স্পিরিচুয়াল ইন্টেলিজেন্স ও মুমিন হৃদয়ের ‘বাছীরাত’

ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব 433 বার পঠিত

প্রযুক্তি ও বস্ত্তবাদের চরম উৎকর্ষের এই যুগে মানবীয় যোগ্যতার বিচারে বুদ্ধিভিত্তিক বুদ্ধিমত্তা (IQ) এবং আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা (EQ) নিয়ে বর্তমানে আকছার চর্চা হয়। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পেশাগত সাফল্য, সামাজিক মেলবন্ধন ও বৈষয়িক সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য এগুলোকে প্রধান চাবিকাঠি মনে করা হয়। কিন্তু বাস্তব জীবনে কেবল আই-কিউ বা ই-কিউ দিয়েই মানুষের জীবনের মূল অর্থ নির্ণয়, প্রকৃত সফলতার মাপকাঠি, মানসিক শান্তি ও সর্বোপরি আদর্শিক নীতি-নৈতিকতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। বস্ত্তবাদের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে আধুনিক সমাজের মানুষ আজ তীব্র শূন্যতা, একাকিত্ব, হতাশা ও দিকভ্রান্তিতে ভুগছে। হৃদয়ের এই অব্যক্ত ব্যাকুলতা মেটাতে পশ্চিমা সমাজবিজ্ঞানীরা তাই এখন নতুন করে ‘স্পিরিচুয়াল ইন্টেলিজেন্স’ (SQ) বা আধ্যাত্মিক বুদ্ধিমত্তার কথা বলছেন। তবে তাদের প্রস্তাবিত আধ্যাত্মিকতার সাথে স্রষ্টার প্রতি আনুগত্যের সম্পর্ক নেই। বরং এটা কেবল মানসিক চাপ কমানোর এক ধর্মনিরপেক্ষ বিকল্প হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। মানুষের শারীরিক সুস্থতার মত জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য অর্জন ও আত্মিক প্রশান্তির জন্য প্রয়োজন আত্মিক সুস্থতা। কিন্তু আল্লাহবিহীন কোনো মতবাদ বা ব্যবস্থায় হৃদয়ের এই সুস্থতা অর্জন করা কখনোই সম্ভব নয়।

আজকের সমাজে মানুষ শারীরিক ফিটনেস ধরে রাখতে কত আয়োজনই না করে! জিম, ডায়েট আর শারীরিক কসরতে বিপুল অর্থ ও সময় ব্যয় করা হয়। কিন্তু শারীরিক সুস্থতার চেয়েও হাযার গুণে গুরুত্বপূর্ণ হ’ল মানুষের ‘হৃদয়ের ফিটনেস’ বা আত্মিক সুস্থতা। রাসুলুল্লাহ (ছাঃ) অন্তরের ফিটনেস সম্পর্কে সুস্পষ্ট হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘জেনে রাখ! তোমাদের শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরো আছে, যা সংশোধন হ’লে পুরো শরীর সংশোধন হয়ে যায়, আর তা নষ্ট হ’লে পুরো শরীরই নষ্ট হয়ে যায়। জেনে রাখ, তা হ’ল ক্বলব বা অন্তর’ (বুখারী হা/৫২)। এজন্য শারীরিক ফিটনেসের পাশাপাশি অন্তরের এই সুস্থতার ব্যাপারে যত্নবান হওয়া একজন প্রকৃত ঈমানদারের মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

মূলত প্রকৃত আধ্যাত্মিক বুদ্ধিমত্তার উৎস হ’ল অহি-র আলোয় আলোকিত অন্তরের জাগ্রত জ্ঞান বা ‘বাছীরাত’ (بصيرة)। অহি-র আলো ব্যতিত কেবল মানুষের নিজস্ব মনগড়া ধ্যান বা মতাদর্শের মাধ্যমে যে আত্মিক চর্চা করা হয়, তা মানুষকে সাময়িক স্বস্তি দিলেও বাস্তব জীবনের ঝঞ্ঝা ও আখেরাতের কঠিন দিনে কোন কাজে আসবে না। কুরআনে মহান আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে আত্মিক পরিচর্যার বিষয়ে বার বার উৎসাহিত করে বলেন, ‘তারা কি যমীনে ভ্রমণ করেনি, যাতে তাদের এমন অন্তর হ’ত যা দিয়ে তারা বুঝতে পারত, কিংবা এমন কান হ’ত যা দিয়ে তারা শুনতে পারত? মূলত চোখ তো অন্ধ হয় না, বরং অন্ধ হয় বুকের ভেতরের হৃদয়’ (হজ্জ ২২/৪৬)। 

ইসলামের দৃষ্টিতে সেই ব্যক্তিই সর্বোচ্চ ‘স্পিরিচুয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা আত্মিক বুদ্ধিমত্তার অধিকারী, যিনি ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার ধোঁকা থেকে মুক্ত হয়ে চিরন্তন আখেরাতকে নিজের আসল গন্তব্য হিসাবে স্থির করে নেন। প্রতিটি কাজে পরকালকে সামনে রাখেন। প্রতিটি মুহূর্তকে পরকালের পাল্লায় মাপেন। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) প্রকৃত বুদ্ধিমান ব্যক্তি এবং আত্মিক বুদ্ধিমত্তার মূল মানদন্ড ঘোষণা করে বলেছেন, ‘বুদ্ধিমান তো সেই ব্যক্তি, যে নিজের আত্মাকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মৃত্যুপরবর্তী জীবনের জন্য আমল করে। আর অপারগ বা নির্বোধ তো সেই ব্যক্তি, যে নিজের কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করে, আবার আল্লাহর কাছে ভালো কিছুর আশা রাখে’ (তিরমিযী হা/২৪৫৯)। আবার স্পিরিচুয়াল ইন্টেলিজেন্স বা আত্মিক ফিটনেসের সর্বোচ্চ রূপ হিসাবে মহানবী (ছাঃ) ‘ইহসান’-এর পরিচয় দিয়ে বলেছেন, ‘তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন তুমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছ; আর যদি দেখতে না পাও, তবে বিশ্বাস রাখবে যে তিনি তোমাকে দেখছেন’ (মুসলিম হা/৮)।

এখানেই ধর্মহীন আধুনিকতার বিপরীতে অবস্থান ইসলামের চিরন্তন তাওহীদী আক্বীদার। আধুনিক পুঁজিবাদীদের কাছে আমাদের প্রশ্ন যদি স্রষ্টাকে বাদ দিয়ে কেবল ধর্মনিরপেক্ষ মনোনিবেশ, মানসিক একাগ্রতা কিংবা মানসিক ব্যায়াম দিয়েই মানুষের আধ্যাত্মিক বুদ্ধিমত্তা ও আত্মিক শান্তি অর্জিত হ’ত, তবে আধুনিক প্রযুক্তি ও বস্ত্তগত দিক থেকে শীর্ষ পরাশক্তি সমাজগুলোতে বিষণ্ণতা, মানসিক ব্যাধি আর আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশী কেন?

প্রকৃতপক্ষে, অহি-র দিকনির্দেশনা ছাড়া মানুষের আত্মিক বুদ্ধিমত্তা কেবল একটি সাময়িক মানসিক ‘পেইনকিলার’ মাত্র, যা আত্মাকে প্রকৃত মুক্তির স্বাদ দেয় না। ইসলামের দৃষ্টিতে স্পিরিচুয়াল ইন্টেলিজেন্স হ’ল তাওহীদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ‘ইহসান’, যার মাধ্যমে মুমিন তার হৃদয়ের সুস্থতা অটুট রাখতে পারে। আর এই বুদ্ধিমত্তা একদিনেই অর্জিত হয় না, বরং প্রয়োজন হয় অবিরাম চর্চা ও পরিচর্যার কঠোর অনুশীলনের। যেমন : 

(১) নির্ভেজাল তাওহীদের চেতনা ও ইহসানের অনুভূতি জাগ্রত রাখা : তাওহীদের প্রতি পূর্ণ নিষ্ঠা, তাক্বদীরের প্রতি অগাধ বিশ্বাস এবং পার্থিব চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে উঠে একমাত্র মহান রববুল আলামীনকে সন্তুষ্ট করার মনমানসিকতা গড়ে তোলাই আত্মিক সুস্থতা অর্জনের মূল চাবিকাঠি। সেই সাথে প্রতিটি ভালো কাজ ও ইবাদতে ‘আল্লাহ আমাকে দেখছেন’ এই অনুভূতি বা ‘ইহসান’ সার্বক্ষণিক জাগিয়ে রাখতে হয়, যা তাকে রিয়া বা লোকদেখানো আমল ত্যাগ করে একমাত্র মহান রববুল আলামীনের সন্তুষ্টি অর্জনে উদ্বুদ্ধ করে। এই চর্চা অব্যাহত রাখতে প্রতিটি কাজে নিজেকে জিজ্ঞাসা করা উচিৎ যে, কাজটি কেন করছি? এতে কি আল্লাহ খুশী হবেন না অন্য কেউ? এভাবে নিজের অবস্থান নিজের কাছে পরিষ্কার রাখতে পারাই SQ বা আধ্যাত্মিক বুদ্ধিমত্তার অর্জনের সবচেয়ে বড় উপায়। আর এই ‘ইহসান’-এর সাথেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে ‘তাযকিয়াতুন নাফস’ (আত্মশুদ্ধি), ‘তাক্বওয়া’ (আল্লাহভীতি) এবং অন্তরের জাগ্রত দৃষ্টি বা ‘বাছীরাত’।

(২) ‘তাক্বওয়া’ ও ‘তাওয়াক্কুল’-এর অনুভূতি সদা সচল রাখা : অন্যায় ও পাপাচার থেকে বাঁচতে অন্তরে ‘তাক্বওয়া’ বা আল্লাহভীতির সুইচ যেমন সবসময় অন (On) রাখতে হয়, তেমনি জীবনের যে কোন পদক্ষেপে সর্বোচ্চ চেষ্টার পর ফলাফলের জন্য একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা বা ‘তাওয়াক্কুল’-এর শক্তিকে সক্রিয় রাখতে হবে। এই দুই ব্যবস্থার সমন্বয় ঘটলে অন্তরে কোন হতাশা বা অহেতুক মানসিক চাপ স্থান পেতে পারে না।

(৩) জীবনের মুহূর্তগুলোকে ছবর ও শুকরিয়ায় আলোকিত করা : মুমিনের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই এক একটি পরীক্ষা। সুখ ও সাফল্য লাভ করলে অহংকার না করে বিনীত ‘শুকরিয়া’ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাকে যেমন অভ্যাসে পরিণত করতে হয়, তেমনই দুঃখ, বিপদে ‘ছবর’ বা ধৈর্যের মাধ্যমে প্রতিকূল পরিস্থিতিকে বরণ করে নেওয়ার নিত্য চেষ্টা রাখতে হয়। আর এটাই হ’ল প্রকৃত আত্মিক বুদ্ধিমত্তা। মানবীয় আবেগের অবাধ বিচরণ আর শয়তানী প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে এটা মুমিনের জন্য সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। রাসুলুল্লাহ (ছাঃ) কত হৃদয়গ্রাহী ভাষাতেই না বলেছেন, ‘মুমিনের বিষয়টাই চমৎকার! তার সব অবস্থাই কল্যাণকর... সুখে সে শুকরিয়া আদায় করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়; আর দুঃখে সে ছবর করে, ফলে তাও তার জন্য কল্যাণকর হয়’ (মুসলিম হা/২৯৯৯)।

(৪) ইস্তিকামাত বা অন্যায় ও পাপাচারের বিরুদ্ধে দৃঢ়চিত্ততা : ইসলামের স্পিরিচুয়াল ইন্টেলিজেন্স কোন নিষ্ক্রিয় বৈরাগ্যবাদ নয়। বরং অন্তরের এক বলিষ্ঠ তেজ ও বাছীরাত, যা মুমিনকে যেকোন অন্যায়, পাপাচার ও ফিৎনার বিরুদ্ধে আপসহীন ও দৃঢ়চিত্ত অবস্থান নিতে সাহস যোগায়। সত্যের পক্ষে ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সটান দাঁড়িয়ে যেতে পারাই হয়ে ওঠে তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।

(৫) মুহাসাবাহ বা নিয়মিত আত্মপর্যালোচনা : শরীরকে ফিট রাখতে যেমন প্রতিদিন সুষম খাদ্য ও দৈহিক কসরত প্রয়োজন, তেমনি আত্মাকে সুস্থ রাখতে নিয়মিত দ্বীনী চর্চা এবং প্রতিদিন নিজের আমল ও চিন্তাকে মুহাসাবা করা, সব কাজকে আল্লাহর দেয়া মানদন্ডে পরখ করতে হয়। শারীরিক জিমের মত প্রতিদিন কুরআন ও ছহীহ হাদীছের চর্চার মাধ্যমে অন্তরের খরা দূর করা, নিজেকে প্রতিনিয়ত আত্মপর্যালোচনার মুখোমুখি করা এবং কোন ক্ষেত্রে ভুল করা মাত্র তওবা করে রবের দিকে ফিরে আসার নামই আত্মিক বুদ্ধিমত্তা।

সর্বোপরি তাওহীদী আক্বীদায় পরিপুষ্ট, ইহসানের আলোয় আলোকিত ও সুন্নাহর ছাঁচে গঠিত খাঁটি ঈমান, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে ‘ইহসান’-এর চেতনা নিয়ে রবের কাছে আত্মসমর্পণ এবং তাওহীদী ‘বাছীরাত’ দিয়ে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে চিরন্তন আখেরাতের পাথেয় সঞ্চয় করার নামই প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা।

আজকের এই বৈষয়িক ও প্রযুক্তিনির্ভর আলোঝলমলে দুনিয়ায় আমরা যদি কেবল প্রযুক্তিজ্ঞান, বৈষয়িক জাঁকজমক আর ডিগ্রি-সার্টিফিকেটের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে জীবন পরিমাপ করি, তবে শেষ বিচারের দিনে আমাদের হিসাবের খাতা শূন্যই থেকে যাবে।

অতএব আসুন, আমরা আমাদের চিন্তাজগত ও কর্মকান্ডকে অহি-র আলোয় নতুন করে সাজাই। প্রতিদিনের ছোট-বড় পরীক্ষায় ছবর ও শুকরিয়ার হাতিয়ার নিয়ে অবতীর্ণ হই। অন্যায়ের সামনে অকুতোভয় থেকে, তাক্বওয়া ও তাওয়াক্কুলের ডিভাইসগুলো সক্রিয় রাখি। আল্লাহ রববুল আলামীন আমাদের সকলকে তাওহীদী বাছীরাত ও ইহসানভিত্তিক আধ্যাত্মিক বুদ্ধিমত্তা অর্জন করার তাওফীক দান করুন এবং আমাদের অন্তরগুলোকে সত্য ও ন্যায়ের উপর অবিচল রাখুন। আমীন!



বিষয়সমূহ: আমল বিধি-বিধান পাপ
আরও