জায়নবাদী ষড়যন্ত্রের ইতিবৃত্ত [দ্বিতীয় কিস্তি]

ডা. মুহাম্মাদ সাইফুর রহমান 362 বার পঠিত

ইহূদীরা এক চিরন্তন ষড়যন্ত্রকারী জাতি : ইহূদীরা পৃথিবীর প্রাচীনতম একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়। তাদের রয়েছে প্রায় তিন হাযার বছরের ইতিহাস। তবে এই ইতিহাস যতটা না ধর্মকেন্দ্রিক, তার চেয়ে বেশি জাতি ও বংশকেন্দ্রিক। জনসংখ্যায় অতি নগণ্য হয়েও আধিপত্য ও সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের ক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে নেই। ইহূদীরা কেবল মুসলমানদেরই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের জন্যই এক চরম অভিশাপ, এক চিরন্তন ষড়যন্ত্রকারী ভয়ংকর শত্রু। যারা যুগে যুগে ষড়যন্ত্রের জাল বুনে আসছে। সভ্যতাকে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে।

সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইহূদীরা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য যে কোনো সমাজ, রাষ্ট্র ও ধর্মের বিরুদ্ধেও ষড়যন্ত্র করতে পিছপা হয়নি। তাদের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য হ’ল সত্য গোপন করা, নবীগণের বিরুদ্ধাচরণ, অন্যান্য জাতি ও ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ, ওয়াদা ও চুক্তিভঙ্গ, বিশ্বাসঘাতকতা, খেয়ানত, গাদ্দারী, পৃথিবীতে ফিতনা সৃষ্টি, যুদ্ধ-বিগ্রহ জিইয়ে রাখা, অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ দখল করা। এমন কোনো অপরাধ নেই যা তারা করেনি বা করছে না। আজও তারাই পৃথিবীর বড় বড় অপকর্মের মূল হোতা এবং বহু গণহত্যার নেপথ্য পরিকল্পনাকারী।

যারা ছিল একসময় সবচেয়ে নিপীড়িত জাতি, তারাই আজ নিপীড়কের নেতৃত্বে। একটি অভিশপ্ত জাতি হিসাবে ইহূদীরা খ্রিস্টানদের কাছেও ঘৃণিত ছিল। খ্রিস্টান জগৎ সর্বসম্মতভাবে এই বিশ্বাস পোষণ করত যে, ইহূদীরা আল্লাহর নবীদের হত্যাকারী জাতি। সে কারণে খ্রিস্টানদের উপাসনায় ইহূদীদের প্রতি লা‘নাত বর্ষণ করা ছিল একটি অংশ। কিন্তু ১৯৬৫ সালের ২৮ অক্টোবর দ্বিতীয় ভ্যাটিকান পরিষদের এক নির্দেশনায় ‘গুড ফ্রাইডে’ উপাসনায় এ অংশটি বাতিল করা হয়।[1]

যে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও রাশিয়ার মতো দেশ একসময় ইহূদীদের তাড়িয়ে দিত, আজ তারাই তাদের অধিকার ও নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে। ইউরোপীয় রেনেসাঁ ও ফরাসী বিপ্লবের সময় থেকে তাদের যে উত্থান শুরু হয়েছিল, তা আজও অব্যাহত। কিন্তু প্রশ্ন হ’ল তাদের এই উত্থান কীভাবে ঘটল? কীভাবে তারা আজকের ক্ষমতাধর জাতিতে পরিণত হ’ল? কোন সে অদৃশ্য শক্তি যার প্রভাবে তারা পরোক্ষভাবে পুরো বিশ্বকে শাসন করছে?

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে বিশ্বজুড়ে শুরু হয় দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লবের উন্মাদনা। নতুন প্রযুক্তির ছোঁয়ায় শিল্প ও অর্থনীতিতে পরিবর্তনের ঢেউ ওঠে। সে সময় পৃথিবী প্রত্যক্ষ করে নতুন এক মতবাদের উত্থান ‘জায়োনিজম’। ‘জায়োনিজম’ আসলে বহু পুরনো এক মতবাদ। তবে জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের স্বপ্নে ১৮৯৭ সালে থিওডর হার্জেল ও ম্যাক্স নর্ডাউ-এর নেতৃত্বে এই মতবাদটি সাংগঠনিক রূপ পায় World Zionist Organization নামে’।[2]

নিজেদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য তারা সমাজে বিষাক্ত জীবাণুর মতো প্রবেশ করে। বিশ্বজুড়ে তারা অসংখ্য ষড়যন্ত্রের বীজ বপন করেছে। তাদের এক লিখিত কর্মপরিকল্পনা হ’ল The Protocols of the Learned Elders of Zion। এই বইটিতে চক্রান্তের যে পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়েছে, তা পড়লে মনে হয় পাঠক নিজেই যেন সেই ষড়যন্ত্রের জালের মধ্যে আবদ্ধ। প্রতিটি পৃষ্ঠায় ঘৃণা, বিদ্বেষ ও প্রতিশোধ পরায়ণতার বিষ ছড়িয়ে আছে।

পরবর্তী অংশে আমরা জানব, খ্রিস্টান সাম্রাজ্যে ইহূদীদের জীবনব্যবস্থা কেমন ছিল, ইউরোপীয় রেনেসাঁ, ফরাসি বিপ্লব, বলশেভিক বিপ্লব, ওসমানীয় খেলাফত ও মোগল সাম্রাজ্যের পতনসহ পৃথিবীর বড় বড় বিপ্লবের পেছনে কীভাবে ইহূদী ষড়যন্ত্র ও জায়োনিস্ট আন্দোলন কাজ করেছে।

রোমান সাম্রাজ্যে ইহূদীরা :

রোমানরা যখন ইহূদীদেরকে জেরুজালেম থেকে উচ্ছেদ করে, তখন তারা ছড়িয়ে পড়ে শাম, ইরাক, ইরান, মদীনা ও তুর্কিস্তানসহ বিভিন্ন অঞ্চলে। এ ছিল তাদের জন্য এক ভয়াবহ কষ্টের যুগ। নিজেদের স্বপ্নের ভূমি হারিয়ে তারা হয়ে পড়ে বিতাড়িত ও লাঞ্ছিত জাতি। রোমান শাসকগণ তাদের ওপর চালায় নির্মম নির্যাতন। রাজকীয় আইন জারি করে ইহূদী ধর্ম গ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয় এবং পঞ্চম শতক থেকে তাদের সরকারী চাকরিও নিষিদ্ধ করা হয়। বিশেষ করে সম্রাট জান্টিয়ান (৫২৫-৫৬৫ খ্রি.) এই নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে কার্যকর করেন’।[3]

এ সময় বহুবার ইহূদীদের ওপর গণহত্যা সংঘটিত হয়। আল্লাহর গযবের ফলে তারা এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ঘুরপাক খেতে থাকে এবং পৃথিবীর বুকে লাঞ্ছনার জীবন-যাপন করতে থাকে। কিন্তু তাদের বিভ্রান্ত আলেমরা জনগণকে ভুল বুঝিয়ে বলতে থাকে, আমরা আল্লাহর শাস্তির কারণে নয়, বরং রোমানদের যুলুমের কারণে দেশান্তরিত হয়েছি। তাই ফিলিস্তীন ভূমি আমাদের চিরস্থায়ী অধিকার। এই ভ্রান্ত বিশ্বাসই আজ পর্যন্ত তাদের রাজনৈতিক চিন্তা ও আন্দোলনের ভিত্তি হয়ে আছে’।[4]

ইহূদীরা একদিকে ধারাবাহিক গণহত্যা ও দেশান্তরের শিকার হয়ে অপদস্ত জীবন-যাপন করছিল। অপরদিকে ঈসা (আঃ)-এর আনীত সত্য দ্বীনের বিপরীতে তাদের ষড়যন্ত্রও পুরো তাগাদা নিয়ে চলছিল। তারা ঈসা (আঃ)-এর সাথীদের মধ্যে একজন চক্রান্তকারী প্রবেশ করিয়ে দেয়। সে ছিল এক ইহূদী আলেম, যে ‘সেন্ট পৌল’ নামে পরিচিত। ধোঁকা দেওয়ার উদ্দেশ্যে সে সত্য দ্বীন গ্রহণ করে এবং ধীরে ধীরে হাওয়ারীদের সঙ্গে মিলে দ্বীনের প্রচারে অংশ নেয়। যখন হাওয়ারিসহ সবাই ‘সেন্ট পৌল’-কে বিশ্বাস করতে শুরু করে, তখন সে সত্য দ্বীনের মধ্যে বিকৃতি শুরু করে। সে প্রচার করতে থাকে যে, ঈসা (আঃ) আল্লাহ তা‘আলার সন্তান এবং মানবসত্তা তার থেকে বিলুপ্ত। এর ফলে আস্তে আস্তে ঈসা (আঃ)-এর আনীত সত্য দ্বীন ‘সেন্ট পৌল’-এর শিরকী বিশ্বাসের স্রোতে বিলীন হ’তে থাকে’।[5]

ইহূদীদের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল যখন ঈসা (আঃ)-এর জন্মের প্রায় তিনশ বছর পরে রোমান সম্রাট খৃষ্টান হয়ে যান। কনস্টানটাইন খৃষ্টান হওয়ার পর ইহূদীদের জন্য পুরো দুনিয়ার পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়ে যায়। তিনি ইহূদীদের ওপর ব্যাপকভাবে যুলুম ও নির্যাতন চালান। কারণ তাদের বিশ্বাসমতে, ইহূদীরা প্রভুর সন্তান (নাউযুবিল্লাহ) ঈসা (আঃ)-কে ঘৃণা করেছিল এবং রোমানদের সঙ্গে মিলিত হয়ে তাঁকে শূলিতে চড়ানোর ষড়যন্ত্র করেছিল। রোমের খৃষ্টানরা ইহূদীদের খৃষ্টান হ’তে বাধ্য করত। যারা খৃষ্টান হ’তে অস্বীকার করত, তাদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করা হ’ত। এটি ইহূদীদের ইতিহাসে অত্যন্ত কঠিন ও নিপীড়নের যুগ হিসাবে বিবেচিত’।[6]

ব্যবিলনে ইহূদীদের অবস্থান : এ লাঞ্ছনাকর দাসত্ব ও বন্দীত্ব সত্ত্বেও ইহূদীরা তাদের অবাধ্যতা ও পাপাচার চালিয়ে যেত। এর ফলে খৃষ্টপূর্ব ৫৮৬ সালে আল্লাহ তাদের উপর দ্বিতীয় ধ্বংসযজ্ঞ চাপিয়ে দেন। এ ধ্বংসযজ্ঞের সেনাপতি ছিলেন নেবুচাদনেজার, যার নাম কিছু বর্ণনায় ‘বখতনছর’ হিসাবে উল্লেখ করা হয়। তিনি ব্যবিলনীয় সাম্রাজ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজা ছিলেন।

নেবুচাদনেজার ফিলিস্তিনের ভূখন্ড থেকে ইহূদীদের নাম-নিশানা সম্পূর্ণরূপে মুছে দেন। ইয়াহুয়া সাম্রাজ্য তছনছ করা হয় এবং মসজিদে আক্বছা ধ্বংস করা হয়, যাকে তারা ‘টেম্পল’ হিসাবে ডাকার অভ্যাস রাখত। এই ধ্বংসযজ্ঞের পর প্রায় ৪০,০০০ ইহূদী নিয়ে তারা ফিলিস্তীন ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। ইতিহাসে এই ঘটনাকে দ্বিতীয় ব্যবিলন বন্দীদশা বলা হয়। এই পতনের ফলে ফিলিস্তীনের ভূখন্ডে তৎকালীন ইহূদী শাসনের অবসান ঘটে। যা খৃষ্টপূর্ব ১০৪৪ থেকে খৃষ্টপূর্ব ৫৮৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪১৮ বছর স্থায়ী ছিল। নেবুচাদনেজারের ধ্বংসযজ্ঞের পর ফিলিস্তীনের বাকি বনু ইস্রায়েল মিসরে পালিয়ে যায়, যাদের বেশির ভাগকে আগেই বন্দী করে ব্যবিলনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

প্রথম বন্দীত্বের সময় প্রায় ১০,০০০ এবং দ্বিতীয় বন্দীত্বের সময় প্রায় ৪০,০০০ ইহূদী বন্দী হয়। নেবুচাদনেজারের শাসনকাল ছিল ৪৭ বছর, খৃষ্টপূর্ব ৫৮৬ থেকে খৃষ্টপূর্ব ৫৩৯ সাল পর্যন্ত। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইহূদীদের এই বিপর্যয়ের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে বলেন, ‘অতঃপর যখন প্রতিশ্রুত সেই প্রথম সময়টি এল, তখন আমরা তোমাদের বিরুদ্ধে আমাদের একদল বান্দাকে প্রেরণ করলাম, যারা ছিল কঠোর যোদ্ধা। অতঃপর তারা জনপদের ঘরে-ঘরে ঢুকে ধ্বংসযজ্ঞ চালালো। আর এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হওয়ারই ছিল’ (বনু ইস্রাঈল ১৭/০৫)[7] 

ইসলামী সাম্রাজ্যে ইহূদীদের অবস্থান : ইহূদীদের উপর খৃষ্টানদের নির্যাতন সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত চলমান ছিল। সপ্তম শতাব্দীতে আরবে ইসলামের সূর্য উদিত হয়। মুহাম্মাদ (ছাঃ) যখন মদীনায় হিজরতের পর নবুঅত প্রতিষ্ঠা করেন, তখন সেখানে তিনটি ইহূদী গোত্র বসবাস করত। বনু কুরায়জা, বনু কায়নুকা ও বনু নাযীর। তারা নবীর আনীত সত্য দ্বীনের সত্যতা জানার পরও তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিল। এ কারণে এবং গাদ্দারী ও চুক্তিভঙ্গের জন্য রাসূল (ছাঃ) তাদের মদীনায় থেকে বের করতে বাধ্য হন।

অতঃপর ওমর (রাঃ)-এর সময় আল্লাহর রাসূলের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদেরকে পুরো জাজিরাতুল আরব থেকে বের করা হয়। যখন ওমর (রাঃ)-এর সময় বায়তুল মুক্বাদ্দাছ বিজিত হয়, তখন ফিলিস্তীনের পবিত্র ভূমির নাম ছিল ‘ইলিয়া’ এবং সেখানে শাসক ছিলেন রোমান বা খৃষ্টান। বায়তুল মুক্বাদ্দাসের খৃষ্টান পাদ্রীরা খেলাফতের অধীনে যিম্মি হিসাবে থাকতে সম্মত হয়।

যখন ওমর (রাঃ) তাদের থেকে শহরের চাবি নেওয়ার জন্য বায়তুল মুক্বাদ্দাসে যান, তখন একটি চিঠি লিখেন। চিঠিতে একটি মূলনীতি ছিল ফিলিস্তীনে খৃষ্টানদের মতো ইহূদীরা বসবাসের কোনো অনুমতি পাবে না। মুসলিমদের হাতে ফিলিস্তীন বিজয় ছিল ইহূদীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ ইহূদীদের সামনে তখন খৃষ্টানদের পর আরেকটি শক্তিশালী দ্বীন ফিলিস্তীন ভূমির দাবি নিয়ে এসেছে এবং সেই ভূমি দখল করেছে।

পরবর্তীতে খৃষ্টান ও মুসলিমদের মধ্যে ক্রুসেড যুদ্ধ শুরু হলে ইহূদীরা এতে সরাসরি অংশ নিত না। কারণ তাদের সংখ্যা এত বেশি ছিল না, যে তারা দুই বড় শক্তির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারত। তবে তারা তাদের পুরনো কৌশল অনুযায়ী চক্রান্ত চালিয়ে যেত, যা তাদের ইতিহাসের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য’।[8]

ইহূদী রাবাইদের মতে, মুসলিম শাসনামলে ইহূদীরা শান্তিপূর্ণভাবে জীবন-যাপন করত এবং নিজেদের মধ্যে প্রভূত উন্নতি সাধন করতে সক্ষম হ’ত। মুসলিম সাম্রাজ্যের শহরগুলোতে ইহূদীরা রঙ করা, তাঁত বোনা, রেশমি কাপড় তৈরি, ধাতুর কাজ ইত্যাদি শিখে নেয় এবং এতে যথেষ্ট পারদর্শিতা অর্জন করে। তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করতে থাকে। যেসব প্রদেশ বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং মুসলিমদের অধীনে আসে, সেখানকার ইহূদীরা মুসলিম শাসনকে সাদরে গ্রহণ করে। খৃষ্টানদের শোষণের পরিবর্তে ইসলামী আইনের কাঠামোর মধ্যে থাকতে ইহূদীরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত। এই সময়ে ইহূদীরা মুসলিমদের দৃষ্টান্ত দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে জ্ঞান ও বিজ্ঞানে পড়াশোনা করে এবং প্রভূত উন্নতি সাধন করে।

দশম শতকে মিসরের কায়রোতে (ফাতেমীয় সাম্রাজ্যের অধীনে) ‘ইয়েশিভাই’ নামে ইহূদীদের একটি শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে ওঠে। এখানে তাওরাত, হালাখা (ইহূদী আইন), তালমুদ ইত্যাদি শিক্ষাদান করা হতো। তিউনিশিয়ার কায়রাওয়ানেও অনুরূপ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। এগুলো মূলত ইহূদী ধনী ব্যক্তিদের আর প্রখ্যাত ইহূদী বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত হ’ত। শিক্ষার্থীরা জ্ঞান-বিজ্ঞানে উৎকর্ষ লাভ করত এবং সমাজে তাদের প্রভাব বৃদ্ধি পেত’।[9]

ইউরোপে যখন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তখন খৃষ্টীয় সপ্তম শতকে তিউনিসিয়ায় ‘আল-যাইতুনা’ নামে একটি শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর পর স্পেনে প্রতিষ্ঠিত হয় কর্ডোভা এবং আন্দালুসিয়ার বিশ্ববিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেখানে ইহূদী, খৃষ্টান ও মুসলিমসহ সকল ধর্মের অনুসারী ছাত্রদের জন্য জ্ঞানার্জন উন্মুক্ত ছিল।

ঐ সময় রোমের একজন পোপও মুসলিম স্পেনে বিদ্যা অর্জনের জন্য এসেছিলেন। ইতালির অগাস্টাইন, সরে এবেলার্ড টমাস, একুইনাস প্রভৃতি পন্ডিতগণ মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এসে জ্ঞান অর্জন করে। পরে তারা মুসলিম পন্ডিতদের লিখিত গ্রন্থসমূহ আরবী ভাষা থেকে ল্যাটিনে অনুবাদ করে ইউরোপকে জ্ঞান-বিজ্ঞানে উৎকর্ষ লাভে সহায়তা করেন।

বলোগনায় প্রতিষ্ঠিত প্রথম ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেদিন যে শিক্ষা সম্পর্কিত গ্রন্থ পড়ানো হ’ত, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য শিক্ষক ছিলেন ইবনে রুশদ, আল-হাসান, আবু আলী সীনা, ইবনু জোহর, জায়ী, আল-রাজি, তাবারী, ইবনু খালদুন। প্যারিসের বিশ্ববিদ্যালয়ে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত চিকিৎসা বিষয়ক গ্রন্থের মধ্যে প্রখ্যাত ছিল ইবনু সীনার আল-কানুন ফিত তিবব। বলা যায়, মুসলিম পন্ডিতরা প্রথমবারে ইহূদী ও খৃষ্টানদেরকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন’।[10]

ইহূদীরা স্পেনের আন্দালুসিয়ায় শিক্ষায় ও সংস্কৃতিতে সর্বোচ্চ উৎকর্ষ অর্জন করে। দশম শতকে স্প্যানিশ রাজদরবারে উমাইয়া খলিফা তৃতীয় আব্দুর রহমান (৯১২-৯৬১) তাদের মধ্যে হিসদাই ইবনে শাপত (৯১৫-৯৭০) কে চিকিৎসক এবং কূটনীতিক হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি একই সঙ্গে ইহূদী সমাজের নেতৃত্বও বহন করতেন এবং নানা শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানকে উদারভাবে অর্থায়ন করতেন।

সেই সময় উমাইয়া খেলাফতের রাজধানী কর্ডোবা ছিল। যা ইহূদী সমাজের সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক উৎকর্ষের কেন্দ্রস্থল হিসাবে পরিণত হয়। এখানে কবি, ব্যাকরণবিদ, দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরা একত্রিত হয়ে জ্ঞান, সাহিত্য ও বিজ্ঞানচর্চায় নেতৃত্ব দেন। একাদশ শতকে উমাইয়া খেলাফাত ভেঙে গেলে স্থানীয় মুসলিম শাসকরা দরবারে ইহূদীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিতে শুরু করেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিলেন স্যামুয়েল ইবনে নাগরেলা (৯৯৩-১০৫৬ খৃ.)। সে গণিত ও দর্শনে পারদর্শী ছিল এবং হিব্রু ও আরবী ভাষায় অসাধারণ লেখালেখির মাধ্যমে শিক্ষার প্রসার ঘটাত।[11]

৭১১ খৃষ্টাব্দ থেকে ১৪৯২ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ৮০০ বছরের মুসলিম শাসনে স্পেনের ইহূদী-খৃস্টানসহ সকল ধর্মের অনুসারীরা বেশ শান্তিতে বসবাস করে আসছিল এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানে প্রভূত উন্নতি সাধিত করেছিল। কিন্তু ১৪৯২ সালে ক্যাথলিক রাজা ফার্ডিন্যান্ড ও ইসাবেলা গ্রানাডা দখল করলে ইহূদীরা বর্বর খৃস্টানদের হাতে অত্যাচারিত হয়ে আন্দালুস থেকে চিরতরে বিতাড়িত হয় এবং পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। যেমন- উত্তর আফ্রিকা, মরক্কো, আলজেরিয়া, তুরস্ক, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইরান, আমেরিকাসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশগুলোতে।

 (ক্রমশঃ)


[1]. মো : নূরুল আমিন, জায়ানবাদ : সূচনা ও ক্রমবিকাশ (১১ই মার্চ ২০০৯, তারিখে বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টারে আয়োজিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ হিসাবে উপস্থাপিত)।

[2]. সিক্রেটস অব জায়োনিজম, হেনরি ফোর্ড, ভাষান্তর : ফুয়াদ আল-আজাদ, (গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্স, ৩য় সংষ্কর, ১৮ই জুলাই ২০২০) ১১ পৃ.।

[3]. আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ, ইসরাইলের উত্থান-পতন (ছায়াবীথি প্রকাশন ঢাকা) ১০৫; www.boimate.com.

[4]. হেদায়াতুল্লাহ মেহমান্দ, অনুবাদ : ইফতেখার সিফাত (রুহামা পাবলিকেশন, প্রথম সংস্করণ নভেম্বর ২০২১) পৃ. ৫২।

[5]. প্রাগুক্ত ৫২ পৃ.।

[6]. প্রাগুক্ত ৫২-৫৩ পৃ.।

[7]. কালের বিবর্তনে ফিলিস্তিনের ইতিহাস, ড. রাগিব সারজানী, আব্দুর রহমান আযহারী অনূদিত, হুদহুদ প্রকাশন, সেপ্টেম্বর ২০২২ পৃ.৭৫-৭৬।

[8]. ইসরাঈলের উত্থান-পতন, আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ, ছায়াবীথি প্রকাশন পৃ. ১২৫-১২৭।

[9]. প্রাগুক্ত পৃ. ১৪২।

[10]. অধ্যক্ষ মুহাম্মাদ আব্দুল মজিদ, বিতর্কিত জেরুজালেম নগরী, (ঢাকা: আধুনিক প্রকাশনী, প্রথম প্রকাশ ২০০৫) ৮৫ পৃ.।

[11]. ইসরাঈলের উত্থান-পতন, ১৪৩-১৪৪ পৃ.।



বিষয়সমূহ: বিবিধ
আরও