শায়খ আব্দুল ওয়াক্বিল হাশেমী

তাওহীদের ডাক ডেস্ক 232 বার পঠিত

জন্ম ও পরিচয় : শায়খ আব্দুল ওয়াক্বিল আল-হাশেমী (রহঃ) ছিলেন একজন প্রখ্যাত হাদীছ বিশারদ, মসজিদ আল-হারামের মুয়াওয্যিন, ইমাম, শিক্ষক এবং দাঈ। তিনি ‘মক্কার মুসনিদ’ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি ১৩৫৭ হিজরীতে (১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দ) ভারত উপমহাদেশের বাহাওয়ালপুর প্রদেশের আহমদপুর শহরে যা তখন ভারতের অন্তর্ভুক্ত ছিল, তবে পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর বর্তমানে পাকিস্তান অংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন হারামাইনের বিশিষ্ট মুহাদ্দিছ শায়খ আব্দুল হক আল-হাশেমী।[1] যিনি মাসজিদুল হারামে ছহীহুল বুখারী এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কিতাবাদির দারস দিতেন।

শিক্ষাজীবন : শৈশবে তাঁর দাদা শায়খ আব্দুল ওয়াহিদের নিকট প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করার পর তিনি জালালপুরের দারুল হাদীছ আল-মুহাম্মাদিয়ায় প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। তাঁর পরিবার মক্কায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করার সুবাদে তিনি কুরআন মুখস্থ করার কাজ চালিয়ে যান এবং দারুল আরকামে দারুল হাদীছ বিভাগে ভর্তি হন। এর পাশাপাশি তিনি মাসজিদুল হারামে তাঁর বাবার সাহচর্য বজায় রেখে হাদীছ, তাফসীর এবং ফিক্বহের অসংখ্য গ্রন্থ শিক্ষা লাভ করেন।

তাঁর শিক্ষকবৃন্দ : শায়খ আব্দুল ওয়াক্বিল অনেক শীর্ষস্থানীয় আলেমের কাছ থেকে ইজাযা এবং দারস প্রদানের অনুমোদন পেয়েছিলেন, যাদের মধ্যে ছিলেন।-তাঁর পিতা শায়খ আব্দুল হক আল-হাশিমী, তুহফাতুল আহওয়াযীর লেখক শায়খ ওবায়দুল্লাহ মুবারকপুরী, শায়খ আব্দুস সালাম বাস্তাভি, শায়খ শামসুল হক। যিনি আব্দুল হকের পুত্র ও সাইয়িদ নাযীর হুসাইন দেহলভী (রহঃ)-এর ছাত্র। এছাড়াও তিনি শায়খ তাক্বীউদ্দিন আল-হিলালী, শায়খ মুহাম্মাদ আব্দুর রাযযাক হামযা, শায়খ আহমাদ শাকির এবং শায়খ মুহাম্মাদ নাছেরুদ্দীন আলবানী (রহঃ) সহ অন্যান্য হাদীছের মহান ব্যক্তিদের কাছ থেকেও সরাসরি ইলম অর্জন করেছেন।

ছাত্রবৃন্দ : সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের সাবেক সদস্য শায়খ ছালেহ আল-ওসাইমী, শায়খ বদর আল-ওতাইবী, শায়খ আব্দুর রহমান আল-ফাক্বিহ এবং বিখ্যাত মুসনিদ ও কেরাত-বিশেষজ্ঞ শায়খ ড. আব্দুল্লাহ আল-উবাইদও তাঁর ছাত্র ছিলেন।

কর্মজীবন : শায়খ ‘দারুল মুহাজিরীন’-এ তাঁর শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন এবং এর ধারাবাহিকতায় তিনি ছহীহুল বুখারীর দারস দেওয়া শুরু করেন। তিনি প্রায় ২৫ বছর জনসাধারণের মধ্যে আমভাবে ইলম বিতরণ এবং প্রচারের কাজে নিবেদিত ছিলেন। তারপর তিনি লেখালেখি এবং ব্যক্তিগত শিক্ষাদানের উপর মনোনিবেশ করেছিলেন। যেখানে মুসলিম বিশ্বের পন্ডিত এবং ছাত্ররা তাঁর কাছ থেকে হাদীছ শুনতে ভ্রমণ করতেন।

দাওয়াতী জীবন : তিনি তাঁর দারস-তাদরীসের জীবনে মুসনাদে আহমাদ (৫০ খন্ডে), সুনানুল বায়হাক্বী আল-কুবরা এবং ইবনু খুযায়মার কিতাব আল-তাওহীদসহ প্রধান প্রধান হাদীছ সংকলনসমূহ ছাত্রদের একাধিক বার পড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি দাম্মাম, কুয়েত, কাতার এবং মিসরের মত শহরে হাদীছ সমাবেশের আয়োজন করতেন এবং মৃত্যুর আগেও দামেষ্ক ও ত্রিপোলিতে ইলমী দারস শুরু করার নিয়ত করেছিলেন।

গ্রন্থ ও রচনাবলী : শায়খ আব্দুল ওয়াক্বিল (রহঃ)-এর অসংখ্য রচনাবলী রয়েছে, যার মধ্যে এমন অনেক কিতাব রয়েছে যেইগুলো ছহীহ আল-বুখারীকে কেন্দ্র করে। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ সমূহের মধ্যে রয়েছে- ইনায়াহ আল-বারী, মিফতাহুল কারী, ইনায়াতুল ওয়াহহাব, ইন‘আমুল বারী, আল-বাহরুল জাখর, ফাতহুল ওয়াহিদ, আল-ক্বওলুল ছহীহ, আল-হিত্তাহ, মুসনাদ আল-ক্বাযবিনী (সুনানে ইবনে মাজাহ-এর বিন্যাস), আল-বাতশাহুল কুবরা ফি গাজওয়াতিল বদর, আল-আরবাঈন আছারান লিস-সা‘আদাহ। এছাড়া তাঁর হাদীছ, ইতিহাস এবং ফিক্বহের উপর আরও অনেক কাজ রয়েছে। যাদ্বারা ত্বলিবুল ইলমরা প্রতিনিয়ত উপকৃত হচ্ছে।

মৃত্যু : শায়খ ২রা রবীউল আউয়াল ১৪৪৭ হিজরী (২৫শে আগস্ট ২০২৫) সোমবার এশার ছালাতের পর মক্কায় ইন্তেকাল করেন। পরের দিন সকালে ফজরের পর মাসজিদুল হারামে তাঁর জানাযা অনুষ্ঠিত হয় এবং আল-মা‘লা কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

উপসংহার : শায়খ আব্দুল ওয়াক্বিল আল-হাশিমী হাদীছের একজন সেবক হিসেবে জীবন-যাপন করেন। তিনি মাসজিদুল হারামের মুয়াওযযিন ও ইমামের দায়িত্ব পালন এবং সেইখানে তিনি শিক্ষাদান করেন। তিনি তাঁর লেখনী ও দারসসমূহের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নববী ইলম এবং এর উত্তরাধিকার রেখে যান। তিনি কুরআন ও সুন্নাহর প্রতি গভীর অনুরাগ, নম্রতা, প্রফুল্ল স্বভাব এবং ইবাদতের প্রতি নিষ্ঠার জন্য পরিচিত ছিলেন। তিনি সত্তর বারেরও বেশি হজ্জ্ব এবং অসংখ্য ওমরাহ পালন করেছিলেন এবং রাতের ছালাতে অবিচল থাকতেন। তাঁর জীবনী ও কর্ম আমাদের জন্য এক উত্তম আদর্শ। আল্লাহ তার দ্বীনী খেদমতসমূহ কবুল করুক।-আমীন!

[1]. তাঁর বাবা শায়খ আব্দুল হক হাশেমী (রহঃ)-এর জীবনী তাওহীদের ডাক পত্রিকার ৭৫তম সংখ্যা, মে-জুন ২০২৫-এ প্রকাশিত হয়েছে।



আরও