দ্বি-বার্ষিক কর্মী সম্মেলন ১৯৯৬-এ প্রদত্ত আমীরে জামা‘আতের ভাষণ
তাওহীদের ডাক ডেস্ক
ডা. মুহাম্মাদ সাইফুর রহমান 13 বার পঠিত
জায়নবাদী সংগঠন সমূহের পরিচয় : ‘জায়নবাদ’ হ’ল ইহূদী চরমপন্থীদের একটি আন্দোলন। তাদের শুধু ইস্রাঈল ভূখন্ডে ইহূদীবাদ কায়েম করাই একমাত্র লক্ষ্য নয়; বরং পুরো বিশ্বের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠাই তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। এই লক্ষ্য অর্জনে তারা পথভ্রষ্ট খৃষ্টান ও পৌত্তলিক হিন্দুদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। আর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তারা বিশ্বব্যাপী অসংখ্য গোপন ও প্রকাশ্য সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে। গবেষকদের মতে, পুরো দুনিয়ায় যেসব সংস্থা সরাসরি জায়নবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য এবং পরোক্ষভাবে তাদের ক্রীড়ানক হিসাবে কাজ করছে, সেগুলোর সংখ্যা লক্ষাধিক।
এমন কোনো দেশ নেই যেখানে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এসব সংস্থা কাজ করছে না। আস্তিক, নাস্তিক, পৌত্তলিক, পীর-দরবেশ, যাজক, সব মতবাদের মানুষকে টার্গেট করে তারা কাজ করে যাচ্ছে এবং সর্বত্রই প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংগঠনিক নিপুণতার পরিচয় দিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিশ্বব্যাপী কর্মরত জায়নবাদী সংস্থাগুলোকে ১০টি ভাগে ভাগ করেছেন। (১) আদর্শিক (২) রাজনৈতিক (৩) প্রশাসনিক (৪) সামাজিক (৫) বুদ্ধিবৃত্তিক (৬) বৈজ্ঞানিক (৭) সাংস্কৃতিক (৮) ধর্মীয় (৯) কৌশলগত (১০) সরবরাহ ও সুযোগ-সুবিধাগত’।[1]
এগুলোর অধীনস্থ সংগঠনগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করা সম্ভব নয়। তবে উদাহরণস্বরূপ নিচে উল্লেখযোগ্য কিছু সংগঠন, সংস্থা, প্রতিষ্ঠান ও আন্দোলনের নাম উল্লেখ করা হ’ল, যে সংগঠনগুলো সরাসরি ইহূদীরা পরিচালনা করে অথবা তাদের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। যেমন-
১. আন্তর্জাতিক ইহূদী কংগ্রেস(International Jewish Congress): যার ফোরাম থেকে পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় বক্তৃতা করার সুযোগ পেয়েছিলেন।
২. বিশ্ব জায়নবাদী সংস্থা(World Zionist Organi- zation): ১৮৯৭ সালে থিওডোর হার্জেলের উদ্যোগে সুইজারল্যান্ডের ব্রাসেলস শহরে অনুষ্ঠিত প্রথম জায়নবাদী কংগ্রেসের মাধ্যমে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ্ব জায়নবাদী সংস্থার (WZO) অধীনে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন কাজ করে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হ’ল- (১) উইজো (Women's International Zionist Organization): নারী আন্তর্জাতিক জায়নবাদী সংস্থা। (২) বিনাই ব্রিথ (Bnai Brith International): আন্তর্জাতিক জায়নবাদী ও ইহূদী সংগঠন। (৩) ম্যাকাবি ওয়ার্ল্ড ইউনিয়ন (Maccabi World Union): বিশ্বের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক ইহূদী ও জায়নবাদী ক্রীড়া সংস্থা। ছয়টি মহাদেশের ৭০টিরও বেশি দেশে এর কার্যক্রম পরিচালিত হয়’।[2]
৩. আন্তর্জাতিক জায়োনিস্ট নীগ (International Zionist League) ৪. বেরিহা মুভমেন্ট (Berihah Movement) : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ থেকে ফিলিস্তীনে ইহূদীদের অবৈধভাবে স্থানান্তরের একটি গোপন আন্দোলনের উদ্দেশ্যে গঠিত হয় এ সংগঠন। ৫. আগুদাত ইস্রাঈল (Agudat Israel) ৬. জুইশ কলোনিয়াল ট্রাস্ট (Jewish colonial trust) ৭. বেনেই মোশা (Benei mosha) ৮. হাগানাহ (Haganah): ‘হাগানাহ’ শব্দের অর্থ হ’ল প্রতিরক্ষা। এটি মূলত ব্রিটিশ ম্যান্ডেটরি। যা ফিলিস্তীনে (১৯২০-১৯৪৮) ইহূদী জনগোষ্ঠীর সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীর সংগঠন। ১৯৪৮ সালে ইস্রাঈল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এই আন্ডারগ্রাউন্ড বাহিনীকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করা হয় এবং এটি বর্তমানে ইস্রাঈল ডিফেন্স ফোর্সেস (IDF)-এর মূল ভিত্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। ৯. হাসকালাহ (Haskalah) : ১৮শ ও ১৯শ শতাব্দীতে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের ইহূদীদের মধ্যে উদ্ভুত একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক আন্দোলন। মূলত এ আনেদালনের মাধ্যমে ইউরোপজুড়ে ধর্মনিরপেক্ষতার বীজ বপন করা হয়। ১০. জুইশ ন্যাশনাল ফান্ড (Jewish National Fund অন্যতম।
পরোক্ষ ইহূদী সংস্থাসমূহ : অর্থাৎ যেসব সংস্থা ইহূদীদের দ্বারা প্রভাবিত বা ইহূদীরা নিয়ন্ত্রণ করে (১) জাতিসংঘ (United Nations) (২) জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ (UN Security Council) (৩) বিশ্বব্যাংক (World Bank) (৪) আন্তর্জাতিক রেডক্রস (International Red Cross) (৫) আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (International Monetary Fund-IMF) (৬) অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল (Amnesty International) (৭) রোটারি ইন্টারন্যাশনাল (Rotary International) (৮) লায়ন্স ক্লাবস ইন্টারন্যাশনাল (Lions Clubs International) (৯) আন্তর্জাতিক ফ্রিম্যাসন মুভমেন্ট (International Freemason Movement) (১০) আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট কংগ্রেস (International Communist Congress) (১১) আন্তর্জাতিক মানি মার্কেট (International Money Market) (১২) আন্তর্জাতিক স্টক এক্সচেঞ্জ (International Stock Exchange) (১৩) অক্সফাম (Oxfam) (১৪) বিভিন্ন এনজিও এবং মাল্টিন্যাশনাল করপোরেশন (Multinational Corporation)। এসব সংস্থাসমূহ পরোক্ষভাবে জায়নবাদী পরিকল্পনা ও লক্ষ্য বাস্তবায়নে তৎপর। নিচে উল্লেখযোগ্য কিছু সংস্থার কার্যক্রম সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা পেশ করা হ’ল।-
জাতিসংঘ : জাতিসংঘের কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করলে এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এই বিশ্ব সংস্থাটি ইহূদীদেরই হাতের পুতুল মাত্র। বিশ্ব শান্তির নামে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটি এ যাবৎ ইহূদী স্বার্থেরই হেফাযত করে আসছে। Protocols of the Learned Elders of Zion (বিজ্ঞ ইহূদী মুরুববীদের চক্রান্ত) গ্রন্থে বিশ্বব্যাপী ইহূদী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য যে Administration of the Super Government-এর কথা বলা হয়েছে, তা-ই হচ্ছে জাতিসংঘ।
নিউইয়র্কের ইহূদী আইন ব্যবসায়ী হেনরি ক্লাইন (Henry Klein) তাঁর Zionism Rules the World (New York, ১৯৪৮) গ্রন্থে লিখেছেন, The United Nations is Zionism. It is the super government mentioned many times in the Protocols of the Learned Elders of Zion promulgated between 1897-1905. অর্থাৎ জাতিসংঘ ইহূদীবাদেরই নামান্তর মাত্র। ১৮৯৭ সাল থেকে ১৯০৫ সালের মধ্যে জারিকৃত বিজ্ঞ ইহূদী মুরুববীদের প্রোটোকল পুস্তকে পুনঃপুনঃ যে সুপার গভর্নমেন্ট-এর কথা বলা হয়েছে, এটি তা-ই)।[3]
জাতিসংঘের প্রথম মহাসচিব ছিলেন নরওয়ের ট্রাইগভে হালভদান লি (Trygve Halvdan Lie, 1946–1952), সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ছিলেন বেলজিয়ামের পল-হেনরি স্পাক (Paul-Henri Spaak) এবং ১৯৯২-১৯৯৬ মেয়াদে মহাসচিবের দায়িত্ব পালনকারী বুত্রোস ঘালি (Boutros Ghali) ছিলেন খ্রিস্টানদের ছদ্মবেশে একজন মিশরীয় ইহূদী।[4]
এছাড়াও জাতিসংঘের ৭৩টি গুরুত্বপূর্ণ পদে ইহূদী অফিসার কর্মরত রয়েছেন। জাতিসংঘের সেক্রেটারিয়েটে ২২টি বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা ইহূদী। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (UNESCO), আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO), আন্তর্জাতিক খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO), বিশ্বব্যাংক (WB), আইএমএফ (IMF) এবং আন্তর্জাতিক অর্থ কর্পোরেশন (IFC)-এর প্রধান প্রধান পদগুলোতে ইহূদীরা কর্মরত। এই সকল কর্মকর্তা সর্বদা জায়নবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়নে তৎপর।
বিশেষ করে ফিলিস্তীনে ইহূদীদের উড়ে এসে জুড়ে বসার সুযোগ দান, ১৯৪৭ সালে অন্যায়ভাবে জাতিসংঘ কর্তৃক ফিলিস্তীন বিভক্তির প্রস্তাব গ্রহণ এবং ফিলিস্তীনে ৭ অক্টোবর ২০২৩ থেকে শুরু হওয়া ইস্রাঈলীদের নৃশংস হামলার প্রতি ঔদাসিন্য প্রমাণ করে যে, জাতিসংঘ ইহূদীদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নিবিড়ভাবে কাজ করছে।[5]
ফ্রিম্যাসন আন্দোলন (Freemason Movement): বিশ্বব্যাপী ইহূদীবাদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য যতগুলো গোপন সংস্থা রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ফ্রিম্যাসন আন্দোলন (Freemason Movement) সবচেয়ে শক্তিশালী। Free Mason শব্দের আভিধানিক অর্থ Free Architect বা স্বাধীন নির্মাতা/রাজমিস্ত্রি।
প্রায় আড়াই হাযার বছর পূর্বে হযরত সুলায়মান (আঃ)-এর স্মৃতি রক্ষার্থে রাজমিস্ত্রিদের একটি গোত্র মিশরে ‘মায়বাদে সুলাইমানী’র ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। এই অট্টালিকার প্রধান রাজমিস্ত্রির নাম ছিল হিরাম আবিফ (Hiram Abiff)। দুশমনদের অমানুষিক অত্যাচার সত্ত্বেও তিনি এই উপাসনালয়ের গোপন নকশা ও পরিকল্পনা প্রকাশ করেননি। এই কারণে তাঁকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছিল। সেই রাজমিস্ত্রির অনুকরণে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে চরম গোপনীয়তা রক্ষা করে একটি দুনিয়াজোড়া আন্দোলন পরিচালনা করার মতলবেই ইহূদীরা তাদের এই আন্দোলনের নাম দিয়েছে 'ফ্রিম্যাসন’।[6]
স্বাধীনতা, সমতা, ভ্রাতৃত্ব ইত্যাদি মুখরোচক সেলাগানকে সামনে রেখে ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনে প্রথম ফ্রিম্যাসন আন্দোলন আত্মপ্রকাশ করে। এর সদস্যরা যে স্থানে একত্রিত হন, তাকে ‘ফ্রিম্যাসন লজ’ বলা হয়।
১৭১৭ সালের ২৪ জুন লন্ডনের এরকম ৪টি লজের সমন্বয়ে ইউনাইটেড গ্র্যান্ড লজ (United Grand Lodge) গঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৭২৬ সালে গ্র্যান্ড লজ অব আয়ারল্যান্ড’ এবং ১৭৩৬ সালে ‘গ্র্যান্ড লজ অব স্কটল্যান্ড’ গঠিত হয়। বিশ্বের অসংখ্য লজ মূলত এই তিনটি গ্র্যান্ড লজের অধীন।
পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর শাখা বিস্তার লাভ করে; যেমন: ১৭২৫ সালে ফ্রান্সে, ১৭৩৩ সালে জার্মানীতে, ১৭৩৫ সালে পর্তুগাল ও হল্যান্ডে, ১৭৩৮ সালে মাদ্রিদে, ১৭৪০ সালে সুইজারল্যান্ডে, ১৭৪২ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও জামাইকাতে, ১৭৪৫ সালে ডেনমার্কে, ১৭৬০ সালে ইতালিতে, ১৭৬৫ সালে বেলজিয়ামে, ১৭৭১ সালে রাশিয়াতে এবং ১৭৭৩ সালে সুইডেনে এর শাখা গঠিত হয়’।[7]
মুঘল সাম্রাজ্য ধ্বংসে ফ্রিম্যাসন আন্দোলন : তৎকালীন সময়ে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী মুঘল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিল দিল্লী। এই প্রেক্ষিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ইহূদী সংগঠনগুলো দলে দলে দিল্লীতে চলে আসতে থাকে এবং সমগ্র উপমহাদেশে তাদের ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে। মুঘল সম্রাটদের অনেকেরই নৈতিক পদস্খলন ও অভ্যন্তরীণ অন্তর্দ্বন্দ্বের সুযোগে তারা সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং শী‘আ ও সুন্নীদের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছড়িয়ে দেয়।
১৭২৯ সালে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে সর্বপ্রথম ‘ফ্রিম্যাসন লজ’ স্থাপিত হয়। অতঃপর ১৭৫৩ সালে মাদ্রাজে এবং ১৭৫৮ সালে মুম্বাইতে এর শাখা স্থাপিত হয়। এরপর ফ্রিম্যাসনের সদস্যরা কিরগিজী, গুর্জিস্থানী ও ইস্পাহানী শী‘আ হিসাবে পরিচয় দিয়ে এবং শী‘আ নাম গ্রহণ করে ইহূদী স্বার্থ উদ্ধারে সচেষ্ট হয়’।[8]
বিগত চারশো বছরে উপমহাদেশে শী‘আ-সুন্নীদের মধ্যে যতগুলো সংঘাত হয়েছে, সেগুলোকে এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে অনুসন্ধান, পর্যালোচনা ও অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। আকবরের ‘দ্বীনে ইলাহী, জাহাঙ্গীরের আমলে শী‘আদের ব্যাপক প্রভাব বৃদ্ধি এবং আলমগীরের আমলে শী‘আ-সুন্নী দ্বন্দ্ব এই চক্রান্তেরই একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। ইহূদীরা শী‘আ সম্প্রদায়ের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে তাদেরকে প্রভাবিত করে এবং নিজেদের লক্ষ্য হাসিলের জন্য পীর, মাশায়েখ, সাধারণ মুসলিম ও সুফীদেরকে তাদের ক্রীড়ানকে পরিণত করে।[9]
অতঃপর ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন ফ্রিম্যাসন লজের পলাশীর নাটক মঞ্চস্থ করতে সমর্থ হয় এবং ভারতবর্ষের পূর্বাংশ অর্থাৎ বাংলা-বিহার-ওড়িশা থেকে মুসলিম শাসনের বিলুপ্তি ঘটে। একইভাবে ১৮৫৭-৫৮ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে হিন্দু, শিখ ও গোর্খাদের অসহযোগিতায় মুসলমানরা পরাজিত হলে দিল্লীর মুঘল সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে’।[10]
পাকিস্তান ধ্বংসে ফ্রিম্যাসন আন্দোলন : ১৮৫৯ সালে লাহোরের আনারকলিতে সর্বপ্রথম ‘ফ্রিম্যাসন লজ’ (লজ অব হোপ অ্যান্ড পারসিভিয়ারেন্স) স্থাপিত হয়। ১৯০৪ সালের ৪ এপ্রিল ভয়াবহ ভূমিকম্পে ক্লাব ভবনটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও ১৯১৬ সালে তা পুনরায় সুদৃশ্য ও আধুনিক স্থাপত্যে নির্মাণ করা হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হলে ইহূদীরা প্রমাদ গণে; কেননা এটি ছিল আধুনিক বিশ্বের প্রথম ধর্মভিত্তিক এবং বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র। তাই পাকিস্তান রাষ্ট্রকে শুরুতেই অভ্যন্তরীণভাবে ব্যর্থ প্রমাণ করতে এবং এর শাসন ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করতে লাহোর ছাড়াও হায়দারাবাদ, কোয়েটা, মুলতান, শিয়ালকোট, রাওয়ালপিন্ডি ও পেশোয়ারে ফ্রিম্যাসনের শাখা গড়ে ওঠে। তৎকালীন সময়ে কেবল করাচিতেই এর ২০টি এবং লাহোরে ৩টি শাখা ছিল, যা সরাসরি ‘গ্র্যান্ড লজ অব ইংল্যান্ড’ (Grand Lodge of England)-এর প্রত্যক্ষ অধীনে পরিচালিত হ’ত এবং স্থানীয় উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ কর্মকর্তা ও আমলাদের নিয়ন্ত্রণ করত’।[11]
ইহূদীরা নিজেদের জন্য ধর্মরাষ্ট্র চায়, কিন্তু অন্য কোনো মুসলিম জাতির স্বাধীন ধর্মরাষ্ট্রের অস্তিত্ব মেনে নিতে তারা মোটেও রাযী ছিল না। এই কারণেই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই তারা এর অখন্ডতা বিনাশ ও বিভাজনে চরম তৎপর হয়ে ওঠে। সিআইএ (CIA), কেজিবি (KGB) এবং মোসাদ (MOSSAD)-সহ বিশ্বের প্রভাবশালী ও শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থায় লুকিয়ে থাকা ইহূদী এজেন্টদের মাধ্যমে তারা নিজেদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে থাকে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভৌগোলিক ও সামাজিকভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলগুলোতে ভাষাগত, জাতিগত ও ভূখন্ডগত জাতীয়তাবাদের সুচতুর বীজ বপন করে এবং সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত ও উসকে দিয়ে তারা অবশেষে পাকিস্তানকে অস্থিতিশীল করে তোলে এবং রাষ্ট্রটিকে বিভক্ত করে ফেলে। পরবর্তীতে পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা ও ধর্মীয় অস্তিত্বের সুরক্ষায় ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে জুলফিকার আলী ভুট্টোর শাসনামলে সরকার আইন জারি করে পাকিস্তানে ফ্রিম্যাসনরির সকল কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং লাহোর ও করাচির ঐতিহাসিক লজ ভবনগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে বাজেয়াপ্ত করে’।[12]
বাংলাদেশে ফ্রিম্যাসনের তৎপরতা : রাজধানী ঢাকার পুরানা পল্টন মোড়ে মুক্তাঙ্গনের একপাশে একটি পুরোনো দোতলা ভবন দাঁড়িয়ে আছে। সাদামাটা একটি ভবন, যা বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয় হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভবনটির গায়ে থাকা একটি ফলক যে কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করে; তাতে লেখা রয়েছে, FREE MASON'S HALL-1910।
তৎকালীন সময়ে ফ্রিম্যাসন বা ইহূদী সম্প্রদায়ের লোকজন ছাড়া কেউ এই ক্লাবে প্রবেশ করতে পারতো না। সে সময়ে ঢাকাবাসীর কাছে এটি ছিল এক গভীর রহস্যময় ক্লাব। এর কয়েক বছর পরই চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ শহরে গোপনীয়ভাবে এর কয়েকটি শাখা গড়ে উঠেছিল। এসব শাখাই তখন ‘গ্র্যান্ড লজ অব ইংল্যান্ড’ (Grand Lodge of England)-এর অধীনে পরিচালিত হ’ত।[13]
নিঃসন্দেহে ব্রিটিশ ভারতে চক্রান্তের বীজ বপনকারী ইহূদীরা বর্তমানে বাংলাদেশে মোসাদ, সিআইএ, র, এমআই ফাইভ-সহ অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা, পাশ্চাত্যের অর্থপুষ্ট এদেশের বিভিন্ন এনজিও, বহুজাতিক সংস্থার এদেশীয় কর্মকর্তা, ইহূদী এজেন্ট হিসাবে কর্মরত মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী, পীর ও ঠাকুরদের মাধ্যমে জ্ঞাতে কিংবা অজান্তেতবাংলাদেশ থেকে মুসলিম সংস্কৃতির প্রভাব বিলুপ্ত করার চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী (যাঁরা মূলত ধর্মবিরোধী), সমাজতন্ত্রী, সাম্যবাদী ও নৈরাজ্যবাদী দলগুলোর ছত্রছায়ায় তারা নির্বিঘ্নে নিজেদের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে চলেছে।[14] [ক্রমশঃ]
-ডা. মুহাম্মাদ সাইফুর রহমান
[সভাপতি, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ, দিনাজপুর-পূর্ব সাংগঠনিক যেলা]
[1]. জায়নবাদ : সূচনা ও ক্রমবিকাশ, মো. নূরুল আমিন, (১৯ মার্চ ২০০৯ তারিখে বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার (IIC) আয়োজিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ হিসেবে উপস্থাপিত) পৃ.৬১।
[2]. সূত্র : ইন্টারনেট।
[3]. ইহূদী চক্রান্ত, আব্দুল খালেক, আধুনিক প্রকাশনী ৪র্থ প্রতিমা ফেব্রুয়ারী ২০২৩ ৪৩ পৃ.।
[4]. ইহূদীরাই সকল গণহত্যার মূল পরিকল্পনাকারী, মূল তারিক মাজিদ, অনুবাদ: এম, এ তাহের (প্রথম প্রকাশ ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০১২) ১৫২।
[5]. ইহূদী চক্রান্ত পৃ. ৪৩।
[6]. সূত্র : ইহূদী চক্রান্ত, আব্দুল খালেক ৪৬ পৃ.।
[7]. ইসরাঈল ও মুসলিম জাহান, সাইদুর রহমান এবং মুহাম্মাদ সিদ্দিক, ইফাবা ২য় সংস্করণ, ডিসেম্বর ২০০৩ পৃ. ২১৪-২১৫।
[8]. বিশ্ব যেভাবে ইহূদীদের দখলে, মূল-ড. উমর মুহাম্মাদ খালিদ, অনুবাদ-মুহাম্মাদ জহিরুল ইসলাম, প্রথম প্রকাশ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ফিলহাল প্রকাশন, পৃ. ৯৫।
[9]. জায়নবাদ : সূচনা ও একমবিকাশ পৃ. ৭৩-৭৫।
[10]. সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতির সদরে-অন্দরে, এস. এম. নজরুল ইসলাম, ইতিহাস- অন্বেষা প্রকাশনা, প্রথম প্রকাশ আগস্ট-২০১৪, পৃ.২২।
[11]. বিশ্ব সেভাবে ইহূদীদের দখলে পৃ. ২-৯৫।
[12]. সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতির সদরে -অন্দরে পৃ-৬২।
[13]. দৈনিক প্রথম আলো, ঢাকার ফ্রিম্যাসন্স হলের মত্য-মিথ্যা ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২০।
[14]. সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতির সদরে-অন্দরে পৃ. ৬২।