ওছমান বিন মুহাম্মাদ আল-খামীস

তাওহীদের ডাক ডেস্ক 171 বার পঠিত

জন্ম ও পরিচয় : ড. ওছমান বিন মুহাম্মাদ বিন হামাদ আল-খামীস ১৯৬২ সালের ২৬শে মে কুয়েতের এক সুপরিচিত ও ধার্মিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বংশধারা আরবের সম্মানিত তামীম গোত্রের নাওয়াসির শাখার অন্তর্গত, যা ইতিহাসে সাহস, জ্ঞান ও ধর্মীয় অবদানের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। ফলে পরিবারের ধার্মিক ও রক্ষণশীল পরিবেশে, ইসলামী আদর্শ ও জ্ঞানচর্চার আবহেই তার চিন্তাশক্তি ও ধর্মচর্চার বীজ অঙ্কুরিত হয়।

শিক্ষাজীবন : শৈশবে প্রাথমিক শিক্ষা কুয়েতে সম্পন্ন করার পর উচ্চতর ইসলামী জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে তিনি সঊদী আরবের রিয়াদে গমন করেন। তিনি রিয়াদের ইমাম মুহাম্মাদ বিন সঊদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে উলূমুল হাদীছ বিভাগে ভর্তি হন ও সেখানেই হাদীছ শাস্ত্রে পান্ডিত্য অর্জন করেন।

শায়খ ওছমান আল-খামীস السبطين অর্থাৎ হাসান ও হোসাইন (রাঃ) সম্পর্কিত হাদীছসমূহ নিয়ে বিশ্লেষণাত্মক গবেষণার মাধ্যমে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। অতঃপর কিং সঊদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে المراجعات دراسة نقدية حديثية (আল-মুরাজা‘আত : একটি সমালোচনামূলক হাদীছ গবেষণা) শীর্ষক গবেষণাপত্রে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তার এই গবেষণাকর্মে তিনি শী‘আ মতবাদের জনপ্রিয় গ্রন্থ المراجعات এর হাদীছসমূহকে উছূলে হাদীছের নীতিমালা অনুযায়ী বিশ্লেষণ করেন এবং সেটির দুর্বলতা ও বিদ‘আতী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।

কর্মজীবন : ড. ওছমান আল-খামীসের কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৮৯ সালে, যখন তিনি কুয়েতের একটি মসজিদে মুয়ায্যিন হিসেবে নিযুক্ত হন। এরপর ১৯৯৩ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি ঐ মসজিদেই ইমাম ও খতীব হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তার কণ্ঠের সৌন্দর্য, বক্তব্যের গভীরতা এবং আকর্ষণীয় বিশ্লেষণ তাকে জনগণের মাঝে জনপ্রিয় করে তোলে।

পরে তিনি কুয়েতের ওয়াকবফ ও ইসলামী বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে তিনি বিভিন্ন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনাও করেছেন। ২০২৫ সালের ১লা মার্চ তিনি ‘Global Da'wah Council’ নামক একটি আন্তর্জাতিক দাওয়াহ সংস্থার সভাপতি নির্বাচিত হন।

দাওয়াতী জীবন : ড. আল-খামীস কেবল একজন গবেষক বা শিক্ষকই নন, বরং সালাফী আক্বীদার একজন মুখলিছ দাঈ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তিনি ইসলামের মূলনীতি ও বিশুদ্ধ আক্বীদা সাধারণ মানুষের নিকট সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার জন্য নিবেদিতপ্রাণ। ড. ওছমান আল-খামীস আক্বীদা ও আমলে সালাফী আক্বীদা অনুসরণ করেন। বিদ‘আত, কবরপূজা, তাওয়াসসুল, ইবাদতে শিরকী আচরণ এবং বাতিল ফিরক্বা সমূহের বিরুদ্ধে তিনি অবিচল কণ্ঠস্বর।

তিনি আক্বীদা, ফিক্বহ, হাদীছ, ইসলামী ইতিহাস, ছাহাবাদের জীবনী ও সমসাময়িক ফেতনা নিয়ে অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করে থাকেন। আক্বীদাগত বিভ্রান্তি নিরসন, রাফেযী শী‘আদের ভ্রান্ত মতবাদ খন্ডনে তিনি বিশেষভাবে মনোনিবেশ করেন। টেলিভিশন প্রোগ্রাম, ইউটিউব চ্যানেল, সরাসরি প্রশ্নোত্তর সেশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি ধারাবাহিকভাবে পাঠদান করে থাকেন।

তিনি নিজের লেখনী, গবেষণা এবং বিভিন্ন টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও বিতর্কে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিয়া বারো ইমামী মতবাদের সমালোচক হিসেবে পরিচিতি পান। বিশেষ করে ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগে লন্ডনভিত্তিক ‘আল-মুস্তাকিলা’ চ্যানেলের মাধ্যমে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তিনি শিয়া আলেমদের সাথে ‘ওছমান (রাঃ)-এর শাহাদাত’ ও ‘আলী (রাঃ) ও মাহদীর নেতৃত্ব’ নিয়ে বিতর্কে সুন্নী মতবাদ উপস্থাপন করতেন। তিনি এসব বিতর্কে সুন্নী পক্ষের নিয়মিত প্রতিনিধি ছিলেন।

গ্রন্থ ও রচনাবলী : ড. ওছমান আল-খামীস একজন প্রখ্যাত লেখকও বটে। তার রচিত গ্রন্থসমূহ ইসলামী জ্ঞানপিপাসুদের জন্য অমূল্য সম্পদ। তার রচিত উল্লেখযোগ্য কিছু গ্রন্থ হ’ল-

১. আহাদীছুল ওয়ারিদাহ ফী শা’নে আস-সিবতাইন ২. আল-মুরাজা‘আত : দিরাসাহ নাকদীয়াহ হাদীছিয়াহ ৩. হিকবাতুম মিনাত তারীখ ৪. কুনূযুস সীরাহ ৫. ফা বিহুদা-হুম ইক্বতাদিহ : ক্বিরাআহ তাছীলিয়াহ ফী সিয়ারি ওয়া ক্বছাছিল আম্বিয়া ৬. মিনাল-ক্বলব ইলাল-ক্বলব ৭. আহকামুত-ত্বহারাত ওয়াছ-ছালাত ৮. আল-কাওয়া‘ইদুন নাফি‘আহ ফী আসমাই আললাহ ওয়া ছিফাতিহী ৯. মানহাজুল-হক্ব ফীল আক্বীদা ওয়াল-আখলাক।

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রচনাসমূহ :

১. শরহু হাদীছি আয়েশা ওয়া ক্বিছছাতু ফাদাক ২. ছিফাতু হাজ্জে নবী (ছাঃ) ৩. মাতা ইয়াশরুকু নূরুকা ইয়া আইয়ুহাল মুনতাযির!

উপসংহার : ড. ওছমান আল-খামীস কেবল একজন সালাফী বিদ্বানই নন, তিনি একাধারে গবেষক, শিক্ষক, দাঈ এবং বাতিল মতবাদের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ কণ্ঠসর। সাধারণ মুসলমানদের আক্বীদাগতভাবে সচেতন করে তোলাই তার জীবনের অন্যতম উদ্দেশ্য। তার জীবন ও কর্ম আধুনিক মুসলিম সমাজের সামনে এক উজ্জ্বল আদর্শ। আল্লাহ তার দ্বীনী খেদমতসমূহ কবুল করুন।-আমীন!



আরও