দ্বি-বার্ষিক কর্মী সম্মেলন ১৯৯৬-এ প্রদত্ত আমীরে জামা‘আতের ভাষণ
তাওহীদের ডাক ডেস্ক
ফায়ছাল মাহমূদ 735 বার পঠিত
মুসলিমের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের পবিত্রতা : মুসলিমের জীবন, সম্পদ ও সম্মান হরণ করা হারাম। বিদায় হজ্জের ভাষণে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মুসলিমদের পরস্পরের রক্ত, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তা সম্পর্কে জোর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,فَإنَّ دِمَاءَكُمْ وَأمْوَالَكُمْ وَأَعْرَاضَكُمْ عَلَيْكُمْ حَرَامٌ، كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا فِيْ بَلَدِكُمْ هَذَا فِيْ شَهْرِكُمْ هَذَا ‘তোমাদের রক্ত, তোমাদের ধন-সম্পদ ও তোমাদের ইযযত পরস্পরের উপরে এমনভাবে হারাম, যেমন এই দিন, এই শহর ও এই মাস তোমাদের জন্য হারাম।[1]
আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কাবা প্রদক্ষিণকালে বলছিলেন,مَا أَطْيَبَكِ وَأَطْيَبَ رِيحَكِ، مَا أَعْظَمَكِ وَأَعْظَمَ حُرْمَتَكِ، وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ، لَحُرْمَةُ الْمُؤْمِنِ أَعْظَمُ عِنْدَ اللَّهِ حُرْمَةً مِنْكِ، مَالِهِ، وَدَمِهِ، وَأَنْ نَظُنَّ بِهِ إِلَّا خَيْرًا- ‘তুমি কতই না পবিত্র এবং তোমার সুগন্ধি কতই না মনোমুগ্ধকর! তুমি কতই না মহান এবং তোমার মর্যাদা কতই না উচ্চ! যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, সেই সত্তার শপথ! আল্লাহর কাছে মুমিনের সম্মান তোমার সম্মানের চেয়েও অধিক। তার সম্পদ ও রক্ত (পবিত্র), আর আমরা তার সম্পর্কে কেবল সুধারণাই পোষণ করি’।[2]
ইসলামে মানুষ হত্যার বিধান : আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে মানুষ হত্যাকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন এবং এর জন্য কঠিন শাস্তির বিধান রেখেছেন। অন্যায়ভাবে কারো জীবন নেওয়া পৃথিবীর অন্যতম জঘন্য কাজ। আল্লাহ বলেন, وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللهُ إِلاَّ بِالْحَقِّ ذَلِكُمْ وَصَّاكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ- ‘ন্যায্য কারণ ব্যতীত কাউকে হত্যা করবে না, যা আল্লাহ হারাম করেছেন। এসব বিষয় তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যাতে তোমরা অনুধাবন করো’ (আন‘আম ৬/১৫১)।
হত্যা গুরুতর ও ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ : আব্দুল্লাহ ইবনু বুরায়দা তার পিতা হ’তে বর্ণনা করেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, قَتْلُ الْمُؤْمِنِ أَعْظَمُ عِنْدَ اللَّهِ مِنْ زَوَالِ الدُّنْيَا ‘মুমিনকে হত্যা করা আল্লাহর নিকট গোটা পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার চেয়ে গুরুতর’।[3]
আবুদ দারদা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি,كُلُّ ذَنْبٍ عَسَى اللَّهُ أَنْ يَغْفِرَهُ، إِلَّا مَنْ مَاتَ مُشْرِكًا، أَوْ مُؤْمِنٌ قَتَلَ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا-. ‘আল্লাহ (চাইলে) সব গুনাহই ক্ষমা করবেন; কিন্তু মুশরিক অবস্থায় কেউ মারা গেলে অথবা ঈমানদার ব্যক্তি অপর কোনো ঈমানদারকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করলে (তা ক্ষমা করবেন না)।[4]
মুসলিমের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণের ভয়াবহ পরিণতি : আহনাফ ইবনু কায়েস (রহঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, আবু বাকরা (রাঃ)-এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হলে তিনি বলেন,إِذَا الْتَقَى الْمُسْلِمَانِ بِسَيْفَيْهِمَا فَالْقَاتِلُ وَالْمَقْتُولُ فِى النَّارِ، قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ هَذَا الْقَاتِلُ فَمَا بَالُ الْمَقْتُولِ قَالَ إِنَّهُ كَانَ حَرِيصًا عَلَى قَتْلِ صَاحِبِهِ- ‘দু’জন মুসলিম তাদের তরবারি নিয়ে মুখোমুখি হ’লে হত্যাকারী এবং নিহত ব্যক্তি উভয়ে জাহান্নামে যাবে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! এ হত্যাকারী (তো অপরাধী) কিন্তু নিহত ব্যক্তির কি অপরাধ? তিনি বললেন, (নিশ্চয়ই) সে তার সঙ্গীকে হত্যা করার জন্য উদগ্রীব ছিল’।[5]
অস্ত্রের দ্বারা ইঙ্গিত করার নিষেধাজ্ঞা : ইসলামে মুসলিম ভাইয়ের প্রতি অস্ত্র উত্তোলনকেও অত্যন্ত কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে, তা সে ঠাট্টাচ্ছলেই হোক বা প্রকৃত অর্থেই হোক। আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,لاَ يُشِيرُ أَحَدُكُمْ عَلَى أَخِيهِ بِالسِّلاَحِ، فَإِنَّهُ لاَ يَدْرِى لَعَلَّ الشَّيْطَانَ يَنْزِعُ فِى يَدِهِ، فَيَقَعُ فِى حُفْرَةٍ مِنَ النَّارِ- ‘তোমাদের কেউ যেন তার কোনো ভাইয়ের উপর অস্ত্র উত্তোলন করে ইশারা না করে। কেননা, সে জানে না হয়তো শয়তান তার হাতে ধাক্কা দিয়ে দিবে, ফলে (মুসলিম হত্যার অপরাধে) সে জাহান্নামের গর্তে নিপতিত হবে’।[6]
ছহীহ মুসলিমের অপর এক বর্ণনায় রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,مَنْ أَشَارَ إِلَى أَخِيهِ بِحَدِيدَةٍ، فَإِنَّ الْمَلَائِكَةَ تَلْعَنُهُ، حَتَّى يَدَعَهُ وَإِنْ كَانَ أَخَاهُ لِأَبِيهِ وَأُمِّهِ- ‘যে ব্যক্তি তার (মুসলিম) ভাইয়ের প্রতি কোনো লোহার অস্ত্র দ্বারা ইঙ্গিত করে, সে ব্যক্তিকে ফেরেশতাবর্গ অভিশাপ করেন, যতক্ষণ না সে তা ফেলে দেয়। যদিও সে তার সহোদর ভাই হয়’।[7]
খোলা তরবারি দেওয়া-নেওয়াও নিষিদ্ধ : ইসলাম মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খাপ খোলা তরবারি বহন ও আদান-প্রদান করতে নিষেধ করেছে। জাবের (রাঃ) বলেন,نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يُتَعَاطَى السَّيْفُ مَسْلُولًا- ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) পরস্পর (খাপ খোলা) উলঙ্গ তরবারি আদান-প্রদান করতে নিষেধ করেছেন’।[8] কারণ ধারালো অস্ত্র খোলা অবস্থায় হস্তান্তর করলে যে কোন সময় দুর্ঘটনা ঘটার ঝুঁকি থাকে।
ভ্রুণ হত্যাও মানব হত্যার ন্যায় অপরাধ : জাহেলী যুগে দারিদ্রের ভয়ে বা কন্যাসন্তান হলে সামাজিক মানক্ষুণ্ণের ভয়ে ছোট নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করা হ’ত। কখনো উত্তপ্ত মরুভূমির বুকে জীবন্ত পুতে ফেলা হ’ত নিষ্পাপ শিশুদের। ইসলাম এই ঘৃণ্য প্রথাকে কঠোরভাবে নিষেধ করে এবং এর জন্য আল্লাহর সম্মুখে লাঞ্ছনা ও শাস্তির ঘোষণা করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ نَحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ إِنَّ قَتْلَهُمْ كَانَ خِطْئًا كَبِيرًا- ‘তোমরা দরিদ্রতার ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না। আমরা তাদের ও তোমাদের রূযী দিয়ে থাকি। নিশ্চয়ই তাদেরকে হত্যা করা মহাপাপ’ (বনু ইস্রাঈল ১৭/৩১)। বর্তমানেও জন্মের পূর্বে গর্ভের জীবন্ত সন্তানকে হত্যা করা একটি মারাত্মক অপরাধ, যা সুস্পষ্ট হত্যার শামিল। ক্বিয়ামতের দিন এই শিশুদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা জিজ্ঞাসা করবেন, ‘কি অপরাধে সে নিহত হয়েছিল?’ (তাকবীর ৮১/৯)।
মানুষ হত্যার অনুমতিপ্রাপ্ত কারণসমূহ : ইসলামে কেবল তিনটি নির্দিষ্ট কারণে মানুষের জীবননাশ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে তার জন্য অবশ্যই ইসলামী আদালতের মাধ্যমে অপরাধ প্রমাণপূর্বক রায় থাকতে হবে। আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) সূত্রে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, لَا يَحِلُّ دَمُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ، يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنِّي رَسُولُ اللهِ، إِلَّا بِإِحْدَى ثَلَاثٍ: الثَّيِّبُ الزَّانِي، وَالنَّفْسُ بِالنَّفْسِ، وَالتَّارِكُ لِدِينِهِ الْمُفَارِقُ لِلْجَمَاعَةِ- ‘ঐ মুসলিম ব্যক্তির রক্ত হালাল নয়, যে সাক্ষ্য দেয় আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল। তবে তিনটি কারণের একটি ঘটলে তা হালাল। (১) বিবাহিত হয়ে ব্যভিচার করলে। (২) যদি কেউ অন্যায়ভাবে কোনো মানুষকে হত্যা করে (ক্বিছাসের ক্ষেত্রে)। (৩) যদি সে মুসলিম সম্প্রদায় ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায়’।[9]
উল্লেখ্য যে, মুরতাদ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ড দেওয়ার পর তাকে তওবা করার জন্য নির্ধারিত সময় প্রদান করতে হবে। যদি সে তওবা করে, তাহ’লে মৃত্যুদন্ড কার্যকর হবে না।
হত্যার ইহকালীনশাস্তি : হত্যাকারীর দুনিয়ার শাস্তি হ’ল ক্বিছাছ। ক্বিছাছ শব্দটি এসেছে (قصص) শব্দ থেকে, যার অর্থ সমপরিমাণ বা অনুরূপ। হত্যার বদলে হত্যা বা আঘাতের বদলে সমপরিমাণ আঘাত করার অনুমোদিত প্রতিবিধানকে ক্বিছাছ বলা হয়।
আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবীতে হত্যার অপরাধে অপরাধী ব্যক্তির জন্য সুষ্পষ্টভাবে শাস্তি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন,يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلَى الْحُرُّ بِالْحُرِّ وَالْعَبْدُ بِالْعَبْدِ وَالْأُنْثَى بِالْأُنْثَى فَمَنْ عُفِيَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٌ فَاتِّبَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ وَأَدَاءٌ إِلَيْهِ بِإِحْسَانٍ ذَلِكَ تَخْفِيفٌ مِنْ رَبِّكُمْ وَرَحْمَةٌ فَمَنِ اعْتَدَى بَعْدَ ذَلِكَ فَلَهُ عَذَابٌ أَلِيمٌ- ‘হে বিশ্বাসীগণ! নিহতদের বদলা গ্রহণের বিষয়টি তোমাদের উপর বিধিবদ্ধ করা হ’ল। স্বাধীনের বদলে স্বাধীন, দাসের বদলে দাস ও নারীর বদলে নারী। এক্ষণে যদি তার (নিহত) ভাইয়ের পক্ষ হ’তে তাকে কিছু মাফ করা হয়, তবে তাকে যেন ন্যায়সঙ্গতভাবে তাগাদা করা হয় এবং সঙ্গতভাবে সেটি পরিশোধ করা হয়। এটি তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ হ’তে লঘু বিধান ও বিশেষ অনুগ্রহ। অতঃপর যদি কেউ এর পরে সীমালংঘন করে, তবে তার জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি’ (বাক্বারাহ ২/১৭৮)।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন,وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فِيهَا أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ وَالْعَيْنَ بِالْعَيْنِ وَالْأَنْفَ بِالْأَنْفِ وَالْأُذُنَ بِالْأُذُنِ وَالسِّنَّ بِالسِّنِّ وَالْجُرُوحَ قِصَاصٌ فَمَنْ تَصَدَّقَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَهُ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ- ‘আর আমরা তাদের উপর বিধিবদ্ধ করেছিলাম যে, প্রাণের বদলে প্রাণ, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, দাঁতের বদলে দাঁত এবং যখম সমূহের বদলে যখম। অতঃপর যে ক্ষমা করে, সেটি তার জন্য কাফফারা হয়ে যায়। বস্ত্তত যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফায়ছালা করে না, তারাই যালেম’ (মায়েদাহ ৫/৪৫)।
ক্বিছাছ বা দিয়াত নিহতের ওয়ারিছদের অধিকার : ইসলামী শরী‘আতে হত্যার ক্ষেত্রে নিহতের ওয়ারিছদের জন্য দু’টি প্রধান অধিকার রয়েছে। ক্বিছাছ বা দিয়াত গ্রহণের অধিকার। আবু শুরাইহ খুযাঈ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,مَنْ قُتِلَ لَهُ قَتِيلٌ بَعْدَ مَقَالَتِي هَذِهِ فَأَهْلُهُ بَيْنَ خِيَرَتَيْنِ أَنْ يَأْخُذُوا الْعَقْلَ أَوْ يَقْتُلُوا- ‘আমার এই বক্তব্যের পর কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করা হলে তার ওয়ারিছরা দু’টি অধিকার পাবে। দিয়াত গ্রহণ করবে অথবা হত্যাকারীকে হত্যা করবে’।[10]
নিহতের পরিবার তাদের নিকট পসন্দনীয় বিধান বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে। আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,مَنْ قُتِلَ فَهُوَ بِخَيْرِ النَّظَرَيْنِ إِمَّا أَنْ يُعْقَلَ، وَإِمَّا أَنْ يُقَادَ أَهْلُ الْقَتِيلِ ‘কাউকে হত্যা করা হ’লে নিহতের পরিবার দু’টি বিনিময়ের মধ্যে পসন্দনীয় একটি বিনিময় গ্রহণ করতে পারবে। তার দিয়াত বা রক্তপণ প্রদান করা হবে অথবা তার ওয়ারিছদেরকে তার ক্বিছাছ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে’।[11]
এই হাদীছগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে, ইসলামী শরী‘আত নিহতের ওয়ারিছদেরকে হত্যার বিচারে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দিয়েছে। তারা চাইলে ক্বিছাছ (প্রাণের বদলে প্রাণ) দাবী করতে পারে অথবা দিয়াত (রক্তমূল্য) গ্রহণ করে হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দিতে পারে। এই বিধান ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সমাজের দুর্বলদের অধিকার সংরক্ষণেও সহায়ক। হত্যাকারীর দুনিয়াবী শাস্তির সাথে নিহত ব্যক্তির সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, الْقَاتِلُ لَا يَرِثُ ‘হত্যাকারী (নিহত ব্যক্তির) ওয়ারিছ হবে না’।[12]
অন্যায়ভাবে হত্যাকারীর পরকালীন শাস্তি : যদি হত্যাকারী পৃথিবীতে তার হত্যার যথোপযুক্ত শাস্তি গ্রহণ না করে, তওবা না করে বা তার বিচার করা না যায় কিংবা তার হত্যার বিষয়টি গোপন থাকে, তাহ’লে উক্ত হত্যাকারীর জন্য পরকালে মহাশাস্তির ব্যবস্থা পবিত্র কুরআনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন,إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَيَقْتُلُونَ النَّبِيِّينَ بِغَيْرِ حَقٍّ وَيَقْتُلُونَ الَّذِينَ يَأْمُرُونَ بِالْقِسْطِ مِنَ النَّاسِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ- أُولَئِكَ الَّذِينَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَمَا لَهُمْ مِنْ نَاصِرِينَ- ‘নিশ্চয় যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে ও অন্যায়ভাবে নবীগণকে হত্যা করে এবং লোকদের মধ্যে যারা ন্যায়ের আদেশ দেয় তাদেরকে হত্যা করে, তুমি তাদের মর্মন্তুদ শাস্তির সুসংবাদ দাও’। ‘এরাই হ’ল তারা যাদের দুনিয়া ও আখেরাতের সকল আমল বরবাদ হয়ে গেছে। আর তাদের কোন সাহায্যকারী নেই’ (আলে-ইমরান ৩/২১-২২)।
সূরা ফুরকানের ৬৩ থেকে ৭৩ নং আয়াতে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত বান্দাদের তেরটি গুণের উল্লেখ করা হয়েছে। তন্মধ্যে ৮ম গুণটি হ’ল, وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا يَزْنُونَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ يَلْقَ أَثَامًا- يُضَاعَفْ لَهُ الْعَذَابُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَيَخْلُدْ فِيهِ مُهَانًا- ‘যারা আল্লাহর সাথে অন্য কোন উপাস্যকে আহবান করেনা। আর যারা আল্লাহ যাকে নিষিদ্ধ করেছেন তাকে সঙ্গত কারণ ব্যতীত হত্যা করেনা এবং যারা ব্যভিচার করেনা। যারা এগুলি করবে তারা শাস্তি ভোগ করবে’। ‘ক্বিয়ামতের দিন তার শাস্তি দ্বিগুণ করা হবে এবং সেখানে সে লাঞ্ছিত অবস্থায় চিরকাল থাকবে’ (ফুরক্বান ২৫/৬৮-৬৯)।
আবু সাঈদ খুদরী ও আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তারা উভয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,لَوْ أَنَّ أَهْلَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ اشْتَرَكُوا فِي دَمِ مُؤْمِنٍ لَأَكَبَّهُمُ اللَّهُ فِي النَّارِ- ‘যদি আকাশমন্ডলী ও যমীনের সকল অধিবাসীরা সম্মিলিতভাবে একজন মুমিনকে হত্যা করে, তাহ’লে আল্লাহ সকলকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন’।[13]
ইবনে আববাস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,يَجِيءُ المَقْتُولُ بِالقَاتِلِ يَوْمَ القِيَامَةِ نَاصِيَتُهُ وَرَأْسُهُ بِيَدِهِ وَأَوْدَاجُهُ تَشْخَبُ دَمًا، يَقُولُ: يَا رَبِّ، قَتَلَنِي هَذَا، حَتَّى يُدْنِيَهُ مِنَ العَرْشِ ‘ক্বিয়ামতের দিন নিহত ব্যক্তি তার হত্যাকারীকে সঙ্গে করে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে। এমতাবস্থায় হত্যাকারীর মাথা ও চুল তার হাতেই থাকবে। শিরাগুলো থেকে রক্ত ঝরতে থাকবে। আর সে বলতে থাকবে, হে আমার প্রভু! এ ব্যক্তি আমাকে হত্যা করেছে। এভাবে বলতে বলতে সে হত্যাকারীকে আরশের অতি নিকটে নিয়ে যাবে’।[14]
এছাড়াও একজন মুসলিমকে ইচ্ছাকৃত হত্যা করার ক্ষেত্রে কুরআনে শাস্তির বিশেষ বিধান উল্লেখ রয়েছে,وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا- ‘যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করে, তার শাস্তি হ’ল জাহান্নাম। সেখানেই সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন, তাকে লা‘নত করেছেন এবং তার জন্য কঠিন শাস্তি প্রস্ত্তত রেখেছেন’ (নিসা ৪/৯৩)।
ক্বিছাছের গুরুত্ব ও সমাজে এর প্রভাব : কুরআনে ক্বিছাছের বিধান কোনো রাষ্ট্রে যথাযথভাবে কার্যকর হলে অন্যায় রক্তপাত, হানাহানি, খুন-খারাবী ও হত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধ সমাজে বিস্তার লাভ করবে না। রাজনৈতিক প্রভাবে, ক্ষমতার দাপটে চাইলেই কেউ এ অপরাধ করার দুঃসাহস দেখাতে পারবে না। সমাজ থেকে অবিচার ও যুলুম বহু গুণে হ্রাস পাবে। ইসলামী খেলাফতের স্বণৃযুগের ইতিহাস তার প্রমাণ। ইতিহাসে যে কোনো সমাজ ও রাষ্ট্রে হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ দমন করতে ক্বিছাছের বিধান যতটা কার্যকরী হয়েছে, মানব রচিত কোনো আইন দ্বারা এমন সফলতা আসেনি। তাই ক্বিছাছের বিধান হ’ল মানবজীবন রক্ষার হাতিয়ার ও রক্ষাকবচ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَاةٌ يَاأُولِي الْأَلْبَابِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ- ‘আর হে জ্ঞানীগণ! ক্বিছাছের মধ্যেই তোমাদের জন্য জীবন নিহিত রয়েছে, যাতে তোমরা সতর্ক হও’ (বাক্বারাহ ২/১৭৯)।
ক্বিছাছের বিধান বিশ্ব মানবতার এক অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত এবং মানুষের মধ্যে সাম্য ও সমতার এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। জাহেলী যুগে হত্যার বিচারের ক্ষেত্রে কোনো সমতা ছিল না; প্রভাবশালী ব্যক্তিরা হত্যার সাথে জড়িত থাকলে তাদের প্রাণদন্ড হ’ত না। এই ভারসাম্যহীন, অনৈতিক ও মানবতা বিরোধী বিধান বিলুপ্ত করে আল্লাহ তা‘আলা ক্বিছাছের বিধান নাযিল করেছেন, যা মানবসমাজে শান্তি ও সমতা নিশ্চিত করে।
হত্যাকান্ডের ভয়ংকর পরিসংখ্যান : দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমানে আধুনিক বিশ্বে মানব ধ্বংসকারী অস্ত্রই হয়ে উঠেছে শক্তি ও সম্মানের মূল মাপকাঠি। ন্যায় ও সততা প্রায় ভূলুণ্ঠিত। ফলে প্রতিনিয়ত বিশ্বজুড়ে চলছে অহরহ হত্যাকান্ড। প্রলম্বিত হচ্ছে লাশের সারি, উচ্চকিত হচ্ছে রক্তের ঢেউ। তুচ্ছ স্বার্থ, অন্যায়ের প্রতিবাদ অথবা মতের বৈপরীত্বের কারণে পাখির মতো গুলি করে হত্যা বা শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণে গণহত্যা চলছে মুড়ি-মুড়কির মত অনায়াসে।
(১) বাংলাদেশে হত্যাকান্ডের পরিসংখ্যান : পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ‘২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ১৬,৫৫৫টি হত্যাকান্ড ঘটেছে বলে দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা থেকে জানা যায়। যার বার্ষিক গড় ৩,৩১১ জন। ২০২৪ সালের শেষ পাঁচ মাসে (আগস্ট থেকে ডিসেম্বর) বাংলাদেশে ১,৫৬৫ জন খুন হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে ৩১৩ জন। আর সমগ্র ২০২৪ সালে মোট খুন হয়েছে ৩,৪৩২ জন বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ, যার মধ্যে পেশাজীবীর সংখ্যা বেশি’।[15] যা বিগত বছরের তুলনায় ক্রমবর্ধমান।
(২) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আগ্নেয়াস্ত্র সংশ্লিষ্ট হত্যাকান্ডের পরিসংখ্যান : ‘সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন’ (সিডিসি) এর তথ্যানুসারে, ‘২০২০ সালে ৪,৩০০ এর বেশি মার্কিন তরুণ আগ্নেয়াস্ত্র সংশ্লিষ্ট আঘাতের কারণে নিহত হয়েছে’।[16] বর্তমানে এ সংখ্যা বছরে পাঁচ হাযার অতিক্রম করেছে। এ চিত্র কেবল বাংলাদেশ বা যুক্তরাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সর্বোন্নত ও উন্নয়নশীল দু’টি দেশের এই চিত্র সারাবিশ্বের প্রতিচ্ছবি।
পক্ষান্তরে সঊদী আরবে ক্বিছাছের বিধান ও দ্রুত বিচার ব্যবস্থা থাকায় ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৪ সালে সঊদী আরবে কমপক্ষে ১০০ জনের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছে, যার মধ্যে ক্বিছাছ হিসাবে ৪১ জন এবং বাকীদের বিরুদ্ধে মাদক সংক্রান্ত ও অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ ছিল। উল্লেখ্য যে, এর মধ্যে আবার ৪৩ জন ছিলেন বিদেশী’।[17]
উপসংহার : অন্যকে হত্যা করার দ্বারা মানুষ নিজের ধ্বংস ত্বরান্বিত করে। আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, যেসব অপরাধে নিজেকে জড়িয়ে ফেলার পর তার ধ্বংস থেকে আত্মরক্ষার উপায় থাকে না, সেগুলোর একটি হ’ল কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা’ (বুখারী হা/৬৮৬৩)। ইসলামে অন্যায়ভাবে হত্যাকে এমন এক জঘন্য অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হয়েছে, যা মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাতে চরম ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। ক্বিছাছের বিধান মানব সমাজ রক্ষার এক কার্যকর হাতিয়ার, যা সমাজে ন্যায়বিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় অপরিহার্য। মুসলিমদের জন্য এই বিধানগুলো মেনে চলা কেবল ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নয়, বরং একটি শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল সমাজ গঠনের চাবিকাঠি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আমাদের সকলকে এই মহাপাপ থেকে দূরে থাকার এবং তাঁর বিধান মেনে চলার তাওফীক দান করুন।-আমীন!
ফায়ছাল মাহমূদ
[কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ;
শিক্ষক : আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, রাজশাহী]
[হাফেয শেখ সা‘দী (৪৪) ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’ চট্টগ্রাম সাংগঠনিক যেলার বর্তমান সভাপতি। ইসলামের প্রবেশদ্বার খ্যাত বর্তমানে শিরক-বিদ‘আতে নিমজ্জিত চট্টগ্রামে পীর ও মাযারপূজারীদের রোষানলের মধ্য দিয়েই সাংগঠনিক প্লাটফর্মে থেকে বিশুদ্ধ ইসলামের দাওয়াতী কাজ করে যাচ্ছেন। অন্দর থেকে উন্মুক্ত ময়দান সবখানেই সাবলীল তার পদচারণা। তার জীবন ঘনিষ্ট নিম্নোক্ত সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ‘তাওহীদের ডাক’ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক আসাদুল্লাহ আল-গালিব]
[1]. বুখারী হা/১৭৩৯; মুসলিম হা/১৬৭৯; মিশকাত হা/২৬৫৯।
[2]. ইবনু মাজাহ হা/৩৯৩২; ছহীহাহ হা/৩২২০; তারাজু‘আত হা/৬৮।
[3]. নাসাঈ হা/৩৯৯০; ছহীহুত তারগীব হা/২৪৪০।
[4]. আবুদাউদ হা/৪২৭০; নাসাঈ হা/৩৯৮৪।
[5]. বুখারী হা/৩১, ৬৮৭৫।
[6]. বুখারী হা/৭০৭২; মিশকাত হা/৩৫১৮।
[7]. মুসলিম হা/২৬১৬; মিশকাত হা/৩৫১৯।
[8]. আবুদাঊদ হা/২৫৮৮; তিরমিযী হা/২১৬৩; মিশকাত হা/৩৫২৭।
[9]. বুখারী হা/৬৮৭৮; মুসলিম হা/১৬৭৬।
[10]. আবুদাউদ হা/৪৫০৪; দারাকুৎণী হা/৩১৪৫।
[11]. বুখারী হা/১১২; মুসলিম হা/১৩৫৫; তিরমিযী হা/১৪০৬।
[12]. ইবনু মাজাহ হা/২৬৯৫।
[13]. তিরমিযী হা/১৩৯৮; মিশকাত হা/৩৪৬৪ (ছহীহ)।
[14]. তিরমিযী হা/৩০২৯; সুনানে নাসাঈ হা/৪৮৬৬।
[15]. কালের কণ্ঠ ২৬শে জানুয়ারী’২৫; দৈনিক ইত্তেফাক ৭ ডিসেম্বর’২৪।
[16]. ডেইলি স্টার বাংলা, ২৩শে এপ্রিল ২০২২।
[17]. ঢাকা পোস্ট ৩রা মে ২০২৫।