ঈমানের মহান মর্যাদা
শরীফুল ইসলাম
ভূমিকা : জীবনের কোন এক বাঁকে এসে আমরা সবাই কখনো না কখনো ভীষণ অসহায় বোধ করি। ভেতর থেকে নিজেকে ছিন্নভিন্ন মনে হয়। মনে হয়, চারপাশের পৃথিবীটা বুঝি ধসে পড়ছে, আর এখানেই সবকিছুর সমাপ্তি। কিন্তু মহান আল্লাহর এই সুবিশাল সৃষ্টিজগতের দিকে তাকালে এক অদ্ভুত সত্য আমাদের বিস্মিত করে। আমরা দেখতে পাই, সৃষ্টির সবচেয়ে সুন্দর বিষয়গুলোর জন্ম হয় কোন না কোন ভাঙনের ভেতর দিয়েই। মানুষের জীবন কখনো এক ছন্দে কাটে না। কখনো তা সুখের পূর্ণতায় ভরে ওঠে, আবার কখনো কষ্টের চরম সীমায় গিয়ে দাঁড়ায়। চারপাশ থেকে বিপদ যখন আমাদের ঘিরে ধরে, মন যখন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে, ঠিক সেই চরম হতাশার মুহূর্তেই ইসলামের শিক্ষা আমাদের সামনে তুলে ধরে আশার আলো, শেখায় নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রেরণা।
প্রকৃতির বুকে ভাঙন ও গড়ার গল্প : আল্লাহ তা‘আলা এই মহাবিশ্বকে এমনভাবে সাজিয়েছেন যেখানে ভাঙন মানেই চূড়ান্ত ধ্বংস নয়, বরং তা এক মহত্তর সৃষ্টির নিদর্শন ও নতুন সৃষ্টির শুভ সূচনা। আকাশের মেঘ যখন নিজের অস্তিত্ব ভেঙে চুরমার করে দেয়, তখনই তৃষ্ণার্ত যমীন সজীব বৃষ্টির দেখা পায়। আবার কৃষক যখন লাঙল বা ট্রাক্টরের ফলায় মাটির বুক চিরে ক্ষতবিক্ষত করে, বাহ্যিকভাবে তা ধ্বংসাত্মক মনে হ’লেও আসলে সেটিই নতুন প্রাণের বীজ বোনার প্রথম ধাপ।
একটি শস্যবীজ যখন মাটির নিচে নিজেকে ভেঙে ফেলে, তখনই সেখান থেকে অপার সম্ভাবনা নিয়ে জন্ম নেয় একটি কচি অঙ্কুর। সেই ক্ষুদ্র বীজটিকে একাকী পঁচতে হয় এবং নিজের শক্ত খোলসটি ভেঙে চুরমার করতে হয়। এই কঠিন বিভাজন আর আত্মাহুতির পরেই তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে সবুজ প্রাণের স্পন্দন। যা ভবিষ্যতে একদিন বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়। এমনকি ঝিনুকের পেটে যখন কোন বালুকণা ঢুকে তাকে অবর্ণনীয় যাতনা দেয়, সেই তীব্র কষ্ট আর ক্ষত থেকেই জন্ম নেয় অমূল্য এক মুক্তা। ঠিক তেমনি প্রচন্ড চাপ আর দহনকাল পার না করলে সাধারণ কার্বন কোনদিন উজ্জ্বল হীরায় পরিণত হ’তে পারে না।
প্রকৃতির এই নিয়ম আমাদের জীবনের কঠিন সময়েও আশার আলো দেখায়। সূর্যোদয়ের ঠিক আগের মুহূর্তটুকুতেই অন্ধকার সবচেয়ে ঘন অনুভূত হয়। আর এই চরম অন্ধকারই হ’ল আলোর প্রত্যাবর্তনের নিশ্চিত সংকেত। ঠিক যেমন একটি পাথর বাটালি আর হাতুড়ির হাযারো আঘাত সহ্য করে সুন্দর ভাস্কর্যে রূপ নেয়, লোহা আগুনে পুড়ে পিটিয়ে ধারালো ইস্পাতে পরিণত হয়। মনে রাখতে হবে, আঘাতের তীব্রতা যত বেশী হয়, ইস্পাত ঠিক ততটাই মজবুত হয়ে ওঠে। তেমনি জীবনের প্রতিটি আঘাত আমাদের আরও শক্তিশালী ও পূর্ণ করে গড়ে তোলে।
বেদনার আড়ালে লুকিয়ে থাকা আনন্দ : সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম আনন্দ কি তবে চরমতম বেদনার আড়ালেই লুকিয়ে থাকে? হ্যাঁ থাকে। একজন আন্তঃসত্ত্বা মা যখন প্রসব বেদনায় হাসপাতালের বিছানায় কাতরান, তখন তাঁর প্রতিটি নিঃশ্বাসে মিশে থাকে এক অসহায় হাহাকার। সেই যন্ত্রণার মুহূর্তে মনে হয় পুরো শরীরটা বুঝি সহস্র ভাগে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যেই মুহূর্তে একটি ছোট্ট প্রাণের প্রথম কান্নার আওয়াজ তাঁর কানে পৌঁছায়, ঠিক তখনই জাদুর মতো সব ব্যথা মিলিয়ে যায়। মনে হয় জীবনের সবটুকু সার্থকতা আজ হাতের মুঠোয়।
মূলত এই যন্ত্রণাই একজন নারীকে পূর্ণতা দেয় এবং তাঁকে ‘মা’ নামক মহিমান্বিত পরিচয়ে ভূষিত করে। মায়ের সেই ত্যাগের মুহূর্তটিতে সৃষ্টি হয় নতুন জীবনের সূচনার এক অনাবিল আনন্দ। যেখানে সবটুকু বেদনা মুছে গিয়ে হৃদয়ে জায়গা করে নেয় এক গভীর প্রশান্তি আর ভালোবাসা।
আপনার জীবন কি তবে ব্যতিক্রম?
মহান আল্লাহ যদি আকাশ, মাটি আর বীজ ভেঙে অপূর্ব কিছু সৃষ্টি করতে পারেন, তবে আপনার জীবনের ভাঙন কেন ব্যর্থ হবে? ইসলামী দর্শনে কষ্টের একটি বিশেষ ও গভীর উদ্দেশ্য রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেছেন যে, এই কষ্ট কখনোই স্থায়ী নয়। এটি মূলত মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের এক মহান মাধ্যম। এ প্রসঙ্গে শ্রেষ্ঠ পরিকল্পনাকারী মহান রব বলেন,إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে’ (ইনশিরাহ ৯৪/৬)।
জীবন যখন আপনাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়, তখন বুঝতে হবে আপনি কোন এক বিশাল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। আয়াতে ‘কষ্টের সাথে স্বস্তি’ শব্দটির ব্যবহার এই নিগূঢ় ইঙ্গিত দেয় যে, যেখানে সমস্যা আছে, তার পাশেই সমাধান বা উত্তরণের পথ অবস্থান করছে। আকাশের মেঘ ভাঙলে যেমন সজীব বৃষ্টি ঝরে, জীবনের কষ্টের ভাঙনও ঠিক তেমনি আমাদের জীবনে প্রশান্তি ও রহমত বয়ে আনে।
কষ্ট বা বিপর্যয়ে অবিচল থাকার পাথেয়
জীবন কোনো সমান্তরাল রেখা নয় যে তা সবসময় একইভাবে চলবে। রাত যখন গভীরতম হয়, তখনই বুঝতে হয় ভোরের আলো খুব কাছে। ঠিক তেমনি, জীবনের পরীক্ষা যখন কঠিনতম পর্যায়ে পৌঁছায়, বুঝতে হবে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ কোনো স্বস্তি আপনার দরজায় কড়া নাড়ছে। আল্লাহ আপনাকে তখনই পরীক্ষার মুখে ফেলেন যখন তিনি আপনাকে আরও উঁচুতে তুলে নিতে চান। তাই একজন মুমিনের জন্য ধৈর্য, দো‘আ এবং তাক্বদীরের ওপর বিশ্বাস হ’ল এমন তিনটি অস্ত্র, যা তাকে যেকোনো পরিস্থিতিতে মোকাবিলা করার সাহস যোগায়। আপনার বর্তমান কষ্টটি কেবল একটি সাময়িক পরীক্ষা, যার পরেই অপেক্ষা করছে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বড় কোনো প্রশান্তির বীজ।
হযরত আব্দুল্লাহ বিন জাফর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) তাকে তাঁর সওয়ারীর পেছনে বসালেন। অতঃপর বললেন, হে বৎস! আমি কি তোমাকে কিছু দান করব না? আমি কি তোমাকে এমন কিছু বাক্য শেখাব না যার মাধ্যমে আল্লাহ তোমাকে উপকৃত করবেন? তুমি আল্লাহর (হুকুমের) হেফাযত করো, আল্লাহ তোমাকে হেফাযত করবেন। তুমি আল্লাহকে স্মরণ করো, তবে তাঁকে তোমার সামনেই পাবে। যখন কিছু চাইবে, তখন কেবল আল্লাহর কাছেই চেয়ো। আর যখন সাহায্যের প্রার্থনা করবে, তখন কেবল আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করো। জেনে রেখো, যা কিছু ঘটার তা লিখে কলম শুকিয়ে গেছে। আর নিশ্চিত থেকো, সমগ্র সৃষ্টিজগৎ যদি তোমার এমন কোনো উপকার করতে চায় যা আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রাখেননি, তবে তারা তা করতে সক্ষম হবে না এবং জেনে রেখো ধৈর্যের সাথেই সাহায্য আসে, বিপদের সাথেই মুক্তি আসে এবং নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি রয়েছে।[1]
উল্লেখ্য যে, পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন নবী-রাসূলগণ। অতঃপর ক্রমানুযায়ী সর্বোচ্চ নেককারগণ। জীবনের চরম সংকটময় মুহূর্তেও তাঁরা ছিলেন রবের সিদ্ধান্তে সদা অবিচল। এতে তাঁরা দুনিয়া ও আখেরাতে সর্বদা বিজয়ী হয়েছেন। যখন জীবনের রূঢ় বাস্তবতা আপনাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়, তখন নবী-রাসূলগণের জীবনের নিম্নোক্ত দৃষ্টিভঙ্গিগুলো আপনাকে ধৈর্য ধারণ করতে এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগাবে ইনশাআল্লাহ।
১. আল্লাহর পরিকল্পনা : ‘ব্রেক’ নয় বরং ‘মেক’ করা : আমরা আমাদের সংকীর্ণ দৃষ্টি দিয়ে কেবল বর্তমানের রূঢ় ভাঙনটুকুই দেখি, কিন্তু আমাদের মহান রব দেখেন আগামীর এক উজ্জ্বল পূর্ণতা। তিনি আমাদের কক্ষচ্যুত (Break) করেন না, বরং মহত্তর কিছুর জন্য তিলে তিলে তৈরি (Make) করেন। আল্লাহর এই শ্রেষ্ঠ পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হ’ল ইউসুফ (আঃ)-এর জীবন। তাঁকে তাঁর নিজের ভাইয়েরা অন্ধকার কূপে নিক্ষেপ করল, তিনি দাসের হাটে বিক্রি হ’লেন এবং মিথ্যা অপবাদে দীর্ঘদিন জেল খাটলেন।
দৃশ্যত এগুলো তাঁর জীবনের চরম বিপর্যয় বা ‘ব্রেক’ মনে হ’লেও মূলত তা ছিল আল্লাহর পরিকল্পনার অংশ। এই প্রতিটি ঘটনাই ছিল তাঁকে মিশরের বাদশা বানানোর একেকটি সিঁড়ি। তিনি যদি কূপে নিক্ষিপ্ত না হ’তেন, তবে কোনদিন মিশরে পৌঁছাতে পারতেন না। আবার যদি কারাবরণ না করতেন, তবে বাদশাহর স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগও পেতেন না। সুতরাং আল্লাহ তাঁকে ভাঙেননি; বরং আগামী দিনের নেতৃত্বের জন্য শ্রেষ্ঠতমরূপে গড়ে তুলেছিলেন।
২. আল্লাহর নৈকট্য লাভ : সুখের দিনগুলোতে মানুষ অনেক সময় আল্লাহকে ভুলে যায়, কিন্তু বিপদের কালো মেঘ ঘনালেই সে একান্তভাবে রবের দরবারে লুটিয়ে পড়ে। এই যে কষ্টের অসীলায় আমরা সিজদায় অশ্রু বিসর্জন দেই কিংবা পাগলপারা হয়ে আল্লাহর সাহায্য চাই। তিনি আমাদের কান্নাবিজড়িত প্রার্থনার আহাজারী শুনতে চান এবং দুনিয়ার সকল শক্তির কাছ থেকে অমুখাপেক্ষী হয়ে কেবলমাত্র তার নিকট ভিক্ষুকের মত আবেদনের করুণ সুর শুনতে ভালোবাসেন। হয়তো মহান রবের সাথে বান্দার এই গভীর ও আত্মিক সংযোগ স্থাপনের জন্যই তিনি মাঝে মাঝে আমাদের জীবনে বিপদ আর বেদনার পরীক্ষা পাঠান।
দুঃখের সময়ে মানুষ আল্লাহর যতটা নিকটবর্তী হ’তে পারে, সুখের আতিশয্যে অনেক সময় তা হয়ে ওঠে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, أَمَّنْ يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ ‘কে তিনি, যিনি আর্তের আহবানে সাড়া দেন, যখন সে তাকে ডাকে এবং তার কষ্ট দূর করে দেন’? (নামল ২৭/৬২)।
এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ ইউনুস (আঃ), যিনি মাছের পেটে ঘুটঘুটে অন্ধকারের ভেতর বন্দি থাকাকালীন কোন জাগতিক উপায় না দেখে চরম সংকটকালীন মুহূর্তে রবকে ডেকেছিলেন এই বলে,فَنَادَى فِي الظُّلُمَاتِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ ‘অতঃপর সে (মাছের পেটে) ঘন অন্ধকারের মধ্যে আহবান করল (হে আল্লাহ!) তুমি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তুমি পবিত্র। আর নিশ্চয়ই আমি সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত’ (আম্বিয়া ২১/৮৭)। সমুদ্রের অতল গহবর আর মাছের পেটের সেই নিঃসঙ্গতাই ছিল তাঁর জন্য আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী হওয়ার মুহূর্ত। ঐ সংকটে আল্লাহ তাঁর আহবানে সাড়া দিয়েছিলেন এবং তাঁকে অন্ধকার থেকে উদ্ধার করেছিলেন।
৩. আত্মশুদ্ধি ও পুনর্গঠনের প্রস্ত্ততি : একটি পুরনো জরাজীর্ণ ঘরকে যেমন বাসযোগ্য ও সুন্দর করার জন্য পূর্বের ভঙ্গুর কাঠামো ভেঙে নতুন ভিত্তি স্থাপন করতে হয়, মানুষের আত্মিক ও চারিত্রিক গঠনের প্রক্রিয়াটিও অনেকটা তেমনই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا ‘সেই সফলকাম হবে, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করবে’ (শামস ৯১/৭)। এর অনন্য দৃষ্টান্ত মেলে ইউসুফ (আঃ)-এর জীবনে। যাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল কারাগারের নিভৃত চার দেয়ালের ভেতর। মিথ্যা অপবাদ আর বন্দিত্বের সেই জরাজীর্ণ সময়গুলোই মূলত তাঁকে ধৈর্য ও তাকওয়ার চরম শিখরে পৌঁছে দিয়েছিল। জেলখানায় তিনি নিজের নফস বা আত্মাকে এমনভাবে পরিশুদ্ধ করেছিলেন যে, যখন তিনি মিশরের সিংহাসনে আরোহণ করলেন, তখন প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমা ও উদারতার এক নতুন মিনার তৈরি করেছিলেন। বৈমাত্রেয় ভাইদের পুরনো প্রতিহিংসার জীর্ণ কাঠামো ভেঙে তিনি সেখানে ভালোবাসার এক অনন্য ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।
৪. ধৈর্য ও ঈমানের পরীক্ষা : শিক্ষা জীবনে পরীক্ষা ছাড়া যেমন উচ্চতর শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হওয়া যায় না, তেমনি ঈমানের কঠিন পরীক্ষা ছাড়া আল্লাহর নৈকট্য লাভ করাও অসম্ভব। আল্লাহ যখন বান্দাকে কষ্টে ফেলেন, তখন তিনি মূলত দেখতে চান বিপর্যয়ের মুখেও বান্দা কি তাঁর উপর সন্তুষ্ট থাকে, নাকি অভিযোগে লিপ্ত হয়। যারা এই পরীক্ষায় ধৈর্যের পরিচয় দেয়, তাদের জন্য রয়েছে সীমাহীন পুরস্কার। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ ‘অবশ্যই আমরা তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল, জান ও ফল-ফসলের ক্ষতি দ্বারা। আর তুমি সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদের’ (বাক্বারা ২/১৫৫)।
এই পরীক্ষার এক চরম শিখরে ছিলেন ইব্রাহীম (আঃ)। যিনি নমরূদের জলন্ত হুতাশনের মধ্যেও কেবলমাত্র আল্লাহর কাছেই নিজের নিবেদনটুকু পেশ করেছিলেন। ফলে জলন্ত অগ্নিকান্ড মুহূর্তেই প্রশান্তিদায়ক ঠান্ডায় পরিনত হয়ে গিয়েছিল। তাকে বৃদ্ধ বয়সের একমাত্র আদরের সন্তানকে কুরবানী করার কঠিন নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পিতা ও পুত্র উভয়েই আল্লাহর এই সিদ্ধান্তের উপর পূর্ণ সন্তুষ্ট হয়ে যখন অসহায় আত্মসমর্পণ করলেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই আল্লাহর পক্ষ থেকে গায়েবী সাহায্য হিসাবে জান্নাতী দুম্বা অবতীর্ণ হ’ল। একইভাবে ইসলামের সূচনালগ্নে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এবং তাঁর ছাহাবীরা দীর্ঘ তিন বছর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কটের শিকার হয়ে অবর্ণনীয় কষ্টে দিন কাটিয়েছিলেন। ক্ষুধার তীব্রতায় তাঁরা পেটে পাথর বেঁধেছিলেন এবং গাছের পাতা খেয়ে জীবন ধারণ করেছিলেন। ছাহাবায়ে কেরাম অভিযোগ না করে যে অটল ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছিলেন, তারই ফসল হিসাবে পরবর্তীতে মক্কা বিজিত হয়েছিল এবং ইসলাম বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিল।
৫. পরীক্ষার মাধ্যমে মর্যাদা বৃদ্ধি ও পুরস্কার লাভ : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে তিনি দুঃখ-কষ্টে পতিত করেন’।[2] যেমন আগুনের তাপে সোনা পুড়ে খাঁটি হয়, তেমনি বিপদের আঘাত মুমিনের গুনাহ ঝরিয়ে তাকে জান্নাতের উপযোগী করে গড়ে তোলে। এছাড়া বান্দার সম্মান বৃদ্ধি ও উচ্চতর নেতৃত্বের আসনে আসীন করার জন্যও আল্লাহ পরীক্ষা নিয়ে থাকেন। যেমন তিনি বলেন,وَإِذِ ابْتَلَى إِبْرَاهِيمَ رَبُّهُ بِكَلِمَاتٍ فَأَتَمَّهُنَّ قَالَ إِنِّي جَاعِلُكَ لِلنَّاسِ إِمَامًا ‘আর যখন ইবরাহীমকে তার প্রতিপালক কতগুলি বিষয়ে পরীক্ষা করলেন, অতঃপর সে তা পূর্ণ করল, তখন তার প্রতিপালক বললেন, আমি তোমাকে মানবজাতির নেতা
করব’ (বাক্বারা ২/১২৪)।
আইয়ূব (আঃ) ছবরকারী নবীগণের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় এবং অনন্য দৃষ্টান্ত ছিলেন। একাধারে তাঁর অর্জিত সম্পদ, প্রিয় সন্তান এবং সুস্বাস্থ্য সব হারিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি অভিযোগের পথ বেছে না নিয়ে আল্লাহর উপর অবিচল আস্থা রেখেছিলেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আল্লাহ তাঁর দো‘আ কবুল করলেন এবং অলৌকিকভাবে আরোগ্য দান করলেন। আল্লাহর নির্দেশে ভূমিতে পদাঘাত করার ফলে যে স্বচ্ছ পানির ঝরনাধারা নির্গত হয়েছিল, তাতে গোসল ও পান করার মাধ্যমে তাঁর বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সকল ব্যাধি দূর হয়ে গেল। অটল ধৈর্যের পুরস্কার হিসাবে তিনি অভূতপূর্ব যৌবন ও স্বাস্থ্য ফিরে পেলেন এবং আল্লাহ তাঁকে আগের চেয়ে দ্বিগুণ সম্পদ ও সন্তান দান করলেন। বিপদে ধৈর্য ধারণ করায় এবং আল্লাহর পরীক্ষাকে হাসিমুখে বরণ করে নেওয়ায় আল্লাহ আইয়ুব (আঃ)-কে ‘ছবরকারী’ ও ‘সুন্দর বান্দা’ হিসাবে প্রশংসা করেছেন (ছোয়াদ ৪৪)। এখান থেকে আমাদের শিক্ষনীয় হ’ল, দুনিয়ার কোন কষ্টই স্থায়ী নয়। অভিযোগ না করে কেবল রবের উপর ভরসা রাখলে হারানো জিনিসের চেয়েও উত্তম কিছু ফিরে পাওয়া সম্ভব।
৬. আল্লাহর উত্তম পরিকল্পনায় বিশ্বাস : আমরা যা হারাই বা জীবনের যে ভাঙনের শিকার হই, তার আড়ালে এমন কোন গভীর কল্যাণ লুকিয়ে থাকতে পারে যা আমরা তৎক্ষণাৎ উপলব্ধি করতে পারি না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন,وَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ وَعَسَى أَنْ تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَكُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ ‘আর অবশ্যই তোমরা এমন বহু কিছু অপসন্দ কর, যা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর অবশ্যই তোমরা এমন বহু কিছু পসন্দ কর, যা তোমাদের জন্য ক্ষতিকর। বস্ত্ততঃ আল্লাহ সবকিছু জানেন, কিন্তু তোমরা জানো না’ (বাক্বারা ২/২১৬)।
পবিত্র কুরআনের সূরা কাহাফে বর্ণিত মূসা (আঃ) ও খিযির (আঃ)-এর সেই নৌকা ছিদ্র করার ঘটনাটি আল্লাহর পরিকল্পনার এক নিখুঁত উদাহরণ। খিযির (আঃ) যখন কয়েকজন মিসকিন ও দরিদ্র ব্যক্তির একটি নৌকার তক্তা ভেঙে ফুটো করে দিয়েছিলেন, তখন মূসা (আঃ)-এর কাছে ঘটনাটি বাহ্যিকভাবে চরম অবিচার মনে হয়েছিল। কিন্তু এর আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক মহান কল্যাণ। সেই এলাকায় এক অত্যাচারী রাজা ছিল, যে সাধারণ মানুষের নৌকাগুলো জোরপূর্বক ছিনিয়ে নিত। নিশ্চয়ই নৌকাটি ভাঙা বা ত্রুটিপূর্ণ থাকার কারণেই রাজা সেটি নিবে না। ফলে দরিদ্র লোকগুলো নৌকার সামান্য সেই ত্রুটি সেরে নিয়ে পরবর্তীতে নিজেদের কাজে লাগাতে পারল। এতে করে তাদের আয়ের শেষ সম্বলটি রক্ষা পেল।
আমরা যখন আমাদের প্রিয় কোন জিনিসে ফাটল কিংবা জীবনে অনাকাঙ্ক্ষিত কোন ত্রুটি দেখি, তখন বিচলিত হয়ে পড়ি। কিন্তু আমরা জানি না, সেই ছোট্ট ত্রুটিটুকুই হয়তো আমাদের পুরো অস্তিত্বকে আরও বড় কোন বিপর্যয় বা ছিনতাই হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করছে। তাই রবের নিখুঁত পরিকল্পনার উপর ভরসা রাখাই মুমিনের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশান্তির জায়গা।
৭.গুনাহ থেকে মুক্তি লাভ : মানুষ হিসাবে আমরা প্রতিনিয়ত ভুল করি। আমাদের পরম দয়ালু রব চান না তাঁর প্রিয় বান্দা পাপের বোঝা নিয়ে পরকালে উপস্থিত হোক। তাই দুনিয়াতেই ছোটখাটো দুঃখ-কষ্ট, অভাব বা অসুস্থতার মাধ্যমে তিনি বান্দার গুনাহ মোচন করে দেন। এটি মূলত পরকালের কঠিন বিচার থেকে বান্দাকে আগাম নিষ্কৃতি দেওয়ার একটি মাধ্যম। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘এ দুনিয়ায় সবচেয়ে কঠিন বিপদগ্রস্থ হ’লেন নবীগণ। তারপর ক্রমানুযায়ী সর্বোচ্চ নেককারগণ। মুমিন পরীক্ষিত হবে তার দ্বীন অনুযায়ী। যদি সে দ্বীনের বিষয়ে কঠিন হয়, তবে তার পরীক্ষা সেই অনুযায়ী কঠিন হবে। আর যদি সে দ্বীনের ব্যাপারে ঢিলা হয়, তার পরীক্ষা অনুরূপ হালকা হবে। মুমিনের উপরে এইভাবে পরীক্ষা চলতে থাকবে। এমন এক সময় আসবে যে, সে যমীনের উপরে চলাফেরা করবে এমন অবস্থায় যে, তার কোন গোনাহ থাকবে না’।[3] তিনি আরো বলেন, ‘মুমিন নর-নারীর নিজ জীবন, সন্তানাদি ও মাল-সম্পদে সর্বদা বালা-মুছীবত লেগে থাকবে। অতঃপর সে আল্লাহর সাথে মিলিত হবে এমন অবস্থায় যে, তার উপরে কোন গোনাহ থাকবে না’।[4]
অর্থাৎ, আপনার উপর আসা বিপদ ও কষ্টগুলো যত সামান্যই হোক না কেন তা মূলত আপনার গুনাহগুলোকে ঝড়িয়ে দিচ্ছে যেমনিভাবে শীতকালে গাছ থেকে পাতা ঝড়ে পরে।
৮. জান্নাত লাভ : বান্দা যখন বড় কোন বিপদে ধৈর্য ধরে, তখন আল্লাহ তাকে সেই বিপদের বিনিময়ে জান্নাতের সর্বোচ্চ আসনে আসীন করেন। ইতিহাসে এমন অনেক ছাহাবীর দৃষ্টান্ত রয়েছে, যাঁরা চরম কষ্ট ও অমানবিক নির্যাতনের বিনিময়ে দুনিয়াতেই সরাসরি জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছিলেন। নিম্নে এরকম দু’টি ঘটনা উল্লেখ করা হ’ল-
যেমন ’আত্বা ইবনু আবূ রাবাহ (রহঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইবনু আববাস (রাঃ) আমাকে বললেন, আমি কি তোমাকে একজন জান্নাতী মহিলা দেখাব না? আমি বললাম অবশ্যই। তখন তিনি বললেন, এই কৃষ্ণকায় মহিলাটি, সে নবী (ছাঃ)-এর নিকট এসেছিল। তারপর সে বলল, আমি মৃগী রোগে আক্রান্ত হই এবং এ অবস্থায় আমার লজ্জাস্থান খুলে যায়। সুতরাং আপনি আমার জন্য আল্লাহর কাছে দো‘আ করুন। নবী (ছাঃ) বললেন, তুমি যদি চাও, ধৈর্য ধারণ করতে পার। তোমার জন্য আছে জান্নাত। আর তুমি যদি চাও, তাহ’লে আমি আল্লাহর কাছে দো‘আ করি, যেন তোমাকে আরোগ্য করেন। মহিলাটি বলল, আমি ধৈর্য ধারণ করব। সে বলল, ঐ অবস্থায় আমার লজ্জাস্থান খুলে যায়, কাজেই আল্লাহর নিকট দো’আ করুন যেন আমার লজ্জাস্থান খুলে না যায়। নবী (ছাঃ) তাঁর জন দো’আ করলেন।[5] এই মহীয়সী নারী ছিলেন উম্মু যুফার (রাঃ)। সে ছিল দীর্ঘ দেহী কৃষ্ণ বর্ণের।[6] তিনি দুনিয়ার আজীবন শারীরিক কষ্ট ও অসুস্থতাকে হাসিমুখে বরণ করে নিয়েছিলেন, কেবল জান্নাতের আশায়।
ইয়াসির পরিবারের উপরে যে ধরনের অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছিল, ইতিহাসে তার তুলনা বিরল। বনু মাখযূম নেতা আবু জাহলের নির্দেশে তাদেরকে খোলা ময়দানে নিয়ে উত্তপ্ত বালুকার উপরে শুইয়ে রেখে প্রতিদিন নানাভাবে নির্যাতন করা হ’ত। একদিন চলার পথে তাদের শাস্তির দৃশ্য দেখে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদের উদ্দেশ্যে বলেন,صَبْرًا آلَ يَاسِر فَإِنَّ مَوْعِدَكُمُ الْجَنَّةُ ‘ধৈর্য ধর হে ইয়াসির পরিবার! তোমাদের ঠিকানা হ’ল জান্নাত’। অবশেষে ইয়াসিরকে কঠিন নির্যাতনের মাধ্যমে এবং তার স্ত্রী সুমাইয়ার গুপ্তাঙ্গে বর্শার আঘাতের মাধ্যমে হত্যা করা হয়।[7] সুবহানাল্লাহ! এই অমানুষিক নির্যাতন তারা হাসিমুখে বরণ করেছেন শুধুমাত্র জান্নাতের আশায়। তাই আপনার আজকের এই জাগতিক কষ্ট আসলে আগামীর চিরস্থায়ী সুখের এক একটি শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ।
উপসংহার : নিরবচ্ছিন্ন সুখ মানুষকে অনেক সময় অলস ও দুর্বল করে দেয়, কিন্তু প্রতিকূলতা মানুষকে শক্তিশালী, সহনশীল এবং অভিজ্ঞ করে তোলে। বড় কোন দায়িত্ব পালনের যোগ্য করার আগে আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের দুঃখ-কষ্টের এক এলাহী প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে নিয়ে যান; ঠিক যেমনটি আমরা সকল নবী-রাসূলের জীবনে দেখেছি। তাই বিপদ দেখে হতাশ হওয়া মুমিনের কাজ নয়। সবসময় মনে রাখা উচিত আল্লাহ আপনাকে ভাঙছেন না, বরং নতুন করে গড়ছেন।
পরিশেষে বলবো নিজেকে ছিন্নভিন্ন বা পর্যুদস্থ মনে হলে নিরাশ হবেন না। রবের উপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখুন। জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতা, লাঞ্ছনা বা কঠোর পরিশ্রম যখন আমাদের মানসিকতাকে ক্ষতবিক্ষত করে, ঠিক তখনই আমাদের ভেতরকার সুপ্ত মেধা ও শক্তিগুলো পূর্ণরূপে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়। আল্লাহ তা‘আলা আপনাকে যে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, অটল ধৈর্য আর তাওয়াক্কুলের বিনিময়ে তার শেষ পরিণতি হবে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ-ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন-আমীন!
-মুহাম্মাদ আব্দুন নূর
[কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ]
[1]. আহমাদ হা/২৮০৪; ছহীহ-শোআইব আরনাঊত্ব।
[2]. বুখারী হা/৫৬৪৫।
[3]. তিরমিযী হা/২৩৯৯; হাকেম হা/৭৮৭৯; ছহীহ ইবনু হিববান হা/২৯২৪; ছহীহাহ হা/২২৮০।
[4]. তিরমিযী হা/২৩৯৮; ইবনু মাজাহ হা/৪০২৩; ছহীহ ইবনু হিববান হা/২৯০১; মিশকাত হা/১৫৬২; ছহীহাহ হা/১৪৩।
[5]. বুখারী হা/৫৬৫২।
[6]. মুসলিম হা/২৫৭৬।
[7]. ইবনু হিশাম ১/৩১৯-২০; হাকেম হা/৫৬৪৬; আলবানী, ফিক্বহুস সীরাহ ১০৩ পৃ., সনদ ছহীহ; সীরাতুর রাসূল (ছাঃ), পৃ. ১৪৩।