ডা: জাকির নায়েক : এক নবদিগন্তের অভিযাত্রী
আহমাদ আব্দুল্লাহ নাজীব
ডা. মুহাম্মাদ সাইফুর রহমান 5 বার পঠিত
মার্টিন লুথারের রিফরমেশন আন্দোলন ও ইহূদীদের প্রভাব : ইউরোপে ইহূদীদের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল মার্টিন লুথারের রিফরমেশন আন্দোলন। মার্টিন লুথার শুরুতে গীর্জা ও পাদ্রীদের অসংগতি ও শৃংখলা সংশোধনের জন্য এই আন্দোলন চালু করেছিলেন। কিন্তু আন্দোলনের একটি বিশেষ দিক ছিল, লুথার রোমান ক্যাথলিক ধর্মবিশ্বাসের বিপরীতে তাওরাত ও যাবূরসহ ওল্ড টেস্টামেন্টকে খৃষ্ট ধর্মের মূল উৎস হিসাবে স্বীকার করতেন।
কিছু ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই ধারণা ইহূদীদের প্রভাব ও কৌশলের সঙ্গে সম্পর্কিত। লুথারের আন্দোলনের ফলে খৃষ্টান সমাজে এমন একটি নতুন দল জন্ম নেয়, যারা ইহূদীদের ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়। তারা ওল্ড টেস্টামেন্টকে দ্বীনের প্রধান উৎস হিসাবে মেনে নিল এবং ইহূদীদের প্রতীক্ষিত ভূমি, হাইকালে সুলায়মানী এবং ফিলিস্তীনে তাদের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। এই নতুন ধর্মীয় সম্প্রদায়ই আজকের প্রটেস্ট্যান্ট। এভাবেই খৃষ্টান সমাজে ইহূদীদের জন্য প্রভাবশালী বন্ধু ও সমর্থক তৈরি হয়’।[1]
এনলাইটমেন্ট আন্দোলন : এটি ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর একটি ইউরোপীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন। যা যুক্তি, বিজ্ঞান, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র ও প্রগতির ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। ইউরোপের দার্শনিকরা নিজেদের অসম্পূর্ণ মানবীয় বুদ্ধিকে কেন্দ্র করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যে, মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মায়। কিন্তু ধর্ম এবং বাদশাহরা তাকে দাসত্বে আবদ্ধ করে রেখেছে।
তাদের মতে, ধর্ম হ’ল এক ধরনের অন্ধকার। যা মানুষকে গোনাহ-ছওয়াব, হালাল-হারাম ও আখিরাতের ধারণায় বেঁধে রাখে। এই ‘অন্ধকার’ থেকে বের হয়ে আসাই নাকি আলোকিত চিন্তা বা যুক্তির মুক্তি। এই আন্দোলনের দার্শনিকরা চারটি মৌলিক নীতিতে ঐকমত্য প্রকাশ করেন। (১) মানুষের যুক্তিই চূড়ান্ত দলীল। (২) দুনিয়া প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক নীতিমালার ওপর চলছে, যেখানে অদৃশ্য কোনো শক্তির হস্তক্ষেপ নেই। (৩) রাষ্ট্রশাসনে সব ধরনের ইলাহী বিধান ও ধর্মীয় ক্ষমতাকে প্রত্যাখ্যান করে। (৪) সমাজের ধারাবাহিক উন্নয়ন ও অগ্রগতি’।[2] ডাচ্ ইহূদী বংশোদ্ভূত দার্শনিক স্পিনোজার ছিলেন এ আন্দোলনের প্রবক্তা। যিনি নিজস্ব যুক্তিবাদী, ধর্মীয় ও দার্শনিক চিন্তার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন’।[3]
এছাড়াও ইহূদীদের ঘনিষ্ঠ মিত্র প্রটেস্ট্যান্ট বুদ্ধিজীবী জন লক, রেনে ডেকার্ট, থমাস হবস, নোবেল বিজয়ী কবি ভলতেয়ার, জ্যাঁ জ্যাক রুশো, চার্লস ডি মন্টেস্ক তাদের রচিত বই, উপন্যাস, সমালোচনাগ্রন্থ ও দার্শনিক তত্ত্বের মাধ্যমে এনলাইটমেন্ট আন্দোলনকে প্রত্যক্ষভাবে শক্তি ও প্রেরণা জুগিয়েছিলেন’।[4]
ফরাসী বিপ্লব : স্বাধীনতা, সমতা ও ভ্রাতৃত্ব এই সেলাগানকে সামনে রেখে ১৭৮৯ সালের ৪ঠা জুলাই ফরাসী বিপ্লব (French Revolution) শুরু হয়। এরপর থেকে ইউরোপজুড়ে ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও ব্যক্তি স্বাধীনতার ধারণা দ্রুত বিস্তার লাভ করে। এই বিপ্লবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় ইহূদীরা। দীর্ঘদিন ধরে তাদের ওপর আরোপিত সব সামাজিক ও রাজনৈতিক বাধা ধীরে ধীরে উঠে যায়। তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক থেকে তারা সমঅধিকারপ্রাপ্ত প্রথম শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়। ফরাসী বিপ্লব ইহূদীদের জন্য নতুন যুগের সূচনা করে। যেখান থেকে তাদের উত্থান আর থেমে থাকেনি। পরবর্তী কয়েক দশকে এই পরিবর্তনই ইস্রাঈল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথকে আরও সুগম করে দেয়’।[5]
ইহূদীদের নতুন ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হ’ল ফরাসী বিপ্লব ধর্মের প্রতি অসন্তোষের প্রভাবে সংঘটিত হয়েছিল এবং এর ফলে পুরো বিশ্বে ধর্মনিরপেক্ষ শাসন ও দ্বীনী কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা চালু হয়। অথচ সেই একই সম্প্রদায় তাদের ক্ষমতা ও বৈশ্বিক প্রভাব ব্যবহার করে ‘ইস্রাঈল’ এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে, যা শুধুমাত্র ধর্মীয় ও বংশীয় ভিত্তিতে গঠিত। এটি প্রমাণ করে যে, নতুন বিশ্বব্যবস্থা, যাকে নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার (New World Order) বলা হয়, বাস্তবায়নের পেছনে ইহূদীদের লক্ষ্য ও পরিকল্পনা কাজ করেছে।[6]
ফরাসী বিপ্লবের প্রভাব ও বৈশ্বিক পরিবর্তন : ১৭৮৯ সালের ফরাসী বিপ্লব ইউরোপে বিশাল পরিবর্তন আনে। অন্যদিকে, ১৭৬৪ সালে হিন্দুস্থানে বক্সার যুদ্ধে (নওয়াব মীর কাসেম আলী ও তার মিত্রশক্তির ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই) ব্রিটেন বাংলায় দখলদারিত্ব স্থাপন করতে সক্ষম হয়। এই দু’টি ঘটনা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তিন ধরনের বিপ্লবের সূচনা করে। ১. রাজনৈতিক বিপ্লব ২. অর্থনৈতিক বা পুঁজিবাদী বিপ্লব ৩. সামরিক বিপ্লব। প্রথমে ইউরোপে এই বিপ্লবগুলো ইহূদীদের প্রভাব ও নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে। পরে ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলেও এর প্রভাব বিস্তৃত হয়।
ইউরোপে রিফরমেশন আন্দোলন, ফরাসী বিপ্লব এবং এনলাইটমেন্ট আন্দোলনের কারণে গীর্জা বাহ্যিকভাবে সংশোধিত হলেও, খৃষ্টান ধর্মীয় উৎসে মৌলিক পরিবর্তন ঘটে। কিতাবুল মুকাদ্দাসের ব্যাখ্যা এখন শুধু পাদ্রীদের কাছে নয়, সাধারণ জনগণের বিবেকের অধিকারেও অর্পিত হয়। এই পরিবর্তন খৃষ্টান সমাজে নতুন বিভাজনের সৃষ্টি করে ক্যাথলিক খৃষ্টান ও প্রটেস্ট্যান্ট খৃষ্টান।[7]
জায়োনিস্ট কার্যক্রমের সূচনা : জায়োনিজম শব্দটি এসেছে হিব্রু জায়ন (Zion) শব্দ থেকে। ‘জায়ন’ হ’ল মূলত যেরুযালেমের মাউন্ট জায়ন বা জায়ন হিল। যে পাহাড়ের উপরে হযরত সোলায়মান (আঃ)-এর মসজিদ ‘বায়তুল মুকাদ্দাস’ অবস্থিত। ১৮৮৫ সালে অস্ট্রিয় ইহূদী লেখক, সাংবাদিক ‘নাথান বারনবুম’ (Nathan Birnbaum) প্রথম ‘জায়োনিজম’ বা ‘জায়নবাদ’ শব্দটি প্রবর্তন করেন।
জায়নবাদ হ’ল ইহূদী শ্রেষ্ঠত্ববাদের এক বহুমুখী প্রত্যয়। যা মূলত জায়ন পাহাড়কে ঘিরে কেনানের চারদিকের প্রতিশ্রুত ভূমি নিয়ে একটি ইহূদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও তার প্রকল্পসমূহের চিন্তা ও কর্মধারা। প্রকৃত অর্থে জায়নবাদ ইহূদী চরমপন্থীদের একটি আন্দোলন। এ আন্দোলনের মূল লক্ষ্য বিশ্বব্যাপী সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।[8]
হাঙ্গেরিয়ার ইহূদী সাংবাদিক ও লেখক থিওডর হার্জেল ১৮৯৬ সালে ‘দ্য জিউইশ স্টেট’ (The Jewish State) নামে একটি বই লিখেন যার মাধ্যমে এই মতাদর্শ জনপ্রিয়তা লাভ করে। থিওডর হার্জেল-কে ‘‘ইহূদীবাদের’’ জনক বা আধুনিক জায়নবাদের জনক বলা হয়। থিওডর হার্জেল ১৮৯৭ সালে World Zionist Organization নামে একটি সংস্থা গঠন করেন। ১৮৯৭ সালের জুন মাসে সুইজারল্যান্ডের বাসেলস শহরে থিওডর হার্জেল এর সভাপতিত্বে জায়নিস্টদের প্রথম বিশ্ব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সম্মেলনে বিশ্বের প্রায় ৫০ এর উর্ধ্বে সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত ২০০ ইহূদী নেতা অংশ গ্রহণ করে। উক্ত সম্মেলনে তারা গোটা বিশ্বকে গোলাম বানানো, আন্তর্জাতিক জায়নিস্ট রাষ্ট্র গঠন এবং ৫০ বছরের ভেতর ফিলিস্তীন দখল করার পরিকল্পনা তৈরী করে। সে সমস্ত পরিকল্পনা সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী চিন্তাবিদরা ছাড়া আর কেউ জানত না। সে পরিকল্পনাগুলো পরবর্তীতে ‘জায়ানিষ্ট প্রটোকল নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে’।[9]
বিশ্বব্যাপী ইহূদী আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য আজ বিশ্বব্যাপী যে দুবার আন্দোলন চলছে তার প্রধান পরিচালক গ্রন্থ হচ্ছে এই প্রটোকল যার পুরো নাম - The Protocol of the Learned Elders of Zion (বিজ্ঞ ইহূদী মুরুবিবদের রচিত কায়দা-কানুন)।
দুনিয়ার মানুষকে সর্বপ্রথম এই বই সম্পর্কে অবগত করিয়েছেন জার্মান খ্রিস্টান প্রফেসর সারজিল এ নাইলাস নামক জনৈক রুশ পাদ্রী। ১৯০৫ সালে প্রফেসর নাইলাস বইখানা প্রকাশ করেন। বইয়ের ভূমিকায় তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ইহূদী ফ্রিম্যাসন ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রস্থল’[10] ফ্রান্সের একটি ফ্রিম্যাসন লজ থেকে জনৈক মহিলা মূল বইখানা [সম্ভবত হিব্রু ভাষায় লিখিত] চুরি করে এনেছিলেন এবং তাকে উপহার দিয়েছিলেন। উল্লেখযোগ্য যে এ ঘটনার পর কোন মহিলাকেই ফ্রিম্যাসন আন্দোলনের সদস্য করা হয় না। প্রফেসর নাইলাস দ্রুত হিব্রু ভাষা থেকে অনুবাদ করে প্রটোকল বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেন। ইহূদী ষড়যন্ত্রে ইহূদী বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদের দ্বারা সংঘটিত রুশ বিপ্লবের পর রুশ কমিউনিস্টরা প্রফেসর নাইলাসকে গোপন দলীল ফাঁস করার অপরাধে অমানুষিক দৈহিক নির্যাতনের পর রাশিয়া থেকে তাড়িয়ে দেয়।[11]
উক্ত প্রটোকলের অনুবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর গোটা বিশ্বে হইচই পড়ে যায়। তৎকালীন ইহূদী বিশ্বের তৎকালীন সবচেয়ে বড় নেতা থিওডর হার্জেল হতাশা প্রকাশ করেন এবং ব্যথিত হৃদয়ে বলতে বাধ্য হনত 'এই সমস্ত গোপন দলীল বাস্তবায়িত হওয়ার পূর্বেই তা ব্যাপক প্রচার হয়ে যাওয়া ইহূদীদেরকে বড় ধরনের বিপদের সম্মুখীন করতে পারে। উল্লিখিত দলীলের মধ্যে সে সমস্ত পরিকল্পনার কথা উল্লেখ ছিল যার মাধ্যমে ইহূদীরা গোটা বিশ্বের উপর সকল সাংস্কৃতিক, অর্থ-নৈতিক, রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং জেরুজালেম ভূখন্ডে জায়নবাদী রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করতে পারে। সে সকল Protocol সামনে আসতেই ইহূদী লবির স্বরূপ ও জায়নবাদী বর্বরতা এবং বর্ণবাদ উজ্জ্বল দিবসের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে যায়। তাদের এই গোপন দলীলগুলো বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় লাখ লাখ কপি প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু খুব দ্রুত এই কপিগুলো বাজার থেকে গায়েব হয়ে যায়। হয়তো সকল কপিই ইহূদীরা কিনে নিত এবং মানুষের হাতে পৌঁছতে দিত না কিংবা সে সমস্ত দোকান ও বাণিজ্য কেন্দ্রকে তছনছ করে দেওয়া হ’ত যেখানে তাদের দলীলের অনুবাদ বিক্রি হ’ত।[12]
ষড়যন্ত্রের পূর্বাভাস ও বাস্তবায়ন : The protocol of the learned Elders of Zion (বিজ্ঞ ইহূদী মুরুবিবদের কায়দা-কানুন) গ্রন্থে পুরো বিশ্বকে করায়ত্ত করার জন্য যে সব ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে ইতো মধ্যে তার অনেক কিছু বাস্তবে ঘটেছে, ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হ’ল।-
(১) রাশিয়ায় জারতন্ত্রের পতন ও কমিউনিজমের উত্থান : বহুল আলোচিত ‘প্রটোকল’-এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল যে, সুপরিকল্পিত বিপ্লবের মাধ্যমে জারতন্ত্র ধ্বংস করে একটি একনায়কতান্ত্রিক কমিউনিস্ট সরকার গঠন করা হবে। ইতিহাসের পাতায় ১৯১৭ সালের এই আমূল পরিবর্তনকে ‘বলশেভিক বিপ্লব’ বা ‘অক্টোবর বিপ্লব’ বলা হয়, যা মূলত জার দ্বিতীয় নিকোলাসের দীর্ঘদিনের শাসনের অবসান ঘটায়। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, এই বিপ্লব ছিল আন্তর্জাতিক জায়নবাদী শক্তির একটি গভীর রাজনৈতিক কৌশল। যেখানে ভ্লাদিমির লেনিন (Vladimir Lenin), লিওন ট্রটস্কি (Leon Trotsky) এবং জোসেফ স্টালিন (Joseph Stalin)-এর মতো নেতারা সম্মুখভাগে থেকে নেতৃত্ব দেন। বিশেষ করে লিওন ট্রটস্কিসহ বলশেভিক পার্টির উচ্চপর্যায়ের অনেক নেতাই জাতিগতভাবে ইহূদী বংশোদ্ভূত ছিলেন। এতে করে জায়নবাদীদের বৈশ্বিক এজেন্ডা ও আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে রাশিয়ার প্রচলিত সামাজিক ও ধর্মীয় কাঠামো ভেঙে সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্থান নিশ্চিত করা হয়।
অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ও ইস্রায়েল প্রতিষ্ঠা : অটোমান সাম্রাজ্য তথা ওছমানীয় খিলাফত ধ্বংস করা এবং ফিলিস্তীনে ইহূদীদের জন্য একটি একক জাতিরাষ্ট্র গঠন ছিল জায়নবাদী আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য। যা অনেক বিশ্লেষকের মতে ‘প্রটোকল’-এর পূর্বাভাসেরই বাস্তবায়ন। ১৯২৪ সালে খিলাফতের চূড়ান্ত পতনের নেপথ্যে ‘দুনমা’ বা ছদ্মবেশী ইহূদী গোষ্ঠী এবং ‘ইয়ং তুর্কস’ আন্দোলনের বিশেষ প্রভাব ছিল। যারা সেক্যুলার জাতীয়তাবাদের আড়ালে ওছমানীয় সালতানাতকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছিল। এর আগে সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামীদ ফিলিস্তীনে ইহূদী বসতি স্থাপনের জায়নবাদী প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করায় তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার নীল নকশা তৈরি করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ১৯১৭ সালের ‘বেলফোর ঘোষণা’র মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার ফিলিস্তীনে ইহূদীদের জন্য আবাসভূমি গড়ার আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দেয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৪৮ সালে ব্রিটেন ও আমেরিকার সরাসরি মদদ এবং জায়নবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীদের তৎপরতায় ফিলিস্তীনের বুকে ইস্রাঈল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এই পরিকল্পিত পরিবর্তনের ফলে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য বিনষ্ট হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যে এক দীর্ঘস্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়।
ইউরোপীয় রাজতন্ত্রের পতন : রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ছিল জায়নবাদী বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ ও লিবারেল-সেক্যুলারিজম প্রসারের পথে প্রধান বাধা। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে মধ্যভাগ পর্যন্ত এক সুগভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরির মাধ্যমে জার্মানি, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, রোমানিয়া, স্পেন এবং ইতালির মতো ক্ষমতাধর রাজতন্ত্রগুলো একে একে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৮ সালে জার্মান সম্রাট কাইজার দ্বিতীয় উইলহেম এবং অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের হ্যাবসবার্গ রাজবংশের পতন ঘটে, যা ইউরোপের মানচিত্র বদলে দেয়। মূলত জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্রের দোহাই দিয়ে এবং বিভিন্ন গোপন সংস্থার মাধ্যমে রাজপরিবারগুলোর বিরুদ্ধে জনমত গঠন ও গণ-আন্দোলন উসকে দেওয়া হয়। রাজতন্ত্রের এই পতনের ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতা ব্যবহার করে ইউরোপের দেশগুলোতে জায়নবাদী বলয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন সংসদীয় গণতন্ত্র বা একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরোক্ষভাবে বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতিতে তাদের প্রভাব বিস্তারকে আরও ত্বরান্বিত করে।
বিশ্বযুদ্ধের সূচনা ও ইহূদী শক্তির উত্থান : ‘প্রটোকল’-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে এমন বিধ্বংসী যুদ্ধের নীল নকশা করা হয়েছিল যেখানে বিজয়ী ও পরাজিত উভয় পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নেপথ্যে কেবল ইহুদিরাই লাভবান হবে। বাস্তবেও ১৯১৪ ও ১৯৩৯ সালে শুরু হওয়া দুটি বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপের শক্তিশালী দেশগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে পঙগু হয়ে পড়ে। কিন্তু এই মহাযুদ্ধের ডামাডোলে জায়নবাদীরা কৌশলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে। তারা একদিকে ব্রিটিশদের থেকে 'বেলফোর ঘোষণা' আদায় করে ফিলিস্তিনে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করে এবং অন্যদিকে যুদ্ধ-ঋণের মাধ্যমে বিশ্ব ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয়। পরিশেষে, এই যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞকে কাজে লাগিয়েই ১৯৪৮ সালে ইস্রাঈল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির চাবিকাঠি কার্যত জায়নবাদী শক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
(৫) তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ছায়া : প্রটোকল-এ তিনটি বিশ্বযুদ্ধের ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে। ইহূদী তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য ক্ষেত্র প্রস্ত্তত করছে। বিশেষ করে আমেরিকাকে ব্যবহার করে এটি শুরু করার চেষ্টা করছে। বর্তমানে ফিলিস্তীন, লেবানন, ইরান ও ইয়েমেনে ইস্রাঈল কর্তৃক সরাসরি আক্রমণ এবং সে আক্রমণকে আমেরিকার প্রত্যক্ষ সহযোগিতা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা ক্রমশ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
(৬) পঞ্চাশ বছরের মধ্যে ফিলিস্তীনে ইহূদী রাষ্ট্র গঠন : ১৮৯৭ সালে সুইজারল্যান্ডের ব্রাসেলসে থিওডোর হার্জলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রথম জায়নিস্ট কংগ্রেস ছিল ফিলিস্তীনে ইহূদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর। যেখানে অংশগ্রহণকারী ৩০০ ইহূদী নেতা আগামী ৫০ বছরের মধ্যে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের গোপন ও প্রকাশ্য মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ঠিক ৫০ বছর পর ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘে ফিলিস্তীন বিভক্তি প্রস্তাব পাস হয় এবং ১৯৪৮ সালে ব্রিটেন ও আমেরিকার সরাসরি সামরিক ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় ফিলিস্তীনীদের উচ্ছেদ করে ‘ইস্রাঈ’ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়’।[13] (ক্রমশ)
-ডা. মুহাম্মাদ সাইফুর রহমান
[সভাপতি, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ, দিনাজপুর-পূর্ব সাংগঠনিক যেলা]
[1]. ইতিহাসের আয়নায় বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ৫৫-৫৬ পৃ.।
[2]. প্রাগুক্ত ১৩৫-১৩৬ পৃ.।
[3]. তথ্যসূত্র : ইন্টারনেট।
[4]. ইতিহাসের আয়নায় বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ১৩৬-১৩৭ পৃ.।
[5]. প্রাগুক্ত ৫৭ পৃ.।
[6]. প্রাগুক্ত ৫৮ পৃ.।
[7]. প্রাগুক্ত ১৪২ পৃ.।
[8]. ফিলিস্তিন বনাম জায়নবাদ: লড়াই ও লিগ্যাসি, মূসা আল হাফিজ, ইলহাম প্রকাশন-২০২৩, পৃ. ৪২।
[9]. বিশ্বায়ন : সাম্রাজ্যবাদের নতুন স্ট্রাটেজি, ইয়াসির নাদীম, অনুবাদ : শহীদুল ইসলাম ফারুকী, প্রফেসর‘স পাবলিকেশন দ্বিতীয় সংস্করণ সেপ্টেম্বর-২০০৮, পৃ. ১০২।
[10]. উল্লেখ্য যে, ফ্রিম্যাসন ইহূদীদের একটি গোপন সংস্থা।
[11]. ইহূদী চক্রান্ত, আব্দুল খালেক, আধুনিক প্রকাশনী, চতুর্থ প্রকাশ ফেব্রুয়ারী-২০২৩, পৃ. ৬৩।
[12]. বিশ্বায়ন : সাম্রাজ্যবাদের নতুন স্ট্রাটেজি, পৃ. ১০২।
[13]. ওয়ার্ল্ড ক্রাইসিস অ্যান্ড প্রোটোকলস বিহাইন্ড দ্য জায়োনিজম, ম্যাথিউ গোলভিনস্কি- মুহাম্মদ খলিফা আত-তিউনিসি, অনুবাদ : কাউসার আহমাদ, ফিলহাল প্রকাশন, প্রথম প্রকাশ মে ২০১৫, পৃ. ৩৬-৩৭।