দাদীর ভালোবাসা
তাওহীদের ডাক ডেস্ক
সেটি ছিল এক বরকতময় পবিত্র রামাযান মাস। একদিন আমার কফিল (স্পনসর) সিদ্ধান্ত নিলেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তিনি তার অর্জিত সম্পদের যাকাত প্রকৃত হকদারদের নিকট নিজ হাতে বিতরণ করবেন। ভালোবাসার টানে পরম আদরে আমাকেও তিনি তার সফর সঙ্গী করে নিলেন।
আমাদের গাড়িতে সুবিন্যস্তভাবে সাজানো ছিল সাদা কাগজের অতি সাধারণ খাম। যার প্রতিটিতে ছিল পাঁচ হাযার রিয়াল। আমরা কোলাহলময় শহর ছেড়ে দূর উপকূলীয় অঞ্চলের গ্রামগুলোর দিকে রওনা হলাম। যেখানকার ধূসর মেঠোপথে দারির্দ্রের ছাপ স্পষ্ট। আর অভাব যেখানে নিত্য দিনের সঙ্গী।
গ্রামের অসংখ্য অভাবী ও অসহায় মানুষের মলিন মুখে খুশির সামান্য হাসি ফুটিয়ে যখন আমরা জেদ্দা-যাজান মহাসড়কে উঠলাম, তখন দুপুরের প্রখর সূর্য আকাশের একদম কেন্দ্রে এসে আগুন ঝরাচ্ছিল। মাথার ওপর খা খা রোদের তীব্র দাবদাহ। আর চোখের সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত মরুভূমির তপ্ত, ধূলি ধূসরিত বালুকারাশি।
হঠাৎ বহুদূরে আমাদের চোখে এক অবিশ্বাস্য ও হৃদয়বিদারক দৃশ্য পড়ল। জনমানবহীন সেই তপ্ত মহাসড়কের ওপর দিয়ে এক বৃদ্ধ একা হেঁটে চলছেন। বয়স দেখে মনে হচ্ছিল সত্তরের কোঠা ছাড়িয়েছে বহু আগেই। গায়ের চামড়ায় ভাজ পড়েছে। তার গায়ে ধুলোমাখা এক জীর্ণ জুববা, মাথায় একটি সাধারণ রুমাল জড়ানো।
আমার কফিল বিস্ময়ে গাড়ির কাচ নামিয়ে বললেন, ‘সুবহানাল্লাহ! এই আগুনে পোড়া প্রখর মরুভূমিতে এমন বৃদ্ধ লোকটা একা একা কোথায় হেঁটে যাচ্ছেন? কোনো গাড়ি নেই, সঙ্গে কেউ নেই! আমাদের ড্রাইভার একটু মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে বলল, নিশ্চয়ই কোনো ইয়েমেনী ভাই! সীমানা পেরিয়ে হয়তো আইনী কাগজপত্র ছাড়া অবৈধ পথ ধরে এসেছে।
আমরা গাড়িটা আস্তে করে তার পাশে এনে থামালাম। দরজার কাচ নামিয়ে নিচে নেমে বৃদ্ধের মুখোমুখি হলাম। রোদের তাপে তার ঠোট দু’টি শুকিয়ে ফেটে রক্ত জমে গেছে। মুখমন্ডল ঘেমে রোদে তামাটে হয়ে উঠেছে। পরম শ্রদ্ধায় সালাম জানালাম, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ! হে শেখ, এত প্রখর রোদে মরুভূমির মধ্যে আপনি কোথা থেকে হেঁটে আসছেন?
বৃদ্ধ থমকে দাঁড়িয়ে জীর্ণ জুববা একটু গুছিয়ে প্রশান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহ। আমি সুদূর ইয়েমেন সীমান্ত থেকে হেঁটে আসছি’।
আমরা ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, এই তীব্র আগুনে পোড়া মরুভূমিতে আপনি কোথায় যাচ্ছেন? ক্লান্তি ও বয়সের ভারে নুয়ে পড়া চোখ দু’টি হঠাৎ টলমল করে উঠল। তিনি কাপতে থাকা হাত দু’টি আসমানের দিকে তুলে পরম আকুতিতে বললেন, আমি যাচ্ছি আমার মনিবের ঘর মক্কায়। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বাইতুল্লাহর একটু দর্শন পেতে, আমার রবের সামনে দাঁড়িয়ে একটিবার ওমরাহ করতে!
আমরা বিস্ময় চেপে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম, কিন্তু শেখ, আপনি কি আইনী কোনো নথিপত্র, ভিসা বা পাসপোর্ট নিয়ে সীমান্ত পার হয়েছেন?
বৃদ্ধ এক মলিন হাসি হেসে বললেন, বাবা! আমার মতো নিঃস্ব, হতদরিদ্র মানুষের কাছে এত টাকা কোথায় থাকবে? আইনী পথে রাজকীয় প্রবেশের জন্য যে সীমান্তে দুই হাযার রিয়াল যামানত দিতে হয়! আমার সারা জীবনের জমা সম্বল ছিল মাত্র দুইশ রিয়াল। তার মধ্যে একশ রিয়াল তো সীমান্ত পর্যন্ত আসার যাতায়াত ভাড়াতেই শেষ হয়ে গেছে। আর বাকি আছে মাত্র একশ রিয়াল। সেই একশ রিয়াল সম্বল নিয়েই আমি আমার রবের উপর ভরসা করে পায়ে হেঁটে যাত্রা শুরু করেছি।
আমার কফিল ছাহেব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, পায়ে হেঁটে এত পথ! আপনি কতদিন ধরে এভাবে এই মরুভূমিতে হাঁটছেন? বৃদ্ধ একদম শান্ত ও অবিচল কণ্ঠে উত্তর দিলেন, আজ ছয় দিন হ’ল। দিন-রাত একটানা হেঁটে চলেছি।
মরুভূমির এই নির্মম তপ্ত আবহাওয়া, তৃষ্ণায় বুক ফেটে চৌচির হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা! বাতাসের প্রতিটি ঝাপটা যেন আগুনের ছ্যাকা লাগছিল। আমাদের ড্রাইভার নিজের আকুলতা সামলাতে না পেরে বলে উঠল, আজকে তো পবিত্র রামাযান মাস! এত কঠিন সফরে আপনি কি ছিয়াম আছেন? বৃদ্ধ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, হ্যাঁ, আলহামদুলিল্লাহ! আমি ছিয়াম আছি। রবের ঘরে যাচ্ছি, তার ফরয ইবাদত ছেড়ে দিয়ে কীভাবে যাই?
কথাটি শুনে আমাদের বুকের ভেতরটা যেন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। প্রচন্ড রোদের দাবদাহ, ক্ষুধা-তৃষ্ণার তীব্র যাতনা আর দীর্ঘ ছয় দিনের অবিরাম হেঁটে চলার ক্লান্তিত। এর মাঝেও একজন সত্তোরোর্ধ্ব বৃদ্ধ ছিয়াম ভাঙেনি! ঈমানের কী অপরিসীম জোর!
আমরা জিজ্ঞেস করলাম, কিন্তু হাইওয়ের এতগুলো কড়া চেকপয়েন্ট, পুলিশ ও নিরাপত্তা রক্ষীদের চোখ এড়িয়ে সীমান্ত থেকে এত দূর আসলেন কীভাবে? তারা আপনাকে গ্রেফতার করল না?
বৃদ্ধ বললেন, সেই রবের কসম, যিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই! আমি প্রত্যেকটি চেকপয়েন্টের ঠিক পাশ দিয়েই হেঁটে গেছি। কিন্তু আল্লাহর কী কুদরত, কেউ আমাকে একটা বারের জন্যও থামায়নি! যেন আসমানের মালিক আমাকে তাদের চোখে অদৃশ্য করে রেখেছিলেন!
তিনি আরও যোগ করলেন, হ্যাঁ, কিছুক্ষণ আগে পুলিশের একটা টহল গাড়ি এসে আমাকে ধরে থানায় নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমি যখন কেঁদে কেঁদে তাদের বললাম, আমার কোনো পার্থিব উদ্দেশ্য নেই, আমি শুধু আমার রবের গৃহ বায়তুল্লাহ যিয়ারত করতে চাই। তখন পুলিশ অফিসাররাও কেঁদে ফেলল এবং আমাকে এ পথেই ছেড়ে দিল।
বৃদ্ধের মুখে এই কথাগুলো শুনে আমাদের শরীরের লোম খাড়া হয়ে গেল। চোখে পানি এসে গেল। আক্ষরিক অর্থেই আমাদের হৃদয় থরথর করে কেঁপে উঠল। সুবহানাল্লাহ! যে বান্দা কেবল আল্লাহর তাওয়াক্কুল আকড়ে ধরে ঘর ছেড়েছে, আসমান ও যমীন যেন তার সেবায় নিয়োজিত হয়ে গেছে!
আমার কফিল ছাহেব আর নিজের ভেতরের আবেগ সামলাতে পারলেন না। তিনি কোনো কিছু না ভেবেই তড়িঘড়ি করে গাড়ির ভেতর থেকে যাকাতের দু’টি খাম এনে বৃদ্ধের হাতে দিলেন। বৃদ্ধ খাম দু’টি হাতে নিয়ে ধন্যবাদের এক স্মিত হাসি উপহার দিলেন। কিন্তু তিনি বিন্দুমাত্র বুঝতে পারেননি যে, সেই সাধারণ সাদা কাগজের খামের ভেতর পরম করুণাময় তার জন্য কী রেখেছেন!
আমি দ্রুত সামনে এগিয়ে গিয়ে আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে বললাম, শেখ! খাম দু’টি খুলে টাকাগুলো সাবধানে আপনার পকেটে গচ্ছিত রাখুন। বৃদ্ধ ধীরে ধীরে তার খাম দু’টি খুলেই ভেতরে থরে থরে সাজানো চকচকে রিয়ালের বান্ডিল দেখতে পেলেন। সব মিলিয়ে মোট দশ হাযার রিয়াল!
মুহূর্তের মধ্যে যেন এক পরম আনন্দের ঝড় বয়ে গেল তার উপর। অত বড় অঙ্কের অর্থ দেখে পরম বিস্ময়ে তিনি নিজের ভারসাম্য হারিয়ে সোজা গাড়ির সিটের ওপর গড়িয়ে পড়লেন। তার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে অশ্রুর ধারা নামল। থরথর করে কাঁপতে থাকা ঠোট থেকে কেবল অস্ফুট আকুতি বের হচ্ছিল, এসব কি আমার জন্য? হে আমার দয়াময় আল্লাহ! এত টাকা! এ সব আমার মতো এক অধমের জন্য!
আমরা তার মাথায় ও মুখে ঠান্ডা পানির ছিটা দিলাম। কিছুক্ষণ পর যখন তিনি একটু ধীরস্থির হলেন, হুঁশ ফিরে পেয়ে দুই হাত বুকে চেপে অঝোর ধারায় কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ভাইয়েরা আমার, ইয়েমেনে আমার ছোট্ট একটি জীর্ণ কুটির ছাড়া আর কিছুই নেই। তার পাশেই ছিল একচিলতে অনাবাদী জমি। আমি আমার জীবনের শেষ সম্বলটুকু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ওয়াক্বফ করে দিয়েছিলাম। সেখানে আমি আর আমার ছেলেমেয়েদের নিয়ে নিজেদের হাত দিয়ে একটা ছোট্ট মসজিদ তৈরি শুরু করেছিলাম। দেয়াল আর ছাদটুকু কোনোমতে তৈরি হয়েছে, কিন্তু মেঝের সিমেন্ট, চট আর লাইট-ফ্যানের মতো প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার একটা রিয়ালও আমার কাছে ছিল না... আমি শেষ রাতে সিজদায় পড়ে কেবল কাঁদতে কাঁদতে বলতাম, ইয়া রব! তোমার ঘরের কাজ তো বাকী আছে, টাকা কোথা থেকে আসবে? আজ আমার রব আপনাদের মাধ্যমে আমার সেই সিজদার কান্নার জবাব পাঠিয়ে দিয়েছেন!
বৃদ্ধের মুখের এই পরম সত্যটি শোনামাত্রই গাড়ির ভেতরে থাকা আমরা তিনজন মানুষ আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। আমাদের সবার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। গাড়ির দরজা খোলা থাকায় বাহির থেকে ভেতরে আসা তপ্ত আবহাওয়া তখন যেন জান্নাতি স্নিগ্ধতায় ভরে গেল। আমাদের হৃদয়ে ভেসে উঠল বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (ছাঃ)-এর সেই অমর ও চিরন্তন হাদীছ, যার লক্ষ্য হয় আখিরাত, আল্লাহ তার অন্তরে স্বচ্ছলতা (তৃপ্তি) দান করেন। তার ছন্নছাড়া কাজগুলোকে সুবিন্যস্ত করে দেন এবং দুনিয়া তার কাছে বাধ্য হয়ে আগমন করে। আর যার চিন্তা হয় শুধুই দুনিয়া, আল্লাহ তার দারিদ্রকে তার দুই চোখের সামনে এনে দেন, তার কাজগুলোকে বিক্ষিপ্ত করে দেন এবং দুনিয়া থেকে সে ততটুকুই পায়, যতটুকু তার ভাগ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে’ (তিরমিযী হা/২৪৬৫)।
আমার কফিল চোখ থেকে টপটপ করে পানি ফেলতে ফেলতে আমাকে আবার ইশারা করলেন। আমি গাড়ির ভেতর থেকে আরও দু’টি খাম এনে বৃদ্ধের হাতে দিলাম। সব মিলিয়ে এখন বৃদ্ধের হাতে জমা হ’ল বিশ হাযার রিয়াল!
বৃদ্ধের চোখের অশ্রুধারা তখন কোনো বাধা মানছিল না। তিনি হাত দু’টি আসমানের দিকে তুলে আমাদের জন্য, আমাদের পিতামাতার জন্য এবং আমাদের সন্তানের জন্য একের পর এক হৃদয়স্পর্শী দো‘আ করতে লাগলেন।
সেই মুহূর্তে মরুভূমির তপ্ত হাওয়ায় যেন আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর বাণী আমাদের কানে কানে গুঞ্জরিত হচ্ছিল,لَوْأَنَّكُمْكُنْتُمْتَوَكَّلُونَعَلَىاللهِحَقَّتَوَكُّلِهِلَرُزِقْتُمْكَمَايُرْزَقُالطَّيْرُتَغْدُوخِمَاصًاوَتَرُوحُبِطَانًا-‘তোমরা যদি আল্লাহর উপর সঠিকভাবে তাওয়াক্কুল করতে, তবে তিনি তোমাদেরকে ঠিক তেমনভাবেই রিযিক দান করতেন, যেমনটা পাখিদের দিয়ে থাকেন। যাদের সকালে খালি পেটে বাসা থেকে বের করে দেন। আর সন্ধ্যায় পূর্ণ পেটে নীড়ে ফিরিয়ে আনেন’ (তিরমিযী হা/২৩৪৪)।
মরুভূমির সেই ধূলিমলিন নিঃসঙ্গ পথে দাঁড়িয়ে সেদিন আমরা চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করেছিলাম, ঈমান কোনো কাল্পনিক রূপকথা নয়। যে বান্দা দুনিয়ার সমস্ত জাগতিক হিসাব-নিকাশ, ভয় ও অহংকার দূরে ঠেলে সম্পূর্ণ খালি হাতে অকৃত্রিম তাওয়াক্কুল নিয়ে আল্লাহর দুয়ারে এসে দাঁড়ায়, আরশের মালিক তার জন্য বন্ধ সমস্ত রুদ্ধ পথ ও আসমানের রহমতের দরজা অলৌকিকভাবে খুলে দেন। বৃদ্ধ উমরাহ পালন করতে মক্কায় পৌঁছাতে পেরেছিলেন কি না, তা আমাদের জানা নেই; কিন্তু সেই মরুভূমিতেই তিনি পরম করুণাময় আল্লাহর কৃপা পেয়ে গিয়েছিলেন।
আল্লাহ আমাদের সকলকে এমন অবিচল ঈমান, পূর্ণ তাওয়াক্কুল এবং তার পথে নিঃস্বার্থভাবে বিলিয়ে দেওয়ার পরম সৌভাগ্য ও তাওফীক দান করুন- আমীন!
[সংকলিত ও পারিমার্জিত]