হাফেয ছালাহুদ্দীন ইউসুফ (রহঃ)
মুখতারুল ইসলাম
শায়খ আবু মুহাম্মাদ আব্দুল হক হাশেমী (রহঃ) (১৮৮৪--১৯৭২) ছিলেন বিংশ শতাব্দীতে হিন্দুস্তানের একজন খ্যাতিমান ইসলামী পন্ডিত, মুহাদ্দিছ, লেখক ও দাঈ। তিনি একজন দক্ষ হাদীছশাস্ত্র বিশারদ হিসাবে পরিচিত ছিলেন। আক্বীদা ও আমলে সুন্নাতের পক্ষে দৃঢ় অবস্থানের কারণে তিনি আলেমদের নিকট বহুল প্রশংসিত ছিলেন। তিনি ভারতীয় উপমহাদেশ ও হারামায়েন শরীফায়েনের মধ্যে ইসলামী জ্ঞানচর্চার সেতুবন্ধন হিসাবে কাজ করেন। প্রায় ৭০ বছরের দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি বহু যোগ্য আলেম ও দাঈ তৈরি করেছেন। তার রচিত অসংখ্য গ্রন্থও ইসলামী জ্ঞান ও তথ্যভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।
জন্ম ও বংশ পরিচয় : শায়খ আব্দুল হক ১৮৮৪ সালে ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের বাহাওয়ালপুরে কোটলা শেখান নামক গ্রামে একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। যার বংশধারা দ্বিতীয় খলীফা হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাঁর পিতা শায়খ আব্দুল ওয়াহিদ ছিলেন একজন আলেম ও দাঈ। শায়খ আব্দুল হক ছিলেন তাঁর পিতা-মাতার একমাত্র জীবিত সন্তান। তাদের অন্য সকল সন্তান শৈশবেই মৃত্যুবরণ করেন। ফলে শায়খ আব্দুল ওয়াহিদ তার একমাত্র সন্তানকে ইসলামের খিদমাতে উৎসর্গ করার সংকল্প করেছিলেন।
শায়খ আব্দুল হক হযরত ওমর (রাঃ)-এর ৪২ তম বংশধর ছিলেন। তার পূর্বপুরুষগণ খ্রিস্টীয় ৮ম শতকের শুরুর দিকে মুহাম্মাদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের সময় ভারতীয় উপমহাদেশে আগমন করেন। তার নামের সাথে যুক্ত আল-হাশেমী উপাধিটি সাধারণ অর্থে হযরত মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর পূর্বপুরুষ হাশেম ইবনু আব্দে মানাফের বংশধারা বোঝাতে ব্যবহৃত হলেও, এখানে এর তাৎপর্য ভিন্ন। এটি তাঁর প্রপিতামহ হাশেম বিন রামাযানের প্রতি সম্বন্ধ করে যুক্ত করা হয়েছে।
শিক্ষাজীবন : শায়খ আব্দুল হক শৈশবে পিতার নিকটে কুরআন হিফয করেন। অতঃপর তিনি ফার্সী ভাষা ও ব্যাকরণ অধ্যয়ন করেন। কেননা তৎকালীন মুসলিম শাসিত উপমহাদেশে ফার্সী ছিল অন্যতম প্রধান ভাষা। এরপর তিনি পিতার নিকটেই আরবী ভাষা, ব্যাকরণ ও ইসলামী শরী‘আহর প্রাথমিক জ্ঞান লাভ করেন। এরপর তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন শহর যেমন মুলতান, দিল্লী, বাতালায় ভ্রমণ করে প্রায় ৬০ জন প্রখ্যাত আলেমের নিকট তাফসীর, হাদীছ, উছূলে হাদীছ, আক্বীদাহ, ফিক্বহ ও আখলাকের শিক্ষা লাভ করেন।
তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ঈসা বিন আহমাদ রাঈ, ইমামুদ্দীন ইবনু মুহাম্মাদ কানবারী, মুহাম্মাদ ইবনু আবু মুহাম্মাদ ঘায়তী ও মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল্লাহ রিয়াসাতী প্রমুখ। তিনি ছহীহ কুতুবে সিত্তাহ, মুসনাদে আহমাদ, মুয়াত্ত্বা মালেকসহ বিভিন্ন প্রধান হাদীছ সংকলনের ওপর ইজাযাহ লাভ করেন এবং হাফিযুল হাদীছ হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেন।
শিক্ষকতা ও দাওয়াতী জীবন : শিক্ষা জীবন শেষে শায়খ আব্দুল হক নিজ জন্মস্থান বাহাওয়ালপুরের আববাসী মসজিদের ইমাম ও কাযী হিসাবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। অতঃপর তিনি ভারতের আহমাদাবাদ শহরে, যেটি জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষের ফলে তখন নতুন বাগদাদ নামে পরিচিত ছিল, প্রথম হাদীছের দারস প্রদান করেন। সেখানে তিনি দীর্ঘদিন শিক্ষকতা চালিয়ে যান।
১৯৪৮ সালে তিনি হজ্জ পালন করতে গিয়ে মক্কায় অবস্থান করেন। তখন কিছু আলেমের সাথে তার গুরুত্বপূর্ণ ইলমী আলোচনার সূত্রপাত হয়। দেশের শীর্ষ আলেমরা যখন জানলেন যে তিনি মুসনাদে আহমাদ-এর ব্যাখ্যা লিখেছেন, তখন তারা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মক্কায় স্থায়ী হয়ে পাঠদানের অনুরোধ করেন।
সেখানে তার জ্ঞানের গভীরতা দেখে স্থানীয় শায়খগণ বাদশাহ আব্দুল আযীযের নিকট তাকে মক্কায় শিক্ষক হিসাবে নিয়োগদানের সুপারিশ করেন। এই সুপারিশ গৃহীত হলে ১৩৬৭ হিজরীতে তিনি মসজিদুল হারামে শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত হন। সেই থেকে মৃত্যু অবধি তিনি মসজিদুল হারামে ও মক্কার অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা ও দাওয়াতী কাজ করেন।
তিনি বলেন, ‘এরপর আল্লাহ তা‘আলা আমাকে এই নিরাপদ নগরীতে হিজরত করার তাওফীক দিলেন। নেককার বাদশাহ আব্দুল আযীয (আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন) আমাকে মসজিদুল হারামে শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেন। সেই সময় প্রধান বিচারপতি শায়খ আব্দুল্লাহ বিন হাসান আশ-শায়েখ, রিয়াদের হাইআতের প্রধান শায়খ ওমর বিন হাসান এবং শায়খ মুহাম্মাদ বিন ইব্রাহীম, শায়খ আব্দুল মালেক বিন ইব্রাহীম এবং প্রিয় শায়খ আব্দুল আযীয বিন বাযসহ অনেক সালাফী আলেম আমার প্রতি সম্মান ও অনুগ্রহ করেন। আল্লাহ তাদের দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম প্রতিদান দিন’।
আক্বীদা : শায়খ আব্দুল হক হাশেমী (রহঃ) আক্বীদা ও আমলে আহলেহাদীছ তথা সালাফদের পথ ও পদ্ধতির অনুসারী ছিলেন। তিনি নিজেই তা স্পষ্টভাবে বলেছেন এবং লোকদেরও এ পথের দিকে আহবান করতেন। তিনি তার ‘হাযিহী আক্বীদাতী’ পুস্তকে বলেন, ‘আমার প্রতি আল্লাহর অন্যতম বড় অনুগ্রহ হ’ল, তিনি আমাকে আদম (আঃ)-এর শ্রেষ্ঠ সন্তান হযরত মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উম্মত বানিয়েছেন। আরেকটি অনুগ্রহ হ’ল, তিনি আমাকে আকীদা ও আমলে সালাফী আহলেহাদীছের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আমার আক্বীদা হ’ল, আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের সালাফে ছালেহীন, ফক্বীহ ও মুহাদ্দিছদের অক্বীদা। তা হ’ল পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করা এবং কোনো রকম বিকৃতি বা মনগড়া ব্যাখ্যা ছাড়াই তার প্রকাশ্য অর্থ অনুযায়ী তা গ্রহণ করা’।
তিনি আরও বলেন, ‘আল্লাহর গুণাবলীর বিষয়ে আমি অত্যন্ত সতর্ক। কুরআন ও হাদীছে যেসব গুণের উল্লেখ আছে, যেমন আরশের উপরে উন্নীত হওয়া, তাঁর হাত, চোখ, আঙুল, পা, হাসা, কথা বলা ইত্যাদি আমি যথাযথ অর্থে গ্রহণ করি। আমি এগুলিকে কোনরূপ বিকৃতি, অস্বীকার বা সাদৃশ্য ছাড়াই বাহ্যিক অর্থে গ্রহণ করি। আর এগুলি কেমন ও কীভাবে ঘটে এই বিষয়টি আমি আল্লাহর কাছে অর্পণ করি। কারণ তা আমাদের অজানা। কিন্তু যেসব বিষয় আল্লাহ আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন, সেগুলো নিয়ে বিভ্রান্তি বা অজানা কিছু নেই। আমি আল্লাহর গুণাবলীসমূহের বিকৃত ব্যাখ্যা করা বিদ‘আতীদের কঠোরভাবে নিন্দা করি। কারণ আল্লাহর গুণের বিকৃত ব্যাখ্যা মানুষকে পথভ্রষ্ট করে। যারা এসব আয়াত ও হাদীছের বিকৃত ব্যাখ্যা থেকে দূরে থাকে, তাদের আক্বীদা সবচেয়ে নিরাপদ। এসব আয়াত ও হাদীছ প্রকৃত ও বাহ্যিক অর্থে বোঝা এবং তাতে ঈমান আনা আবশ্যক’।
‘আমি বিশ্বাস করি, মুমিনরা ক্বিয়ামতের দিন তাদের রবকে দেখতে পাবে। আমি আল্লাহর ঊর্ধ্বারোহণকে বিশ্বাস করি। তিনি আসমানের উপরে আরশে আছেন। কিন্তু আকাশ তাঁকে ধারণ করে আছে বা ছায়া দিচ্ছে এমন কোনো বিশ্বাস নয়’।
শায়খ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (রহঃ) তাঁর এই আক্বীদা গ্রন্থের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ‘আমি শায়খ নাছিরুস সুন্নাহ ও বিদ‘আতের বিরুদ্ধে সংগ্রামী আবু মুহাম্মাদ আব্দুল হক হাশেমীর প্রদত্ত আক্বীদাটি পাঠ করেছি। আমি এটি অত্যন্ত মূল্যবান ও প্রশংসনীয় অক্বীদা মনে করি।
শায়খ বিন বায আরও বলেন, ‘সমসাময়িক যুগে জ্ঞানের বিশালতায় কাউকেই আমি শায়েখ আব্দুল হক হাশেমীর সমতুল্য পাইনি’।
মানহাজ : শায়খ আব্দুল হক হাশেমী (রহঃ) আক্বীদার ন্যায় আমলের ক্ষেত্রেও আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের অনুসারী ছিলেন। তিনি বলেন, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার, যিনি আমাকে ছহীহ সুন্নাহর অনুসারী করেছেন। আমি তাক্বলীদ পরিত্যাগ করেছি। তবে চার ইমামসহ অন্যান্য সকল ইমামকে সম্মান করি এবং তাদের ইজতিহাদে কোন আপত্তি করিনা। বরং ছহীহ হাদীছকে রায় ও মতের উপর প্রাধান্য দিই’।
‘আমার অনুসরণীয় পদ্ধতি হ’ল, আমি কুরআনে যা পাই, তার আলোকে ফৎওয়া দিই। যদি কুরআনে না পাই, তাহ’লে হাদীছে অনুসন্ধান করি এবং হাদীছকে কুরআনের ব্যাখ্যা হিসাবে গ্রহণ করি। হাদীছেও যদি না পাই, তাহলে আমি ছাহাবী, তাবে‘ঈ এবং পরবর্তী ইমাম ও মুজতাহিদদের মত গ্রহণ করি ইমামদের মধ্যে যিনি পূর্ববর্তী, তার কথা আগে গ্রহণ করি এবং যিনি ইজতিহাদে অগ্রগামী ও সঠিকের অধিক নিকটবর্তী, তার কথাকেই প্রাধান্য দিই’।
‘চার ইমাম বা অন্য কারো তাক্বলীদ না করার কারণে কেউ দোষারোপ বা নিন্দা করলে আমি তাতে তোয়াক্কা করি না। কারণ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছাড়া প্রত্যেকের বক্তব্য গ্রহণ ও প্রত্যাখ্যানযোগ্য। তিনিই হলেন প্রকৃত আদর্শ ও অনুসরণীয় ব্যক্তি। ছাহাবাদের যুগ থেকে ক্বিয়ামত পর্যন্ত সকলেই তাঁর অনুসরণ করতে বাধ্য’।
শায়খ হাম্মাদ আল-আনছারী (রহঃ) বলেন, ‘শায়খ আব্দুল হক হাশেমী নির্দিষ্ট কোন মাযহাবের অনুসরণে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তিনি ছিলেন মুক্তচিন্তার অধিকারী। তার হাদীছ ও ফিক্বহে গভীর জ্ঞান ছিল’।
অধ্যাপক ওমর আব্দুল জাববার বলেন, ‘তিনি কুতুবে সিত্তাহর হাদীছ, তার সনদসমূহ, ইমামদের মাঝে মতভেদ ও তাদের দলীলগুলো ভালোভাবে জানতেন এবং সঠিক মতকে সমর্থন দিতেন। তিনি বিদ্বানদের মতামতকে সম্মান করতেন এবং পূর্ববর্তী ইমামদের ভালোবাসতেন’।
হাদীছের প্রতি গভীর অনুরাগ : শায়খ আব্দুল হকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল হাদীছের প্রতি প্রবল আগ্রহ। শায়খের পুত্র আব্দুল ওয়াকিল আল-হাশেমী বলেন, ‘আমার পিতা প্রতিদিন ফজরের ছালাতের পর নিয়মিতভাবে কুরআনের কয়েকটি আয়াত, ছহীহ বুখারীর কয়েকটি হাদীছ এবং ছহীহ মুসলিমের কয়েকটি হাদীছ পাঠ করতেন’।
এমনকি হারাম শরীফের ইমামগণ যদি কোনো সুন্নাত বাদ দিতেন বা ভুল করতেন, তবে তিনি তা সংশোধনের জন্য তাদেরকে সতর্ক করতেন। তিনি ভুল ব্যাখ্যাকারীদের প্রতিবাদ করতেন এবং তাদের সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হতেন। এ সময় তার বিতর্ক ছিল অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ।
আব্দুল ওয়াকিল আরো বলেন, ‘একবার আমাকে একটি হাদীছ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। কিন্তু আমি তা মনে করতে পারিনি। ফলে আমি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে বাড়ি ফিরে ঘুমিয়ে পড়ি। অতঃপর আমি আমার পিতাকে স্বপ্নে দেখি এবং তাকে বলি, আববা! এই হাদীছটি কোথায় আছে? তিনি বললেন, আমি কি তোমাকে বুখারী অধ্যয়নে অবহেলা না করতে উপদেশ দিইনি? এই হাদীছটি ছহীহ বুখারীর কিতাবুল জিহাদ-এর একটি বাবের শিরোনাম হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে আমি কিতাব খুলে ঠিক তেমনই তা পেয়েছি যেমনটি তিনি বলেছিলেন’।
চারিত্রিক গুণাবলি : শায়খ আব্দুল হক (রহঃ) ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, দুনিয়াবিমুখ, পরহেযগার, পরিতুষ্ট, আত্মপ্রচারণা ও প্রদর্শনবিমুখ মানুষ। তিনি ইলমের প্রচার-প্রসারে খুবই আগ্রহী ছিলেন। সময়ের ব্যাপারে ছিলেন অত্যন্ত সচেতন ও কৃপণ। তার বিনয়ের দৃষ্টান্ত এই যে, তিনি তার কিছু গ্রন্থে নিজের পরিচয়ে লিখতেন ‘আহকারুল মুদাররিসীন বিল মাসজিদিল হারাম, আবু মুহাম্মাদ আব্দুল হক হাশেমী’ অর্থাৎ ‘মসজিদে হারামের সবচেয়ে নগণ্য শিক্ষক, আবু মুহাম্মাদ আব্দুল হক হাশেমী’।
ইলমের প্রতি আগ্রহ : ইলম অর্জনের প্রতি তার আগ্রহ ও অধ্যবসায়ের একটি আশ্চর্য দৃষ্টান্ত জানা যায়। তার ছেলে শায়খ আব্দুল ওয়াকিল একাধিকবার জানান যে, ‘এক লোক হজ্জে আসার সময় ইবনু মা‘ঈনের ‘তারীখ আদ-দূরী’র একটি পান্ডুলিপি সঙ্গে আনেন। শায়খ মুহাম্মাদ আব্দুর রাযযাক হামজা তা দেখতে পেয়ে শায়খ আব্দুল হককে জানান। শায়খ ঐ লোকের নিকটে বইটি ধার চান। তখন ফটোকপির সুবিধা না থাকায় তিনি ও তার সন্তানরা তিন দিন একটানা পালাক্রমে সেই পান্ডুলিপি নকল করেন’। সেই হাতে লেখা কপি অনেকেই দেখেছেন, যাতে শায়খের নিজের ও তার সন্তানদের হাতের লেখা আছে।
গ্রন্থ ও রচনাবলী : শায়েখ আব্দুল হক হাশেমী তাফসীর, হাদীছ ও উছূলে হাদীছ, শারহুল হাদীছ, আক্বীদাহ, ফিক্বহ ও উছূলে ফিক্বহ, আরবী ভাষা ও ব্যাকরণ, সীরাত ও ইসলামী ইতিহাসসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় ৮০টি গভীর গবেষণাধর্মী গ্রন্থ রচনা করেন। তার কিতাবগুলো কুরআন ও হাদীছের মযবূত দলীলের উপর প্রতিষ্ঠিত। তার ভাষা ছিল সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর। তার রচনার মধ্যে কিছু কিতাব আরব বিশ্ব ও উপমহাদেশে পাঠ্যবই স্বরূপ পড়ানো হয়। তার রচিত কিতাবসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হ’ল :
তার ছাত্র ও সমকালীন মনীষীদের মূল্যায়ন : শায়খ আব্দুল হক হাশেমী (রহঃ) মক্কায় ২৪ বছরসহ সর্বমোট প্রায় ৭০ বছর শিক্ষকতা করেন। তার এই দীর্ঘ ছাত্র জীবনে অনেক যোগ্য আলেম, শিক্ষক ও দাঈ তৈরী করেছেন। তার ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সঊদী আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতী শায়খ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল আযীয বিন বায, শায়খ আব্দুর রাযযাক, মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ শানক্বীতী এবং তার নিজের ছেলে আব্দুল ওয়াকিল হাশেমী। তিনি ছাত্রদের মধ্যে যে জ্ঞানতরঙ্গ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তা থেকে আজও সারা বিশ্বের মুসলমানগণ বিশেষত আহলেহাদীছ আলেমগণ উপকার লাভ করছেন।
অধ্যাপক ওমর আব্দুল জাববার বলেন, ‘তখন (ছাত্র কালে) তিনি জীবনের অষ্টম দশকে ছিলেন। তিনি ছিলেন বিনয়ী, দুনিয়াবিমুখ, সংযমী, কনিষ্ঠদের শিক্ষাদানে উৎসাহী। তিনি মসজিদুল হারামে নিয়মিত পাঠদান করতেন। এ ছাড়া মুহাজিরীন সালাফী মাদ্রাসা ও দারুল হাদীছ, মক্কায়ও পাঠদান করতেন। তিনি কখনও রিয়াকারে পরিণত হননি। তিনি ছিলেন যুগে যুগে দ্বীনী আলেমদের মতই নীরব ও বিনম্র’।
তার পাঠদানের ধরন ছিল প্রমাণনির্ভর ও যুক্তিপূর্ণ। বিশেষ করে হানাফী মাযহাবের অনেক ইজতিহাদকে তিনি সুন্নাহর আলোকে খন্ডন করতেন।
তিনি উচ্চকণ্ঠে পাঠদান করতেন, যা মাইক ছাড়াই শোনা যেত। তিনি নিজে ১৪ খন্ডে ছহীহ বুখারীর যে ব্যাখ্যা লিখেছেন, তা থেকে মসজিদুল হারামে দীর্ঘদিন পাঠদান করেছেন। বিদায়া ও নিহায়াসহ বহু কিতাব তার সামনে পাঠ করা হয়েছে।
মৃত্যু : শায়খের ছেলে আব্দুল উকাইল বলেন, ১৯৭২ সাল মোতাবেক ১৩৯২ হিজরীর রামাযান মাসে আমার আববা দু’বার নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। একবার ডান ফুসফুসে, আরেকবার বাম ফুসফুসে। তবে তার সমস্ত ইন্দ্রিয় সচল ছিল। কেউ কোনো ভুল মাসআলা বললে তিনি মাথা নাড়তেন। পুরো রামাযান জুড়েই তিনি এ অবস্থায় ছিলেন। অতঃপর শাওয়াল মাসের ১৮ তারিখ বৃহস্পতিবার সকালে উঠে বসলেন, শরীর নড়াচড়া করলেন, তারপর শুয়ে পড়লেন এবং শাহাদাতের কালেমা পড়তে পড়তে মৃত্যুবরণ করলেন’। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। তার বিদায়ে মুসলিম জাহান এক গুণী আলেমকে হারালো। এ যুগে এমন একজন আলেমের অস্তিত্ব সত্যিই বিরল!
মক্কায় তার প্রথম জানাযায় ইমামতি করে শায়খ আব্দুর রহমান আল-খুলাইফী। সেখানে ৮০ হাযারের বেশি মানুষ অংশগ্রহণ করেন। এরপর তাকে মদীনা নেওয়া হয়। সেখানে শুক্রবার সকালে আরও ৭০ হাযারের বেশি মানুষকে নিয়ে জানাযা পড়েন শায়েখ অব্দুল আযীয আছ-ছালেহ।
তার আকাঙ্খা ছিল বাক্বী কবরস্থানে দাফন হওয়া। তার সে আকাঙ্খা পূরণ হয়েছে। তাকে ইমাম মালেক (রহঃ)-এর পা ও নবী (ছাঃ)-এর সন্তান ইব্রাহীমের মাথার পাশে কবরস্থ করা হয়। তার এক পাশে ছাহাবী সা‘দ ইবনু মু‘আয (রাঃ)-এর কবর, যার মৃত্যুতে আরশ কেঁপে উঠেছিল। অপর পাশে আরেক ছাহাবী আব্দুর রহমান ইবনু আউফ (রাঃ)। আল্লাহ তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করুন এবং তাকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন।- আমীন