ডা: জাকির নায়েক : এক নবদিগন্তের অভিযাত্রী
আহমাদ আব্দুল্লাহ নাজীব
ভূমিকা : শীত হ’ল এক কঠিন পরীক্ষার মৌসুম। তীব্র ঠান্ডা বাতাস শরীরকে জমিয়ে দেয়। পানি বরফের মতো কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে। গরিব-দুঃখীর জীবন আরও কষ্টকর হয়ে পড়ে। এই এক ঋতু যা মুখের হাসি শুকিয়ে দেয়। একটুখানি অসতর্কতায় নাক দিয়ে পানি ঝরে। ত্বকের সৌন্দর্য কেড়ে নেয়, দেহকে রুক্ষ করে তোলে। অনেকে তীব্র ঠান্ডায় জীবনও হারায়। কুয়াশার চাদরে মোড়ানো জুবুথুবু প্রকৃতির সাথে দিনের সূচনা হয়। রাত নামে বরফ শীতল নিস্তব্ধতায়। আর কনকনে ঠান্ডা বাতাস নিঃশ্বাসের সাথে বরফের ছুরির ন্যায় গলা চিরে প্রবেশ করে।
এরপরেও শীতকাল মুমিনের জন্য সত্যিই এক বরকতময় বসন্ত। এসময় সে ইবাদতের সুশীতল বাগানে মন খুলে বিচরণ করতে পারে। সহজ আমলের সবুজ প্রান্তরে হাঁটতে হাঁটতে তার হৃদয় ভরে ওঠে। যেমন বসন্তের চারণভূমিতে চরতে চরতে পশুরা সবল হয়ে ওঠে। তেমনি শীতের রহমত মুমিনের দ্বীনকে আরও জীবন্ত, দৃঢ় ও সজীব করে। সালাফে ছালেহীন শীত আসতেই আনন্দিত হতেন। কারণ এর দিন ছোট। যা ছিয়াম পালনকারীর জন্য সহজ। আর রাত দীর্ঘ, যা ক্বিয়ামুল লাইল আদায়কারীর জন্য দারুণ সুযোগ।
ঋতুর পরিবর্তন : নিশ্চয়ই সময়ের আবর্তন ও ঋতুর পরিবর্তনে আল্লাহর রয়েছে গভীর প্রজ্ঞা ও অগাধ রহস্য। এর কিছু নমুনা আমরা বুঝতে পারি। আর অনেক কিছুই আমাদের জ্ঞানের আড়ালে থেকে যায়। বছরের প্রতিটি ঋতুকে আল্লাহ এমনভাবে সাজিয়েছেন, যাতে প্রতিটি ঋতুতে বান্দা বিশেষ ধরনের ইবাদত ও নেক কাজের সুযোগ পায়, যে সুযোগ হয়তো অন্য ঋতুতে মেলে না। আবার কিছু ঋতু ও পরিস্থিতিতে তাকে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করেন, যাতে তার প্রকৃত দাসত্ব প্রকাশ পায় এবং রবের প্রতি তার পূর্ণ বিনয় ও আত্মসমর্পণ প্রতিফলিত হয়।
শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষার এই চক্র ছাড়া ফসল, পানি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র সব বিনষ্ট হয়ে যেত। এটি আল্লাহ নির্ধারিত বিশ্বব্যবস্থারই এক চমৎকার সামঞ্জস্য। আল্লাহ তা‘আলা শীত-গ্রীষ্ম, রাত-দিন সব কিছু নির্দিষ্ট পরিমাপে সৃষ্টি করেছেন, যাতে মানুষ চিন্তা ও শিক্ষা গ্রহণ করে। আল্লাহ বলেন,وَهُوَ الَّذِيْ يُحْيِيْ وَيُمِيْتُ وَلَهُ اخْتِلَافُ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ أَفَلَا تَعْقِلُوْنَ- ‘তিনিই জীবন ও মৃত্যু দান করেন এবং তাঁর কর্তৃত্বে রয়েছে রাত্রি ও দিনের আগমন-নির্গমন। তবুও কি তোমরা বুঝবে না?’ (মুমিনূন ২৩/৮০)। সুতরাং শীত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, আল্লাহই প্রকৃত নিয়ন্ত্রণকারী। আর সৃষ্টির প্রতিটি পরিবর্তন তাঁর হিকমতের অংশ।
তীব্র শীত আগমণের কারণ : দুনিয়ার প্রচন্ড গরম ও তীব্র শীত জাহান্নামের নিঃশ্বাসের প্রভাব। যা মুমিনকে আল্লাহর শাস্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে নেক আমল ও তওবার পথে ফেরার শিক্ষা দেয়। আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, ‘জাহান্নাম তার প্রতিপালকের নিকট এ বলে নালিশ করেছিল, হে আমার প্রতিপালক! (দহনের প্রচন্ডতায়) আমার এক অংশ আর এক অংশকে গ্রাস করে ফেলেছে। ফলে আল্লাহ তা‘আলা তাকে দু’টি শ্বাস ফেলার অনুমতি দিলেন। একটি শীতকালে আর একটি গ্রীষ্মকালে। আর সে দু’টি হ’ল, তোমরা গ্রীষ্মকালে যে প্রচন্ড উত্তাপ এবং শীতকালে যে প্রচন্ড ঠান্ডা অনুভব কর’।[1]
শীতকাল মুমিনের শীতল গণীমত : শীত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সুযোগ সবসময় আসে না। যখন এসেছে, তখনই কাজে লাগানো প্রয়োজন। যে মুমিন শীতকে শুধু কম্বল গায়ে দিয়ে ঘুমানোর সময় মনে করে, সে এই ঋতুর প্রকৃত রহমত হারিয়ে ফেলে। কিন্তু প্রকৃত মুমিন বুঝে, এই শীতের রাতগুলো আসলে আল্লাহর বিশেষ উপহার। যেমন বসন্ত প্রকৃতির জন্য সবচেয়ে সুন্দর ও আরামদায়ক, তেমনি শীতকাল মুমিনের ইবাদত ও আত্মসংস্কারের জন্য একটি সুযোগ-সমৃদ্ধ মৌসুম। এজন্য রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,الغَنِيْمَةُ البَارِدَةُ الصَّوْمُ فِيْ الشِّتَاءِ ‘শীতকালের ছিয়াম বিনা পরিশ্রমে যুদ্ধলব্ধ মালের তথা গণীমতের অনুরূপ’।[2]
শীতের সময় ফরয ছালাত : ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত নবী করীম (ছাঃ) বলেন,مَنْ سَمِعَ النِّدَاءَ فَلَمْ يُجِبْهُ، فَلَا صَلَاةَ لَهُ إِلَّا مِنْ عُذْرٍ ‘যে ব্যক্তি আযান শুনল এবং তার কোন ওযর না থাকা সত্ত্বেও জামা‘আতে উপস্থিত হ’ল না, তার ছালাত নাই’।[3]
‘আমর ইবনুল ‘আছ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, যাতু সালাসিলের যুদ্ধের সময় একদা শীতের রাতে আমার স্বপ্নদোষ হয়। আমার আশংকা হ’ল যে, যদি এই সময় আমি গোসল করি, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হব। আমি তায়াম্মুম করে আমার সাথীদের সাথে ফজরের ছালাত আদায় করি। (যুদ্ধ হ’তে) প্রত্যাবর্তনের পর আমার সঙ্গী-সাথীরা এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে অবহিত করেন। তিনি বলেন, হে ‘আমর! তুমি নাপাক অবস্থায় তোমার সাথীদের সাথে ছালাত আদায় করলে? আমি তাকে আমার গোসল করার অক্ষমতার কথা জ্ঞাপন করলাম এবং আরো বললাম, আমি আল্লাহ তা‘আলার কালাম শুনেছি, وَلَا تَقْتُلُوْا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيْمًا- ‘আর তোমরা আত্মঘাতী হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়াশীল’ (নিসা ৪/২৯)। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কিছু না বলে মুচকি হাসি দেন’।[4]
শীত দ্বারা জাহান্নামীদের শাস্তি : জাহান্নামে নেই স্বস্তির শীতলতা। যখন শীতলতার আশায় কিছু চাইবে, তখন সামনে আসবে গাস্সাক। তা এমন এক শীতলতা, যার স্পর্শে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠবে। মহান আল্লাহ বলেন,لَا يَذُوْقُوْنَ فِيْهَا بَرْدًا وَلَا شَرَابًا- إِلَّا حَمِيْمًا وَغَسَّاقًا- ‘সেখানে তারা আস্বাদন করবে না শীতলতা কিংবা পানীয়’। ‘কেবল ফুটন্ত পানি ও দেহনিঃসৃত পুঁজ-রক্ত ব্যতীত’ (নাবা ৭৮/২৪-২৫)।
ইবনু আববাস (রাঃ) বলেছেন, গাস্সাক হ’ল জাহান্নামের এমন অতিশীতল শাস্তিত যার তীব্র শীতলতাই দগ্ধ করে। মুজাহিদ (রহঃ) বলেছেন, এটি এমন শীত, যার তীব্রতার কারণে জাহান্নামীরা একটুকুও স্বাদ নিতে কিংবা সহ্য করতে পারবে না। তিনি আরো বলেছেন, গাস্সাক হ’ল এমন কিছু, যা একইসাথে অত্যন্ত ঠান্ডা এবং ভয়াবহ দুর্গন্ধযুক্ত’।[5]
শীতকালে সতর্কতা : ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) যখন শীত আগমনের কথা জানতে পারতেন, তখন তিনি তার অধীনস্থদের খোঁজ-খবর নিতেন এবং তাদের উদ্দেশ্যে লিখিত উপদেশ দিতেন। তিনি বলতেন, জেনে রেখো, শীত উপস্থিত হয়েছে। আর শীত এক শত্রু। তাই তার মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্ত্ততি গ্রহণ করো। উলের কাপড়, পায়ের জুতো ও মোজা প্রস্ত্তত রাখো। উলের পোশাককে নিজের গায়ে ভিতরে-বাইরে দু’দিকেই ব্যবহার করো। কারণ শীত হ’ল এমন এক শত্রু, যার আক্রমণ দ্রুত প্রবেশ করে এবং বের হ’তে সময় নেয় অনেক’।[6] এটি ছিল তার পূর্ণাঙ্গ উপদেশ, গভীর দূরদৃষ্টি, অপরিসীম সহানুভূতি এবং প্রজাদের প্রতি তার আন্তরিক যত্নের নিদর্শন।
শীতকাল সম্পর্কে সালাফদের মতামত :
(১) হযরত ওমর (রাঃ) মৃত্যুশয্যায় তার ছেলেকে নছীহত করে বলেছিলেন, ‘হে বৎস! ঈমানকে দৃঢ় রাখার জন্য কিছু গুণ অাঁকড়ে ধরবে। ছেলে জিজ্ঞেস করল, সে গুণগুলো কী? ওমর (রাঃ) বললেন, তীব্র গরমের দিন ছিয়াম রাখা, যা আত্মাকে শুদ্ধ করে এবং দৃঢ়তা বাড়ায়। দ্বীনের মর্যাদা রক্ষার জন্য আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে সাহসের সঙ্গে তরবারি চালানো, বিপদ-আপদে ধৈর্য ধরা। কারণ ধৈর্যই মুমিনের শক্তি। কনকনে শীতে পূর্ণাঙ্গভাবে ওযূ করা। যে ওযূ গুনাহ ধুয়ে দেয়। মেঘলা দিনে দেরি না করে সময়মতো ছালাত আদায় করা, যাতে শয়তান ছালাত নষ্ট করতে না পারে’।[7]
(২) মু‘আয (রাঃ) মৃত্যুর সময় অশ্রুসিক্ত হয়ে বলেছিলেন, ‘আমি কাঁদছি এজন্য যে, ছিয়ামের তৃষ্ণা সহ্য করে গ্রীষ্মের দীর্ঘ দিনগুলো আর পাবো না। শীতের লম্বা রাতগুলোতে দাঁড়িয়ে ছালাত পড়ার সৌভাগ্য আর জুটবে না এবং জ্ঞানীদের সমাবেশে হাঁটু গেড়ে বসে, আল্লাহর স্মরণে ডুবে থাকার সে মধুর মুহূর্তগুলো আর দেখা হবে না’।[8]
(৩) হাসান বাছরী (রহঃ) বলতেন, ‘মুমিনের জন্য শীতকাল কতই না সুন্দর একটি সময়! এর রাতগুলো লম্বা। সে ইচ্ছেমতো দাঁড়িয়ে ছালাত পড়তে পারে। আর দিনের সময়গুলো ছোট, ফলে সে সহজেই ছিয়াম রাখতে পারে’।[9]
(৪) ইবনু রজব (রহঃ) বলেন, ‘শীতকালই মুমিনের জন্য সত্যিকার বসন্ত। কারণ এই ঋতুতে সে ইবাদতের বাগানে মন ভরে ঘুরে বেড়াতে পারে। ছালাত, যিকির ও অন্যান্য বন্দেগীর ময়দানে মুক্তভাবে বিচরণ করতে পারে এবং সহজ-সরল নেক কাজের উদ্যানগুলোতে তার হৃদয়কে পরিপূর্ণভাবে পবিত্র ও নির্মল রাখে। শীত হ’ল নেক কাজের অতুলনীয় সুযোগ। এটি সুযোগ করে দেয় নফল ছিয়াম বৃদ্ধির’।[10]
(৫) ইমাম আল-মুনাওয়ী (রহঃ) বলেন, ‘শীতে ছিয়াম রাখা হ’ল ঠান্ডা গণীমত। অর্থাৎ এমন লাভজনক নেক আমল যা কষ্ট যন্ত্রণা ছাড়াই খুব সহজেই অর্জিত হয়। আরবদের ভাষায় ‘ঠান্ডা’ শব্দটি আরাম ও স্বস্তি বুঝাতে ব্যবহৃত হয়। কারণ তাদের দেশে গরমই প্রধান। আর যখনই শীত আসে, তারা সেটিকে পরম স্বস্তি ও আরামের নিদর্শন বলে বিবেচনা করে’।[11]
(৬) মুওয়ায্যাদ (রহঃ) বলতেন, ‘তিনটি জিনিস না থাকলে, আমি জীবনকে দীর্ঘায়িত হওয়া মোটেও পসন্দ করতাম না। ১. তৃষ্ণা সহ্য করে গ্রীষ্মের দিনে ছিয়াম ২. শীতের রাতে দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় ও ৩. আল্লাহর কিতাব তেলাওয়াত করে তাহাজ্জুদে অমৃত-স্বাদ অনুভব করা’।[12]
শীতের রাতে কষ্ট সত্ত্বেও ইবাদতের ফযীলত :
শীতের রাতে ক্বিয়ামুল লায়ল তথা তাহাজ্জুদ ছালাত বান্দার নফসের কাছে দু’ভাবে কঠিন। ঠান্ডার কষ্ট এবং শীতের উষ্ণ বিছানা ছেড়ে ওঠার পরীক্ষা। কিন্তু যে উঠতে পারে, তার জন্যই অপেক্ষা করে রবের নৈকট্য, প্রশান্ত হৃদয় আর আলোকিত জীবন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, لَا سَمَرَ إِلَّا لِمُصَلٍّ أَوْ مُسَافِرٍ ‘রাতে জেগে থাকা উচিত শুধুমাত্র ইবাদতকারী বা পথযাত্রীর জন্য’।[13]
অন্যটি হ’ল কঠিন ঠান্ডা সত্বেও পূর্ণরূপে ওযূ করা। আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘আমি কি তোমাদের এমন কাজ সম্পর্কে জানাবো না, যা করলে আল্লাহ (বান্দার) পাপরাশি মিটিয়ে দেন এবং মর্যাদা বৃদ্ধি করেন? লোকেরা বলল, হ্যাঁ; হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, ‘কষ্টের সময় পূর্ণরূপে ওযূ করা, মসজিদে বেশি পদচারণা এবং এক ছালাতের পর আর এক ছালাতের জন্য প্রতীক্ষা করা; আর এ কাজগুলোই হ’ল সতর্কতা’।[14]
(২) মু‘আয বিন জাবাল (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, একদিন ভোরে নবী করীম (ছাঃ) ফজরের ছালাতে আসতে দেরী করলেন। এমনকি আমরা প্রায় সূর্য উঠে যাচ্ছে বলে প্রত্যক্ষ করছিলাম। এমন সময় তিনি দ্রুত বেরিয়ে আসলেন। ছালাতের ইক্বামত দেওয়া হ’ল। তিনি সংক্ষিপ্তভাবে ছালাত আদায় করলেন। সালাম শেষে তিনি উচ্চস্বরে ডাকলেন। আমাদের বললেন, যেভাবে তোমরা আছো সেভাবেই তোমাদের কাতারে বসে থাক। এরপর তিনি আমাদের দিকে ফিরে বললেন, আজ ভোরে তোমাদের কাছে (যথাসময়ে বের হয়ে) আসতে আমাকে কিসে বিরত রেখেছিল সে বিষয়ে আমি তোমাদের বলছি।
আমি রাতেই উঠেছিলাম। ওযূ করে যা আমার তাক্বদীরে ছিল সে পরিমাণ তাহাজ্জুদের ছালাত আদায় করলাম। এরপর আমি ছালাতে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম। ঘুম ভারী হয়ে এল। হঠাৎ দেখি, মহান আল্লাহ তা‘আলা সুন্দরতম রূপে আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি বললেন, হে মুহাম্মাদ! আমি বললাম, প্রভু আমার, বান্দা হাযির। তিনি বললেন, মালা-এ-আলায় কি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে? আমি বললাম, হে আমার রব, আমি তো জানি না। আল্লাহ তা‘আলা তিন বার উল্লেখিত উক্তি করলেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, আমি দেখলাম তিনি আমার কাঁধের দুই হাড্ডির মাঝে তাঁর হাত রাখলেন। আমার বুকে তাঁর অঙগুলসমূহের শীতল ছোঁয়া আমি অনুভব করলাম। এতে প্রতিটি বস্ত্ত আমার সামনে প্রতিভাত হয়ে উঠল। সব আমি চিনে নিলাম।
তিনি বললেন, হে মুহাম্মাদ! আমি বললাম, প্রভু আমার, বান্দা হাযির। তিনি বললেন, মালা-এ-আলায় কি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে? আমি বললাম, গোনাহের কাফফারা নিয়ে। তিনি বললেন, সেগুলো কি? আমি বললাম, জামা‘আতের উদ্দেশ্যে পায়ে হেঁটে যাওয়া, ছালাতের পরও মসজিদে অবস্থান করা, কষ্টের সময়ও পরিপূর্ণভাবে ওযূ করা’।[15]
রাতের অন্ধকারে মসজিদে গমনের ফযীলত : যে ব্যক্তি নানা কষ্ট-পরিশ্রম সত্ত্বেও মসজিদে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হয়, বিশেষ করে রাতের অন্ধকারে, সুখবর তার জন্য! তার অপেক্ষায় রয়েছে অসীম কল্যাণ ও অপরিমেয় পুরস্কার। বুরায়দা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি নবী করীম (ছাঃ) হ’তে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন,بَشِّرِ الْمَشَّائِيْنَ فِيْ الظُّلَمِ إِلَى الْمَسَاجِدِ بِالنُّوْرِ التَّامِّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ‘যারা অন্ধকারে মসজিদের দিকে বেশী বেশী চলে। তাদেরকে ক্বিয়ামত দিবসে পরিপূর্ণ নূরের সুসংবাদ দাও’।[16]
আল্লাহর দেওয়া উষ্ণতা ও রিযিকের জন্য কৃতজ্ঞতা : হে প্রিয় পাঠক! এই বরকতময় ঋতুতে আমাদের উচিত আল্লাহর মহৎ অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞ হওয়া। আল্লাহ আমাদেরকে উষ্ণ পোশাক, ঘর-বাড়ি এবং সুস্বাদু খাদ্য দিয়েছেন। যেখানে অনেক মানুষ রাত কাটায় খোলা আকাশের নিচে, শীতের তীব্রতা ও ক্ষুধার যন্ত্রণার মধ্যে। এজন্য আমাদের উচিত আল্লাহর নে‘মতসমূহের জন্য অন্তর থেকে শুকরিয়া আদায় করা। কেবল নিজের জন্য নয় বরং দরিদ্র ও অসহায়দের সহায়তার মাধ্যমে এই কৃতজ্ঞতাকে পূর্ণতা দিতে হবে। আল্লাহ বলেন,وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيْدَنَّكُمْ وَلَئِنْ كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِيْ لَشَدِيْدٌ- وَقَالَ مُوْسَى إِنْ تَكْفُرُوْا أَنْتُمْ وَمَنْ فِيْ الْأَرْضِ جَمِيْعًا فَإِنَّ اللهَ لَغَنِيٌّ حَمِيْدٌ- ‘আর (স্মরণ কর) যখন তোমাদের প্রতিপালক জানিয়ে দেন, যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর, তাহ’লে আমি অবশ্যই তোমাদেরকে বেশী বেশী দিব। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তাহ’লে (মনে রেখ) নিশ্চয়ই আমার শাস্তি অত্যন্ত কঠোর’। ‘আর মূসা বলল, যদি তোমরা এবং পৃথিবীর সবাই অকৃতজ্ঞ হও, (তবে মনে রেখ) আল্লাহ অভাবমুক্ত ও প্রশংসিত’ (ইব্রাহীম ১৪/৭-৮)।
শীতে দরিদ্র ও অসহায়দের প্রতি ব্যয় ও সহায়তা : হে ভাই এবং বোনেরা! শীতকালে অনেক দরিদ্র ও অসহায় মানুষ শীতের তীব্রতায় কষ্ট পায়। তাদের কাছে প্রায়শই এমন কিছু থাকে না, যা তাদের দেহকে ঠান্ডা থেকে রক্ষা করতে পারে। না পোশাক, না পর্যাপ্ত খাদ্য। তাই তাদের প্রতি সহায় হৌন। কেননা নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,الرَّاحِمُوْنَ يَرْحَمُهُمُ الرَّحْمَنُ، ارْحَمُوْا مَنْ فِيْ الأَرْضِ يَرْحَمْكُمْ مَنْ فِيْ السَّمَاءِ ‘যে দয়ালু, দয়াময় আল্লাহ তাকে দয় করের। অতএব তুমি পৃথিবীবাসীর প্রতি দয়া করো, তাহ’লে আসমানের অধিপতি তোমার প্রতি দয়া করবেন’।[17] তিনি আরও বলেন,مَنْ كَانَ فِيْ حَاجَةِ أَخِيْهِ كَانَ اللهُ فِيْ حَاجَتِهِ ‘যে তার ভাইয়ের প্রয়োজন মিটায়, আল্লাহ তার প্রয়োজন মিটান’।[18]
আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, السَّاعِى عَلَى الأَرْمَلَةِ وَالْمِسْكِيْنِ كَالْمُجَاهِدِ فِىْ سَبِيْلِ اللهِ أَوِ الْقَائِمِ اللَّيْلَ الصَّائِمِ النَّهَارَ- ‘যে ব্যক্তি বিধবা ও মিসকীনদের ভরণপোষণের চেষ্টা করে, সে আল্লাহর পথের জিহাদকারীর ন্যায়। অথবা সে ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে দিনে ছিয়াম পালন করে ও রাতে (নফল ইবাদতে) দাঁড়িয়ে থাকে’।[19]
অতএব শীতের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথেই দরিদ্রদের সাহায্যে এগিয়ে যান। কারণ এতে রয়েছে বিশাল ছওয়াব, ধন-সম্পদে বরকত এবং রিযিকের বৃদ্ধির উপায়।
রাতের শেষ প্রহরে তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা : হে আল্লাহর বান্দারা, এই বরকতময় শীতের সময়ে সবচেয়ে বড় ছওয়াবের কাজগুলোর মধ্যে একটি হ’ল রাতের শেষ প্রহরে বেশী বেশী তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করা। কেননা এটি মুমিন বান্দার শ্রেষ্ঠ আমল। আল্লাহ বলেন,كَانُوْا قَلِيْلًا مِنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُوْنَ- وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُوْنَ- ‘তারা রাত্রির সামান্য অংশেই নিদ্রা যেত’। ‘এবং রাত্রির শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত’ (যারিয়াত ৫১/১৮)।
আর নবী করীম (ছাঃ) বলেন, ‘মহামহিম আল্লাহ তা‘আলা প্রতি রাতে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেন, কে আছ এমন, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দিব। কে আছ এমন যে, আমার কাছে চাইবে? আমি তাকে তা দিব। কে আছ এমন, যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব’।[20]
সুতরাং এই সুযোগটি হাতছাড়া করবেন না। নিজের দো‘আ ও ক্ষমা প্রার্থনায় আন্তরিক হৌন। কারণ এই মুহূর্তগুলো আল্লাহর কাছে আপনাকে নিকটতম করে তোলে।
শীতের ছাড়! শীতকাল মুমিন বান্দার জন্য এক বিশাল প্রাঙ্গণ, যেখানে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী ইবাদতের সহজতা ও সুবিধা অনুধাবনের অপার সুযোগ রয়েছে। এই ঋতু আমাদের শেখায় যে, আল্লাহ আমাদের উপর কষ্ট আর জটিলতা চান না। বরং স্বাচ্ছন্দ্য ও সহজতার পথ প্রদর্শন করেছেন। কেননা তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের প্রতি সহজতা চান, কঠিনতা চান না’ (বাক্বারাহ ২/১৮৫)।
এই সহজতার প্রকাশ দেখা যায় শীতকালীন কিছু বিশেষ অনুমতিতে। উদাহরণ স্বরূপ, পবিত্র অবস্থায় থাকা উলের মোজা বা খিফাফের উপর মাসহ করা। নবী করীম (ছাঃ) এই অনুমতি দিয়েছেন এক দিনের জন্য মুক্বীম অবস্থায় এবং মুসাফিরের জন্য তিন দিন পর্যন্ত। এছাড়া পানি না থাকলে বা শীতের তীব্রতায় স্বাস্থ্যের ক্ষতি আশঙ্কাজনক হ’লে তায়াম্মুম করা যায়। এটিও আল্লাহর দয়া, রহমত এবং বান্দার জন্য সহজতার নিদর্শন।
প্রচন্ড শীতে বাড়িতে ছালাত : ইবনু ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন,كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُنَادِي مُنَادِيهِ فِي اللَّيْلَةِ الْمَطِيرَةِ، أَوِ اللَّيْلَةِ الْبَارِدَةِ ذَاتِ الرِّيحِ صَلُّوا فِي رِحَالِكُمْ- ‘বৃষ্টিপাতের রাতে অথবা শীতের রাতে বায়ু প্রবাহ হলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ঘোষক ডেকে বলতেন, তোমরা তোমাদের আবাসস্থলে ছালাত আদায় কর’।[21]
নাফে‘ (রহঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, প্রচন্ড এক শীতের রাতে ইবনু ওমর (রাঃ) যাজনান নামক স্থানে আযান দিলেন। এরপর তিনি ঘোষণা করলেন, তোমরা আবাস স্থলেই ছালাত আদায় করে নাও। পরে তিনি আমাদের জানালেন যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সফরের অবস্থায় বৃষ্টি অথবা প্রচন্ড শীতের রাতে মুয়ায্যিনকে আযান দিতে ,দ বলতেন এবং সাথে সাথে একথাও ঘোষণা করতে বলতেন যে, তোমরা আবাসে ছালাত আদায় করে নাও’।[22]
ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, তীব্র শীত দিনে ও রাতে জামা‘আত ছেড়ে দেওয়ার জন্য বৈধ অযুহাত। আর প্রচন্ড গরম যোহরের ছালাতে অযুহাত হিসেবে গণ্য হয়। বরফ বা তুষার যদি এমন হয় যে, কাপড় ভিজে যাওয়ার শঙ্কা থাকে, সেটিও জামা‘আত ছাড়ার বৈধ কারণ’।[23]
উপসংহার : মানুষ প্রতি বছর জাহান্নামের ভয়ংকর নিঃশ্বাসের প্রভাব তীব্র শীত আর প্রখর গরম নিজের ত্বকেই অনুভব করে। তবুও আমাদের জেনে-বুঝে উদাসীনতা! আগুনের উত্তাপ ও বরফের স্পর্শ সামান্যতম ছুঁয়ে গেলেই কাতর হয়ে পড়ি। এই শীত আমাদের জন্য সেই ভয়ংকর শাস্তির ক্ষুদ্রতম শিক্ষা, যেন আমরা আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচার পথ খুঁজে নিই। যখন ঠান্ডায় হাত কাঁপে, শরীর জমে যায়, তখন মুমিনের মনে জাগে প্রশ্ন যদি এটাই এত কষ্টকর, তবে জাহান্নামের ঠান্ডা কত ভয়ংকর হবে! শীত আসে দেহকে কাঁপাতে নয়, বরং আত্মাকে জাগাতে। আসুন, এই শীতকে আমাদের ঈমানের নতুন জীবন গড়ার সময় বানাই। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের শীতের প্রতিটি মুহূর্তকে বরকতময় ইবাদতে পরিণত করুন।-আমীন!
হাসিবুর রশীদ
[1]. বুখারী হা/৩২৬০; মুসলিম হা/৬১৭; মিশকাত হা/৫৯১।
[2]. বুখারী হা/৩২৬০; মুসলিম হা/৬১৭; মিশকাত হা/৫৯১।
[3]. তিরমিযী হা/২১৭; ইবনু মাজাহ হা/৭৯৩; মিশকাত হা/১০৭৭।
[4]. আবুদাঊদ হা/৩৩৪ ছহীহ-আলবানী।
[5]. তাফসীর ইবনু রজব হাম্বলী, ২/৫৩৩ পৃ.।
[6]. ইবনু রজব, লাতায়েফুল মা‘আরেফ ১/৩৩০ পৃ.।
[7]. ইবনু রজব, লাতায়েফুল মা‘আরেফ ১/৩২৮ পৃ.।
[8]. ইবনু রজব, লাতায়েফুল মা‘আরেফ ১/৩২৭ পৃ.।
[9]. ইবনু রজব, লাতায়েফুল মা‘আরেফ ১/৩২৭ পৃ.।
[10]. ইবনু রজব, লাতায়েফুল মা‘আরেফ ১/৩২৬ পৃ.।
[11]. আবু তুরাব সাইয়েদ বিন হুসায়েন, নিদাঊর রাইয়ান ১/৪২ পৃ.।
[12]. ইবনু রজব, লাতায়েফুল মা‘আরেফ ১/৩২৭ পৃ.।
[13]. ছহীহাহ হা/২৪৩৫; ছহীহুল জামে‘ হা/৪৭৫৬।
[14]. মুসলিম হা/২৫১; মিশকাত হা/২৮২।
[15]. তিরমিযী হা/৩২৩৫; মিশকাত হা/৭৪৮।
[16]. আবুদাঊদ হা/৫৬১; মিশকাত হা/৭২১।
[17]. তিরমিযী হা/১৯২৪; মিশকাত হা/৪৯৬৯।
[18]. বুখারী হা/২৪৪২; মুসলিম হা/২৫৮০; মিশকাত হা/৪৯৫৮।
[19]. বুখারী হা/৫৩৫৩; মুসলিম হা/২৯৮২; মিশকাত হা/৪৯৫১।
[20]. বুখারী হা/৭৪৯৪; মুসলিম হা/৭৫৮; মিশকাত হা/১২২৩।
[21]. ইবনু মাজাহ হা/৯৩৭ ছহীহ-আলবানী।
[22]. বুখারী হা/৬৩২, ৬৬৬।
[23]. নববী, আল-মাজমূ‘ ৪/৯৯ পৃ.।