবনে দ্বীন বা জীবনব্যবস্থা অনিবার্য। ধর্ম, মতবাদ বা দর্শন যে যাই বলুক না কেন, প্রতিটি মানুষের জীবন কোন না কোন নির্দেশনা ও নীতিমালার অধীনে পরিচালিত হয়। কিন্তু সেই নির্দেশনা যদি মানবরচিত হয়, তবে তাতে সীমাবদ্ধতা, ভুল, স্বার্থপরতা ও পারস্পরিক দ্বন্দ্ব থাকা স্বাভাবিক। তাই অনুসরণযোগ্য প্রকৃত দ্বীন সেটাই, যা আমাদের সৃষ্টিকর্তা আমাদের জন্য নির্ধারণ করেছেন। যিনি সৃষ্টির সব প্রয়োজন সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান রাখেন। আর সে পরিপূর্ণ ও চিরস্থায়ী জীবনব্যবস্থা হ’ল আল্লাহ প্রদত্ত ইসলাম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللهِ الْإِسْلَامُ وَمَا اخْتَلَفَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ إِلَّا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْعِلْمُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ وَمَنْ يَكْفُرْ بِآيَاتِ اللهِ فَإِنَّ اللهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট মনোনীত একমাত্র দ্বীন হ’ল ইসলাম। আর আহলে কিতাবগণ (শেষনবীর উপর ঈমান আনার ব্যাপারে) মতভেদ করেছে তাদের নিকট ইল্ম এসে যাবার পরেও কেবল পরস্পরে হঠকারিতাবশে। বস্ত্তত যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে (তারা জানুক যে,) অবশ্যই আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী’ (আলে ইমরান ৩/১৯)।
(ক) ইসলামকে পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা হিসাবে গ্রহণ করা : ইসলাম শুধু আমাদের ছালাত-ছিয়ামের নির্দেশনা প্রদান করেনা। বরং ইসলাম আমাদের পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনীতি, রাজনীতিসহ জীবনের প্রতিটি বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছে। আল্লাহ বলেন,الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের উপর আমার অনুগ্রহকে সম্পূর্ণ করলাম। আর ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসাবে মনোনীত করলাম’ (মায়েদাহ ৫/৩)। যে মনে করে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় সফলতা ইসলামের মধ্যেই রয়েছে তার চিন্তা, মূল্যবোধ, আচার-আচরণ ও সিদ্ধান্ত ইসলামের আলোয় পরিচালিত হয়।
(খ) হালাল গ্রহণ ও হারাম বর্জন করা : আল্লাহ তা‘আলা বলেন,يَاأَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُبِينٌ- ‘হে মানবজাতি! তোমরা পৃথিবী থেকে হালাল ও পবিত্র বস্ত্ত ভক্ষণ কর। আর শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু’ (বাক্বারাহ ২/১৬৮)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, মানুষের নিকট এমন এক সময় আসবে, যখন মানুষ উপার্জনের ক্ষেত্রে হারাম-হালাল বিবেচনা করবে না। যেমন তিনি বলেন,يَأْتِي عَلَى النَّاسِ زَمَانٌ لاَ يُبَالِي الْمَرْءُ مَا أَخَذَ مِنْهُ أَمِنَ الْحَلاَلِ أَمْ مِنْ الْحَرَامِ ‘এমন এক যুগ আসবে, যখন মানুষ পরোয়া করবে না যে, সে কোথা হ’তে সম্পদ উপার্জন করল, হালাল হ’তে না হারাম হ’তে’।[6] হারাম খাদ্য ভক্ষণ করা সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ جَسَدٌ غُذِّيَ بِحَرَامٍ ‘যে দেহ হারাম খাদ্য দিয়ে প্রতিপালিত হয়েছে, সে দেহ জান্নাতে প্রবেশ করবে না’।[7] আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে হ’লে সকল প্রকার হারাম থেকে বেঁচে থাকতে হবে।
মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে নবী হিসাবে সন্তুষ্টির স্বরূপ
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে নবী হিসাবে পেয়ে সন্তুষ্ট হওয়া মানে কেবলমাত্র মুখে-মুখে তাঁর প্রতি বিশ্বাস ও ভালবাসা প্রকাশ করার মধ্যে নিহিত নয়। যেমনটা আমরা প্রচলিত মীলাদ-ক্বিয়াম কিংবা ঈদে মীলাদুন্নবী অনুষ্ঠানগুলোতে দেখে থাকি। একজন মুসলিম নবী প্রেমে গদগদ হয়ে বছরে দু’একবার আনন্দ মিছিল বা র্যালীতে যোগদান করেন। যুবকরা নবী (ছাঃ)-এর অপমানের প্রতিবাদে রাজপথ গরম করেন। কিন্তু রাসূল (ছাঃ)-এর আদর্শ নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করতে তারা অপারগ। এসমস্ত লোকদের মধ্যে অনেকে আছেন পাঁচ ওয়াক্ত ফরয ছালাত পর্যন্ত তারা আদায় করেন না। নবী (ছাঃ)-কে ভালবাসার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হ’ল তাঁর আদর্শ ও সুন্নাতকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করা এবং বাস্তব জীবনে সেটি মেনে চলা। তিনি যা শিক্ষা দিয়েছেন তার অনুসরণ করা, তাকে সর্বোত্তম আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করা, তাকে সর্বাধিক ন্যায়পরায়ণ এবং মানবজাতির জন্য পরম কল্যাণময় বলে বিশ্বাস করাই সত্যিকার অর্থে নবীপ্রাপ্তিতে সন্তুষ্ট হওয়া বুঝায়।
(ক) মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর নবুঅতকে আন্তরিকতার সাথে গ্রহণ করা : মুমিনের ঈমান তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তিনি আল্লাহর শেষ রাসূল মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর আনীত নবুঅতকে পূর্ণ আন্তরিকতা, ভালবাসা ও বিনয়ের সঙ্গে গ্রহণ করেন এবং যাবতীয় বিধি-নিষেধ জীবনের জন্য সর্বোত্তম পথ হিসাবে মনে করেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,قُلْ يَاأَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ يُحْيِي وَيُمِيتُ فَآمِنُوا بِاللهِ وَرَسُولِهِ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ الَّذِي يُؤْمِنُ بِاللهِ وَكَلِمَاتِهِ وَاتَّبِعُوهُ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ- ‘তুমি বল, হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। যার জন্যই আসমান ও যমীনের রাজত্ব। তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। যিনি জীবিত করেন ও মৃত্যু দান করেন। অতএব তোমরা বিশ্বাস স্থাপন কর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর, যিনি নিরক্ষর নবী। যিনি বিশ্বাস স্থাপন করেছেন আল্লাহ ও তার বাণী সমূহের উপর। তোমরা তার অনুসরণ কর যাতে তোমরা সুপথপ্রাপ্ত হ’তে পার’ (আ‘রাফ ৭/১৫৮)।
যে ব্যক্তি মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর নবুঅতকে না মেনে মৃত্যুবরণ করবে, সে অবশ্যই জাহান্নামী হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন,وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ، لَا يَسْمَعُ بِي أَحَدٌ مِنْ هَذِهِ الْأُمَّةِ يَهُودِيٌّ، وَلَا نَصْرَانِيٌّ، ثُمَّ يَمُوتُ وَلَمْ يُؤْمِنْ بِالَّذِي أُرْسِلْتُ بِهِ، إِلَّا كَانَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ- ‘যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ তাঁর কসম, এই উম্মতের (অর্থাৎ মানবজাতির) যে কেউই, সে ইহূদী হৌক বা নাছারা হৌক- আমার নবুঅতের খবর শুনবে, অথচ যা নিয়ে আমি প্রেরিত হয়েছি, তার প্রতি ঈমান না এনে মৃত্যুবরণ করবে, সে নিশ্চয়ই জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত হবে’।[8]
(খ) সর্বাবস্থায় মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর আনুগত্য করা : মুমিনের জীবনে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর আনুগত্য করার অর্থ প্রকারন্তরে আল্লাহরই আনুগত্য করা এবং তাঁর অবাধ্যতাই ভ্রষ্টতা ও ধ্বংসের কারণ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللهَ وَمَنْ تَوَلَّى فَمَا أَرْسَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا- ‘যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করে, সে আল্লাহর আনুগত্য করে। আর যে ব্যক্তি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাদের উপর আমরা তোমাকে তত্ত্বাবধায়ক করে পাঠাইনি’ (নিসা ৪/৮০)। তিনি আরো বলেন, لَا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُمْ بَعْضًا قَدْ يَعْلَمُ اللَّهُ الَّذِينَ يَتَسَلَّلُونَ مِنْكُمْ لِوَاذًا فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ- ‘তোমরা রাসূলের আহবানকে তোমাদের পরস্পরের প্রতি আহবানের ন্যায় গণ্য করো না। আল্লাহ তাদেরকে জানেন যারা তোমাদের মধ্য থেকে চুপিসারে চলে যায়। অতএব যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা এ বিষয়ে সাবধান হৌক যে, ফিৎনা তাদেরকে গ্রাস করবে অথবা মর্মন্তুদ শাস্তি তাদের উপর আপতিত হবে’ (নূর ২৪/৬৩) ।
(গ) বিদ‘আত বর্জন করা : বিদ‘আত হ’ল শরী‘আতে নতুন কিছু উদ্ভাবন করা। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। রাসূল (ছাঃ) আমাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতার জন্য সকল বিষয় বলে দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেন,مَا تَرَكْتُ شَيْئًا مِمَّا أَمَرَكُمُ اللهُ بِهِ إِلاَّ وَقَدْ أَمَرْتُكُمْ بِهِ وَلاَ تَرَكْتُ شَيْئًا مِمَّا نَهَاكُمُ اللهُ عَنْهُ إِلاَّ وَقَدْ نَهَيْتُكُمْ عَنْهُ- ‘আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন এমন কোন জিনিসই আমি (বর্ণনা করতে) ছাড়িনি। আর আমি তার হুকুম তোমাদেরকে অবশ্যই দিয়েছি। আর আমি এমন কোন জিনিসই ছাড়িনি যা আল্লাহ তা‘আলা নিষেধ করেছেন। কিন্তু আমি তোমাদেরকে তা অবশ্যই নিষেধ করেছি’।[9] এজন্য শরী‘আতে নতুন কিছু তৈরী করা সম্পূর্ণভাবে নিষেধ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, مَنْ أَحْدَثَ فِيْ أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيْهِ فَهُوَ رَدٌّ ‘যে ব্যক্তি আমাদের শরী‘আতে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করল, যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত’।[10] আল্লাহ বিদ‘আতী ব্যক্তির তওবা কবুল করেন না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,إِنَّ اللهَ حَجَبَ التَّوْبَةَ عَن كُلِّ صَاحِبِ بِدْعَةٍ حَتَّى يَدَع بِدْعَتَهُ- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক বিদ‘আতীর তওবা কবুল করেন না, যতক্ষণ না সে তার বিদ‘আত ত্যাগ করে’।[11]
বিদ‘আত করার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে অসম্মানিত ও তার রিসালাতে সন্দেহ পোষণ করা হয়। ইমাম মালেক (রহঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে বিদ‘আত সৃষ্টি করল এবং তাকে উত্তম আমল মনে করল, সে ধারণা করল যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) রিসালাতে খেয়ানত করেছেন। কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে (ইসলাম) পূর্ণাঙ্গ করলাম’ (মায়েদাহ ৫/৩)। সুতরাং সে যুগে (রাসূল ছাঃ ও ছাহাবায়ে কেরামের যুগ) যা দ্বীন হিসাবে গণ্য ছিল না, বর্তমানেও তা দ্বীন হিসাবে পরিগণিত হবে না’।[12]
(ঘ) মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে সর্বোচ্চ ভালবাসা : মুমিনের হৃদয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর প্রতি এত গভীর ভালবাসা থাকতে হবে, যা পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি, পরিবার-পরিজন এমনকি নিজের জীবনের থেকেও অধিক। কারণ তাঁর প্রতি ভালবাসাই ঈমানের পরিপূর্ণতার ভিত্তি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম। আল্লাহ বলেন,قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ- ‘তুমি বল, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তবে আমার অনুসরণ কর। তাহ’লে আল্লাহ তোমাদের ভালবাসবেন ও তোমাদের গোনাহসমূহ মাফ করে দিবেন। বস্ত্তত আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াবান’ (আলে ইমরান ৩/৩১)। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ ‘তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হ’তে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা, তার সন্তান ও সব মানুষের অপেক্ষা অধিক প্রিয় হই’।[13]
(ঙ) মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর সিদ্ধান্তকে সর্বোত্তম ও চূড়ান্ত হিসাবে গ্রহণ করা : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সিদ্ধান্তের কাছে দুনিয়ার যেকোন মানুষের মতামত, যুক্তি ও আইনের কোন মূল্য নেই এবং যেকোন বিষয়ে তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا وَاتَّقُوا اللهَ إِنَّ اللهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ- ‘আর রাসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত হও। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ কঠিন শাস্তিদাতা’ (হাশর ৫৯/৭)। অন্যত্র তিনি বলেন,لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللهَ كَثِيرًا- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূলের মধ্যে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ নিহিত রয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসকে কামনা করে ও অধিকহারে আল্লাহকে স্মরণ করে’ (সূরা আহযাব ৩৩/২১)।
(চ) মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর আদর্শ প্রচারে উৎসাহী হওয়া : মুমিনের জীবনের অন্যতম দায়িত্ব হ’ল আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর আদর্শ অনুযায়ী ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ গড়ে তুলতে সচেষ্ট থাকা। অতঃপর এই আদর্শের শিক্ষা সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া। এটি শুধু শিক্ষামূলক কাজ নয়, বরং ঈমানের প্রকাশ এবং দাওয়াহর মৌলিক দায়িত্ব। মুমিন যত আন্তরিকভাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর শিক্ষা প্রচার করবে, ততই সমাজে সত্যের আলো ছাড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সুযোগ পাবেন। আল্লাহ বলেন,وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ ‘আর আমরা তো তোমাকে বিশ্ববাসীর জন্য কেবল রহমত হিসাবেই প্রেরণ করেছি’ (আম্বিয়া ২১/১০৭)। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,مَنْ دَعَا إِلَى هُدًى كَانَ لَهُ مِنَ الأَجْرِ مِثْلُ أُجُورِ مَنْ يَتَّبِعُهُ لاَ يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْئًا وَمَنْ دَعَا إِلَى ضَلاَلَةٍ كَانَ عَلَيْهِ مِنَ الإِثْمِ مِثْلُ آثَامِ مَنْ يَتَّبِعُهُ لاَ يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ آثَامِهِمْ شَيْئًا ‘কেউ যদি হেদায়াতের পথে আহবান করে তাহ’লে সে তার অনুসারীর সমপরিমাণ ছওয়াব পাবে। তবে অনুসরণকারীদের ছওয়াব থেকে মোটেও কম করা হবে না। আর অন্যায় পথের দিকে অহবানকারী ব্যক্তি তার অনুসারীদের পাপের সমপরিমাণ পাপের অংশীদার হবে, তবে তাদের (অনুসরণকারীদের) পাপ থেকে মোটেই কমানো হবে না’।[14]
তিন সন্তুষ্টির ফলাফল :
হৃদয়ের গভীর থেকে এই তিনটি সন্তুষ্টি মুমিনের জীবনে এক আধ্যাত্মিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। আর এর মাধ্যমেই বান্দা ঈমানের প্রকৃত স্বাদ ও মিষ্টতা অনুভব করতে পারে। যেমন রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,ثَلَاثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ بِهِنَّ حَلَاوَةَ الْإِيْمَانِ: مَنْ كَانَ اللهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا، وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ، وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ بَعْدَ أَنْ أَنْقَذَهُ اللهُ مِنْهُ، كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ- ‘তিনটি গুণ যার মধ্যে আছে, সে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করতে পারে। (১) আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার নিকট অন্য সকল কিছু হ’তে অধিক প্রিয় হওয়া (২) কাউকে একমাত্র আল্লাহর জন্যই ভালবাসা (৩) কুফরীতে প্রত্যাবর্তনকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হবার মত অপসন্দ করা’।[15] এই সন্তুষ্টি মানুষকে দুনিয়াবী প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব ভুলিয়ে হতাশামুক্ত ও প্রশান্ত জীবন উপহার দেয়। কারণ সে বিশ্বাস করে তার রবের ফায়ছালাতেই নিহিত রয়েছে চূড়ান্ত কল্যাণ। সর্বোপরি, এই ত্রিমুখী সন্তুষ্টির সর্বোত্তম পুরস্কার হ’ল জান্নাতের নিশ্চয়তা। যা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ওয়াদা অনুযায়ী ঐ ব্যক্তির জন্য অবধারিত হয়ে যায়।
উপসংহার : পরিশেষে প্রিয় পাঠকদের প্রতি আন্তরিক আহবান, আমরা কি সত্যিই আল্লাহকে আমাদের রব হিসাবে, ইসলামকে আমাদের দ্বীন হিসেবে এবং মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে আমাদের নবী ও পথপ্রদর্শক হিসাবে পেয়ে অন্তর থেকে সন্তুষ্ট? নাকি আমরা পারিবারিক সূত্রে, সামাজিক রেওয়াজে কিংবা নিছক লৌকিকতার বশে এসব সত্য কেবল মুখে উচ্চারণ করে থাকি। অথচ জীবনের সিদ্ধান্ত, চিন্তা ও আচরণে তার প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়।
একবার আমরা নিজেদেরকে জিজ্ঞেস করি, আমাদের ভালবাসা, ভয়, আশা ও নির্ভরতার কেন্দ্র কি সত্যিই আল্লাহ? আমাদের জীবন পরিচালনার মূলনীতি কি প্রকৃতপক্ষে ইসলাম? আর আমাদের চলার পথের একমাত্র আদর্শ কি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সুন্নাত? আসুন, আল্লাহর বিধানকে, তাঁর প্রেরিত দ্বীন ইসলামকে এবং তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিই। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র, সর্ব স্তরে যদি এই ঈমানের বাস্তবায়ন ঘটে, তবেই আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুত চিরসুখের জান্নাত আমাদের জন্য অবধারিত হবে। দয়াময় আল্লাহ তা‘আলা যেন আমাদেরকে অন্তর থেকে সত্যিকার অর্থে এই সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফীক দান করেন, ঈমানকে আমাদের জীবনের চালিকাশক্তিতে পরিণত করেন এবং তাঁর সন্তুষ্টির পথে দৃঢ়ভাবে অবিচল থাকার শক্তি দান করেন।-আমীন!
মুহাম্মাদ আব্দুন নূর
[কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ]
[1]. মুসলিম হা/১৮৮৪; নাসাঈ হা/৩১৩৫; মিশকাত হা/৩৮৫১।
[2]. মুসলিম হা/৩৮৬; আবু দাউদ হা/৫২৫; মিশকাত হা/৬৬১।
[3]. আবু দাঊদ হা/৪৭৫৩; মিশকাত হা/১৩১।
[4]. মুসলিম, তিরমিযী হা/২৬২৩, মিশকাত হা/৯।
[5]. মুসলিম হা/২৯৯৯; মিশকাত হা/৫২৯৭।
[6]. বুখারী হা/২০৫৯।
[7]. বায়হাকবী শুআবুল ঈমান হা/৫৭৫৯, মিশকাত হা/২৭৮৭।
[8]. মুসলিম হা/১৫৩; মিশকাত হা/১০।
[9]. সিলসিলা ছহীহাহ হা/১৮০৩।
[10]. বুখারী হা/২৬৯৭; মুসলিম হা/১৭১৮; মিশকাত হা/১৪০।
[11]. তাবারাণী, ছহীহুত তারগীব হা/৫৪; সিলসিলা ছহীহাহ হা/১৬২০।।
[12]. আশরাফ ইব্রাহীম, আল-বুরহানুল মুবীন ফিত তাছাদ্দী লিল বিদ্ই ওয়াল আবাতীল ১/৪২ পৃ.।
[13]. বুখারী হা/১৫।
[14]. তিরমিযী হা/২৬৭৪।
[15]. বুখারী হা/১৬; মুসলিম হা/৪৩; মিশকাত হা/৮।