আশাবাদের সুসংবাদ : জীবনের নতুন দিগন্ত

আবু আফিয়া 13 বার পঠিত

ভূমিকা : জীবন মৃত্যু পর্যন্ত এক অবিরাম পথচলা। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে মানুষকে নানা ঝড়-ঝাপটা, দুঃখ-কষ্ট, রোগ-শোক এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হ’তে হয়। অনেক সময় চারপাশের নানামুখী সমস্যা ও ব্যর্থতা মানুষের মনকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। তাকে ঠেলে দেয় নিরাশা আর হতাশার অতল গহবরে। কিন্তু ইসলাম আমাদের এমন এক শাশ্বত জীবনবিধান উপহার দিয়েছে, যেখানে হতাশার কোনো স্থান নেই। ইসলামের মূল কথাই হ’ল আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইতিবাচক মনোভাব। আর এটি এমন একটি মানবিক গুণ, যা সামগ্রিকভাবে জীবন সম্পর্কে মানুষের প্রত্যাশা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে ইতিবাচক করে তোলে। ফলে মানুষ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কল্যাণের খোঁজ করে, বর্তমানকে উপভোগ করে এবং এক উজ্জ্বল, সুন্দর ও আনন্দময় ভবিষ্যতের আশায় বুক বাঁধে। আলোচ্য প্রবন্ধ একজন মুমিনের হৃদয়কে জীবনের কঠিনতম মুহূর্তে ভেঙে না পড়ে আশাবাদের রঙে রাঙিয়ে তুলবে, নতুন উদ্যমে পথ চলতে সাহায্য করবে এবং হৃদয়ে রোপণ করবে আল্লাহর রহমতের প্রতি এক অটল বিশ্বাস। ইনশাআল্লাহ!

আশাবাদী হ’তে কুরআনে উৎসাহ প্রদান : আমাদের মনের মণিকোঠায় আশার আলো জ্বালানোর সবচেয়ে মহিমান্বিত উৎস হ’ল পবিত্র কুরআন। এই কুরআন কি আমাদের বুকভরা আশা, অনাবিল আনন্দ আর চিরন্তন প্রশান্তি এনে দেয় না? অবশ্যই দেয়। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন,لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللهِ ‘তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না’ (যুমার ৩৯/৫৩)। তিনি বলেন, وَلَا تَيْأَسُوا مِنْ رَوْحِ اللهِ ‘আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না’ (ইউসুফ ১২/৮৭)। তিনি আরো বলেন,وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا، ‘আর তোমরা হীনবল হয়ো না, চিন্তান্বিত হয়ো না’ (আলে ইমরান ৩/১৩৯)

আশাবাদের সর্বশ্রেষ্ঠ উৎস পবিত্র কুরআন এমন সব আশার বাণীতে পরিপূর্ণ, যা মানব হৃদয়ের অন্ধকার কোণে আলোর মশাল জ্বেলে তাকে উজ্জীবিত করে। যে ব্যক্তি নিজের নফসের ওপর যুলুম করে গুনাহের সাগরে ডুবে গেছে এবং শয়তানের পাতা ফাঁদে পা দিয়েছে, তাদের জন্য আশাবাদের সুসংবাদ দিয়ে আল্লাহ বলেন,قُلْ يَاعِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ- ‘বল, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের উপর যুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিবেন। নিশ্চয় তিনিই তো ক্ষমাশীল ও দয়াবান’ (যুমার ৩৯/৫৩)। ফলে মুহূর্তেই পাপের রাজ্যে হাহাকার করতে থাকা হৃদয়টি এক অকৃত্রিম আনন্দ, পরম তৃপ্তি, আর প্রফুল্লতায় ভরে উঠবে।

যে মানুষটির দুনিয়াবী সব ধন-সম্পদ হারিয়ে গেছে, সে যখন পবিত্র কুরআনের এই অমৃত বাণীটি পাঠ করবে, তখন তার হৃদয়ে আশার সঞ্চার হবে,قُلْ بِفَضْلِ اللهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُوا هُوَ خَيْرٌ مِمَّا يَجْمَعُونَ- ‘অনুগ্রহের কারণে তাদের আনন্দিত হওয়া উচিত। এটি সবকিছু থেকে উত্তম যা তারা সঞ্চয় করে’ (ইউনুস ১০/৫৮)

যে ব্যক্তি বারবার আল্লাহর দরবারে হাত তোলার পরেও নিজের কাঙ্ক্ষিত দো‘আটি কবুল হ’তে দেখছে না, সে যদি পরম করুণাময়ের এই অমিয় বাণীটি স্মরণ করে, তখন সে বুঝতে পারবে যে, কখনো কখনো আসল কল্যাণ লুকিয়ে থাকে আমাদের অপসন্দের বিষয়ের মাঝে। আল্লাহ বলেন, وَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ وَعَسَى أَنْ تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ، ‘আর অবশ্যই তোমরা এমন বহু কিছু অপসন্দ কর, যা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর অবশ্যই তোমরা এমন বহু কিছু পসন্দ কর, যা তোমাদের জন্য ক্ষতিকর’ (বাক্বারাহ ২/২১৬)

জীবনের পরম সুখের দেখা মেলে কোনো চরম দুঃখের আড়ালে। আর বড় কোনো আনন্দের আগমন ঘটে এক বুক বেদনার নদী পার হয়ে। বাস্তবতা হ’ল, পৃথিবীর বুকে নেমে আসা সব বিপদ-আপদ আর কঠিনতম সংকটকেও যদি আল্লাহর অফুরন্ত দয়া ও করুণার দাঁড়িপাল্লায় মাপা হয়, তবে তা এক নিমেষেই তুচ্ছ ও বিলীন হয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন,الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ- أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِنْ رَبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ- ‘যাদের উপর কোন বিপদ আসলে তারা বলে, নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তার দিকেই ফিরে যাব’। ‘তাদের উপর তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হ’তে রয়েছে অফুরন্ত দয়া ও করুণা এবং তারাই হ’ল সুপথপ্রাপ্ত’ (বাক্বারাহ ২/১৫৬-১৫৭)। তাই তো বলি সেইসব আশাবাদী মানুষদের জন্য চিরকাল সুসংবাদ, যারা মহান আল্লাহর অসীম দয়া ও ভালোবাসার ওপর অবিচল আস্থা রাখে!

আশাবাদের উদাত্ত আহবান : এই নশ্বর পৃথিবীতে মানুষকে মহান আল্লাহ তা‘আলার নানামুখী পরীক্ষার মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে হয়। এখানে কখনো আসে দারিদ্র, কখনো আসে প্রাচুর্য। কখনো সুখের সুবাতাস, আবার কখনো দুঃখের কালো মেঘ। চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে নানা পরীক্ষা আর পরীক্ষা। বাস্তবতা হ’ল, জীবনের চাকা কখনো এক জায়গায় থমকে থাকে না। চিরস্থায়ী শান্তি ও চিরন্তন নে‘মতের একমাত্র ঠিকানা তো হ’ল পরকাল। যা কখনো শেষ হবে না, যা কখনো হারিয়ে যাবে না।

যদি চারপাশের নানামুখী সংকটে এই সুবিশাল পৃথিবীটা আপনার ওপর সংকীর্ণ বা ছোট হয়ে এসে থাকে; যদি আপনি আপনার জীবনসঙ্গী বা সন্তানের আচরণে প্রতিনিয়ত হৃদয়ে রক্তক্ষরণ অনুভব করেন; যদি আপনার আত্মীয়-স্বজন কিংবা প্রতিবেশীদের অবহেলা আর কটু কথা আপনাকে ক্ষতবিক্ষত করে; কিংবা যদি মানুষের বদলে যাওয়া রূপ দেখে আপনি ক্লান্ত অথবা একের পর এক সমস্যার বেড়াজালে বন্দী জীবন-যাপন করেন, তবে জানুন মহান আল্লাহর সেই আশা জাগানিয়া অভয়বাণী,وَلَا تَيْأَسُوا مِنْ رَوْحِ اللهِ إِنَّهُ لَا يَيْأَسُ مِنْ رَوْحِ اللهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَافِرُونَ- ‘আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত থেকে কেউ নিরাশ হয় না অবিশ্বাসী সম্প্রদায় ব্যতীত’ (ইউসুফ ১২/৮৭)

কষ্টের পরেই স্বস্তি : আজ যিনি আপনাকে কাঁদিয়েছেন, কাল তিনিই আপনার মুখে হাসি ফুটাতে পারেন। আজ যে পরিস্থিতি আপনার প্রতিকূলে, কাল তা আপনার অনুকূলে চলে আসতে পারে। কারণ, তিনি ভাঙা কপাল জোড়া লাগান, ভাগ্য পরিবর্তন করেন। মহিমান্বিত আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, سَيَجْعَلُ اللهُ بَعْدَ عُسْرٍ يُسْرًا- ‘সত্বর আল্লাহ কষ্টের পর সহজ করে দিবেন’ (তালাক ৬৭/৭)। তিনি আরও বলেন,إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا- ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে’ (শরহ ৯৪/৬)

মনে এক বুক আশার আলো রাখবেন। ঘোর অন্ধকারের পরেই কিন্তু স্নিগ্ধ আলোর ছুবহে ছাদিক উদিত হয়। চরম ক্লান্তির পরেই আসে পরম শান্তির বিশ্রাম। কঠিন অসুস্থতার পরেই লুকিয়ে থাকে সুস্বাস্থ্যের নে‘মত। ঘোর দারিদ্রের পরেই আসে সচ্ছলতার সুদিন এবং তীব্র সংকটের পরেই ধরা দেয় মুক্তির আনন্দ। ধৈর্য আর সহনশীলতার সাথে অবিচল থাকলেই মানুষ তার কাংখিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে। কারণ এই মহাবিশ্বে পরিস্থিতি কখনো এক অবস্থায় থমকে থাকে না। প্রবাহমান নদীর যেমন জোয়ার-ভাটা থাকে, তেমনি দুঃখের ভাটার পরে আনন্দেও জোয়ার আসে।

উল্লেখ যে, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) সবসময় আশাবাদ পসন্দ করতেন। তিনি যখনই কোনো সুন্দর ও অর্থবহ নাম বা কথা শুনতেন, তখনই তাঁর বক্ষ প্রশান্তিতে ভরে উঠত। হোদায়বিয়ার সন্ধির দিনে মক্কার কুরাইশদের পক্ষ থেকে যখন সুহাইল ইবনে আমর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে চুক্তি ও আলোচনার জন্য এগিয়ে আসছিলেন, তখন তার নাম শুনেই আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) আশাবাদী হয়ে উঠলেন। কারণ ‘সুহাইল’ শব্দটির অর্থ হ’ল সহজ, সরল বা স্বস্তিদায়ক। তাঁকে আসতে দেখে নবীজী (ছাঃ) ছাহাবীদের উদ্দেশ্যে চমৎকার একটি আশার বাণী শুনিয়ে বললেন, لَقَدْ سَهُلَ لَكُمْ مِنْ أَمْرِكُمْ ‘এখন তোমাদের কাজ সহজ হয়ে গেছে’।[1] আল্লাহর রাসূলের সেই পবিত্র আশাবাদই সত্যে পরিণত হয়েছিল; সুহাইলের আগমন মদীনার মুসলিমদের জন্য এক বিরাট কল্যাণ ও বিজয়ের বার্তা নিয়ে এসেছিল।

শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন, অনেক মানুষের অবস্থা এমন হয় যে, যখন তারা সমাজে কোনো অন্যায়-অত্যাচার দেখে কিংবা মানুষের চালচলন ও দ্বীনী অবস্থার চরম অবক্ষয় প্রত্যক্ষ করে, তখন তারা ভেঙে পড়ে এবং বিপদে পড়া মানুষের মতো হায়-হুতাশ ও বিলাপ করতে শুরু করে। অথচ এভাবে ভেঙে পড়া বা নিরাশ হওয়া সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। বরং একজন মুমিনের দায়িত্ব হ’ল যেকোনো পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ করা, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং ইসলামের ওপর অবিচল থাকা। একই সাথে এই দৃঢ় বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ সবসময় মুত্তাকী ও সৎকর্মশীলদের সাথেই আছেন’।[2]

কল্যাণের আশাবাদী হওয়া আল্লাহর প্রতি উত্তম ধারণার অংশ : আশাবাদ মানুষের অন্তরে মহান আল্লাহর প্রতি উত্তম ধারণা ও মযবূত ঈমান জাগ্রত করে। এটি অত্যন্ত মহৎ গুণ। কারণ আশাবাদ জীবনে কল্যাণ বয়ে আনার একটি অন্যতম মাধ্যম। আর আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখা হ’ল আশাবাদের পরম লক্ষ্য। নবী (ছাঃ) বলেছেন, ‘মহিমান্বিত আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা আমার প্রতি যেমন ধারণা পোষণ করে, আমি তার সাথে তেমনই আচরণ করি। সে যদি আমার প্রতি ভালো ধারণা রাখে, তবে তার জন্য কল্যাণ রয়েছে। আর সে যদি মন্দ ধারণা রাখে, তবে তার জন্য তেমনই (পরিণতি) রয়েছে’।[3] 

অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,لَا يَمُوتَنَّ أَحَدُكُمْ إِلَّا وَهُوَ يُحْسِنُ بِاللهِ الظَّنَّ- ‘তোমাদের প্রত্যেকেই যেন মহান আল্লাহর প্রতি উত্তম ধারণা পোষণ করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে’।[4]

আল্লাহর প্রতি এই সুধারণা এবং আশাবাদ এমন একটি বিষয়, যা প্রতিটি মুমিনের সবসময় নিজের মাঝে টিকিয়ে রাখা উচিত। কারণ এটি মানুষকে কাজ করার এবং সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এক প্রবল শক্তি জোগায়। একজন আশাবাদী মানুষ সর্বদা এই আশা বুকে লালন করে যে, তার অনাগত ভবিষ্যৎ বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর ও কল্যাণকর হবে। অতীতে সে যা কিছু হারিয়েছে আল্লাহ তার উত্তম বিকল্প দান করবেন। জীবনের সব বাধা-বিপত্তি ও কঠিন পরীক্ষা সে পেরিয়ে যেতে পারবে এবং আজ যা তার সাধ্যের বাইরে, অচিরেই সে তা লাভ করতে সক্ষম হবে।

বিখ্যাত ইসলামিক স্কলার ইমাম আল-মাওয়ার্দী (রহঃ) কতই না চমৎকার বলেছেন, ‘আশাবাদ মানুষের ইচ্ছাশক্তিকে শক্তিশালী করে, কর্মক্ষেত্রে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে এবং বিজয় বা সফলতা অর্জনে দারুণভাবে সাহায্য করে। স্বয়ং আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) তাঁর জীবনের প্রতিটি যুদ্ধ ও অভিযানে সর্বদা আশাবাদী থাকতেন। আর ইসলামের দৃষ্টিতে আশাবাদ বলতে মুমিনের অন্তরের সেই প্রফুল্লতা, আল্লাহর প্রতি সুধারণা এবং সর্বদা ভালো কিছুর প্রত্যাশা করাকেই বুঝায়’।[5]

আশাবাদের অনন্য উপকারিতা

আশাবাদ কেবল একটি সুন্দর মানসিকতাই নয়। বরং এটি মুমিনের জীবনের এক অনন্য চালিকাশক্তি। এর প্রধান প্রধান উপকারিতাগুলো নিচে দেওয়া হ’ল।-

১. আল্লাহর প্রতি সুধারণার এক মহা-দুয়ার : আশাবাদ মানুষের সামনে মহান আল্লাহর প্রতি উত্তম ধারণা পোষণ করার এক বিশাল দরজা খুলে দেয়। এটি অন্তরে অনাবিল সুখ ও আনন্দ বয়ে আনে এবং মন থেকে সব দুশ্চিন্তা ও বিষণনতা দূর করে দেয়। যা শরী‘আতের দৃষ্টিতেও এটি অত্যন্ত কাম্য বিষয়। আর এজন্য রাসূল (ছাঃ) সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর নিকট এই দু‘আটি করতেন, اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট আশ্রয় প্রাথৃনা করছি দুশ্চিন্তা (ভবিষ্যতের ভাবনা) ও বিষণ্ণতা (অতীতের দুঃখ) হ’তে, অক্ষমতা ও অলসতা হ’তে, কৃপণতা ও কাপুরুষতা হ’তে, ঋণের বোঝা ও মানুষের যবরদস্তি হ’তে’।[6]

২. সংকল্পকে দৃঢ় করে ও বিজয় এনে দেয় : আশাবাদ মানুষের কর্মস্পৃহাকে বাড়িয়ে দেয়, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করে এবং কঠোর পরিশ্রম ও কাজের প্রতি এক নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। যেমন মহান আল্লাহ বলেন,وَقُلِ اعْمَلُوا فَسَيَرَى اللهُ عَمَلَكُمْ وَرَسُولُهُ، ‘আর তুমি বল, তোমরা কাজ করে যাও। অচিরেই তোমাদের কাজ দেখবেন আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও ঈমানদারগণ’ (তওবা ৯/১০৫)

ছহীহ মুসলিমের একটি হাদীছে হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘দুর্বল মুমিনের চেয়ে শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর নিকট অধিক উত্তম এবং অত্যন্ত প্রিয়। তবে উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে। তোমার জন্য যা কল্যাণকর তা লাভ করতে সর্বদা সচেষ্ট থাকো, আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করো এবং কখনো হাল ছেড়ো না (হতাশ হয়ো না)। আর যদি তোমার কোনো ক্ষতি বা বিপদ হয়, তবে কখনো এমন বল না, যদি আমি এমন করতাম, তবে এমন এমন হ’ত; বরং বল ‘এটি আল্লাহর ফায়ছালা, তিনি যা চেয়েছেন তা-ই করেছেন’। কারণ, ‘যদি’ (আক্ষেপ) শব্দটি শয়তানের কুমন্ত্রণা ও কাজের পথ খুলে দেয়’।[7]

৩. অন্তরে সাহস ও অটলতা জোগায় : আশাবাদ মানুষের অন্তরে অসীম সাহস ও আত্মিক শক্তি জোগায়, যার ফলে সে জীবনের যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি এবং বাধা-বিপত্তির মুখোমুখি দাঁড়ানোর অটল মনোবল খুঁজে পায়।

৪. ইবাদতের পূর্ণতা লাভ ও আল্লাহর প্রতি সুধারণা : ইসলামে ইবাদত কবুল হওয়া এবং তা নিখুঁতভাবে সম্পাদন করার অন্যতম শর্ত হ’ল মনের একাগ্রতা ও আশাবাদ। মহান আল্লাহর প্রতি ভালো ধারণা ইবাদতের প্রাণ। মহান আল্লাহ বলেন,وَادْعُوهُ خَوْفًا وَطَمَعًا إِنَّ رَحْمَتَ اللهِ قَرِيبٌ مِنَ الْمُحْسِنِينَ- ‘আর তোমরা তাঁকে ডাক ভয় ও আকাংখার সাথে। নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত সৎকর্মশীলদের অতীব নিকটবর্তী’ (‘আরাফ ৭/৫৬)

হাদীছে কুদসীতে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, আল্লাহ বলেন, ‘আমি আমার বান্দার ধারণার পাশে থাকি। আর আমি তার সাথে থাকি, যখন সে আমাকে স্মরণ করে। সুতরাং সে যদি তার মনে আমাকে স্মরণ করে, তাহ’লে আমি তাকে আমার মনে স্মরণ করি, সে যদি কোন সভায় আমাকে স্মরণ করে, তাহ’লে আমি তাকে তাদের চেয়ে উত্তম ব্যক্তিদের (ফেরেশতাদের) সভায় স্মরণ করি’।[8] 

একজন মানুষ যখন বিশ্বাস করে যে আল্লাহ তার ইবাদত কবুল করবেন, তার তাওবা গ্রহণ করবেন এবং তাকে পুরস্কৃত করবেন, তখন সে ইবাদতে পরম তৃপ্তি ও শক্তি পায়। এই আশাবাদই ইবাদতকে সুনিপুণ করার মূল চালিকাশক্তি।

৫. শারীরিক ও মানসিক আরোগ্য লাভ : আধুনিক বিজ্ঞান আজ প্রমাণ করছে যে ‘পজিটিভ থিংকিং’ বা আশাবাদ মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। তবে ইসলাম সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগেই এই প্রেসক্রিপশন দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন কোনো রোগীকে দেখতে যেতেন, তখন তার মনে আশা সঞ্চারের জন্য তিনি বলতেন,لَا بَأْسَ طَهُورٌ إِنْ شَاءَ اللهُ ‘ভয় নেই, ইনশাআল্লাহ এই অসুস্থতা তোমার গুনাহ খাতার পবিত্রকারী (আরোগ্যকারী) হবে’।[9] [ক্রমশ:]

-আবু আফিয়া

[এমফিল গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়]


[1]. আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৪/২০০; দালায়েলুন নবুওয়াহ ৪/১০৫।

[2]. আল-মুনতাখাব ১/১৩৯ পৃ.।

[3]. আহমাদ হা/৯০৭৬; ছহীহাহ হা/১৬৬৩।

[4]. মুসলিম হা/২৮৭৭; মিশকাত হা/১৬০৫।

[5]. আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ্দীন ৩১৯ পৃ.।

[6]. বুখারী হা/২৮৯৩।

[7]. মুসলিম হা/২৬৬৪; ইবনু মাজাহ হা/৭৯।

[8]. বুখারী হা/৭৪০৫; মুসলিম হা/২৬৭৫; মিশকাত হা/২২৬৪।

[9]. বুখারী হা/৭৪০৫; মিশকাত হা/১৫২৯।



বিষয়সমূহ: বিধি-বিধান
আরও