পবিত্রতা অর্জনের শিষ্টাচার
বযলুর রহমান
মামূন বিন হাসমত 13 বার পঠিত
উপস্থাপনা : আল্লাহ তা‘আলা মানবজাতিকে এই ধরাধামে পাঠিয়েছেন একমাত্র তাঁরই ইবাদতের উদ্দেশ্যে। তবে শুধু ইবাদত করাই শেষ কথা নয়। বরং তা হ’তে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিবেদিত। নিয়ত যদি খাঁটি না হয়, তবে বাহ্যিকভাবে দেখতে পাহাড়সম বড় আমলও আল্লাহর নিকট মূল্যহীন। অনন্তকালের কঠিন আযাবের ভয় আর চিরন্তন মুক্তির ব্যাকুল তৃষ্ণা বুকে নিয়ে মানুষ প্রতিনিয়ত নানাভাবে ইবাদতের সাধনা করে চলেছে। কিন্তু সেই আমল আল্লাহর নিকট পৌঁছাতে প্রয়োজন শরী‘আতের কষ্টিপাথরে যাচাইকৃত কিছু অলঙ্ঘনীয় শর্তের নিখুঁত বাস্তবায়ন। মূলত, কবুলযোগ্য আমলই হচ্ছে মুমিনের সেই আলো, যা তার ইহকালীন জীবনকে করে সুবাসিত এবং পরকালীন অন্ধকারকে করে জ্যোতির্ময়।
উত্তম আমল করার জন্য আল্লাহর পরীক্ষা : মহান আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবীর সমস্ত মানুষের মধ্যে কে উত্তম আমলকারী, তিনি তা পরীক্ষা করবেন। আর এই আমলের পরিসীমা হ’ল মৃত্যু। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا وَهُوَ الْعَزِيزُ الْغَفُورُ- ‘যিনি মৃত্যু ও জীবনকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য, কে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক সুন্দর আমল করে? আর তিনি মহাপরাক্রান্ত ও ক্ষমাশীল’ (মুল্ক ৬৭/২)।
আমল কবুল হওয়ার পরেও জাহান্নামে যাওয়া : আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, তোমরা কি বলতে পারো অভাবী লোক কে? তারা বললেন, আমাদের মধ্যে যার দিরহাম (টাকা-কড়ি) ও ধন-সম্পদ নেই সে তো অভাবী লোক। তখন নবী করীম (ছাঃ) বললেন, আমার উম্মতের মধ্যে সে প্রকৃত অভাবী লোক, যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও জাকাত নিয়ে আসবে; অথচ সে এ অবস্থায় আসবে যে সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, অমুকের সম্পদ ভোগ করেছে, অমুককে হত্যা করেছে ও আরেকজনকে প্রহার করেছে। এরপর সে ব্যক্তিকে তার নেক আমলগুলো থেকে দেওয়া হবে, অমুককে নেক আমল থেকে দেওয়া হবে। এরপর যদি পাওনাদারের হক তার নেক আমল থেকে পূরণ করা না যায় সে ঋণের পরিবর্তে তাদের পাপের একাংশ তার প্রতি নিক্ষেপ করা হবে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।[1]
ছাহাবীদের অন্তরে আমল কবুলের ব্যাকুলতা : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ছাহাবীগণ সৎকর্মের ব্যাপারে নিজেদের সর্বোচ্চ উজাড় করে দেওয়ার পরও সবসময় এই ভয়ে কম্পমান থাকতেন, পিছনে তাদের আমলগুলো বাতিল হয়ে যায় কি না। কিংবা আল্লাহর দরবারে তা কবুল না হয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয় কি না! তাদের এই শঙ্কা কিন্তু কোনো দুর্বলতা ছিল না। বরং তা ছিল তাঁদের গভীর জ্ঞান আর সুদৃঢ় ঈমানেরই এক জীবন্ত বহিঃপ্রকাশ। বিখ্যাত তাবেঈ আব্দুল্লাহ ইবনু আবী মুলায়কা (রহঃ) বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর এমন ত্রিশজন ছাহাবীর সান্নিধ্য পেয়েছি, যাদের প্রত্যেকেই নিজের ব্যাপারে মুনাফিকীর ভয় করতেন। তাদের কেউই কখনো দাবি করতেন না যে, তার ঈমান জিব্রীল ও মিকাঈল-এর ঈমানের সমতুল্য’।[2]
আবুদ্দারদা (রাঃ) বলতেন, ‘আমি যদি নিশ্চিতভাবে জানতে পারতাম যে, আল্লাহ তা‘আলা আমার জীবনের মাত্র একটি ছালাত কবুল করে নিয়েছেন, তবে তা আমার কাছে গোটা দুনিয়া ও তার ভেতরের সমস্ত ঐশ্বর্যের চেয়েও বেশি প্রিয় হ’ত। কারণ স্বয়ং আল্লাহ ঘোষণা করেছেন,إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তো মুত্তাক্বীদের কুরবানীই মাত্র কবুল করে থাকেন’ (মায়েদাহ ৫/২৭)।[3]
ইবাদত কবুল হওয়ার মৌলিক শর্ত ৩টি :
(১) আক্বীদা ছহীহাহ : অর্থাৎ শিরকমুক্ত নির্ভেজাল তাওহীদ বিশ্বাসী হওয়া আমল কবুল হওয়ার জন্য অতি যরূরী। কেননা আক্বীদাহ বাতিল হলে আমল কবুল হয় না। যেমন আল্লাহ বলেন,وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ، ‘আর যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দ্বীন তালাশ করে, তার নিকট থেকে তা কখনোই কবুল করা হবে না এবং ঐ ব্যক্তি আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে’ (আলে ইমরান ৩/৮৫)। তিনি বলেন,وَقَدِمْنَا إِلَى مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَاهُ هَبَاءً مَنْثُورًا، ‘আর আমরা সেদিন তাদের কৃতকর্ম সমূহের দিকে মনোনিবেশ করব। অতঃপর সেগুলিকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করব’ (ফুরক্বান ২৫/২৩)।
আবু উমামা বাহিলী (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,إِنَّ اللهَ لا يَقْبَلُ مِنَ العَمَلِ إِلَّا ما كان لهُ خالِصًا، وابْتُغِيَ بهِ وجْهُهُ، ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা কোন আমল কবুল করেন না, যদি তাঁর জন্য তা খালেছ অন্তরে ও তাঁর সন্তুষ্টির জন্য করা না হয়।[4]
হাফেয ইবনু কাছীর (রহঃ) সূরা কাহাফের ১১০ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, আমল কবুল হওয়ার জন্য রুকন রয়েছে। অবশ্যই এটা একমাত্র আল্লাহর জন্য খালেছ হ’তে হবে এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর শরী‘আতের মধ্যে হবে’।[5]
ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, ইখলাছহীন আমল ও সুন্নাহর অনুসরণবিহীন সৎকাজ করা ঐ মুসাফিরের ন্যায়, যে বালুভর্তি বস্তার বোঝা বহন করে, যা তার কোন উপকারে আসে না’।[6]
শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আক্বীদা হ’ল যে ব্যক্তি কোনো আমল করার সময় আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার সেই আমলটি কবুল করেন। আর আমলে তাক্বওয়া অবলম্বন করার অর্থ হ’ল কাজটি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং তাঁরই নির্দেশিত পদ্ধতি (সুন্নাহ) অনুযায়ী করা। সুতরাং কেউ যদি কোনো নির্দিষ্ট কাজে আল্লাহকে ভয় করে তা সম্পন্ন করে, তবে আল্লাহ তার সেই আমলটি কবুল করে নিবেন। যদিও সে ব্যক্তি অন্য কোনো বিষয়ে পাপিষ্ঠ বা অবাধ্য হেŠক না কেন। পক্ষান্তরে কেউ যদি কোনো নির্দিষ্ট কাজে আল্লাহকে ভয় না করে, তবে আল্লাহ তার সেই আমলটি কবুল করবেন না। আইনত সে অন্য সব বিষয়ে যতই অনুগত ও পুণ্যবান হৌক না কেন’।[7]
সুতরাং সঠিক আক্বীদার কারণে একজন সর্বোচ্চ পাপী ব্যক্তিও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জাহান্নামে অবস্থানের পর জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন,إِذَا دَخَلَ أَهْلُ الْجَنَّةِ الْجَنَّةَ، وَأَهْلُ النَّارِ النَّارَ يَقُولُ اللهُ مَنْ كَانَ فِى قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ مِنْ إِيمَانٍ فَأَخْرِجُوهُ- ‘জান্নাতীগণ যখন জান্নাতে আর জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে তখন আল্লাহ বলবেন, যার অন্তঃকরণে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমান আছে তাকে বের কর’।[8]
(২) তরীকা ছহীহ হওয়া : যাবতীয় আমল রাসূল (ছাঃ)-এর ছহীহ সুন্নাহ অনুযায়ী হওয়া। কেননা আমলের ক্ষেত্রে শরী‘আত নির্ধারিত পরিমাণে কম-বেশী করলে তা আল্লাহর কাছে কবুল হয় না।[9] আল্লাহ বলেন,قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُمْ بِالْأَخْسَرِينَ أَعْمَالًا، الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعًا، أُولَئِكَ الَّذِينَ كَفَرُوا بِآيَاتِ رَبِّهِمْ وَلِقَائِهِ فَحَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فَلَا نُقِيمُ لَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَزْنًا، ‘বলে দাও, আমরা কি তোমাদেরকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত আমলকারীদের সম্পর্কে জানিয়ে দেব? তারা হ’ল সেই সব লোক যাদের পার্থিব জীবনের সকল প্রচেষ্টা বিফলে গেছে। অথচ তারা ভেবেছে যে, তারা সৎকর্ম করছে। ওরা হ’ল তারাই, যারা তাদের প্রতিপালকের আয়াত সমূহকে এবং তার সাথে সাক্ষাতকে অস্বীকার করে। ফলে তাদের সকল কর্ম নিস্ফল হয়ে যায়। ক্বিয়ামতের দিন আমরা তাদের জন্য দাড়িপাল্লা খাড়া করব না (কাহফ ১৮/১০৩-১০৫)।
অর্থাৎ আল্লাহ তার প্রিয় নবী রাসূল (ছাঃ)-এর মাধ্যমে যে পদ্ধতি মানুষকে জানিয়েছেন, সে পদ্ধতিতে আমল না করলে তা কবুল হবে না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, مَنْ أَحْدَثَ فِى أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيهِ فَهُوَ رَدٌّ، যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু প্রবর্তন করবে, তা প্রত্যাখ্যাত’।[10] তিনি আরো বলেন, مَنْ عَمِلَ عَمَلاً لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا، فَهْوَ رَدٌّ، যে ব্যক্তি এমন কোন আমল করল, যাতে আমাদের নির্দেশনা নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।[11]
(৩) আমল ইখলাছপূর্ণ হওয়া : ইখলাছ সম্পর্কে কুরআন ও হাদীছে অনেক বর্ণনা এসেছে। তন্মধ্যে وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللهَ مُخْلِصِيْنَ لَهُ الدِّينَ، ‘তাদেরকে এছাড়া কোন নির্দেশ করা হয়নি যে, তারা খাঁট মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে’ (বাইয়েনাহ ৯৫/৫)। আল্লাহ বলেন,فَمَنْ كَانَ يَرْجُوا لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا، ‘যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাক্ষাত কামনা করে সে যেন সৎকর্ম সম্পাদন করে, এবং তার পালনকর্তার ইবাদতে কাউকে শরীক না করে’ (কাহফ ১৮/১১০)।
আল্লাহ তার নবীকে সম্বোধন করে বলেন,قُلِ اللهَ أَعْبُدُ مُخْلِصًا لَهُ دِينِي، فَاعْبُدُوا مَا شِئْتُمْ مِنْ دُونِهِ، ‘বল, আমি নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর ইবাদত করি। অতএব তোমরা তাঁর পরিবর্তে যার ইচ্ছা তার ইবাদত কর’ (যুমার ৩৯/১৪-১৫)।
আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেন,إِنَّ اللهَ لاَ يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ- ‘আল্লাহ কারো আকৃতি অথবা সম্পদের দিকে তাকান না। তবে তার কাজ এবং অন্তরের দিকে তাকান’।[12]
এছাড়া আমল কবুলের জন্য আরোও কিছু শর্ত রয়েছে। নিম্নে তা তুলে ধরা হ’ল।- যেমন,
১. বিশুদ্ধ নিয়ত : নিয়তের বিশুদ্ধতা ছাড়া কোনো আমলই কবুল হবে না। কেননা নিয়তের উপরও সব আমল কবুল হওয়া নির্ভর করে। ওমর ইবনে খাত্ত্বাব (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّةِ، وَإِنَّمَا لاِمْرِئٍ مَا نَوَى، فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى اللهِ وَرَسُولِهِ فَهِجْرَتُهُ إِلَى اللهِ وَرَسُولِهِ، وَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى دُنْيَا يُصِيبُهَا أَوِ امْرَأَةٍ يَتَزَوَّجُهَا، فَهِجْرَتُهُ إِلَى مَا هَاجَرَ إِلَيْهِ ‘নিঃসন্দেহে যাবতীয় আমলের ফলাফল নিয়তের উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেককে জন্য তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিদান দেয়া হবে। যার হিজরত আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হবে, সে হিজরত আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টি হিসাবেই গণ্য হয়। যার হিজরত দুনিয়া অর্জন অথবা কোন মহিলা বিবাহ করার উদ্দেশ্যে হবে, সে যার উদ্দেশ্যে হিজরত করেছে সে হিসাবেই গণ্য হবে’।[13]
২. হালাল রুযী : আমল কবুল হওয়ার জন্য হালাল জীবিকার বিকল্প নেই। হারাম জীবিকা খেয়ে আমল করলে তা আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তাআলার নির্দেশ -يَاأَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ- ‘হে রাসূলগণ! তোমরা পবিত্র বস্ত্ত হ’তে ভক্ষণ কর এবং সৎকর্ম কর। নিশ্চয়ই তোমরা যা কর, সবই আমি অবগত’ (মুমিনূন ২৩/৫১)।
সাঈদ বিন ইয়াযীদ বলেন, خَمْسُ خِصَالٍ بِهَا تَمَامُ الْعِلْمِ، وَهِيَ: مَعْرِفَةُ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، وَمَعْرِفَةُ الْحَقِّ وَإِخْلَاصُ الْعَمَلِ لِلَّهِ، وَالْعَمَلِ عَلَى السُّنَّةِ، وَأَكْلُ الْحَلَالِ، فَإِنْ فُقِدَتْ وَاحِدَةً لَمْ يُرْفَعِ الْعَمَلُ- পাঁচটি গুণে ইলমের পূর্ণতা রয়েছে। আর তা হ’ল আল্লাহকে চেনা, হক বুঝা, আল্লাহর জন্য ইখলাছপূর্ণ আমল করা, সুন্নাহ মোতাবেক আমল ও হালাল খাদ্য গ্রহণ করা। আর এর একটি নষ্ট হ’লে আমল কবুল হবে না’।[14]
হালাল রুযী ভক্ষণ করা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ لَحْمٌ نبَتَ مِنَ السُّحْتِ وَكُلُّ لَحْمٍ نَبَتَ مِنَ السُّحْتِ كَانَتِ النَّارُ أَوْلَى بِهِ- যে দেহের গোশত হারাম মালে গঠিত, তা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। হারাম মালে গঠিত দেহের জন্য জাহান্নামই সমীচীন।[15] তিনি আরো বলেন, لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ جَسَدٌ غُذِّيَ بالحرَامِ- ‘হারাম দ্বারা পরিপুষ্ট দেহ জান্নাতে প্রবেশ করবে না’।[16]
৩. আমল কবুলের প্রতি মনোযোগী হওয়া : আলী (রাঃ) বলেন, كونوا لقبول العمل أشد اهتماما منكم بالعمل، فإنّه لن يقلّ عمل مع التّقوى، وكيف يقلّ عمل متقبّل؟ ‘তোমরা আমল করার চেয়ে আমল কবুল হওয়ার ব্যাপারে বেশী গুরুত্ব দাও’। কেননা তাক্বওয়ার সাথে সম্পাদিত কোন আমল অল্প হয় না, তাহ’লে কবুলযোগ্য আমল কিভাবে অল্প হবে?[17]
৪. দরূদ শরীফ পাঠ করা : দরূদ পড়া যে কোনো নেক আমল কবুল হওয়ার জন্য রাসুলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ওপর দরূদ পড়া অন্যতম একটি শর্ত। হযরত ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন,إِنَّ الدُّعَاءَ مَوْقُوفٌ بَيْنَ السَّمَاءِ وَالأَرْضِ، لا يَصْعَدُ مِنْهُ شَيْءٌ حَتَّى تُصَلِّيَ عَلَى نَبِيِّكَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- ‘নিশ্চয় বান্দার দোয়া বা আমল ততক্ষণ পর্যন্ত আসমান ও জমিনের মাঝে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে। যতক্ষণ না বান্দা রাসুলুল্লাহ (ছাঃ)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করে’।[18]
৫. আমল করার পর আল্লাহর কাছে কবুলের দো‘আ করা : ইব্রাহীম (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ) কাবা নির্মাণের মতো মহান আমল করার পরও দো‘আ করেছিলেন,رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ- ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদের পক্ষ থেকে এটি কবুল কর। নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ’ (বাক্বারাহ ২/১২৭)।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, মানবজীবনের প্রকৃত সার্থকতা ও পরকালীন চূড়ান্ত মুক্তি লাভ কেবল আমলের পাহাড় গড়ার উপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে মহান আল্লাহর দরবারে সেই আমল কতটুকু গ্রহণযোগ্যতা পেল তার উপর। লোকদেখানো ইবাদত কিংবা নিষ্ঠাহীন বাহ্যিক আমলের স্তূপ পরকালের কঠিন ময়দানে ধূলিকণায় পরিণত হ’তে পারে, যদি তা শরী‘আতের সূক্ষ্ম কষ্টিপাথরে উত্তীর্ণ না হয়। তাই একজন সচেতন মুমিনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত আমলের বাহ্যিক সংখ্যার চেয়ে তার আত্মিক গভীরতা ও বিশুদ্ধতার ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া। ক্বিয়ামতের সেই ভয়াবহ দিনে যেদিন কোনো সম্পদ বা সন্তান কোনো কাজে আসবে না, সেদিন কেবল এই খাঁটি আমলই বান্দার জন্য নাযাতের আলো হয়ে জ্বলবে। আসুন, আমরা আমাদের প্রতিটি কর্মকে ইখলাছ ও সুন্নাহর ছাঁচে ঢেলে সাজাই, যেন নিঃশ্বাসের অবসান ঘটার আগেই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি এবং পরকালে দেউলিয়া না হয়ে তাঁর অশেষ রহমত ও চিরন্তন জান্নাতের অংশীদার হ’তে পারি। হে মহান রব! আমাদের সকল ছোট-বড় সৎকর্মকে আপনার দরবারে কবুল করে নিন এবং আমাদের শেষ পরিণতি সুন্দর করুন।- আমীন!
-মামূন বিন হাসমত
[সহ-সভাপতি, কুষ্টিয়া-পশ্চিম, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ ও
এমফিল গবেষক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া]
[1]. মুসলিম হা/৬৪৭৩।
[2]. বুখারী, তা‘লীক্ব, ‘মুমিনের এই ভয় পাওয়া যে, সে নিজেও টের পাবে না, অথচ অজান্তেই তার আমল ধ্বংস হয়ে যাবে’ অনুচ্ছেদ-৩৬।
[3]. ইবনু কাছীর, তাফসীর সূরা মায়েদাহ ২৭ আয়াত, ৩/৮৪ পৃ.।
[4]. নাসাঈ হা/৩১৪০; ছহীহুত তারগীব হা/১৩৩১।
[5]. তাফসীর ইবনু কাছীর, সূরা কাহাফ ১১০ নং আয়াতে ব্যাখ্যা দ্র.।
[6]. আল-ফাওয়ায়েদ পৃ. ৪৯।
[7]. মাজমু‘উল ফাতাওয়া ১০/৩২২ পৃ.।
[8]. বুখারী হা/৬৫৬০; মিশকাত হা/৫৫৮০।
[9]. মুসলিম হা/১৭১৮।
[10]. বুখারী হা/২৬৯৭; মিশকাত হা/১৪০।
[11]. বুখারী তরজমাতুল বাব-২০; মুসলিম হা/১৭১৮।
[12]. মুসলিম হা/৪৬৫১।
[13]. বুখারী হা/১, ৬৬৮৯; মুসলিম হা/১৯০৭; মিশকাত হা/১।
[14]. কুরতুবী, ২/২০৮, সূরা বাক্বারাহ ১৬৮নং আয়াতের তাফসীর দ্র.।
[15]. আহমাদ, দারেমী, বায়হাক্বী, শুআবুল ঈমান, মিশকাত হা/২৭৭২; ছহীহুল জামে হা/৪৫১৯।
[16]. বায়হাক্বী শুআবুল ঈমান, মিশকাত হা/২৭৮৭; ছহীহাহ হা/২৬০৯।
[17]. আবূ নুআইম ইছফাহানী, হিলয়াতুল আওলিয়া ১/৭৫ পৃ.; সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ, ১১/২৯৯ পৃ.।
[18]. তিরমিযী হা/৪৮৬।