ড. ভি আব্দুর রহীম
তাওহীদের ডাক ডেস্ক
তাওহীদের ডাক ডেস্ক 3 বার পঠিত
ড. মুহাম্মাদ তাকিউদ্দীন হেলালী একাধারে একজন বিশিষ্ট আলেম, মুহাদ্দিছ, ভাষাবিদ, কবি, সাহিত্যিক ও সালাফী পর্যটক ছিলেন। তিনি মূলত মরক্কোর অধিবাসী হ’লেও পরবর্তীতে ইরাকে বসবাস করেন। আবু শু‘আইব আদ-দুক্কালী ও মুহাম্মাদ ইবনুল ‘আরাবী আল-‘আলাওয়ীর পর তাকেই মরক্কোতে সালাফী দাওয়াতের অন্যতম কান্ডারী হিসাবে গণ্য করা হয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কর্মের মধ্যে রয়েছে ইংরেজী ভাষায় ছহীহ বুখারীর অনুবাদ ও মুহাম্মাদ মুহসিন খানের সঙ্গে যৌথভাবে পবিত্র কুরআনের ইংরেজী অনুবাদ সম্পাদন, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গ্রন্থাগারে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। তিনি ছিলেন অত্যন্ত কর্মঠ, জ্ঞানসমৃদ্ধ ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। আরব বিশ্ব, ভারত, সুইজারল্যান্ড ও জার্মানীতে দীর্ঘ ভ্রমণ, অধ্যাপনা এবং বিশ্ববরেণ্য আলেমদের সান্নিধ্য তাকে একজন সচেতন দাঈ ও প্রজ্ঞাবান সংস্কারকে পরিণত করে।
জন্ম ও পরিচয় : ড. মুহাম্মাদ তাকিউদ্দীন ১৩১১ হিজরী মোতাবেক ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে মরক্কোর সিজিলমাসা অঞ্চলের আল-ফারখ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার ছিল একটি প্রসিদ্ধ আলেম পরিবার। তাঁর পিতা ও দাদা উভয়ই খ্যাতিমান ফক্বীহ ও ইসলামী পন্ডিত ছিলেন। তার পূর্বপুরুষরা নবম হিজরী শতকে তিউনিসিয়ার কায়রাওয়ান থেকে মরক্কোর সিজিলমাসা অঞ্চলে হিজরত করেছিলেন। তার ঊর্ধ্বতন পূর্বপুরুষ হেলাল-এর দিকে সম্বন্ধযুক্ত করে তার নামের শেষে হেলালী যুক্ত করা হয়। বিবাহের পূর্বে তার কুনিয়াত ছিল আবু আবদুল্লাহ। পরে প্রথম পুত্র শাকীবের সঙ্গে সম্পর্কিত করে তাকে আবু শাকীব নামে অভিহিত করা হয়।
শিক্ষাজীবন : মুহাম্মাদ তাকিউদ্দীন পিতার কাছে শিক্ষার্জন শুরু করেন এবং মাত্র বারো বছর বয়সে কুরআন হিফয সম্পন্ন করেন। পনের বছর বয়সে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর পিতার মৃত্যুতে অভিভাবকহীন হয়ে তিনি বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে ঘুরে বেড়ান এবং অবশেষে জিয়ান অঞ্চলে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি মসজিদের ইমাম ও শিশুদের কুরআন শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ১৩৩৩ হিজরীতে মূলত জীবিকার সন্ধানে তিনি আলজেরিয়ায় যান। সেখানে শায়খ মুহাম্মাদ হাবীবুল্লাহ আশ-শানক্বীতীর নিকট সাত বছর অধ্যয়ন করেন। ১৩৩৮ হিজরীতে শায়খ শানক্বীতী ইন্তিকাল করেন।
অতঃপর ১৩৪০ হিজরীতে মরক্কো ফিরে এসে ফেজ শহরের বিভিন্ন আলেমের নিকট পড়াশোনা করেন। তার শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন শায়খ আল-ফাতিমী আশ-শারাওয়ী, শায়খ মুহাম্মদ আল-আরাবী আল-আলাওয়ী এবং শায়খ আহমাদ সুকাইরিজ। তিনি জামি‘উল কারাউইয়ীন থেকে সনদও লাভ করেন।
১৯২২ সালে ২৬ বছর বয়সে মুহাম্মাদ তাকিউদ্দীন হেলালী মিসরে সফর করেন। সেখানে তিনি শায়খ মুহাম্মদ রশীদ রেযাসহ বহু সালাফী আলেমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পাশাপাশি আল-আযহারের উচ্চ বিভাগে কিছুদিন পাঠ গ্রহণ করেন। মিসর থেকে তিনি হজ্জ পালনের জন্য মক্কায় সফর করেন।
হজ্জ সম্পন্ন করার পর তিনি জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে ভারতে গমন করেন। সেখানে তিনি বহু বিশিষ্ট আলেমের সাক্ষাৎ লাভ করেন এবং তাদের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করেন। বিশেষভাবে সুনান তিরমিযীর ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘তুহফাতুল আহওয়াযী’র লেখক শায়খ আব্দুর রহমান মুবারকপুরীর নিকট হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন এবং ইজাযাহ লাভ করেন। এছাড়াও তিনি তৎকালীন ভারতে বসবাসকারী ইয়েমেনী শায়খ মুহাম্মাদ ইবনু হুসাইন ইবনু মুহসিন আল-হাদীদীর কাছে কুতুবে সিত্তাহর কিছু অংশ পাঠ করেন এবং তার কাছ থেকেও ইজাযাহ লাভ করেন।
শায়খ মুহাম্মাদ তাকিউদ্দীন ভারত সফর শেষ করে ইরাকের যুবায়ের শহরে গমন করেন। সেখানে মৌরিতানীয় আলেম শায়খ মুহাম্মাদ আল-আমীন আশ-শানক্বীতীর শিষ্যত্ব লাভ করেন। তিনি ছিলেন মাদরাসাতুন নাজাহ আল-আহলিয়াহ-এর প্রতিষ্ঠাতা। তিনি শায়খ শানক্বীতীর কন্যা আয়েশাকে বিবাহ করেন এবং সেখানেই অবস্থান করেন।
কর্মজীবন : ১৯৩৪ সালে শায়খ তাকিউদ্দীন ইরাকী নাগরিকত্ব লাভ করেন। তিনি যুবায়ের শহরে বসবাস করেন এবং মাদরাসাতুন নাজাহ-এ ইংরেজী পড়াতেন। অল্প কিছু সময়ের জন্য তিনি জামে‘ আল-যাকির-এর ইমাম হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন। কিছুদিন পর যুবাইর থেকে পুনরায় মিসরে ফিরে যার এবং সেখান থেকে সঊদী আরব গমন করেন। এসময় শায়খ মুহাম্মাদ রশীদ রেযা তার ব্যাপারে বাদশাহ আব্দুল আযীয আলে সঊদের কাছে একটি সুপারিশপত্র দেন। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘মুহাম্মাদ তাকিউদ্দীন হেলালী মরক্কো থেকে আগত আলেমদের মধ্যে সর্বোত্তম। আশা করি আপনারা তার জ্ঞান থেকে উপকৃত হবেন’।
বাদশাহ আব্দুল আযীয তাকে কয়েক মাস অতিথি হিসাবে রাখেন। পরে তাকে মসজিদে নববীর শিক্ষা কার্যক্রমের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করেন। দুই বছর পর তাকে মক্কার মসজিদুল হারাম ও সঊদী ইনস্টিটিউটে এক বছরের জন্য বদলি করা হয়।
এরপর শায়খ হেলালীকে মসজিদে নববীর ইমাম হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি ছালাতে দীর্ঘ কিরা’আত করতেন, এতে কিছু মানুষ অসন্তুষ্ট হয়। তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলতেন, ‘তোমাদের জন্য আমি আমার ছালাত নষ্ট করব না’। এ ঘটনায় অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি ইরাকে ফিরে যান এবং বাগদাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন।
বাগদাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা উভয় কাজই করেন। এসময় ইন্দোনেশিয়া ও ভারত থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার আমন্ত্রণ আসে। তিনি শায়খ সুলায়মান নাদভীর আহবানে ভারতের নাদওয়াতুল উলামা-র লাখনৌ ক্যাম্পাসে আরবী সাহিত্যের প্রধান অধ্যাপক হিসাবে যোগ দেন। তার ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন আবুল হাসান আলী নাদভী। সেখানে তিন বছর অবস্থানকালে তিনি ইংরেজী ভাষা শিক্ষা করেন এবং শায়খ সুলায়মান নাদভীর পরামর্শে ও তার ছাত্র মাসঊদ আলম নাদভীর সহযোগিতায় আয-যিয়া নামে একটি সাময়িকী প্রকাশ করেন।
তিন বছর ভারতে অবস্থানের পর তিনি আবার শ্বশুরালয় যুবায়ের ফিরে শ্বশুর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাতুন নাজাহ-এ শিক্ষকতা করেন। সেখানে তিন বছর শিক্ষকতার পর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় যান এবং আমীর শাকীব আরসালানের আতিথ্য গ্রহণ করেন। শাকীব আরসালান জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার কাছে তার জন্য সুপারিশপত্র লেখেন। এরপর তিনি জার্মানীর বন বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবী ভাষার প্রভাষক নিযুক্ত হন। এক বছরের মধ্যে জার্মান ভাষায় ডিপ্লোমা অর্জন করেন। একই সঙ্গে শিক্ষক ও ছাত্র উভয় পরিচয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা চালিয়ে যান এবং জার্মান ভাষা থেকে আরবী ও আরবী থেকে জার্মান ভাষায় বহু গ্রন্থ ও আর্টিকেল অনুবাদ করেন। ১৯৩৯ সালে তিনি বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র, প্রভাষক এবং আরবী বেতার বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে যোগ দেন।
১৯৪০ সালে তিনি ‘আল-জামাহির ফীল জাওয়াহির’ গ্রন্থের ভূমিকার অনুবাদ ও টীকার ওপর ডক্টরেট গবেষণাপত্র জমা দেন। এতে তিনি মার্টিন হার্টমান ও কার্ল ব্রোকেলমানসহ কয়েকজন প্রাচ্যবিদের মতামতের সমালোচনামূলক জবাব দেন। দশজন বিশিষ্ট অধ্যাপকের পরীক্ষক বোর্ড সর্বসম্মতিক্রমে তাকে পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করে। তিনি লিখেছেন, ‘আমি চল্লিশ বছর বয়সের পর ইউরোপে গিয়েছিলাম কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি অর্জনের জন্য, যাতে এশিয়া ও আফ্রিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রবেশ করে শিক্ষিত সমাজের মধ্যে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে পারি। কারণ এশিয়া ও আফ্রিকার মানুষ উচ্চ ডিগ্রিকে এত বেশী মর্যাদা দেয় যে, ডিগ্রিধারীর কথা সহজেই গ্রহণ করে, যদিও সে প্রকৃত জ্ঞানে অজ্ঞ হয়’।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফিলিস্তীনের গ্রান্ড মুফতী মুহাম্মাদ আমীন আল-হুসাইনীর নির্দেশে তিনি রাজনৈতিক দায়িত্বে মরক্কো যান। স্পেন শাসিত তেতুয়ানে পাঁচ বছর অবস্থান করেন এবং শায়খ আব্দুল্লাহ কানূনের সহযোগিতায় লিসানুদ্দীন সাময়িকী প্রকাশ করেন। এর নাম রাখা হয় আন্দালুসের বিখ্যাত সাহিত্যিক লিসানুদ্দীন ইবনুল খতীবের স্মরণে।
১৯৪৭ সালে ড. হেলালী পুনরায় ইরাকে যান এবং বাগদাদের কুল্লিয়াতুল মালিকা আলিয়াতে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৫৮ সালের সামরিক অভ্যুত্থান পর্যন্ত তিনি সেখানে কর্মরত ছিলেন। ১৯৫৯ সালে মরক্কো ফিরে পঞ্চম মুহাম্মাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য অনুষদে অধ্যাপনা করেন। ১৯৬৮ সালে শায়খ আব্দুল আযীয বিন বাযের আমন্ত্রণে মদীনার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসাবে যোগ দেন। ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত সেখানে কর্মরত থেকে পরে মরক্কোয় ফিরে দাওয়াতী কাজে আত্মনিয়োগ করেন।
ইন্তিকাল : শায়খ ড. মুহাম্মাদ তাকিউদ্দীন হেলালী ১৪০৭ হিজরীর ২৫শে শাওয়াল মোতাবেক ২২শে জুন ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দ, সোমবারে মরক্কোর কাসাব্লাঙ্কায় নিজ বাসভবনে ইন্তিকাল করেন।
রচিত গ্রন্থসমূহ : শায়খ ড. মুহাম্মাদ তাকিউদ্দীন হেলালী রচিত গ্রন্থের সংখ্যা অনেক। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হ’ল :
এছাড়াও তিনি আল-ফাতহ (মুহিববুদ্দীন আল-খতীব সম্পাদিত) এবং আল-মানার (মুহাম্মাদ রশীদ রেযা সম্পাদিত) সাময়িকীতে নিয়মিত লিখতেন। তার অসংখ্য বক্তৃতা, সেমিনার, গবেষণাপত্র, প্রবন্ধ ও দাওয়াতী রচনা ইসলামী জ্ঞানভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।
সূত্র : ইন্টারনেট