সাংগঠনিক শৃঙ্খলায় কমান্ড এবং কন্ট্রোল

মুহাম্মাদ আব্দুন নূর 12 বার পঠিত

ভূমিকা : যেকোন সংগঠন, রাষ্ট্র বা আন্দোলনের সাফল্যের পেছনে দু’টি শক্তি নীরবে কাজ করে। সঠিক নেতৃত্ব (Command) এবং কার্যকর তদারকি (Control)। নেতৃত্ব থাকলেও যদি নিয়ন্ত্রণ না থাকে, তবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। আবার নিয়ন্ত্রণ থাকলেও দূরদর্শী নেতৃতব না থাকলে সংগঠন লক্ষ্যচ্যুত হয়। আদর্শ নেতৃত্বের জন্য এই দু’য়ের মধ্যে ভারসাম্য থাকা অতীব যরূরী। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বহু শক্তিশালী রাষ্ট্র ও সংগঠন বাহ্যিক শত্রুর আক্রমণে নয়; বরং নেতৃত্বের দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, সমন্বয়হীনতা এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ব্যর্থতার কারণেই পতনের মুখে পড়েছে।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছিলেন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ আদর্শ নেতা। মক্কী ও মাদানী জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তিনি পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, যোগ্য ব্যক্তির হাতে দায়িত্ব অর্পণ, ধারাবাহিক তারবিয়াত, সুশৃঙ্খল কর্মীবাহিনী গঠন এবং সংকট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে Command & Control-এর এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বর্তমান সময়ে বহু দুনিয়াবী ও ইসলামী সংগঠন নেতৃত্বের দুর্বলতা, পরিকল্পনাহীনতা, জবাবদিহিতার অভাব, প্রশিক্ষণের ঘাটতি ও ঐক্যহীনতার মতো সংকটে আক্রান্ত। এ প্রেক্ষাপটে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সীরাতের আলোকে Command & Control-এর মৌলিক নীতিমালা, বাস্তব প্রয়োগ ও সমকালীন সাংগঠনিক সংকট উত্তরণে করণীয় বিষয়গুলো সংক্ষেপে উপস্থাপনের প্রয়াস নেওয়া হয়েছে।

কমান্ড ও কন্ট্রোল :

কমান্ড (Command) : এটি হ’ল সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও দিকনির্দেশনা দেওয়ার মূল কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা। মূলত একজন নেতার দূরদর্শিতা, সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও হিকমতের মাধ্যমেই এটি গড়ে ওঠে। যা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করে কি করতে হবে তার নির্দেশ।

কন্ট্রোল (Control): এটি হ’ল সেই নির্দেশনাসমূহ কিভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে তা পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং সমন্বয় করার প্রক্রিয়া। এটি নিশ্চিত করে যে কাজগুলো পরিকল্পনা অনুযায়ী সঠিকভাবে হচ্ছে কি না (Monitoring/Evaluation) ।

ইসলামী সংগঠনে কমান্ড ও কন্ট্রোলের ভিত্তি : ইসলামে Command & Control-এর ভিত্তি চারটি মৌলিক নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত।

(১) আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর শর্তহীন আনুগত্য : অতঃপর নেতার প্রতি পূর্ণ আনুগত্য স্বীকার করা। যা ইসলামী নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বোচ্চ মানদন্ড নির্ধারণ করে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর এবং আনুগত্য কর রাসূলের ও তোমাদের নেতৃবৃন্দের’ (নিসা ৪/৫৯)। এখানে আল্লাহ ও রাসূল (ছাঃ)-এর আনুগত্য শর্তহীন ঘোষণা করা হয়েছে এবং অন্যান্য সকল নেতৃবৃন্দের অনুগত্য হবে আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্যের অধীন। যেমন আলী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘আল্লাহর অবাধ্যতায় কোন আনুগত্য নেই। আনুগত্য কেবল সৎকর্মে’।[1]

(২) শূরা বা পারস্পরিক পরামর্শ : যা নেতৃত্বকে স্বেচ্ছাচারিতা থেকে রক্ষা করে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে। আল্লাহ বলেন, ‘তাদের সকল কাজ পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়’ (শূরা ৪২/৩৮)।

(৩) জবাবদিহিতা : যার মাধ্যমে নেতা ও অধীনস্থ প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে আল্লাহর কাছে এবং প্রয়োজনে মানুষের কাছেও জবাবদিহির আওতাভুক্ত থাকে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই স্ব স্ব দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে’।[2]

(৪)নেতৃত্বকে আমানত হিসাবে গ্রহণ করা : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘নেতৃত্ব হচ্ছে একটি আমানত। আর ক্বিয়ামতের দিন তা হবে লাঞ্ছনা ও অনুশোচনার কারণ। তবে যে এর হক সম্পূর্ণ আদায় করবে তার কথা ভিন্ন’।[3]

এ চারটি নীতির সমন্বয়েই ইসলামী Command & Control ব্যবস্থা ন্যায়ভিত্তিক, সুশৃঙ্খল, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর নেতৃত্বের ভিত্তি রচনা করে।

কার্যকর কমান্ড ও কন্ট্রোলের জন্য নেতৃত্বের অপরিহার্য গুণাবলী :

ইসলামী সংগঠনে নেতৃত্ব কেবল নির্দেশ প্রদান নয়। বরং সঠিক দিকনির্দেশনা, আদর্শ চরিত্র এবং বিচক্ষণতার মাধ্যমে সংগঠনকে লক্ষ্যপানে পরিচালিত করার একটি আমানত। তাই একজন নেতার মধ্যে এমন কিছু গুণাবলি থাকা অপরিহার্য, যা তাঁর নেতৃত্বকে গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর করে তোলে। নিম্নে তা তুলে ধরা হ’ল।-

১. তাক্বওয়া: নেতৃত্বের মূল চালিকাশক্তি হ’ল আল্লাহভীতি বা তাক্বওয়া। যে নেতার হৃদয়ে তাক্বওয়া থাকে, তিনি কোন অন্যায়ের সাথে আপস করেন না এবং পদমর্যাদার অপব্যবহার থেকে নিজেকে মুক্ত রাখেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, يَا أَيُّهَا الذِّينَ آمَنُوا إِنْ تَتَّقُوا اللهَ يَجْعَلْ لَكُمْ فُرْقَانًا ‘হে মুমিনগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদেরকে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করার শক্তি (দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতা) দান করবেন’ (আনফাল ৮/২৯)।

২. যোগ্যতা ও দূরদর্শিতা : নেতৃত্ব দানের যোগ্য তিনি, যিনি জ্ঞান, দক্ষতা, আমানতদারিতা ও দায়িত্ব পালনে সক্ষম। কারণ যোগ্য নেতার নির্দেশ অধীনস্থরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করে এবং তাঁর প্রতি আস্থা ও শ্রদ্ধার ভিত্তিতেই সংগঠনে শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। একজন যোগ্য নেতা সংগঠন বা জাতিকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে পারেন। পক্ষান্তরে অযোগ্য নেতৃত্বের প্রতি অনীহা, অনাস্থা ও সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়। কার্যকর Command & Control প্রতিষ্ঠার প্রথম শর্তই হ’ল যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচন। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন,إِذَا ضُيِّعَتِ الأَمَانَةُ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ، قَالَ كَيْفَ إِضَاعَتُهَا يَا رَسُولَ اللهِ؟ قَالَ إِذَا أُسْنِدَ الأَمْرُ إِلَى غَيْرِ أَهْلِهِ، فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ ‘যখন আমানত নষ্ট করা হবে, তখন ক্বিয়ামতের অপেক্ষা করো’। জিজ্ঞাসা করা হ’ল, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমানত কিভাবে নষ্ট হবে? তিনি বললেন, ‘যখন দায়িত্ব অযোগ্য ব্যক্তির হাতে অর্পণ করা হবে, তখন ক্বিয়ামতের অপেক্ষা করো’।[4]

৩. ন্যায়পরায়ণতা: ন্যায়পরায়ণতা একজন নেতার অন্যতম প্রধান গুণ। একজন নেতা যখন ব্যক্তি বা আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়ের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তখন অধীনস্থদের মধ্যে তাঁর প্রতি আস্থা সৃষ্টি হয় এবং তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁর নির্দেশনা মেনে চলে। এর ফলে সংগঠনে Command & Control প্রতিষ্ঠিত হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার ও সদাচরণের নির্দেশ দেন’ (নাহল ১৬/৯০)। তিনি আরো বলেন, ‘আর যখন তোমরা লোকদের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়-নীতির সাথে করবে’ (নিসা ৪/৫৮)।

৪. বিনয় ও ক্ষমাশীলতা : বিনয় একজন নেতার গ্রহণযোগ্যতা ও প্রভাব বৃদ্ধি করে। বিনয়ী নেতা অধীনস্থদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন, তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ করেন এবং প্রয়োজনে নিজের ভুলও সংশোধন করেন। ফলে তাঁর প্রতি আস্থা ও শ্রদ্ধা বৃদ্ধি পায়, যা কার্যকর Command & Control প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,فَبِمَا رَحْمَةٍ مِنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ ‘বস্ত্ততঃ আল্লাহর অনুগ্রহের কারণেই তুমি তাদের প্রতি কোমলহৃদয় হয়েছ। যদি তুমি রূঢ়ভাষী ও কঠিন হৃদয়ের হ’তে, তাহ’লে তারা তোমার পাশ থেকে সরে যেত’ (আলে-ইমরান ৩/১৫৯)।

৫. সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা : যেকোন সংগঠনকে বিভিন্ন সংকট ও ক্রান্তিকাল অতিক্রম করতে হয়। এসব মুহূর্তে সিদ্ধান্তহীনতা কাটিয়ে সময়োপযোগী, বিচক্ষণ ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ একজন নেতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গুণ। অনেক সময় সিদ্ধান্তহীনতা ভুল সিদ্ধান্তের চেয়েও বেশী ক্ষতিকর হয়। কারণ এতে কর্মীরা দিকনির্দেশনা হারায়, কাজের গতি শ্লথ হয়ে যায় এবং সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে। আবার আবেগ, গুজব বা ব্যক্তিগত পসন্দ-অপসন্দের ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্তও সংগঠনের জন্য ক্ষতির কারণ হ’তে পারে। তাই একজন নেতার উচিত নির্ভরযোগ্য তথ্য, বাস্তব পরিস্থিতি, শূরার পরামর্শ এবং শরী‘আতের নির্দেশনার আলোকে দৃঢ়তার সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ ‘অতঃপর যখন তুমি দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে , তখন আল্লাহর উপর ভরসা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তার উপর ভরসাকারীদের ভালবাসেন’(আলে-ইমরান ৩/১৫৯)।

৬. পরামর্শ গ্রহণ : একজন সফল নেতা নিজের মতামতের পাশাপাশি অধিনস্তদের পরামর্শ গ্রহণ করেন। এর ফলে সিদ্ধান্ত অধিক বাস্তবসম্মত, গ্রহণযোগ্য ও ফলপ্রসূ হয়। একই সঙ্গে অধীনস্থদের মধ্যে সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা ও দায়িত্ববোধ সৃষ্টি হয়। যা Command & Control প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ ‘আর যরূরী বিষয়ে তাদের সাথে পরামর্শ কর’ (আলে-ইমরান ৩/১৫৯)। وَأَمْرُهُمْ شُورَىٰ بَيْنَهُمْ ‘তাদের কাজকর্ম পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সম্পাদিত হয়’ (শূরা ৪২/৩৮)।

৭.ধৈর্য ও আত্মত্যাগ: প্রকৃত নেতা নিজের স্বার্থের চেয়ে সংগঠন ও কর্মীদের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেন এবং প্রয়োজনে ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশ ত্যাগ করে তাদের পাশে থাকেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا ‘আর আমরা তাদের মধ্য থেকে কিছু ব্যক্তিকে নেতা মনোনীত করেছিলাম তাদের ধৈর্যশীলতার কারণে, যারা আমাদের নির্দেশ মতে পথ প্রদর্শন করত’ (সাজদাহ ৩২/২৪)। তিনি আরও বলেন,وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ ‘তারা নিজেরা অভাবগ্রস্ত হ’লেও অন্যদের নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দেয়’ (হাশর ৫৯/৯)।

রাসূল (ছাঃ)-এর নেতৃত্বে কমান্ড ও কন্ট্রোলের বাস্তব চিত্র :

হুদায়বিয়ার সন্ধি : আবেগের পরিবর্তে কৌশলগত নেতৃত্ব : হিজরী ৬ষ্ঠ বছরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) প্রায় ১৪০০ (মতান্তরে ১৫০০) ছাহাবীকে সঙ্গে নিয়ে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কার দিকে রওয়ানা হন। কিন্তু কুরাইশ তাঁকে মক্কায় প্রবেশ করতে বাধা দেয়। দীর্ঘ আলোচনা ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর উভয় পক্ষের মধ্যে হুদায়বিয়ার সন্ধি সম্পাদিত হয়। সন্ধির কয়েকটি শর্ত বিশেষত সে বছর ওমরাহ না করে ফিরে যাওয়া এবং মক্কা থেকে কোন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করে মদীনায় চলে এলে তাকে ফেরত দেওয়ার শর্ত অনেক ছাহাবীর নিকট অত্যন্ত কঠিন ও অপমানজনক বলে মনে হয়েছিল। এমনকি ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাৎক্ষণিক আবেগ বা জনমতের চাপে সিদ্ধান্ত না নিয়ে পরিস্থিতিকে সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করেন এবং বৃহত্তর স্বার্থে সন্ধিটি গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে আল্লাহ তা‘আলা এই সন্ধিকেই ‘সুস্পষ্ট বিজয়’ বলে আখ্যায়িত করেন’ (ফাতহ ৪৮/১)। বাস্তবেও এই সন্ধির ফলে যুদ্ধবিরতির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়, ইসলামের দাওয়াত অবাধে বিস্তারের সুযোগ লাভ করে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে। অবশেষে এই সন্ধিই মক্কা বিজয়ের ভিত্তি রচনা করে।[5]

এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, একজন সফল নেতা কখনো তাৎক্ষণিক আবেগ বা সাময়িক জনচাপের কাছে আত্মসমর্পণ করেন না। তিনি বাস্তবতা ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

মক্কা বিজয়ের মুহূর্তে শৃঙ্খলা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের অনন্য দৃষ্টান্ত : মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা ও রক্তপাত এড়াতে সুস্পষ্ট নির্দেশনা জারি করেন। ঘোষণা করলেন, ‘যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের গৃহে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ; যে ব্যক্তি অস্ত্র পরিত্যাগ করবে, সে নিরাপদ; আর যে ব্যক্তি নিজ গৃহের দরজা বন্ধ করে অবস্থান করবে, সেও নিরাপদ’।[6] এ ঘোষণার মাধ্যমে তিনি বিজয়ের মুহূর্তে জনমনে নিরাপত্তাবোধ সৃষ্টি করেন এবং প্রতিশোধ, লুণ্ঠন ও অরাজকতার সব পথ রুদ্ধ করে দেন। ফলে সাক্ষাৎ মুসলিম বাহিনীর প্রতিশোধের স্পৃহা দমিত হয় ও রক্তপাতহীন বিজয় সাধিত হয়।

এ সময় আনছারদের কেউ কেউ মনে করেছিলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হয়তো স্বদেশ ও স্বজাতির প্রতি অনুরাগবশত মক্কাতেই থেকে যাবেন। তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে অহী নাযিল হ’লে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদের ডেকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিলেন, مَعَاذَ اللهِ الْمَحْيَا مَحْيَاكُمْ وَالْمَمَاتُ مَمَاتُكُمْ ‘আল্লাহর আশ্রয় চাই। আমার জীবন তোমাদের সাথে ও আমার মরণ তোমাদের সাথে’।[7] তাঁর এ বক্তব্যে আনছারদের সব সংশয় দূর হয়ে যায় এবং তারা নিজেদের কথার জন্য ওজর পেশ করলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তা গ্রহণ করেন।[8] এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, একজন সফল নেতা শুধু যুদ্ধক্ষেত্র নয়, বিজয়ের পর অনুসারীদের আবেগ, উদ্বেগ ও মানসিক অবস্থাও বিচক্ষণতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করেন।

হুনাইনের যুদ্ধে সংকটময় মুহূর্তে নেতৃত্ব : হুনাইনের যুদ্ধে শত্রুপক্ষের আকস্মিক আক্রমণে মুসলিম বাহিনীর একটি অংশ সাময়িকভাবে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। এসময় রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে ১০ থেকে ১২ জন ছাহাবী ব্যতীত কেউ ছিল না। কিন্তু এমন সংকটময় মুহূর্তেও রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। এ সময় তিনি ডানদিকে ফিরে ডাক দিয়ে বলেন,هَلُمُّوْا إلَيَّ أيها الناسُ، أنَا رَسُوْلُ الله، أنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللهِ، ‘আমার দিকে এসো হে লোকেরা! আমি আল্লাহর রাসূল’। ‘আমি আব্দুল্লাহর পুত্র মুহাম্মাদ’।[9] এরপর তিনি ছাহাবীদের পুনরায় সমবেত করেন, তাদের মনোবল দৃঢ় করেন এবং বিচ্ছিন্ন বাহিনীকে সুসংগঠিত করে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে ফিরিয়ে আনেন। এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, সংকটকালে একজন দক্ষ নেতা আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য, দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে অধীনস্থদের সাহস জোগান এবং ভেঙে পড়া পরিস্থিতিকেও পুনরায় নিয়ন্ত্রণে আনেন। এতে বুঝা যায়, সফল Command & Control কেবল নির্দেশ প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সংকটময় অবস্থায় নেতৃত্বের দৃঢ়তা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং অধীনস্থদের পুনরায় সংগঠিত করার সক্ষমতার উপরও নির্ভরশীল।

কমান্ড ও কন্ট্রোল সংকটের কারণ ও কার্যকর পদক্ষেপসমূহ

১. অযোগ্য ও অদক্ষ নেতৃত্ব : যেকোনো সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করে দক্ষ ও যোগ্য নেতৃত্বের ওপর। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর জীবন থেকে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ইয়ামানে ইসলাম প্রচার, বিচারকার্য পরিচালনা এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের জন্য মু‘আয ইবনু জাবাল (রাঃ)-কে প্রতিনিধি হিসাবে প্রেরণ করেন। বিদায়ের সময় তিনি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, তোমার সামনে কোন বিষয় উপস্থাপিত হলে কিভাবে ফায়ছালা করবে? মু‘আয (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, যদি সেখানে না পাও? তিনি বললেন, রাসূলের সুন্নাহ অনুযায়ী। তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, যদি তাতেও না পাও? তিনি বললেন, তখন আমি নিজের সর্বোচ্চ ইজতিহাদ করব। তাঁর এ উত্তরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহর প্রশংসা করেন।[10]

অন্যদিকে আবু যার গিফারী (রাঃ) ছিলেন অত্যন্ত পরহেযগার ও সত্যনিষ্ঠ একজন ছাহাবী। একবার তিনি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট কোন প্রশাসনিক দায়িত্ব প্রার্থনা করলে রাসূল (ছাঃ) তার কাঁধে আঘাত করে বললেন, ‘হে আবূ যার! তুমি দুর্বল। অথচ এটি হচ্ছে একটি আমানত। আর ক্বিয়ামতের দিন এ হবে লাঞ্ছনা ও অনুশোচনার কারণ। তবে যে এর হক সম্পূর্ণ আদায় করবে তার কথা ভিন্ন’।[11]

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর এসকল দৃষ্টান্ত থেকে স্পষ্ট হয় যে, কোন সংগঠনের সফলতা শুধু আদর্শ বা আন্তরিকতার ওপর নির্ভর করে না। বরং সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক দায়িত্বে নিয়োগ এবং তার যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়নের ওপরই সংগঠনের দীর্ঘমেয়াদি সফলতা নির্ভরশীল। এটি Command & Control ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি।

২. নেতা ও কর্মীদের পারস্পরিক সুসম্পর্কের অভাব : Command & Control ব্যবস্থার কার্যকারিতা অনেকাংশে নেতা ও কর্মীদের পারস্পরিক ভালোবাসা ও আন্তরিক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। এ সম্পর্ক দুর্বল হ’লে সংগঠনের শৃঙ্খলা ও ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হুনায়নের যুদ্ধের পর রাসূল (ছাঃ) নওমুসলিম কুরাইশ নেতাদের অন্তর ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে তাদেরকে অধিক পরিমাণে বন্টণ করে দেন। এটি দেখে কিছু আনছার ছাহাবী মনে করেছিলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হয়তো নিজ গোত্রকে বেশী প্রাধান্য দিচ্ছেন। বিষয়টি জানতে পেরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আনছারদের একত্রিত করে অত্যন্ত আন্তরিক ও হৃদয়স্পর্শী ভাষায় বলেন, ‘তোমরা কি এতে খুশী নও যে, লোকেরা দুনিয়া নিয়ে চলে যাক। আর তোমরা আল্লাহর রাসূলকে নিয়ে চলে যাও ও তাঁকে তোমাদের বাড়ীতে আশ্রয় দাও?’ ‘অতএব সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে রয়েছে মুহাম্মাদের জীবন, যদি হিজরত না থাকত, তাহ’লে আমি হ’তাম আনছারদের একজন। যদি লোকেরা বিভিন্ন গোত্র বেছে নেয়, তবে আমি আনছারদের গোত্রে প্রবেশ করব’।

রাসূল (ছাঃ)-এর উক্ত হৃদয়স্পর্শী ভাষণ শুনে কাঁদতে কাঁদতে সকলের দাড়ি ভিজে গেল এবং তারা সবাই বলে উঠল, رَضِيْنَا بِرَسُوْلِ اللهِ قَسْمًا وَحَظًّا ‘আমরা সবাই আল্লাহর রাসূলের ভাগ-বণ্টনে সন্তুষ্ট’।[12] অতএব নেতা ও কর্মীদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি বা আস্থার সংকট সৃষ্টি হলে তা আন্তরিক সংলাপ, সহমর্মিতা ও ভালোবাসার মাধ্যমে দূর করাই কার্যকর Command & Control-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

৩. কর্মীর পারদর্শিতা অনুযায়ী পদের অসামঞ্জস্যতা : কার্যকর কমান্ড ও কন্ট্রোলের জন্য নেতার করণীয় হ’ল যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টন করা। যোগ্য ব্যক্তিকে অবমূল্যায়ন করে অযোগ্য ব্যক্তির হাতে দায়িত্ব অর্পণ করলে কর্মদক্ষতা হ্রাস পায় এবং দক্ষ কর্মীদের মনোবল ভেঙে যায়। আল্লাহ বলেন,إِنَّ اللهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা আমানতসমূহ যথাযথ হকদারদের নিকট অর্পণ কর’ (নিসা ৪/৫৮)।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছাহাবীদের দক্ষতা ও পারদর্শীতা অনুযায়ী দায়িত্বে নিয়োজিত করতেন। যেমন আকাবার দ্বিতীয় বায়‘আতের পর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মদীনায় ইসলাম প্রচারের জন্য মুছ‘আব ইবনু উমাইর (রাঃ)-কে প্রতিনিধি হিসাবে প্রেরণ করেন। তিনি বয়সে তরুণ হলেও তাঁর জ্ঞান, প্রজ্ঞা, দাওয়াতী দক্ষতা ও উত্তম চরিত্রের কারণে এ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের জন্য নির্বাচিত হন। তাঁর সফল নেতৃত্ব ও দাওয়াতের ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই মদীনার বহু মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে এবং হিজরতের জন্য একটি সুদৃঢ় ভিত্তি তৈরি হয়।[13]

৪. যুগোপযোগী পরিকল্পনার অভাব : দ্রুত পরিবর্তনশীল বর্তমান বিশ্বে যেকোন সংগঠনের সফলতার জন্য যুগোপযোগী পরিকল্পনা অপরিহার্য। সময়, পরিবেশ ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিকল্পনা গ্রহণে ব্যর্থ হলে সংগঠন প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে এবং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন ব্যাহত হয়। এ বিষয়ে খন্দকের যুদ্ধ একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। মদীনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) প্রচলিত যুদ্ধকৌশলের পরিবর্তে সালমান ফারসী (রাঃ)-এর পরামর্শে পরিখা খননের অভিনব পরিকল্পনা গ্রহণ করেন, যা সে সময় আরবদের কাছে সম্পূর্ণ নতুন ছিল। তিনি নিজে ছাহাবীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পরিখা খননে অংশগ্রহণ করেন এবং পুরো কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকি করেন।[14]

৫. স্বেচ্ছাচারিতা ও পরামর্শ উপেক্ষা : ইসলামে নেতৃত্বের একটি মৌলিক ভিত্তি হ’ল শূরা বা পরামর্শ (আলে ইমরান ৩/১৫৯)। কিন্তু অনেক সময় পরামর্শসভা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে; সিদ্ধান্ত পূর্বনির্ধারিত থাকে এবং অন্যের মতামতের মূল্যায়ন করা হয় না। যদিও সর্বশেষ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেতা বা কর্তৃপক্ষের নেওয়ার অধিকার রয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে নেতা সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরও অধীনস্থরা তা উপেক্ষা করে এবং আন্তরিকভাবে বাস্তবায়ন না করে টালবাহানা করে। ফলে সাংগঠনিক সমন্বয় ও শৃঙ্খলা দুর্বল হয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিয়মিত ছাহাবীদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। এমনকি হুদায়বিয়ার সন্ধির পর ছাহাবীগণ দ্বিধাগ্রস্ত হলে তিনি উম্মু সালামাহ (রাঃ)-এর পরামর্শ গ্রহণ করেন এবং সেই পরামর্শই সংকট নিরসনে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।[15]

৬. অন্ধ আনুগত্য : যখন কর্মীরা নেতার প্রতিটি সিদ্ধান্তকে যাচাই-বাছাই ছাড়াই সমর্থন করে, তখন ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধনের সুযোগ নষ্ট হয় এবং সংগঠনের ক্ষতি হয়। ফলে নেতৃত্বের ভুলগুলো বড় ক্ষতি ডেকে আনে। তবে ছাহাবীগণের জীবনে এর বিপরীত চিত্র দেখা যায়। ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি শতভাগ আনুগত্য ও ভালোবাসা সত্ত্বেও বিভিন্ন বিষয়ে নিজের মতামত নির্ভয়ে পেশ করতেন। বহুবার তিনি রাসূল (ছাঃ)-এর সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও করেছেন এবং একাধিক ক্ষেত্রে তাঁর মতের অনুকূলে আল্লাহ তা‘আলা অহী নাযিল করেন।[16] এতে প্রমাণিত হয় ইসলামী নেতৃত্বে যুক্তিসংগত মতামত ও গঠনমূলক পরামর্শের মূল্য রয়েছে। অন্যদিকে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) অন্ধভক্তিকে নিরুৎসাহিত করে বলেন, ‘তোমরা যখন অতিরিক্ত প্রশংসাকারীদের দেখবে, তখন তাদের মুখে মাটি নিক্ষেপ করবে’।[17] এজন্য সংগঠনে এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে যেখানে সত্য কথা বলার সুযোগ থাকবে, ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধন করা যাবে এবং যোগ্য পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এমন সাংগঠনিক সংস্কৃতিই কমান্ড ও কন্ট্রোলকে কার্যকর করে তুলে।

৭. জ্যেষ্ঠতার দোহাই : সমাজ ও সংগঠনে জ্যেষ্ঠতা সম্মানের বিষয় হ’লেও নেতৃত্ব নির্বাচনের একমাত্র মানদন্ড নয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মাত্র ১৮-২০ বছর বয়সী উসামা ইবনু যায়েদ (রাঃ)-কে এমন একটি বাহিনীর সেনাপতি নিযুক্ত করেন, যেখানে আবূবকর, ওমর (রাঃ) সহ বহু প্রবীণ ছাহাবী উপস্থিত ছিলেন। তাঁর অল্প বয়স নিয়ে ছাহাবীগণ আপত্তি করলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) দাঁড়িয়ে বলেছিলেন,إِنْ تَطْعَنُوْا فِيْ إِمَارَتِهِ فَقَدْ كُنْتُمْ تَطْعَنُوْنَ فِيْ إِمَارَةِ أَبِيْهِ مِنْ قَبْلُ وَايْمُ اللهِ إِنْ كَانَ لَخَلِيْقًا لِلْإِمَارَةِ وَإِنْ كَانَ لَمِنْ أَحَبِّ النَّاسِ إِلَيَّ وَإِنَّ هَذَا لَمِنْ أَحَبِّ النَّاسِ إِلَيَّ بَعْدَهُ ‘তোমরা আজ তার নেতৃত্বের সমালোচনা করছ, এভাবে তোমরা তাঁর পিতা (যায়দ)-এর নেতৃত্বেরও সমালোচনা করতে। আল্লাহর কসম! সে (যায়দ) ছিল নেতৃত্বের জন্য যোগ্য ব্যক্তি এবং আর সে আমার কাছে লোকেদের মধ্যে প্রিয়তম ব্যক্তি। তার এ (উসামাহ) লোকেদের মধ্যে আমার কাছে প্রিয়তম ব্যক্তি’।[18] এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইসলামে নেতৃত্বের মানদন্ড বয়স, বংশ বা সামাজিক মর্যাদা নয়; বরং যোগ্যতা ও দক্ষতা। আবার একবার যোগ্য ব্যক্তিকে নেতৃত্ব প্রদান করা হলে ব্যক্তিগত আপত্তি পরিহার করে তার নেতৃত্ব মেনে চলাও কার্যকর Command & Control-এর অপরিহার্য শর্ত।

৮. সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতার অভাব : সংগঠনে গঠনমূলক সমালোচনা ও যৌক্তিক ভিন্নমতকে গ্রহণ করার মানসিকতা না থাকলে Command & Control দুর্বল হয়ে পড়ে। নেতা যদি প্রতিটি ভিন্নমতকে অবাধ্যতা বা শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসাবে বিবেচনা করেন, তবে কর্মীদের মধ্যে ভয় ও নীরবতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। এতে ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধনের সুযোগ নষ্ট হয়।

ওহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ব্যক্তিগত মত ছিল মদীনার ভেতরে থেকেই প্রতিরক্ষা যুদ্ধ করা। কিন্তু অধিকাংশ ছাহাবী শহরের বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করার পক্ষে মত দেন। তিনি নিজের মত পরিত্যাগ করে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত গ্রহণ করেন এবং ওহুদের ময়দানে বের হন। পরবর্তীতে কেউ মত পরিবর্তনের কথা বললেও তিনি সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসেননি।[19] উপরোক্ত ঘটনায় প্রমাণিত হয় যে, বৈষয়িক ব্যাপারে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ গ্রহণ ও তা মেনে নেওয়া নেতার জন্য সঙ্গত। কিন্তু তাঁকে বাধ্য করা যাবে না। বরং তাঁর সিদ্ধান্ত সকলকে নির্দ্বিধায় মেনে নিতে হবে।[20]

প্রকৃত নেতা নিজের মতকে সর্বদা চূড়ান্ত মনে করেন না; বরং যৌক্তিক মতামতকে গুরুত্ব দেন। এতে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হয় এবং নেতা-কর্মীদের মধ্যে অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি পায়।

৯. ঐক্য ও সংহতির অভাব : যেকোন সংগঠনের মৌলিক দু’টি বিষয়ে ঐক্য প্রয়োজন। ১. লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে ঐক্য ২. কর্মপদ্ধতিতে ঐক্য। নেতা ও কর্মীদের মধ্যে এ দু’টি মৌলিক বিষয়ে সমন্বয় না থাকলে নেতার নির্দেশনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় না। লক্ষ্যগত বিভ্রান্তি, কর্মপদ্ধতিগত মতপার্থক্য এবং পারস্পরিক আস্থার সংকটের কারণে সংগঠনের মধ্যে বিভক্তি ও অকার্যকারিতা তৈরী হয়।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নেতৃত্বে ঐক্য ও সংহতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি মদীনায় মুহাজির ও আনছারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যক্তিগত, গোত্রীয় ও আঞ্চলিক বিভেদ দূর করে তাদেরকে এক আদর্শিক বন্ধনে আবদ্ধ করেন। ফলে ছাহাবীগণ ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নির্দেশ বাস্তবায়নে সময়, শ্রম, সম্পদ, এমনকি জীবন উৎসর্গ করতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি।

১০. উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাব : প্রবাদ আছে, ‘কঠিন প্রশিক্ষণ, সহজ যুদ্ধ’। যেকোনো সংগঠনের সফলতা কেবল দক্ষ নেতৃত্বের ওপর নয়; বরং প্রশিক্ষিত ও সুসংগঠিত কর্মীবাহিনীর ওপরও নির্ভরশীল। কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ না দিলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, ফলে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ব্যহত হয়। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ধারাবাহিক তারবিয়াত বা প্রশিক্ষণ। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَতিনিই নিরক্ষরদের মধ্যে তাদেরই একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের নিকট তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদের কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন’ (জুমু‘আহ ৬২/২)

এ প্রশিক্ষণের বাস্তব প্রয়োগও ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত। ইয়ামানে প্রেরণের আগে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মু‘আয ইবনু জাবাল (রাঃ)-কে বিচারকার্য পরিচালনার পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেন।[21] আবার যেকোন যুদ্ধের পূর্বে সৈন্যদের কাতারবিন্যাস, দায়িত্ব বণ্টন ও যুদ্ধকৌশল সম্পর্কে সরাসরি নির্দেশনা প্রদান করতেন। এ ধারাবাহিক তারবিয়াত ও প্রশিক্ষণের ফলেই ছাহাবীগণ দক্ষ নেতা, যোগ্য প্রশাসক এবং সুশৃঙ্খল কর্মীবাহিনীতে পরিণত হয়েছিলেন।

উপসংহার : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সীরাত আমাদের সামনে Command & Control-এর এক পূর্ণাঙ্গ ও ভারসাম্যপূর্ণ মডেল উপস্থাপন করে। তিনি কখনো স্বেচ্ছাচারী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেননি। আবার শৃঙ্খলার প্রশ্নেও কোন শৈথিল্য প্রদর্শন করেননি। তার কার্যকর সিদ্ধান্তের ফলেই অল্প সময়ের মধ্যে একটি বিচ্ছিন্ন জাতি বিশ্বসভ্যতার নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হয়। আজকের ইসলামী সংগঠনগুলো যদি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সীরাত থেকে এ নীতিমালাগুলো আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে নেতৃত্বের সংকট, সমন্বয়হীনতা ও সাংগঠনিক দুর্বলতা অনেকাংশে দূর করা সম্ভব হবে। ইনশাআল্লাহ!


-মুহাম্মাদ আব্দুন নূর

 [কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ]


[1]. বুখারী হা/৭২৫৭; মুসলিম হা/১৮৪০; মিশকাত হা/৩৬৬৫।

[2]. বুখারী হা/৮৯৩; মুসলিম, হা/১৮২৯।

[3]. মুসলিম, হা/১৮২৫।

[4]. বুখারী হা/৬৪৯৬; মিশকাত হা/৫৪৩৯।0

[5]. সীরাতুর রাসূল (ছাঃ), (৩য় মুদ্রণ) পৃ. ৪৬৪-৪৬৯।

[6]. ছহীহ মুসলিম হা/১৭৮০।

[7]. ইবনু হিশাম ২/৪১৬; আলবানী, ফিক্বহুস সীরাহ, ৩৯৯ পৃঃ, সনদ ছহীহ।

[8]. ছহীহ মুসলিম হা/১৭৮০।

[9]. আহমাদ হা/১৫০৬৯, সনদ হাসান; গাযালী, ফিক্বহুস সীরাহ তাহকীক্ব আলবানী, ৩৮৯ পৃঃ, সনদ ছহীহ।

[10]. আবূ দাঊদ হা/৩৫৯২; সুনান তিরমিযী হা/১৩২৭।

[11]. ছহীহ মুসলিম হা/১৮২৫।

[12]. বুখারী হা/৪৩৩০; আহমাদ হা/১১৭৪৮ সনদ হাসান

[13]. সীরাতুর রাসূল (ছাঃ) পৃ. ২০৭-২০৮।

[14]. সীরাহ ছহীহাহ ২/৪২০-২১।

[15]. ছহীহুল বুখারী হা/২৭৩১-২৭৩২।

[16]. বুখারী হা/১৩৬৬; মুসলিম হা/১৭৬৩, ২৩৯৯; আবুদাউদ হা/৩৬৭০।

[17]. ছহীহ মুসলিম হা/৩০০২।

[18]. বুখারী হা/৪৪৬৯; মুসলিম হা/২৪২৬।

[19]. আহমাদ হা/১৪৮২৯, সনদ ছহীহ লেগায়রিহী-আরনাঊত্ব; ফাৎহুল বারী হা/৭০৩৫-এর আলোচনা।

[20]. সীরাতুর রাসূল (ছাঃ) পৃ. ৩৪৮।

[21]. আবূ দাঊদ হা/৩৫৯২; সুনান তিরমিযী হা/১৩২৭।



বিষয়সমূহ: সংগঠন
আরও