আবুবকর ছিদ্দীক (রাঃ)-এর জীবনকর্ম ও খিলাফতকাল (২য় কিস্তি)

শরীফ হোসাইন 4 বার পঠিত

ইসলামের সাহায্যে অর্থ-সম্পদ ব্যয় : আবুবকর (রাঃ)-এর অর্থ ব্যয় নবী করীম (ছাঃ)-এর ব্যক্তিগত খাবার কিংবা পোশাক-পরিচ্ছদের পেছনে ছিল না। কারণ আল্লাহ তার নবীকে সমস্ত সৃষ্টির সম্পদ থেকে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী ও ধনী করেছিলেন। বরং তার এই অর্থ ব্যয় ছিল দ্বীন ও ঈমান প্রতিষ্ঠার কাজে নবীজিকে সাহায্য করার জন্য। এজন্য ইসলামের প্রারম্ভিক যুগ থেকেই তার অর্থ ব্যয় ছিল মূলত সেই সমস্ত মুমিনদের মুক্ত করার পিছনে, যাদেরকে কাফেররা অমানুষিক নির্যাতন করত কিংবা হত্যা করতে চাইত। যেমন তিনি এমন সাতজন দাস-দাসীকে কিনে মুক্ত করেছিলেন, যাদেরকে আল্লাহর রাস্তায় চলার কারণে শাস্তি দেওয়া হ’ত। যেমন বেলাল, আমের বিন ফুহাইরাহ, যান্নিরাহ, আন-নাহদিয়াহ ও তার কন্যা, বনু মুআম্মিল গোত্রের দাসী এবং উম্মু উবাইসকে মুক্ত করেছিলেন।[1] আবুবকরের এই অবদানের গভীরতা দেখেই পরবর্তীতে ওমর (রাঃ) বলতেন, আবুবকর হলেন আমাদের নেতা এবং তিনি আমাদের নেতাকে (বেলালকে) মুক্ত করেছেন’।[2]

আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেছেন, আমাদের উপর যারই কোন অবদান ছিল, আমরা তার উপযুক্ত প্রতিদান দিয়ে দিয়েছি, শুধু আবুবকর ব্যতীত। নিশ্চয়ই আমার উপর তার এমন অবদান রয়েছে, যার প্রতিদান ক্বিয়ামতের দিন স্বয়ং আল্লাহ তাকে দিবেন। আর কোন সম্পদই আমাকে কখনো সেই পরিমাণ উপকার করেনি, যে পরিমাণ উপকার আবুবকরের সম্পদ আমাকে করেছে। আর আমি যদি কাউকে আমার খলীল (অকৃত্রিম বন্ধু) হিসাবে গ্রহণ করতাম, তবে আবুবকরকেই খলীল হিসাবে গ্রহণ করতাম’।[3]

এবিষয়ে একদিন তাঁর পিতা আবু কুহাফা তাকে বলেন, বেটা! আমি দেখছি তুমি যত দুর্বল দাস-দাসী মুক্ত করছ। যদি তুমি শক্তিশালী ও সাহসী কিছু লোককে মুক্ত করতে, তাহ’লে তারা তোমাকে রক্ষা করত এবং তোমার পক্ষে যুদ্ধ করত! জবাবে আবুবকর বলেন, হে পিতা! আমি তো কেবল আল্লাহর জন্যই এগুলি করেছি। অতঃপর তাঁর সম্পর্কে ‘সূরা লায়েল’ নাযিল হয়।[4]

ওমর (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদের ছাদাক্বা করার নির্দেশ দিলেন। আমি মনে মনে ভাবলাম, আজ যদি আমি আবুবকরকে কোন কাজে ছাড়িয়ে যেতে পারি, তবে আজই সেই দিন! ফলে আমি আমার অর্ধেক সম্পদ নিয়ে এলাম। তখন নবী করীম (ছাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, তোমার পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছ? আমি বললাম, অনুরূপ অর্ধেক সম্পদ রেখে এসেছি। আর আবুবকর (রাঃ) তার কাছে যা কিছু ছিল, তার সবটুকু নিয়ে হাযির হলেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবুবকর! তোমার পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছ? তিনি উত্তরে বললেন, তাদের জন্য আল্লাহ ও তার রাসূলকে রেখে এসেছি। আমি মনে মনে বললাম, আমি কখনোই কোন বিষয়ে তার সাথে প্রতিযোগিতা করে জিততে পারব না’।[5] 

উল্লেখ্য যে, রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে হিজরতের সময় তিনি তার সাথে থাকা সমস্ত অর্থ-কড়ি সঙ্গে নিয়ে যান। পরবর্তীতে তার বৃদ্ধ বাবা আবু কুহাফা ঘরে এসে জিজ্ঞেস করলেন, আবুবকর কি তার ধন-সম্পদ তোমাদের জন্য রেখে গেছে, নাকি সবই সাথে নিয়ে গেছে? আসমা (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, তিনি আমাদের জন্য প্রচুর সম্পদ রেখে গেছেন! এরপর আমি দেয়ালের কুঠুরিতে কিছু পাথর রেখে তা কাপড় দিয়ে ঢেকে দিলাম এবং বললাম, এই সম্পদ তিনি আমাদের জন্য রেখে গেছেন। মূলত বৃদ্ধ বাবার মনকে আশ্বস্ত করার জন্যই আমি এটা করেছিলাম, যাতে তিনি ভাবেন যে আবুবকর তার পরিবারকে খালি হাতে রেখে যাননি। আর আবু কুহাফাও তাদের কাছ থেকে কিছুই দাবি করেননি’।[6]

মদীনায় হিজরতে রাসূল (ছাঃ)-এর সহচার্য লাভ : হিজরতের সফরে আবুবকর (রাঃ) যে অনন্য মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছিলেন, তা অন্য কোন ছাহাবীর ভাগ্যে জোটেনি। ফলে ওমর, ওছমান ও আলী (রাঃ) সহ অন্য সমস্ত ছাহাবীর উপর তার এই একক শ্রেষ্ঠত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত। আর তার স্বীকৃতি স্বরূপ আল্লাহ আয়াত নাযিল করলেন,إِلَّا تَنْصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللهُ إِذْ أَخْرَجَهُ الَّذِينَ كَفَرُوا ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ... ‘যদি তোমরা তাকে (রাসূলকে) সাহায্য না কর, তবে মনে রেখ আল্লাহ তাকে সাহায্য করেছিলেন যখন তাকে কাফেররা (মক্কা থেকে) বের করে দিয়েছিল এবং সে ছিল (ছওর) গিরিগুহার মধ্যে দু’জনের একজন... (তাওবাহ ৯/ ৪০)

যখন মুশরিকরা নবী করীম (ছাঃ)-কে হত্যা, বন্দি কিংবা নির্বাসিত করার চক্রান্ত করল, তখন তিনি তাদের হাত থেকে বেঁচে মক্কা থেকে বের হয়ে যান। এই যাত্রায় তার সাথে ছিলেন তার পরম সুহৃদ ও সঙ্গী আবুবকর (রাঃ)। তারা মক্কার সওর গুহায় তিন দিন আত্মগোপন করে রইলেন, যেন তাদের খোঁজে বের হওয়া অনুসন্ধানকারীরা মক্কায় ফিরে গেলে তারা মদীনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে পারেন। গুহার ভেতরে অবস্থানকালে আবুবকর (রাঃ) এই ভয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছিলেন যে মুশরিকরা যদি কোনোভাবে তাদের দেখে ফেলে, তবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ক্ষতি সাধন করবে। আর এরই প্রেক্ষিতে উপরোক্ত আয়াতটি নাযিল। ফলে নবী করীম (ছাঃ) তাকে আশ্বস্ত ও শান্ত করছিলেন এবং তার মনকে দৃঢ় করছিলেন।[7]

উল্লেখ্য যে, উক্ত আয়াতে আবুকবর ছিদ্দীক (রাঃ)-এর যে সমস্ত ফযীলত ও মর্যাদা প্রকাশ পেয়েছে, তা নিম্নে তুলে ধরা হ’ল-

(১) কাফেররা আবুবকরকেও বহিষ্কার করেছিল : যখন কাফেররা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে মক্কা থেকে বহিষ্কার করেছিল তিনি ছিলেন দু’জনের দ্বিতীয়জন (ثَانِيَ اثْنَيْنِ)। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তারা তাদের উভয়কেই মক্কা থেকে একসাথে বহিষ্কার করেছিল। মূলত কাফেররা সমস্ত মুহাজিরদের মক্কা থেকে বের হ’তে বাধ্য করত। যেমনটি আল্লাহ বলেন,لِلْفُقَرَاءِ الْمُهَاجِرِينَ الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ، ‘(ফাই-এর সম্পদ) অভাবগ্রস্ত মুহাজিরদের জন্য। যারা তাদের ঘর-বাড়ি ও মাল-সম্পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে’ (হাশর ৫৯/৮)

আল্লাহ আরও এরশাদ করেন,أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا وَإِنَّ اللهَ عَلَى نَصْرِهِمْ لَقَدِيرٌ- الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ بِغَيْرِ حَقٍّ إِلَّا أَنْ يَقُولُوا رَبُّنَا اللهُ، ‘যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হ’ল তাদেরকে, যারা আক্রান্ত হয়েছে। কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করতে সক্ষম’। ‘যারা তাদের ঘর-বাড়ী থেকে অন্যায়ভাবে বহিষ্কৃত হয়েছে এজন্য যে, তারা বলে আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ’ (হজ্জ ২২/৩৯-৪০)

কারণ, কাফেররা ছাহাবীদের ঈমান বহাল রেখে মক্কায় শান্তিতে বসবাস করতে বাধা সৃষ্টি করেছিল। আর ছাহাবীদের পক্ষে ঈমান ত্যাগ করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। অতএব, তারা যেহেতু মুমিন ছিলেন, তাই কাফেররা নানা নির্যাতন ও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে তাদের মক্কা থেকে বের করে দিয়েছিল। আর এরই প্রেক্ষিতে তাদের হিজরত ছিল।[8]

(২) গুহার অভ্যন্তরে রাসূলের সাহচর্য : পবিত্র কুরআনের অকাট্য বাণী দ্বারা সওর গুহায় আবুবকর (রাঃ)-এর অনন্য মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব অত্যন্ত সুপষ্টভাবে প্রমাণিত। আনাস (রাঃ)-এর সূত্রে আবুবকর ছিদ্দীক (রাঃ) হ’তে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমরা যখন গুহার ভেতরে ছিলাম, তখন আমি আমাদের মাথার ওপর মুশরিকদের পায়ের পাতাগুলো দেখতে পেলাম। আমি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! তাদের কেউ যদি নিজের পায়ের পাতার দিকে তাকায়, তবেই আমাদের দেখে ফেলবে। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, يَا أَبَا بَكْرٍ مَا ظَنُّكَ بِاثْنَيْنِ؟ اللهُ ثَالِثُهُمَا ‘হে আবুবকর! সেই দু’জনের ব্যাপারে তোমার ধারণা কী, যাদের তৃতীয়জন হলেন স্বয়ং আল্লাহ?[9]

অন্য বর্ণনায় এসেছে, আমি গুহায় নবী (ছাঃ)-এর সাথে ছিলাম, তখন মুশরিকদের পদচিহ্ন দেখতে পেয়ে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! তাদের কেউ যদি তার পা কিছুটা উপরে তোলে, তবেই আমাদের দেখে ফেলবে। তিনি বললেন, ‘সেই দুজনের ব্যাপারে তোমার ধারণা কী, যাদের তৃতীয়জন হলেন আল্লাহ।[10] 

(৪) তিনি ছিলেন নবীজির চিরন্তন ও শর্তহীন সঙ্গী : পবিত্র কুরআনের এই বাণী যখন সে তার সঙ্গীকে বলছিল,(إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ)। কেবল সওর গুহার সাময়িক সাহচর্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তিনি ছিলেন নবী করীম (ছাঃ) এমন এক চিরন্তন ও শর্তহীন সঙ্গী, যিনি সাহচর্যের ক্ষেত্রে এমন এক পূর্ণতা লাভ করেছিলেন যার অংশীদার অন্য কেউ হ’তে পারেনি। ফলে তিনি সাহচর্যের সর্বোচ্চ ও শ্রেষ্ঠ স্তরে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। যাতে কোন দ্বিমত বা বিতর্ক নেই। যেমনটি ইমাম বুখারী (রহঃ) আবু দারদা (রাঃ)-এর সূত্রে নবী করীম (ছাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, যেখানে নবী করীম (ছাঃ) বলেছিলেন, তোমরা কি আমার খাতিরে আমার সঙ্গীকে একটু রেহাই দেবে না? এই হাদীছ দ্বারা সুষ্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, অন্য সবাইকে ছাহাবী বা সঙ্গী হিসাবে গণ্য করা সত্ত্বেও নবী করীম (ছাঃ) আবুবকর (রাঃ)-কে একটি বিশেষ এবং অনন্য সাধারণ মর্যাদা দিয়েছিলেন; কারণ তিনি সাহচর্যের পূর্ণতার দিক থেকে ছিলেন অনন্য। আর এই কারণেই ওলামায়ে কেরামদের মধ্য থেকে অনেকেই বলেছেন, আবুবকরের মধ্যে এমন কিছু অনন্য গুণ ও বৈশিষ্ট্যসমূহ ছিল, যার অংশীদার বা সমকক্ষ অন্য কেউ নন’।[11]

৫. তিনি ছিলেন নবীজির প্রতি পরম সহানুভূতিশীল ও চিন্তিত: পবিত্র কুরআনের এই বাণী لاتَحْزَنْ ‘তুমি বিষণ্ণ হয়ো না’ কথার দ্বারা সুষ্পষ্ট প্রমাণ বহন করে যে, নবীজির সেই সঙ্গী তার প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল, গভীর ভালোবাসায় সিক্ত এবং তার পরম সাহায্যকারী ছিলেন। যার কারণে তিনি অত্যন্ত চিন্তিত ও বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিলেন। মানুষ সাধারণত ভয়ের মুহূর্তে কেবল তার প্রিয়জনের সুরক্ষার জন্যই এমন ব্যাকুল ও চিন্তিত হয়। আবুবকর (রাঃ)-এর এই ব্যাকুলতা ও চিন্তা ছিল স্বয়ং নবী করীম (ছাঃ)-এর জীবন রক্ষা এবং ইসলামের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে। এই কারণেই হিজরতের সফরে পথ চলার সময় তিনি কখনো নবীজির সামনে হাতেন, আবার কখনো তার পেছনে হাতেন। নবী করীম (ছাঃ) তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেছিলেন, যখন আমার ওঁৎ পেতে থাকা শত্রুর (গুপ্তঘাতক) কথা মনে পড়ে, তখন আপনার সামনে চলে আসি। আর যখন পেছন থেকে ধেয়ে আসা অনুসন্ধানকারীদের কথা মনে পড়ে, তখন আপনার পেছনে চলে যাই। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) শহীদ হবেন আর তিনি নিজে বেঁচে থাকবেন এমনটি তিনি ভাবতেও পারতেন না; বরং তিনি সর্বদা নিজের জান, মাল ও পরিবার দিয়ে নবীজিকে উৎসর্গ করতে উন্মুখ থাকতেন। বস্ত্তত প্রতিটি মুমিনের জন্যই এমন ভালোবাসা পোষণ করা ওয়াজিব, আর সিদ্দীকে আকবর (রাঃ) হলেন মুমিনদের মধ্যে এই দায়িত্ব সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গরূপে পালনকারী।[12]

(৬) নবীজির সাথে আল্লাহর বিশেষ নৈকট্য ও তাঁর সাহচর্যের অংশীদার: পবিত্র কুরআনের এই বাণী إِنَّ اللهَ مَعَنَا ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন’ এই কথার সুস্পষ্ট দলীল যে, নবী করীম (ছাঃ) এই বিশেষ আল্লাহভীতি ও নৈকট্যের মাঝে আবুবকর ছিদ্দীক (রাঃ)ও অংশীদার ছিলেন। যা সৃষ্টির আর কোন মানুষ লাভ করতে পারেনি। এই নৈকট্য ও সাথে থাকা নির্দেশ করে যে, আল্লাহ তা‘আলা শত্রুদের বিরুদ্ধে তাদের সাহায্য, সমর্থন ও সহযোগিতা করছিলেন। অর্থাৎ নবী করীম (ছাঃ) যেন বলছিলেন হে আবুবকর! আল্লাহ আমাকেও সাহায্য করবেন এবং তোমাকেও সাহায্য করবেন এবং আমাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে আমাদের জয়ী করবেন। এটি ছিল পরম সম্মান ও ভালোবাসার সাহায্য, যেমনটি মহান আল্লাহ এরশাদ করেছেন,إِنَّا لَنَنْصُرُ رُسُلَنَا وَالَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ يَقُومُ الْأَشْهَادُ- ‘আমরা অবশ্যই সাহায্য করব আমাদের রাসূলদের ও মুমিনদের, যেদিন দন্ডায়মান হবে সাক্ষীগণ’ (গাফির ৪০/৫১)

এটি আবুবকর (রাঃ)-এর জন্য প্রশংসার সর্বোচ্চ চূড়া। কারণ, এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে তিনি এমন এক ব্যক্তি যার ঈমানের সাক্ষ্য স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) দিয়েছেন, যা এমন এক সংকটময় মুহূর্তে আল্লাহর বিশেষ সাহায্য পাওয়ার দাবি রাখে, যখন সাধারণত আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত বান্দা ছাড়া বাকি সবাই হতাশ ও সহায়হীন হয়ে পড়ে। আর এই কারণেই সুফিয়ান ইবনু ওয়ায়নাহ (রহঃ) বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা তার নবীর অবমাননা বা পাশে না দাঁড়ানোর কারণে (উম্মতের) সমস্ত সৃষ্টিকে তিরস্কার করেছেন, একমাত্র আবুবকর ছাড়া। এমনকি ওলামায়ে কেরাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আবুবকর (রাঃ)-এর ছাহাবী হওয়াকে অস্বীকার করবে, সে কাফের হিসাবে গণ্য হবে। কারণ সে পবিত্র কুরআনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করল।

আবু কাসিম আল-সুহাইলীসহ একদল বিদ্বান বলেছেন, এই বিশেষ নৈকট্য ও মর্যাদা আবুবকর ছাড়া আর কারও জন্য প্রমাণিত নয়। ঠিক একইভাবে নবী করীম (ছাঃ) এই বাণী সেই দু’জনের ব্যাপারে তোমার ধারণা কী, যাদের তৃতীয়জন হলেন স্বয়ং আল্লাহ? এ শব্দ ও অর্থ উভয় দিক থেকেই তাদের অনন্য সাধারণ একক বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে। এই অনন্য বৈশিষ্ট্যের একটি বাস্তব প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায় নবী করীম (ছাঃ)-কে বলা হ’ত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ। যখন আবুবকর (রাঃ) খিলাফতের দায়িত্ব নিলেন, তখন মানুষ তাকে বলতে শুরু করল ‘খলীফাতু রাসূলিল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর রাসূলের প্রতিনিধি’। তারা খলীফা শব্দটিকে আল্লাহর রাসূলের সাথে সম্পৃক্ত করলেন, যিনি আবার স্বয়ং আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত। আর যা আল্লাহর রাসূলের সাথে সম্পর্কিত, তা মূলত আল্লাহর সাথেই সম্পর্কিত। কিন্তু যখন আবুবকরের পর ওমর (রাঃ) খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন, তখন মানুষ তাকে ‘আমীরুল মুমিনীন’ বা‘ মুমিনদের নেতা’ বলে সম্বোধন করতে শুরু করল। ফলে এই নামকরণের মাধ্যমে সেই বিশেষ সম্পর্কের ধারাবাহিকতাটি সমাপ্ত হ’ল। যা আবুবকর (রাঃ)-কে সমস্ত ছাহাবীর উপর অনন্য মর্যাদা দিয়েছিল’।[13] 

(৭) প্রশান্তি ও খোদাভীতিপূর্ণ সাহায্য নাযিল হওয়ার মুহূর্তেও তিনি ছিলেন নবীজির সঙ্গী : মহান আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেছেন, অতঃপর আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তার ওপর প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাকে এমন এক শক্তিশালী বাহিনী (ফেরেশতা) দ্বারা সাহায্য করলেন যা তোমরা দেখতে পাওনি... (তাওবাহ ৯/৪০)। যিনি চরম ও ভয়াবহ ভীতিপূর্ণ মুহূর্তে নবী করীম (ছাঃ) একান্ত সঙ্গী ছিলেন, সুখবর ও আল্লাহর বিশেষ সাহায্য-সমর্থন আসার মুহূর্তে তিনি তার সঙ্গী হওয়াাই সবচেয়ে বেশি যুক্তিযুক্ত ও স্বাভাবিক।

এই আনন্দ ও বিজয়ের মুহূর্তে তার সাহচর্যের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করার প্রয়োজন হয়নি; কারণ পূর্বাপর বক্তব্য ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিই তা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে। আর যখন এটি নিশ্চিতভাবে জানা গেল যে তিনি এই বিশেষ মুহূর্তেও নবী করীম (ছাঃ) সাথে ছিলেন, তখন এটিও সুষ্পষ্ট হয়ে যায় যে, মানুষের অলক্ষ্যে ফেরেশতা বাহিনী পাঠিয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ওপর যে বিশেষ প্রশান্তি ও ঐশ্বরিক সাহায্য নাযিল হয়েছিল, তার একটি মহিমান্বিত অংশ ও বরকত তার সেই মহান সঙ্গীও (আবুবকর) লাভ করেছিলেন, যা অন্য সাধারণ মানুষের ভাগ্যে জোটেনি। আর এটিই হ’ল পবিত্র কুরআনের অলঙ্কারশাস্ত্র (বালাগাত) এবং চমৎকার প্রকাশভঙ্গির এক অনন্য নিদর্শন’।[14]

ইবনুল কাইয়িম বলেন, ইবনু তায়মিয়াহ বলেছেন, আয়াতের তার উপর (عَلَيْهِ) সর্বনামটি মূলত নবী করীম (ছাঃ)-এর দিকে ফিরেছে এবং তার অনুগামী বা সঙ্গী হিসাবে আবুবকর (রাঃ)-ও এর অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। অর্থাৎ মূল প্রশান্তি ও সাহায্য স্বয়ং নবী করীম (ছাঃ) ওপরই নাযিল হয়েছিল এবং তার বরকতে ও পরোক্ষভাবে তা তার সঙ্গীর ওপরও ছড়িয়ে পড়েছিল’।[15]

[ক্রমশঃ]

শরীফ হোসাইন

[আরবী প্রভাষক, পাতারহাট ইসলামিয়া ফাযিল মাদ্রাসা, মেহেন্দিগঞ্জ, বরিশাল]

 

[1]. ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশক ৩০/৬৭; উসদুল গাবাহ ২/৩২৪ পৃ.।

[2]. হাকেম হা/৫২৪১ হাদীছ ছহীহ; আবু নাঈম ফিল হিলইয়া ১/১৪৭ পৃ.।

[3]. তিরমিযী হা/৩৬৬১; ছহীহুল জামে‘ হা/৫৬৬১।

[4]. ইবনু হিশাম ১/৩১৮-৩১৯ পৃ.।

[5]. আবুদাঊদ হা/১৬৭৮; তিরমিযী হা/৩৬৭৫।

[6]. মিনহাজুস সুন্নাহ ৮/৫৪২ পৃ.।

[7]. তাফসীর ইবনু কাছীর ২/৩৫৮ পৃ.।

[8]. মিনহাজুস সুন্নাহ ৪/৩৩, ২৬৬, ২৬৭ পৃ.।

[9]. মুসলিম হা/২৩৮১; মিশকাত হা/৫৮৬৮

[10]. বুখারী হা/৪৬৬৩; মিশকাত হা/৫৮৬৮, মিনহাজুস সুন্নাহ ৪/২৪০-২৪১।

[11]. মিনহাজুস সুন্নাহ ৪/২৪৫, ২৫২ পৃ.।

[12]. মিনহাজুস সুন্নাহ ৪/২৬২-২৬৩ পৃ.।

[13]. মিনহাজুস সুন্নাহ ৪/২৪২-২৪৩ পৃ.।

[14]. মিনহাজুস সুন্নাহ ৪/২৭২ পৃ.।

[15]. বাদাইউল ফাওয়াইদ, ৪/১১২।



আরও