আল্লাহর সান্নিধ্যে হৃদয়ের প্রশান্তি (২য় কিস্তি)

রাকীবুল ইসলাম 9 বার পঠিত

(৪) অতি লোভ ও কৃপণতা : মানুষের আত্মাকে কলুষিত করা মারাত্মক ব্যাধি হ’ল অতি লোভ এবং কৃপণতা। সহজ কথায়, সম্পদ অর্জনের পূর্বে মানুষের মাঝে যে তীব্র লালসা কাজ করে, তা-ই হ’ল অতি লোভ। আর সম্পদ হাতে আসার পর তা ভালোবেসে আকড়ে ধরা এবং সৎকাজে ব্যয় না করার মানসিকতাই হ’ল কৃপণতা। এই ধ্বংসাত্মক উপাদান মানুষের নফসের মাঝেই সুপ্ত থাকে। যে ব্যক্তি কৃপণতা করে, সে মূলত তার ভেতরের এই কুপ্রবৃত্তির দাসত্ব করে। আর যে ব্যক্তি কৃপণতা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারে, সে তার ভেতরের লোভকে পরাস্ত করে এর অনিষ্ট থেকে রক্ষা পায়। মূলত এমন ব্যক্তিই প্রকৃত সফলকাম। এ বিষয়ে সতর্ক করে আল্লাহ বলেন,وَمَنْ يُوْقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ- ‘বস্ত্তত যারা হৃদয়ের কার্পণ্য হ’তে মুক্ত, তারাই সফলকাম’ (হাশর ৫৯/৯)

লোভের মহৌষধ : অতি লোভের প্রতিষেধক হ’ল অন্যকে নিজের ওপর প্রাধান্য দেওয়া। এটি মানবীয় উদারতার সর্বোচ্চ পর্যায়। নিজের পসন্দের ধন-সম্পদ বা অন্য যেকোনো প্রিয় জিনিসের প্রতি নিজের তীব্র আকাংখা ও প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও, স্রেফ ত্যাগের মহিমায় তা অন্যের কল্যাণে বিলিয়ে দেওয়া। এমনকি নিজের চরম অভাব ও সংকটের মুহূর্তেও যারা অন্যকে অগ্রাধিকার দেন, তারাই এই গুণের অধিকারী। মদীনার আনছার ছাহাবীদের এই অনন্য ত্যাগের প্রশংসা করে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন, وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ ‘আর তারা নিজেদের উপর তাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়, যদিও তাদেরই রয়েছে অভাব’ (হাশর ৫৯/৯)

(৫) অহংকার : হৃদয়ের পবিত্রতা ও অনাবিল প্রশান্তি ধ্বংসাত্মক অন্যতম ব্যাধি হ’ল অহংকার। এই অহংকারই ছিল অভিশপ্ত ইবলীসের প্রথম পাপ। সৃষ্টির সূচনা লগ্নে সে এই অহংকারের চাদর গায়ে জড়িয়েই মহান আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করেছিল। ফলে তার সমস্ত ইবাদত-বন্দেগি ধূলিসাৎ হয়ে যায় এবং তার চূড়ান্ত পরিণতি হয় আল্লাহর রহমত থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার ও চিরস্থায়ী অভিশাপ। শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) অহংকারের ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, অহংকার হ’ল শিরকের চেয়েও মারাত্মক পাপ। কারণ, একজন মুশরিক আল্লাহর সাথে অন্যকে শরীক করলেও আল্লাহর ইবাদতকে একেবারে অস্বীকার করে না; সে আল্লাহরও ইবাদত করে, অন্যেরও করে। কিন্তু একজন অহংকারী ব্যক্তি এতটাই উদ্ধত হয় যে, সে স্বয়ং আল্লাহর ইবাদত ও দাসত্ব করতেই অস্বীকার করে এবং অহংকারবশত মুখ ফিরিয়ে নেয়’।[1]

আর এ কারণেই অহংকারীদের জন্য মহান আল্লাহ নির্ধারণ করে রেখেছেন জাহান্নামের উত্তপ্ত আগুন। পবিত্র কুরআনে সেই ভয়াবহ দৃশ্যের অবতারণা করে আল্লাহ বলেন,قِيْلَ ادْخُلُوْا أَبْوَابَ جَهَنَّمَ خَالِدِيْنَ فِيْهَا فَبِئْسَ مَثْوَى الْمُتَكَبِّرِيْنَ- ‘বলা হবে, তোমরা জাহান্নামের দরজাসমূহ দিয়ে প্রবেশ কর সেখানে চিরকাল অবস্থানের জন্য। আর দাম্ভিকদের জন্য সেটা কতই না নিকৃষ্ট ঠিকানা!’ (যুমার ৩৯/৭২)

যদি আমরা হৃদয়ে আল্লাহর নিবিড় সান্নিধ্য ও স্বর্গীয় প্রশান্তি অনুভব করতে চাই, তবে এই অহংকারের বীজকে অন্তর থেকে উপড়ে ফেলতে হবে। মনে রাখতে হবে, মাটির তৈরি মানুষের এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে অহংকার করার মতো কোনো উপাদানই নেই। বিনম্রতাই মুমিনের আসল সৌন্দর্য, যা মানুষকে আল্লাহর কাছে সম্মানিত এবং সৃষ্টির কাছে প্রিয় করে তোলে।

(৬) দুনিয়ার প্রতি মোহ : দুনিয়ার প্রতি অন্ধ ভালোবাসাই হ’ল পৃথিবীর সমস্ত পাপের মূল উৎস এবং সব অপরাধের চাবিকাঠি। মানুষ যখন আখেরাতকে ভুলে কেবল দুনিয়া গোছানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়, তখনই তার নীতি, নৈতিকতা ও সততার দেয়াল ভেঙে পড়ে। হযরত আবু যার (রাঃ) বলেন, আমি একদিন মদীনার একটি পাথুরে জমিতে নবী করীম (ছাঃ)-এর সাথে হাঁটছিলাম। এমন সময় আমাদের সামনে ওহোদ পাহাড় ভেসে উঠল। তখন তিনি বললেন, হে আবু যার! আমি উত্তর দিলাম, লাববাইক হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! তিনি বললেন, ‘আমার কাছে যদি এই ওহোদ পাহাড় সমান সোনাও থাকে, তবুও তিন দিন পার হওয়ার পর তা থেকে একটি দীনারও আমার কাছে অবশিষ্ট থাকুক, এটি আমাকে সামান্যতম আনন্দ দেবে না। তবে হ্যঁা, সেই অংশ ছাড়া যা আমি ঋণ পরিশোধের জন্য জমিয়ে রাখব’।[2]

ফুযায়েল ইবনু ইয়ায (রহঃ) বলেন, দুনিয়া প্রাপ্তির অতিরিক্ত আনন্দ আল্লাহর ইবাদতের মিষ্টতা ও স্বাদকে কেড়ে নেয়। আর দুনিয়া নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ইবাদত নষ্ট করে দেয়’।[3]

একজন অসুস্থ রোগীর সামনে যেমন পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার উপস্থিত করলেও তার অসুস্থতার তীব্রতার কারণে সে খাবারের প্রতি কোনো আগ্রহ বা ক্ষুধা অনুভব করে না। ঠিক তেমনি দুনিয়ার মোহে আক্রান্তত ব্যক্তি ইবাদতের স্বাদ আস্বাদন করতে পারে না। এমনকি সে যদি জোর করে ইবাদত করতেও বসে, অন্তরের ব্যাধির কারণে সে ইবাদত তাকে কোনো মানসিক তৃপ্তি দেয় না।

(৭) পদমর্যাদা ও নেতৃত্বের লোভ : অভিশপ্ত ইবলীসের পতনের মূল কারণ কেবল অহংকারই ছিল না, বরং তার পেছনে কাজ করেছিল এই নেতৃত্বের লোভ ও শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার এক অন্ধ বাসনা। এই ক্ষমতার লোভ আর শ্রেষ্ঠত্বের মোহে পড়েই ফেরাউন, হামান ও তাদের বিশাল বাহিনী সত্যকে অস্বীকার করে কুফরির অন্ধকার বেছে নিয়েছিল। একই রোগে আক্রান্ত হয়ে আবু জাহল ও তার কওম এবং তৎকালীন ইহূদী সমাজ সত্য জানা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত ঈমান থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। কারণ তারা ভয় পেয়েছিল যে সত্যকে মেনে নিলে সমাজে তাদের এতদিনের তৈরি করা কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সতর্ক করে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ আমার প্রতি অহি পাঠিয়েছেন যে তোমরা পরস্পরের প্রতি বিনয়ী হও; যেন কেউ কারও উপর অহংকার বা বড়ত্ব যাহির না করে। আর কেউ কারও উপর অন্যায়-অবিচার না করে’।[4]

যারা লৌকিকতার চোরাবালিতে হারিয়ে যায়, তারা মূলত অবচেতনভাবে পৃথিবীর বুকে নিজেদের উচ্চ ও শ্রেষ্ঠ প্রমাণের এক অসম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। ফলে তা তাদের পরকালের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত করে।

(৮) সস্তা খ্যাতির মোহ : যে বান্দা মনে মনে সস্তা খ্যাতি ও সুখ্যাতি পসন্দ করে, সে আল্লাহর সাথে তার বিশ্বাসের দাবীর ক্ষেত্রে কখনো সত্যবাদী হ’তে পারে না। একজন নিষ্ঠাবান মানুষের যখন কোন সমালোচনা করা হয়, তখন সে রেগে যায় এবং অহংকারবশত নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের জন্য বাহানা খুঁজে না। বরং সে নিজের ত্রুটি স্বীকার করে বলে, আল্লাহ সেই ভাইয়ের উপর রহম করুন, যিনি উপহার হিসাবে আমার ত্রুটিগুলো আমার সামনে তুলে ধরেছেন। যে ব্যক্তি নিজের কাজে আত্মমুগ্ধ হয়, সে কখনই নিজের ভেতরের দোষত্রুটি দেখতে পায় না। এমনকি সে যে নিজের ত্রুটি সম্পর্কে অসচেতন এই চরম সত্যটাও অনুধাবন করতে পারে না। বর্তমানে এটি মারাত্মক মরণব্যাধিতে পরিণত হয়েছে।

দ্বিতীয় ধাপ : আল্লাহর সান্নিধ্য লাভে সৎকর্ম সমূহ

সমস্ত আত্মিক ব্যাধি দূর করার পর একজন মুমিনের প্রধান দায়িত্ব হ’ল তার প্রতিটি নেক আমল পরিপূর্ণ ইখলাছ ও অত্যন্ত বিনয়ের সাথে সম্পাদন করা এবং যাবতীয় কল্যাণমূলক কাজে অগ্রগামী হওয়া। বান্দা যত দ্রুত ও ব্যাকুলতার সাথে নেক আমল নিয়ে মহান আল্লাহর দিকে এগিয়ে যায়, তার দয়াময় প্রতিপালকও তত দ্রুত তার দিকে কল্যাণ, বরকত ও নে‘মতের প্রাচুর্য নিয়ে এগিয়ে আসেন। নিম্নে সে সমস্ত সৎকর্ম সমূহ তুলে ধারা হ’ল।-

(১) ইখলাছপূর্ণ আমল করা : ইবাদতের পূর্ণতা আসে একনিষ্ঠ ইখলাছের ভিত্তিতে। আল্লাহ বলেন,وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ، ‘অথচ তাদেরকে এছাড়া কোন নির্দেশ দেয়া হয়নি যে, তারা খালেছ অন্তরে একনিষ্ঠভাবে কেবলমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে’ (বাইয়েনাহ ৯৮/৫)। ইবনু ওছায়মীন (রহঃ) বলেছেন, ইবাদতে ইখলাছ রক্ষার অর্থ হ’ল, বান্দাকে আল্লাহর প্রতি পরম ভক্তি, নিখাদ ভালোবাসা, তার ছওয়াব ও সন্তুষ্টির তীব্র আশা ছাড়া অন্য কোনো জাগতিক উদ্দেশ্য যেন ইবাদতের দিকে টেনে না আনে’।[5]

(২) অন্তরে খুশূ-খুযূ রাখা : অন্তরের খুশূ-খুযূ আল্লাহর নিবিড় সান্নিধ্য এনে দেয়। প্রত্যেক মুমিনের অপরিহার্য কর্তব্য হ’ল নিজেকে খুশূ-খুযূর চাদরে আবৃত করা। যেন সে তার রবের সামনে নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পন করতে পারে। প্রখ্যাত ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) বলেন, আমাদের ইসলাম গ্রহণ করার পর মাত্র চার বছর অতিবাহিত হ’তে না হ’তেই মহান আল্লাহ এই আয়াতটি নাযিল করে আমাদের অনুযোগ করলেন,أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِيْنَ آمَنُوْا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوْبُهُمْ لِذِكْرِ اللهِ ‘মুমিনদের কি সে সময় আসেনি যে, তাদের হৃদয় সমূহ বিগলিত হবে আল্লাহর স্মরণে? (হাদীদ ৫৭/১৬)[6]

আর বিনয়ীদের মর্যাদা সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন,وَبَشِّرِ الْمُخْبِتِيْنَ- الَّذِيْنَ إِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوْبُهُمْ، ‘এবং তুমি বিনয়ীদের সুসংবাদ দাও’। ‘আল্লাহর নাম স্মরণ করা হ’লে যাদের হৃদয় ভীত হয়’ (হজ্জ ২২/৩৪-৩৫)

(৩) নে‘মতদাতার দিকে দৃষ্টি রাখা : সুখের সময়ে যার অন্তরের দৃষ্টি নে‘মতকে ছাপিয়ে একমাত্র নে‘মতদাতার ওপর স্থির থাকে; বিপদের কঠিন মুহূর্তেও তার দৃষ্টি যাবতীয় কষ্টকে ছাড়িয়ে সরাসরি পরীক্ষা গ্রহণকারী আল্লাহর দিকেই নিবদ্ধ থাকে। সুখ কিংবা দুঃখ কোনো অবস্থাই তাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিচ্যুত করতে পারে না। ফলে তিনি জীবনের প্রতিটি মোড়ে মহান আল্লাহর মা‘রেফত বা গভীর পরিচয়ের সাগরে ডুবে থাকে। আল্লাহ যখন মূসা (আঃ)-এর কওম তথা বনু ইস্রাঈলকে সম্বোধন করেছেন, তখন তাদের আত্মিক স্তরের দুর্বলতার কারণে বলেছেন, اذْكُرُوْا نِعْمَتِيَ ‘তোমরা আমার নে‘মতকে স্মরণ করো’ (বাকারাহ ২/৪০)। কিন্তু তিনি উম্মতে মুহাম্মাদীকে সম্বোধন করে বলেছেন, فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ ‘সুতরাং তোমরা একমাত্র আমাকেই স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব’ (বাক্বারাহ ২/১৫২)। সুতরাং সর্বাবস্থায় নে‘মতদাতা আল্লাহর দিকে দৃষ্টি রাখলেই হৃদয়ের প্রশান্তি পাওয়া সম্ভব।

(৪) রবের প্রতি ভয় ও আশা রাখা : দুনিয়ার একটি ক্ষণস্থায়ী চাকুরীর জন্য যদি আমরা ক্যামেরা ও অদৃশ্য পরিদর্শকের ভয়ে এতটা সুশৃঙ্খল ও বিনম্র হ’তে পারি, তবে যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, যার ফেরেশতারা প্রতি মুহূর্তে আমাদের প্রতিটি আমল লিপিবদ্ধ করছেন এবং যিনি আমাদের অন্তরের গোপন খবরাখবর জানেন, সেই মহান রবের সামনে আমাদের জীবন কতটা সজাগ ও অনুগত হওয়া উচিত? আসুন, আমরাও আমাদের জীবনকে আল্লাহর রহমতের আশা এবং তার শাস্তির ভয়ের দোলাচলে সাজিয়ে তুলি, যা আমাদের পৌঁছে দিবে আল্লাহর নিবিড় সান্নিধ্যে এবং হৃদয়ের কাঙ্ক্ষিত অনাবিল প্রশান্তিতে। যেমন আল্লাহ বলেন,إِنَّهُمْ كَانُوْا يُسَارِعُوْنَ فِي الْخَيْرَاتِ وَيَدْعُوْنَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوْا لَنَا خَاشِعِيْنَ- ‘তারা সর্বদা সৎকর্মে অগ্রণী থাকত। তারা আকাংখা ও ভীতির সাথে আমাদের আহবান করত। আর তারা ছিল আমাদের প্রতি বিনীত’ (আম্বিয়া ২১/৯০)

(৫) আল্লাহর ইবাদতে অবিচলতা : ইবাদতের পথ সবসময় কুপ্রবৃত্তির কাছে কিছুটা কঠিন ও শ্রমসাধ্য মনে হয়। কিন্তু এই সাময়িক কষ্টের আড়ালেই লুকিয়ে আছে আল্লাহর নিবিড় সান্নিধ্য এবং অন্তরের স্থায়ী প্রশান্তি। ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি চিরস্থায়ী সৌভাগ্য ও অনাবিল সুখের স্বাদ আস্বাদন করতে চায়, সে যেন নিজেকে সর্বাবস্থায় আল্লাহর দাসত্বের দোরগোড়ায় আবদ্ধ করে রাখে’।[7] মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (ছাঃ)-কে তার ইবাদত ও আনুগত্যের ওপর চরম ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দিয়ে পবিত্র কুরআনে বলেন,رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا فَاعْبُدْهُ وَاصْطَبِرْ لِعِبَادَتِهِ هَلْ تَعْلَمُ لَهُ سَمِيًّا- ‘তিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল এবং এ দু’য়ের মধ্যবর্তী সবকিছুর পালনকর্তা। অতএব আপনি তাঁরই ইবাদত করুন ও তাঁরই ইবাদতে অবিচল থাকুন। আপনি কি তাঁর সমতুল্য কাউকে জানেন?’ (মারিয়াম ১৯/৬৫)

(৬) আমলের সৌন্দর্যের প্রতি যত্নশীল হওয়া : আজকাল অনেক মানুষ কেবল বাহ্যিক আমল ও আনুষ্ঠানিকতা নিয়েই ভীষণ ব্যস্ত। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, বাহ্যিক ইবাদত বা আমলগুলোর বিধান শরী‘আতে মূলত এজন্যই দেওয়া হয়েছে, যাতে এর মাধ্যমে মানুষের অন্তরের সংশোধন, স্থিরতা এবং একমাত্র আল্লাহর দিকে মুখ ফেরানোর তাওফীক অর্জন করতে পারে। বাহ্যিক আমলের সাথে নিয়তের সম্পর্ক ঠিক তেমনই, যেমন মানুষের দেহের সাথে তার রূহের সম্পর্ক। রূহ বা আত্মা যদি পবিত্র ও সুন্দর হয়, তবে মানবদেহটিও পবিত্র ও সুন্দর থাকে। আর রূহ যদি অপবিত্র হয়, তবে দেহটিও অপবিত্র হয়ে যায়।[8]

আমরা আমাদের আমলগুলোর বাহ্যিক সংখ্যার চেয়ে তার অভ্যন্তরীণ রূহ বা নিয়তের বিশুদ্ধতার প্রতি বেশি যত্নশীল হই। তবেই আমাদের আমলগুলো আল্লাহর দরবারে কবুল হবে এবং আমাদের অশান্ত হৃদয়ে আল্লাহর নিবিড় সান্নিধ্যের প্রকৃত প্রশান্তি নেমে আসবে। আর এজন্যই রাসূল (ছাঃ) বলেন,إِنَّ اللهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ، وَلَكِنْ يَّنْظُرُ إِلَى قُلُوْبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ- ‘আল্লাহ তোমাদের চেহারা ও ধন-সম্পদের দিকে দেখেন না, তিনি দেখেন তোমাদের অন্তরসমূহ এবং আমলসমূহ’।[9]

(৭)সর্বোত্তম কথার অনুকরণ : জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বোত্তম ও নিখুঁত পথের অনুসারী ব্যক্তির জন্য রয়েছে সুসংবাদ। আল্লাহ বলেন,فَبَشِّرْ عِبَادِ الَّذِيْنَ يَسْتَمِعُوْنَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُوْنَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِيْنَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُوْلُوْ الْأَلْبَابِ- ‘অতএব সুসংবাদ দাও আমার বান্দাদের, যারা মনোযোগ দিয়ে কথা শোনে, অতঃপর তার মধ্যে উত্তমটির অনুসরণ করে। তাদেরকে আল্লাহ সুপথে পরিচালিত করেন এবং তারাই হ’ল জ্ঞানী’ (যুমার ৩৯/১৭-১৮)

(৮)আল্লাহর ও তাঁর রাসূলের ডাকে তাৎক্ষণিক সাড়া দেওয়ার : আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনের পথে অন্যতম প্রধান শর্ত হ’ল আল্লাহ এবং তার রাসূল (ছাঃ)-এর যেকোনো নির্দেশ ও ডাক শোনামাত্রই কোনো প্রকার বিলম্ব ছাড়া তাৎক্ষণিক সাড়া দেওয়া। হযরত আবু সাঈদ বিন মুআল্লা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি একদা মসজিদে ছালাত আদায় করছিলাম, এমন সময় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাকে ডাকলেন। কিন্তুআমি (ছালাতরত থাকায়) তাৎক্ষণিক তার ডাকে সাড়া দিতে পারলাম না। ছালাত শেষ করে আমি যখন তাঁর নিকট আসলাম, তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি যখন তোমাকে ডাকলাম, তখন কিসে তোমাকে আমার কাছে আসতে বাধা দিল? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি ছালাত আদায় করছিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ‘কেন, মহান আল্লাহ কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,يَاأَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا اسْتَجِيْبُوْا لِلَّهِ وَلِلرَّسُوْلِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيْكُمْ، ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আহবানে সাড়া দাও। যখন তিনি তোমাদের আহবান করেন ঐ বিষয়ের দিকে যা তোমাদেরকে জীবন দান করে’ (আনফাল ৮/২৪)[10] আল্লাহর বিধানের সামনে আমাদের আত্মসমর্পণ যেন হয় তাৎক্ষণিক ও নিঃশর্ত। তবেই আমাদের জীবনে নেমে আসবে ঈমানের অমিয় মিষ্টতা এবং আল্লাহর নিবিড় সান্নিধ্যে হৃদয়ের কাঙ্ক্ষিত প্রশান্তি।

ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, ‘মানুষের মধ্যে খুব কম ব্যক্তিই এই সূক্ষ্ম বিষয়টি টের পেয়ে থাকে। অনেকের জ্ঞান তো এই স্তর পর্যন্ত পৌঁছায়ই না যে শয়তান (মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য) অনেক সময় কল্যাণের সত্তরটি দরজা খোলার নির্দেশ দেয়! হয় সে এই ভালো কাজগুলোর অসীলা নিয়ে মূলত মন্দের একটি নির্দিষ্ট দরজায় পৌঁছাতে চায়, অথবা এর মাধ্যমে সে বান্দার এমন এক সুমহান, অতি-মর্যাদাপূর্ণ ও সর্বোত্তম কল্যাণকে হাতছাড়া করিয়ে দিতে চায়, যা ঐ সত্তরটি দরজার চেয়েও অনেক বেশি শ্রেষ্ঠ ও মহান ছিল’।[11] 

(৯) ছালাতের মাধুর্যতা গ্রহণ করা : ছালাত হ’ল এমন এক মযবুত সেতু, যা পার হয়ে মুত্তাকী পরহেযগারগণ তাদের হৃদয়ের শীতলতা লাভ করেন এবং এর মাধ্যমে বিনীত অন্তরের অধিকারী বান্দাগণ তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ চাওয়া ও চূড়ান্ত গন্তব্য খুঁজে পান। বিখ্যাত তাবেঈ বিদ্বান বকর বিন আব্দুল্লাহ আল-মুযানী (রহঃ) মানুষের এই পরম সৌভাগ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘হে বনু আদম! তোমার চেয়ে সৌভাগ্যবান আর কে আছে? তোমার জন্য ছালাতের স্থান এবং ওযূর পথ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। তুমি যখনই চাও, কোনো প্রকার অ্যাপয়েন্টমেন্ট বা মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই সরাসরি তোমার মহান রবের দরবারে প্রবেশ করতে পারো এবং তার সাথে একান্তে কথোপকথন করতে পারো’।[12] 

ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) ছালাতের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক সুমিষ্ট ফলের বিবরণ দিয়ে বলেন, ‘দুনিয়াতে যার চোখ ছালাতের মাধ্যমে শীতল হ’ল, আখেরাতেও পরম রবের নৈকট্য লাভের মাধ্যমে তার চোখ জুড়িয়ে যাবে। শুধু আখেরাতে নয়, দুনিয়াতেও সে পরম শান্তি লাভ করবে। আর দুনিয়াতে যার চোখ একমাত্র আল্লাহকে পেয়ে শীতল হয়, তাকে দেখে জগতের অন্য সব সৃষ্টির চোখও শীতল হয়ে যায়। পক্ষান্তরে, যার চোখ আল্লাহকে পেয়ে শীতল হ’ল না, দুনিয়ার হাযারো প্রাপ্তির ভিড়েও তার আত্মা কেবলই আফসোস, দীর্ঘশ্বাস আর একাকীত্বের আগুনে পুড়তে থাকবে’।[13] যখন আমাদের ছালাত খুশূ-খুযূ আর ইখলাছের আলোয় জীবন্ত হয়ে উঠবে, তখনই আমরা আস্বাদন করতে পারব ঈমানের প্রকৃত স্বাদ এবং আল্লাহর নিবিড় সান্নিধ্যে হৃদয়ের সেই অনাবিল ও কাঙ্ক্ষিত স্বর্গীয় প্রশান্তি।

(১০) ইবাদতে নিয়মিত অবিচল থাকা : আল্লাহর সান্নিধ্যের মধ্য দিয়ে জীবনে প্রশান্তি আনতে সাধ্যানুযায়ী নিয়মিত ইবাদতে ব্রতী হ’তে হবে। দৈনিক ফরয ও সুন্নাতের পাশাপাশি তাহাজ্জুদ ও চাশতসহ কুরআন তেলাওয়াতে অভ্যস্ত হ’তে হবে। শুরুতে এই পথ কিছুটা কঠিন বা ক্লান্তিকর মনে হ’তে পারে। কিন্তু ধৈর্যের সাথে লেগে থাকলে একসময় এই আমলগুলোই পানাহারের মতো জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অভ্যাসে পরিণত হবে। তাই অলসতা আর অজুহাতকে পেছনে ফেলে, আললাহর রহমতের আশা আর অন্তরের গভীর ভালোবাসা নিয়ে আজ থেকেই অবিচল হউন; কারণ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নিয়মিত প্রচেষ্টাগুলোই জীবনে এনে দেবে হৃদয়ের অনাবিল প্রশান্তি আর পরকালের সফলতা।

(১১) দৈহিক ইবাদতসমূহের প্রতি যত্নশীল হওয়া : ঈমান আনার পর মহান আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এবং অধিক ছওয়াবের আমল হ’ল দৈহিক ইবাদতসমূহ। তথাপি দৈহিক ইবাদতসমূহ। কেননা ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর স্ত্রীদের নিকট আগত তিন ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ইবাদত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। কিন্তু জবাব শুনে তারা এটাকে খুবই কম মনে করে বলে, রাসূল (ছাঃ)-এর তুলনায় আমরা কোথায়? তাঁর পূর্বের ও পরের সকল পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। অতঃপর তিনজনের একজন বলল, এখন থেকে আমি সারা রাত ছালাত আদায় করব। আরেকজন বলল, আমি সারা বছর ছিয়াম পালন করব, ত্যাগ করব না। অপরজন বলল, আমি নারী সংশ্রব হ’তে দূরে থাকব, কখনো বিবাহ করব না। অতঃপর রাসূল (ছাঃ) তাদের নিকটে আসলেন এবং বললেন, ‘তোমরা কি এরূপ এরূপ বলছিলে?أَمَا وَاللهِ إِنِّي لَأَخْشَاكُمْ لِلَّهِ، وَأَتْقَاكُمْ لَهُ، لَكِنِّي أَصُومُ وَأُفْطِرُ، وَأُصَلِّي وَأَرْقُدُ، وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ، فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي- মনে রেখ! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের মধ্যে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশী ভয় করি এবং আমি সবচেয়ে বেশী পরহেযগার। কিন্তু আমি ছিয়াম পালন করি ও ছিয়াম ত্যাগ করি। আমি ছালাত আদায় করি ও ঘুমাই। আর আমি বিবাহ করেছি। অতএব যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত থেকে দূরে সরে যাবে, সে আমার দলভুক্ত নয়’।[14]

যে ব্যক্তি ইবাদতের আধ্যাত্মিক সুফল সম্পর্কে জানতে পারে, তার কাছে আমল করা অত্যন্ত সহজ ও আনন্দদায়ক হয়ে ওঠে। ফলে ইবাদত ছাড়া অন্য কাজে সময় নষ্ট করা কষ্টকর মনে হয়। এর মাধ্যমে বান্দার অন্তর ঈমানের আলোয় আলোকিত হয় এবং শরীরের প্রতিটি অঙ্গ আল্লাহর সামনে বিনম্রতার সৌন্দর্যে সুশোভিত হয়। এই অবস্থাটি ইহকালে মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য এনে দেয় এবং পরকালের চিরস্থায়ী সুখের পথ সুগম করে।

(ক্রমশঃ)

[কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সদস্য, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ ও কেন্দ্রীয় দাঈ, আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ]

 

 

[1]. মাদারিজুস সালিকীন ২/৩১৬।

[2]. বুখারী হা/৬৪৪৪ ‘রিক্বাক্ব’ অধ্যায়।

[3]. ইবনু আবিদ্দুনিয়া ৩/২৬৪ পৃ.।

[4]. মুসলিম হা/২৮৬৫; মিশকাত হা/৪৮৯৮।

[5]. মাজমূ‘ ফাতাওয়া ২১/১৮ পৃ.।

[6]. মুসলিম হা/৩০২৭।

[7]. মাদারিজুস সালিকীন ১/৪২৯ পৃ.।

[8]. বুখারী হা/৫২; মুসলিম হা/১৫৯৯; মিশকাত হা/২৭৬২।

[9]. মুসলিম হা/২০৮৭; মিশকাত হা/৫৩১৪, রাবী আবু হুরায়রা (রাঃ)।

[10]. বুখারী হা/৪৪৭৪।

[11]. বাদায়িউল ফাওয়ায়িদ ২/৪৮৫ পৃ.।

[12]. হায়াতুস সালাফ বায়নাল কওলে ওয়াল আমাল ১৯৭ পৃ.।

[13]. আল-ওয়াবিলুছ ছাইয়িব ২৩-২৪ পৃ.।

[14]. বুখারী হা/৫০৬৩; মুসলিম হা/১৪০১; মিশকাত হা/১৪৫ ‘ঈমান’ অধ্যায় ‘কিতাব ও সুন্নাহ অাঁকড়ে ধরা’ অনুচ্ছেদ, রাবী আনাস (রাঃ)।



বিষয়সমূহ: আমল
আরও