যুবসমাজে নব্য জাহেলিয়াত ও উত্তরণের উপায়

ফায়ছাল মাহমূদ 13 বার পঠিত

ভূমিকা : জাহেলিয়াত একটি কলুষিত মানসিক অবস্থা ও বিভ্রান্তিকর জীবনদর্শন। এই দর্শনের পরতে পরতে লেপ্টে আছে ঘোর অন্ধকারের ছাপ। মেঘের ঘনঘটা যেমন চারপাশকে নিমিষেই অন্ধকারাচ্ছন্ন করে ফেলে, তেমনি জাহেলিয়াতও মানবসমাজকে এক চরম নৈরাজ্যের আঁধারে ডুবিয়ে দেয়। মূলত আলোর বিপরীত যেমন অন্ধকার, তেমনি জ্ঞানের বিপরীত হ’ল জাহেলিয়াত। জাহেলিয়াত সমাজজুড়ে তৈরি করে এক মরীচিকার ধোঁয়াশা, যা মানুষকে সত্য অনুধাবনের যোগ্যতা থেকে বঞ্চিত করে এবং ভালো-মন্দ বুঝে ওঠার আগেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। একজন মুসলিমের জন্য ‘জ্ঞান’ হ’ল প্রকৃতপক্ষে ততটুকু ইলম, যা জানা তার জন্য ফরয এবং যা তাকে মূর্খতার আবর্ত থেকে মুক্ত এক আল্লাহর আনুগত্যের পথ দেখায়। আলোচ্য প্রবন্ধে যুব সমাজে নব্য জাহেলিয়াতের স্বরূপ ও উত্তরণের উপায় সম্পর্কে আলোচনার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ!

জাহেলিয়াত কী? جاهليّة শব্দের আভিধানিক অর্থ অজ্ঞতা, মূর্খতা, জ্ঞানহীনতা ইত্যাদি। শারঈ পরিভাষায়, জাহেলিয়াত কেবল জ্ঞানহীনতা নয়, যা জ্ঞানের বিপরীত; বরং এর অর্থ হ’ল প্রবৃত্তির অনুসরণ করা, গোঁড়ামি করা এবং আল্লাহর হেদায়াতের জ্ঞান ও বিধান থেকে মুখ ফিরিয়ে বাতিল রীতিনীতি, মতামত ও আইনের দিকে ধাবিত হওয়া।

অতএব, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর আনীত আক্বীদা, আহকাম ও আখলাকের বিপরীত যা কিছুই রয়েছে, তাই জাহেলিয়াতের অন্তর্ভুক্ত। আরো স্পষ্ট করে বলা যায়, আল্লাহর বিধানের বিপরীত যা কিছু তাই জাহেলিয়াত। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধান ব্যতীত অন্য বিধান কামনা করে, সে বস্ত্তত জাহেলিয়াতের অনুসরণ করে’।[1]

নব্য জাহেলিয়াত

তথাকথিত আধুনিক সমাজে প্রথাগত ডিগ্রিধারী বহু ‘জ্ঞানী’ মানুষের অভাব নেই। কিন্তু আত্মিক আলোর সেই প্রকৃত জ্ঞান তাদের মাঝে অনুপস্থিত। আর এই প্রকৃত জ্ঞানের অভাবেই শিক্ষিতদের মাধ্যমেই মানবসমাজে যুলুম, অত্যাচার ও নিপীড়ন মহামারি আকার ধারণ করেছে। যৌবনের টগবগে রক্ত নিয়ে কোনো তরুণ যখন আলোর পথে এগিয়ে যেতে চায়, তখন নব্য জাহেলিয়াত তাকে চারদিক থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে ধরে। কখনো মরীচিকার হাতছানি, কখনো আলো-অাঁধারির গোলকধাঁধা, কখনো সত্যের ছদ্মবেশে মিথ্যার ফুলঝুরি, আবার কখনো বা ধর্মের নামে অধর্মের বেড়াজাল। ফসলের মাঠে অতিরিক্ত আগাছার ভিড়ে আসল ফসল যেমন তার স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও গতি হারিয়ে যায়। ঠিক তেমনি বর্তমান যুবসমাজও এক বৈরী পরিস্থিতির মুখোমুখি। বহু যুবক তাদের জীবনের এই সোনালী বসন্তকে রবের সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করতে চায়। কিন্তু চারপাশের এই জাহেলী পরিবেশের কারণে তীব্র চেষ্টা সত্ত্বেও অনেকে আলোর সঠিক পথ খুঁজে পেতে ব্যর্থ হন। নিম্নে যুব সমাজে নব্য জাহেলিয়াত সমূহ ধরা হ’ল।

১. শিক্ষায় জাহেলিয়াত : বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার বড় জাহেলিয়াত হ’ল শিক্ষা বলতে আজ যুবকদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে শুধুই অর্থ উপার্জন, বিলাসী জীবন ও জাগতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার এক চরম বস্ত্তবাদী মানসিকতা। শিক্ষা যে রবের প্রদত্ত এক শ্রেষ্ঠ নে‘মত, আর এর মাধ্যমে যে স্রষ্টার মহত্ত্বকে চেনা এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করাই মুখ্য উদ্দেশ্য, তা সমাজ থেকে সম্পূর্ণ মুছে দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্মের সামনে বিষাক্ত উপঢৌকন হিসেবে তুলে দেওয়া হয়েছে অবাধ মিশ্রণের পরিবেশ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে উদীয়মান যুবকদের টগবগে যৌবনে লালসার সুড়সুড়ি দিয়ে তাদের নৈতিকতা, চারিত্রিক পবিত্রতা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে অঙ্কুরেই ধ্বংস করে দিচ্ছে। ফলে বিদ্যাপীঠগুলো আজ জ্ঞানচর্চার পবিত্র কেন্দ্রের পরিবর্তে অনৈতিকতার অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।

২. সংস্কৃতিতে জাহেলিয়াত : আজকের সংস্কৃতি যেন জাহেলিয়াতের সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী। উৎসব ও বিনোদনের নামে এখানে চলছে পশ্চিমা ও বিজাতীয় অপসংস্কৃতির অন্ধ ও নির্লজ্জ অনুকরণ। আর এই পঙ্কিলতার স্রোতে গা ভাসিয়ে তথাকথিত সুশীল সমাজ ও বুদ্ধিজীবীরা উল্টো ইসলামের অনুসারীদের দিকেই আঙুল তুলছেন। কোনো যুবক ইসলামের পথে চলতে চাইলে তারা তাকে ‘ধর্মান্ধ-জঙ্গি’ ‘মধ্যযুগীয় বর্বর’, কিংবা ‘মৌলবাদী’র মতো নানা ট্যাগ লাগাতে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ করেন না।

আশ্চর্যের বিষয় হ’ল, কথিত প্রগতিশীলরাই আবার অবলীলায় উচ্চারণ করেন, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ এর মতো চরম কুফরি ও ঈমানবিধ্বংসী সেলাগান! সংস্কৃতির মোড়কে এই প্রচ্ছন্ন কুফর ও ফিতনা আজ মুসলিম যুবসমাজের ঈমানী দেয়ালকে প্রতিনিয়ত আঘাত করে চলেছে।

৩. সাহিত্যে জাহেলিয়াত : সাহিত্যকে বলা হয় সমাজের দর্পণ। বর্তমান সমাজব্যবস্থায় সাহিত্যিকগণ শব্দ ও পরিভাষায় ছলচাতুরির জাহেলিয়াত তৈরি করে যুবসমাজকে বিভ্রান্তির গোলকধাঁধায় নিক্ষেপ করেছে। অতি সুক্ষ্মভাবে পাপের নাম বদলে দিয়ে সেটিকে আকর্ষণীয় রূপে যুবকদের সামনে পেশ করা হচ্ছে। যেমন, প্রকাশ্য ব্যভিচার ও যিনাকে বলা হচ্ছে লিভ টুগেদার, নগ্নতা ও বেহায়াপনার প্রহসনকে বলা হচ্ছে প্রগতি, জঘন্য সুদকে বলা হচ্ছে মুনাফা, প্রকাশ্য ঘুষকে উপরি বা সার্ভিস চার্জ এবং সর্বগ্রাসী পাপাচারকে মডার্নিজম বা আধুনিকায়ন বলে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে।

এমনকি কখনো কখনো একশ্রেণীর দরবারী আলেম ও নামধারী মুফতী ফৎওয়া দিয়ে পরিষ্কার হারামকে জায়েয বানিয়ে যুবকদের বিভ্রান্ত করছে। পাপকে পাপ মনে না করার এই মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি যুবককে সঠিক দ্বীনে ফিরে আসা এবং সরল পথ খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে দিন দিন কঠিনতর বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

৪. দর্শনে জাহেলিয়াত : সেক্যুলার বা নাস্তিক্যবাদী চিন্তাধারার এমন এক মায়াজাল, যা খুব সহজেই তাদের মনে আল্লাহ, ইসলাম ও পরকাল নিয়ে নানামুখী সংশয় তৈরি করছে। পুরো সামাজিক ও একাডেমিক পরিবেশকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যা যুবসমাজকে কেবলই নশ্বর দুনিয়ার পেছনে ছুটতে বাধ্য করে এবং জাগতিক স্বার্থ অর্জনে এক অন্ধ ও ব্যাকুল মানসিকতা তৈরি করে। আজকের তরুণরা কুরআন-সুন্নাহ থেকে যোজন যোজন দূরে। এভাবে বহু মুসলিম যুবক তাওহীদের অমিয় সুধা থেকে বঞ্চিত হয়ে ঘোর নাস্তিক্যবাদ ও সংশয়বাদের অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে।

৫. মানসিকতা ও চিন্তার জাহেলিয়াত : মানুষের চিন্তা ও মনস্তত্ত্ব যদি আল্লাহর তাওহীদ, রাসূলের সুন্নাহ এবং পরকালের চেতনা থেকে বিচ্যুত হয়, শরী‘আতের দৃষ্টিতে সেটাই চিন্তার জাহেলিয়াত। অর্থাৎ বাহ্যিকভাবে আধুনিক বা সভ্য দাবির সাথে চিন্তাভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতা ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের (আক্বীদা) সাথে সাংঘর্ষিক হওয়া। প্রবৃত্তির গোলামী, বস্ত্তবাদ, হিংসা, অহংকার, কৌলিন্য প্রথা, গোড়ামী, অন্ধ অনুসরণ-অনুকরণ, আল্লাহর বিধানের চাইতে মানুষের বিধানকে উত্তম মনে করা বা কখনো তুলনার ক্ষেত্রে চিন্তায় আনা, নৈতিক অবক্ষয় বা পতন কে প্রগতি মনে করা ইত্যাদি মানসিকতা ও চিন্তার জাহেলিয়াত।

৬. চক্ষুর জাহেলিয়াত : বর্তমান যুগে চক্ষুর জাহেলিয়াত এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। হাতের স্মার্টফোনটি আজ যেন অশ্লীলতার এক উন্মুক্ত ক্যানভাস। যেখানে নযর হেফাযত করা তরুণদের জন্য সবচেয়ে বড় ঈমানী চ্যালেঞ্জ। বিষয়টি এমন এক ট্রাজিক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মানুষ যত বেশি আধুনিক প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে, তত বেশি তার চোখের নিয়ন্ত্রণ ও পবিত্রতা হারিয়ে ফেলছে। ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রামের নানা ফিচারে আঙুলের প্রতিটি স্ক্রলিং যেন পাপের ঝুলিকে ভারী করে তুলছে।

শুধু ভার্চুয়াল জগৎই নয়, বাস্তবের স্কুল-কলেজ, হাট-বাজার, অফিস-আদালত কিংবা কর্মস্থলের সর্বত্রই যেন আজ পাপের প্রকাশ্য পসরা সাজিয়ে রাখা হয়েছে। চোখ মেলে তাকালেই যেন নযরের খেয়ানত আর চোখের যেনার এক অলঙ্ঘনীয় ফাঁদ পেতে রাখা হয়েছে। এই সর্বব্যাপী চাক্ষুষ ফিতনার মাঝে নিজের দৃষ্টিকে পবিত্র রাখা বর্তমান যুবসমাজের জন্য এক কঠিন ঈমানী লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৭. ফিউচার প্ল্যানিং এর ক্ষেত্রে জাহেলিয়াত : যুবক যেŠবনকালে পদার্পণ করার পূর্বে সে চিন্তা করে ভবিষ্যতে আমাকে একটি ভালো ক্যারিয়ার গড়তে হবে, মানসম্মত চাকরি পেতে হবে, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হ’তে হবে, সংসারের হাল ধরতে হবে ইত্যাদি। সে চারপাশে কত শুভাকাংখীর মুখে দো‘আ আর পরামর্শের ফুলঝুরি দেখতে পায়। কিন্তু তারপর চিরস্থায়ী জীবনের জন্য তার কোন পরিকল্পনা থাকে না। সে তার দ্বীন নিয়ে কখনো চিন্তা করেনা। কেউ তার মনে এরূপ চিন্তার বীজ বুনে দেয় না। কথিত এ সভ্য সমাজে সে এভাবেই বেড়ে উঠতে থাকে।

৮. উগ্রতার ফাঁদ : সঠিক দ্বীনী ইলম বা জ্ঞান ছাড়া কেবল অন্ধ আবেগের বশে চরমপন্থী চিন্তা লালন করা এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়ার এক ভয়াবহ প্রবণতা বর্তমান যুবসমাজের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। ইসলামের প্রকৃত জ্ঞান না থাকায় বহু আবেগপ্রবণ যুবক উগ্র ও চরমপন্থী ব্যক্তিবর্গ এবং নামধারী কিছু সংগঠনের পাতা ফাঁদে পা দিচ্ছে। তারা জিহাদের নামে সন্ত্রাসবাদ আর ধর্মের নামে অধর্মকে বুকে টেনে নিয়ে সমাজে নানামুখী ফিৎনা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে।

এর পাশাপাশি বাংলার সরলমনা বহু যুবককে নোংরা রাজনৈতিক আবর্তে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। চতুর নেতারা নিজেদের কায়েমী স্বার্থ হাছিল করার জন্য এই তরুণদের ব্যবহার করে। ফলশ্রুতিতে, বহু সম্ভাবনাময় যুবকের ইহকাল ও পরকাল উভয় জীবন ধ্বংসের অতল গহবরে তলিয়ে যাচ্ছে।

৯. শিথিলতার জাহেলিয়াত : মন পরিষ্কার থাকলে পর্দা বা আমল লাগে না। এটি বর্তমান যুগের অন্যতম এক শয়তানের সূক্ষ্ম ধোঁকা। এমন কিছু চটকদার ও মন-ভোলানো সেলাগান দিয়ে আজকের যুবসমাজকে তার মূল ইবাদত-বন্দেগী থেকে সুকৌশলে গাফেল করে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে একশ্রেণীর যুবক অবলীলায় ভাবছে, এখন তো কেবল জীবনের শুরু, বৃদ্ধ হব যখন তখন ইবাদত করব, দাড়ি রাখব, হজ্জ করব আর ইসলামের বিধি-নিষেধগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ পালন করব। আবার কেউ কেউ তো আরও একধাপ এগিয়ে চরম ধৃষ্টতার সাথে বলে বসেন, ছালাত আদায় না করলেও আমার ঈমান ঠিক আছে!

দুঃখজনক বিষয় হ’ল, ঘরের অভিভাবক তথা পিতা-মাতাও আজ এই জাহেলিয়াতের অংশীদার হয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা সন্তানকে আদর করে বলছেন, পরীক্ষার সময় ছিয়াম পালন করতে হবে না, এই বয়সে কেউ দাড়ি রাখে, জীবনের তো বহু সময় বাকি! আস্তাগফিরুল্লাহ ! অথচ তারা ভুলে যান যে, মৃত্যুর কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। আমরা প্রতিনিয়ত চোখের সামনে দেখছি, বহু তরতাজা যুবক যৌবনের প্রারম্ভেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে কবরের বাসিন্দা হয়ে যাচ্ছে। জীবনের বাকি সময়টুকু পাওয়ার গ্যারান্টি তাদের কে দিল?

১০. দাওয়াত দানে জাহেলিয়াত : বর্তমান পৃথিবীতে দুই ধরনের দাওয়াত চলছে একটা আল্লাহর পথে আর একটা তাগুত বা শয়তানের পথে। বহু যুবকে আমরা দেখি তারা শয়তানের পথে, তাগুতের পথে বা দুনিয়া হাছিলের জন্য যুবকদের আহবান করে। অথচ একজন মুসলিম যুবক হিসাবে তার দাওয়াত দানের কথা ছিল কল্যাণের পথে, আখেরাতের পথে, আল্লাহর দিকে। আমরা বহু যুবককে দেখি তাগুতী দাওয়াত বা কুফরী দাওয়াত গ্রহণ করে তাদের দ্বীন-দুনিয়া সর্বস্ব হারিয়ে ফেলছে। দুনিয়া হাছিলের আহবান করে যুবক তার জান্নাত হারিয়ে জাহান্নামের কাঠখড়িতে পরিণত হচ্ছে।অথচ হাদীছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জাহিলী যুগের আহবান (স্লোগান বা পক্ষপাতমূলক ডাক) দেয়, সে জাহানণামের অধিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত’। একজন ছাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে যদি ছালাত আদায় করে এবং ছিয়াম পালন করে, তবুও? তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, যদিও সে ছালাত আদায় করে এবং ছিয়াম পালন করে। অতএব তোমরা আল্লাহর সেই আহবানে আহবান কর, যেখানে তিনি তোমাদের মুসলিম, মুমিন এবং আল্লাহর বান্দা নামে অভিহিত করেছেন’।[2]

উত্তরণের উপায়

১. জ্ঞানার্জনে ব্রতী হোন! এখনই সময় আমাদেরকে ওহীর জ্ঞানে আলোকিত হয়ে নিজের মন-মগজ ও মেধাকে শানিত করা। বিদ্যার শক্তিশালী তরবারি দিয়ে এই সমস্ত ফিতনাকে টুকরা টুকরা করা বা নিঃশেষ করা সম্ভব। চতুর্দিক থেকে ধেয়ে আসা জাহেলিয়াতকে রুখতে জ্ঞানের ধারাল তরবারি আমাদেরকে সর্বদা প্রস্ত্তত রাখতে হবে। কেবল ইলম বা জ্ঞানই পারে জাহেলিয়াত ও ইসলাম এর মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে।

আল্লাহ বলেন,هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ- ‘যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান? বস্ত্তত জ্ঞানীরাই কেবল উপদেশ গ্রহণ করে থাকে (যুমার ৩৯/৯)। আল্লাহ বলেন, إِنَّمَا يَخْشَى اللهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ- ‘বস্ত্তত আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে’ (ফাত্বির ৩৫/২৮)

২. পরকালমুখী লক্ষ্য নির্ধারণ করুন! একজন মুসলিমের স্থায়ী আবাস হচ্ছে তার পরকাল। পরকালকে ঠিক রেখে ইহকাল পরিচালনা করতে হবে। কেন্দ্র ঠিক করুন! উপকেন্দ্র এমনিতেই নিয়ন্ত্রণে আসবে! আল্লাহ বলেন,بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا- وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَى ‘বরং তোমরা দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দাও। অথচ আখেরাতই উত্তম ও অধিক স্থায়ী’ (আ‘লা ৮৭/১৬-১৭)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন,مَنْ كَانَ يُرِيدُ حَرْثَ الْآخِرَةِ نَزِدْ لَهُ فِي حَرْثِهِ ‘যে ব্যক্তি আখেরাতের ফসল কামনা করে আমরা তার জন্য তার ফসল বাড়িয়ে দেই’ (শূরা ৪২/২০)

৩.হতাশার চাদর ছিঁড়ে ফেলুন! দুনিয়া না পাওয়ার ব্যর্থতা বা দুশ্চিন্তা, অর্থনৈতিক অভাবগ্রস্থতা, উচ্চভিলাসী লাইফস্টাইলে না পৌঁছানো, দুনিয়াবী লক্ষ্য বা টার্গেট পূরণে ব্যর্থ হওয়া ইত্যাদি বিষয় যেন আমাদের কখনো হতাশায় না ফেলে। সর্বদা ঈমান ও প্রকৃত বিশ্বাসের বলে আমরা যেন বলিয়ান হই। শয়তান যেন কখনোই কোন ধরনের জাহালাত বা অজ্ঞতার সুযোগে আমাদেরকে হতাশ না করে।

আল্লাহ বলেন, وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنْتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ- ‘আর তোমরা হীনবল হয়ো না, চিন্তান্বিত হয়ো না। তোমরাই বিজয়ী যদি তোমরা মুমিন হও’ (আলে-ইমরান ৩/১৩৯)

৪. দো‘আর দুর্গ গড়ে তুলুন! একজন সৈনিকের জন্য সেনানিবাস উত্তম আশ্রয় স্থল। যুদ্ধক্ষেত্রে দুর্গ বা কেল্লা তাকে সেভ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ঠিক তেমনি একজন মুসলিমের জীবনে দো‘আও নিরাপদ দুর্গ গড়ে তোলে, যা বিভিন্ন সমস্যার সমাধান, পাপ, হতাশা, দুশ্চিন্তা, অলসতা, অক্ষমতা ইত্যাদি থেকে রক্ষা করে। যেমন রাসূল (ছাঃ) অলসতা, হতাশা, দুঃখ-দুর্দশা দুশ্চিন্তা, অক্ষমতা ইত্যাদি থেকে দো‘আ করতেন,اللَّهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ مُنْكَرَاتِ الأَخْلَاقِ، وَالأَعْمَالِ وَالأَهْوَاءِ- ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট আশ্রয় চাই নিকৃষ্ট চরিত্র, নিকৃষ্ট কর্ম ও কুপ্রবৃত্তি থেকে’।[3]

৫. সমাজ সংস্কারে সচেষ্ট হৌন! পরিবার বা সমাজ থেকে যেহেতু মানুষ উঠে আসে। এখানেই দুর্গ গড়ে তুলতে হবে। এ সমাজ থেকেই সর্বপ্রকার জাহেলিয়াতকে উৎখাত করতে হবে। সমূলে উৎপাটন করতে হবে, ভেঙ্গে ফেলতে হবে তার শয়তানি কুমন্ত্রণা দানকারী সকল কপাট। সমাজ সংস্কারের ব্রতী হ’তে হবে সকল যুবককে। তেজদ্দীপ্ত ঈমানী বলে বলিয়ান হয়ে বাধার সকল প্রাচীর ভেঙ্গে দাওয়াত দিতে হবে এক আল্লাহর পথে। পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের পথে। মহান আল্লাহ বলেন,وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِمَّنْ دَعَا إِلَى اللهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ- ‘ঐ ব্যক্তির চাইতে কথায় উত্তম আর কে আছে, যে (মানুষকে) আল্লাহর দিকে ডাকে ও নিজে সৎকর্ম করে এবং বলে, নিশ্চয়ই আমি আজ্ঞাবহদের অন্তর্ভুক্ত’ (হা-মীম সাজদাহ ৪১/৩৩)

উপসংহার : হে প্রিয় যুবক ও তরুণ ভাই! সর্বত্র জাহেলিয়াতের তীব্র স্রোতে আমরা যদি ঈমান, আমল আক্বীদার শক্তিশালী বাঁধ না দিতে পারি, বাতিলের স্রোতে খড়-কুটোর ন্যায় ভেসে যাব, সমাজ ধ্বংস হবে। তখন কী জবাব দেব মহান রবের কাছে আমাদের যৌবনকালের? যৌবনের শক্তিমত্তার? আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞানের? অতএব আসুন! জাহেলিয়াতের সব বাধা উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে যাই। তাওহীদী ঝান্ডা উড্ডীন করি এবং মহান রবের সন্তুষ্টি কামনায় নিজের মেধা, শ্রম, বুদ্ধি, অর্থ সবকিছু খরচ করি। মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন। আমীন!

ফায়ছাল মাহমূদ

[কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ]


[1]. তাবারী, মায়েদাহ ৫/৫০ আয়াতের তাফসীর।

[2]. তিরমিযী হা/২৮৬৩; মুসনাদে আহমাদ হা/২২৯৭৮।

[3]. মিশকাত হা/২৪৭১; তিরমিযী ৩৫৯১।



বিষয়সমূহ: যুবসমাজ
আরও