ইয়াহইয়া জোয়ান সুকুইল্ল্যো
শাকিরুল ইসলাম
[এডি রেডজোভিক (৫১) মার্শাল আর্টের ৫ম ডিগ্রি ব্ল্যাক বেল্ট অধিকারী। তিনি শিকাগোতে বড় হয়েছেন এবং সেখানেই তাঁর প্রাথমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। গ্রেসি জিউ-জিৎসু-এর প্রতি তার তীব্র অনুরাগ তাকে শিকাগো, ক্যালিফোর্নিয়া এবং ব্রাজিলের মধ্যে যাতায়াত করতে অনুপ্রাণিত করে। তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার গ্রেসি একাডেমি এবং ব্রাজিলের গ্রেসি ব্যারা সদর দপ্তরে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তিনি শিকাগোতে রয়েস এবং রোরিয়ন গ্রেসির অনুমোদিত প্রথম ‘গ্রেসি জিউ-জিৎসু ট্রেনিং সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে তিনি কার্লোস গ্রেসি জুনিয়রের প্রথম আমেরিকান প্রতিনিধি হিসাবে নিযুক্ত হন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি বিশুদ্ধ দ্বীন ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য TheDeenShowTV প্রতিষ্ঠা করেন। যেখানে এখন পর্যন্ত ১৮৩৯টি ভিডিও আপলোড হয়েছে। যার ফলোয়ার সংখ্যা প্রায় ১.৫১ মিলিয়ন।]
প্রশ্ন : আপনার নাম ও আপনার জীবন সম্পর্কে কিছু বলুন?
এডি রেডজোভিক : আমার নাম এডি রেডজোভিক। আমি একজন মার্শাল আর্ট ইন্সট্রাক্টর এবং ‘দ্য দ্বীন শো’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও হোস্ট। আমার জন্ম নিউইয়র্কে হলেও আমি বড় হয়েছি শিকাগোর অত্যন্ত বিপজ্জনক এক গ্যাং কালচারে। আমার কৈশোর ও যৌবনের শুরুর দিকটা ছিল অপরাধ, মারামারি আর অর্থহীন জাগতিক আকাংখার পিছনে ছোটার এক দীর্ঘ গল্প। আমি নিজেই একটি ছোট বেপরোয়া গ্যাং-এর নেতৃত্ব দিতাম এবং রাস্তাঘাটে বিশৃংখলা সৃষ্টি করাটাই ছিল আমাদের কাজ। সেই সময় আমার কোনো ভালো রোল মডেল ছিল না। আমি কেবল হলিউড তারকাদের অনুকরণ করতাম এবং টাকা ও ক্ষমতার পেছনে ছুটতাম।
প্রশ্ন: কিভাবে আপনার অন্ধকার জীবন শুরু হয়েছিল এবং গ্যাং-এর শীর্ষ নেতৃত্বে পৌঁছেছিলেন?
এডি রেডজোভিক : আমার অন্ধকার জীবনের পথচলা শুরু হয়েছিল হাই স্কুল থেকেই। অন্য ছেলেরা যখন বাস্কেটবল বা ফুটবল টিমে যোগ দিচ্ছিল, আমি তখন নিজের একটি আলাদা গ্রুপ তৈরি করছিলাম। পরে সেই গন্ডি পেরিয়ে নিজের মতো কিছু বেপরোয়া ছেলেকে নিয়ে একটি ছোট দল গড়ে তুলি। আমরা একসাথে আড্ডা দিতাম, ক্লাবে যেতাম এবং যেকোনো মারামারিতে একে অপরের ঢাল হয়ে দাঁড়াতাম। কোনো ঝামেলা সামলানোর দরকার হলে ওরাই ছিল আমার প্রধান শক্তি। আমি তখন খুব মারকুটে স্বভাবের ছিলাম এবং রাস্তায় নিজের শক্তি প্রমাণ করতে মরিয়া থাকতাম। এই আগ্রাসী মনোভাবই আমাকে সেই দলটির প্রধান বা লিডারে পরিণত করেছিল।
প্রশ্ন: আপনি কি কখনও গ্রেপ্তার হয়েছিলেন?
এডি রেডজোভিক : হ্যাঁ, অতীতে আমার জীবনে এমন ঘটনা বেশ কয়েকবার ঘটেছে। আমি কোনো বড় ধরনের অপরাধী হিসাবে ফেডারেল কারাগারে বা দীর্ঘ মেয়াদে সাজা খাটতে দূরে কোথাও যাইনি। তবে আমাকে কুক কাউন্টি জেলে যেতে হয়েছিল। মূলত মারামারি এবং রাস্তায় বিশৃংখলা তৈরির দায়েই আমাকে গ্রেপ্তার করা হ’ত। সাধারণত দেখা যেত, মারামারির জন্য পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আর পরের দিনই আমি জেল থেকে যামিনে বেরিয়ে আসছি।
প্রশ্ন: গ্যাং লাইফের কোন বিশেষ স্মৃতি কি আপনার মনে পড়ে?
এডি রেডজোভিক : একটি ঘটনার কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। একবার অনেক রাতে আমি ও আমার দলের বন্ধুরা লরেন্সের একটি এলাকা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। তখন রাত প্রায় ১০-টা বা ১১-টা হবে। হঠাৎ একদল লোক আমাদের পথ আটকে জিজ্ঞেস করল তোমরা কোন দলের? শিকাগোতে ভুল এলাকায় ভুল ‘হ্যান্ড জেস্টার’ বা হাতের ইশারা দেখালে আপনার প্রাণ পর্যন্ত যেতে পারে। যদিও আমি তখন গ্যাং ছেড়ে দিয়েছিলাম এবং কোনো ঝামেলায় জড়াতে চাচ্ছিলাম না, কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠল। বিপক্ষ দলের একজন ক্রমাগত উস্কানি দিচ্ছিল এবং আমার খুব কাছে চলে আসছিল। আত্মরক্ষার খাতিরে আমি তাকে আঘাত করতেই চারপাশ থেকে ইঁদুরের মতো অসংখ্য মানুষ বেরিয়ে এল। ওটা ছিল তাদের এলাকা। আমরা পিছু হটলেও আমার এক বন্ধু সেখানে আটকে যায়। তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে আমি ভিড়ের ভেতর ঢুকে পড়ি। এরই মধ্যে কেউ একজন একটি ভাঙা কাঁচের বোতল দিয়ে আমার পিঠে গভীর আঘাত করে।
অবাক করার বিষয় হলো, প্রচন্ড রক্তপাতের মধ্যেও আমার মাথায় তখন একটাই চিন্তা ঘুরছিল, কীভাবে এই অপমানের প্রতিশোধ নেব! এটাই ছিল সেই অন্ধকার জীবনের চক্রাকার স্বভাব। দৌড়াতে দৌড়াতে আমি যখন অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিলাম, বন্ধুরা তখন দেখতে পায় আমার পিঠ দিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে। শেষ পর্যন্ত অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে হ’ল এবং আমি হাসপাতালে ভর্তি হলাম। আলহামদুলিল্লাহ সেদিন পরিস্থিতি আরও খারাপ হ’তে পারত। আমি হয়তো মারাই যেতাম, কিন্তু আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন।
প্রশ্ন : আপনার এ জীবন নিয়ে পরিবারের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল এবং আপনি কীভাবে সেখান থেকে ফিরে এলেন?
এডি রেডজোভিক : আমার এই জীবনধারা বাবা-মাকে, বিশেষ করে আমার মাকে চরম দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপে রাখত। তাদের এই কষ্ট থেকে মুক্তি দিতে এবং নিজেকে বদলাতে আমি একসময় শিকাগো ছেড়ে বসনিয়ায় চলে যাই। এটি ছিল অনেকটা সেই হাদীছের মতো, যেখানে পরিবেশ পরিবর্তনের মাধ্যমে তওবা করার কথা বলা হয়েছে। আমি তখন বুঝতে পেরেছিলাম যে, মানুষ যখন জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ভুলে কেবল খাওয়া-দাওয়া আর আনন্দ-ফুর্তিতে মত্ত থাকে, তখন সে পশুর চেয়েও অধম হয়ে যায়। সেই সময় আমার জীবন ছিল উদ্দেশ্যহীন। যা কেবল টাকা আর পার্টির চক্রে বন্দি ছিল।
প্রশ্ন : আপনার অতীত জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ কী?
এডি রেডজোভিক : আমার সবচেয়ে বড় আক্ষেপ হ’ল ভুল মানুষকে আদর্শ মেনে ভুল বন্ধুর সাথে মেশা। আমি এমন একজনকে অনুসরণ করেছিলাম, যার কারণে আমার জীবনে গ্যাং কালচার ও ফিতনার পথ খুলে গিয়েছিল। আমার অভিজ্ঞতা থেকে আমি এটাই বলব, বন্ধুরা হ’ল লিফটের মতো। তারা আপনাকে হয় উপরে তুলবে, নয়তো নিচে নামাবে। তাই সবসময় ভালো বন্ধু নির্বাচন করুন। কারণ আপনার চরিত্রের ওপর বন্ধুদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। যদিও আল্লাহর ইচ্ছায় সেই কঠিন পথ পেরিয়ে আজ আমি সঠিক পথে এসেছি। কিন্তু সবার এই সৌভাগ্য নাও হ’তে পারে।
প্রশ্ন : আপনার জীবনের পরিবর্তনটা ঠিক কীভাবে হয়েছিল?
এডি রেডজোভিক : জীবনের এক পর্যায়ে যখন আমি সব দেখে ফেলেছি এবং বয়স বাড়তে শুরু করেছে, তখন আমার ভাবনায় পরিবর্তন আসা শুরু হ’ল। এক রামাযান মাসে আমার বোন আমাকে কবরের আযাব সংক্রান্ত একটি মর্মস্পর্শী গল্প শুনিয়েছিল। যদিও গল্পটির সত্যতা সম্পর্কে আমি নিশ্চিত ছিলাম না, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত বার্তা আমাকে প্রচন্ডভাবে নাড়িয়ে দেয়। আমার এক চাচা তখন আমাকে ‘লাইফ, ডেথ অ্যান্ড হেয়ারআফটার’ (জীবন, মৃত্যু ও পরকাল) নামে একটি বই দেন। ইসলামের দৃষ্টিতে কবরের জীবন এবং বিচার দিবসের বাস্তবতা নিয়ে আমি গভীরভাবে ভাবতে শুরু করি। আমি অনুভব করলাম, আমাকেও একদিন সেই অন্ধকার কবরে যেতে হবে। এই চিন্তাটিই আমার পরিবর্তনের প্রথম ধাপ ছিল।
প্রশ্ন ২: মৃত্যু ও পরকাল নিয়ে আপনার এই ভাবনাকে কোনো বিশেষ ঘটনা কি আরও ত্বরান্বিত করেছিল?
এডি রেডজোভিক : হ্যাঁ, একবার একটি পার্টিতে যাওয়ার সময় আমরা অনেকজন মিলে লিফটে আটকে গিয়েছিলাম। ফায়ার সার্ভিস আসার আগ পর্যন্ত প্রায় আধঘণ্টা আমরা সেখানে ঘামছিলাম আর হাঁসফাঁস করছিলাম। সেই বদ্ধ স্থানে আটকে থাকা অবস্থায় আল্লাহ আমাকে যেন এক বিশেষ নিদর্শন দেখালেন। আমি লিফটের সেই শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার সাথে কবরের অন্ধকারের তুলনা করতে শুরু করলাম। আমি ভাবলাম, যদি আমি এই অবস্থায় মারা যাই, যখন আমি স্রেফ একটি পার্টিতে যাচ্ছিলাম এবং স্রষ্টার দেওয়া জীবনের আসল উদ্দেশ্য পালন করছিলাম না, তবে আমার পরিণতি কী হবে? পরকাল ও মৃত্যু নিয়ে এই গভীর উপলব্ধিই আমাকে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে অনুপ্রাণিত করেছিল।
প্রশ্ন : আপনার ইসলাম গ্রহণের মুহূর্তটা কেমন ছিল?
এডি রেডজোভিক : ২০০১ সালের কোন একদিন আমি শিকাগোর একটি মসজিদে যাই। দিনটি জুম‘আ বার ছিল না। এক সাধারণ দুপুরে যখন আমি ভেতরে ঢুকলাম। এক অপার্থিব নিস্তব্ধতা আমাকে গ্রাস করল। সেখানে একজন ভাই আমাকে ইসলামের ‘তাওহীদ’ বা একত্ববাদের কথা বুঝালেন। জানলাম ইসলাম মানে কোন ব্যক্তির পূজা নয়। বরং সরাসরি স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পণ। যিশু বা ঈসা (আঃ) সম্পর্কে ইসলামের স্বচ্ছ ধারণা আমার দীর্ঘদিনের সকল যৌক্তিক ও আত্মিক সংশয় এক মুহূর্তে দূর করে দিল। কালেমা শাহাদাত পাঠের সেই মুহূর্তটি ছিল যোহরের ছালাতের কাছাকাছি সময়। যখন আমি কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে উচ্চারণ করলাম ‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ..., আমার মনে হচ্ছিল প্রতিটি শব্দ আমি হৃদয় দিয়ে অনুভব করছি। ‘ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু’ বলার সাথে সাথেই আমি ডুকরে কেঁদে উঠি; মনে হয়েছিল আমার আত্মাটি যেন দীর্ঘ বনবাস কাটিয়ে অবশেষে তার আসল ঘরে ফিরে এসেছে।
প্রশ্ন : সত্য অনুধাবনের পর আপনার জীবনে কী ধরনের পরিবর্তন এলো?
এডি রেডজোভিক : সত্য জানার পর আমি কালক্ষেপণ না করে সাথে সাথেই মদ ও নেশার জগত ছেড়ে দেই এবং নিয়মিত ছালাত শুরু করি। আমার সামনে তখন বড় পরীক্ষা ছিল পুরানো বন্ধু ও উপার্জনের পথ ত্যাগ করা। মৃত্যুচিন্তা আমার জন্য অনুঘটক হিসাবে কাজ করেছিল। আমি বুঝেছিলাম অযুহাত দেখিয়ে পুরনো অন্ধকার জীবনে থাকা মানে নিজের ধ্বংস ডেকে আনা। তাই আলহামদুলিল্লাহ দুনিয়ার সবকিছুর বিনিময়ে আমি ইসলামকেই শ্রেষ্ঠ নে‘মত হিসাবে বেছে নিয়েছি। এক কথায়, ইসলামের নিয়মগুলো আমার কাছে জীবনের একটি সফল ‘ব্লু-প্রিন্ট’ বা নকশার মতো মনে হয়েছে। একজন সফল উদ্যোক্তা যেমন সফল হওয়ার পথ দেখিয়ে দেন, আল্লাহ আমাদের ঠিক তেমনি সফল হওয়ার পথ বলে দিয়েছেন।
প্রশ্ন : ৯/১১-এর পরবর্তী সময় কেমন ছিল?
এডি রেডজোভিক : ৯/১১-এর পর পরিস্থিতি সত্যিই কঠিন হয়ে গিয়েছিল। চারদিকে ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণা ছড়িয়ে পড়েছিল। আমি অনুভব করলাম, মানুষকে ইসলামের সঠিক রূপ জানানোই এখন আমার জীবনের মূল লক্ষ্য। কারণ ইসলাম কোনো মানুষের তৈরি করা অসম্পূর্ণ ব্যবস্থা নয়, এটি ঐশ্বরিক ও নিখুঁত। কুরআনের একটি আয়াত আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছিল, জেনে রাখ, ‘আল্লাহর যিকিরেই চিত্ত প্রশান্ত হয়’ (রা‘দ ১৩/২৮)। বস্ত্তগত সম্পদ দিয়ে মানুষ যে শান্তি পায় না, আমি ইবাদতের মাধ্যমে সেই ‘সাকীনা’ বা প্রশান্তি খুঁজে পেলাম।
প্রশ্ন ২: ‘দ্য দ্বীন শো’ (TheDeenShowTV) শুরু করার আইডিয়াটা কীভাবে এলো?
এডি রেডজোভিক : ইউটিউব তখন মাত্র শুরু হয়েছে। আমি যখন প্রথমবারের মতো হজ্জে যাওয়ার প্রস্ত্ততি নিচ্ছিলাম, তখন আদলী মুহাম্মদ সাঈদের সাথে একটি ছোট প্যানেল ডিসকাশন ভিডিও করি। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে মানুষ কেবল দীর্ঘ লেকচার শুনতে অভ্যস্ত নয়, তারা আধুনিক টকশো-র মতো আয়োজন পছন্দ করে। আমি মানুষের মনের সাধারণ প্রশ্নগুলো নিয়ে এই সংস্কৃতির উপযোগী করে অনুষ্ঠানটি সাজালাম। আলহামদুলিল্লাহ, মানুষের কাছে পৌঁছানোর এটি একটি দারুণ মাধ্যম হয়ে দাঁড়ালো এবং সেখান থেকেই ২০০৬ সালেই TheDeenShowTV-এর জয়যাত্রা শুরু হ’ল।
প্রশ্ন: বর্তমানে মিডিয়ার প্রয়োজনীয়তাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
এডি রেডজোভিক : আমাদের অবশ্যই উচ্চমানের ইসলামিক মিডিয়া প্রয়োজন। বর্তমান মিডিয়ার অধিকাংশ মানুষ ভুল ধারণা প্রচার করছে। ইসলাম সবকিছুর যৌক্তিক প্রমাণ দেয়। অন্যান্য মিডিয়া মানুষের সামনে এমন সব আইডিয়া তুলে ধরে যা মানুষের আত্মার তৃপ্তি দেয় না, কিন্তু ইসলাম দেয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে পীস টিভি, হুদা টিভি, আল-জুমু‘আহ ম্যাগাজিন, ইউরোপ পেপার, ইসলাম টিভি এবং অবশ্যই ‘দ্য দ্বীন শো’ দেখার পরামর্শ দিই।
প্রশ্ন : আপনার ছাত্রদের সাথে ইসলামের দাওয়াত শেয়ার করার অভিজ্ঞতা কেমন?
এডি রেডজোভিক : আমি আমার ছাত্রদের সাথে মাঝেমধ্যেই ইসলামের কথা বলি এবং আলহামদুলিল্লাহ তাদের একটা অংশ শেষ পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করে। তাদের শাহাদাহ পাঠের মুহূর্তটা আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দের।
প্রশ্ন : আমি এক সময় রাস্তায় মানুষের কাছে গিয়েও ইসলামের দাওয়াত দিতেন। সেই অভিজ্ঞতাটি কেমন ছিল?
এডি রেডজোভিক : হ্যাঁ, আমি তখন এতটাই উত্তেজিত ছিলাম যে, সুযোগ পেলেই মানুষের কাছে এগিয়ে যেতাম। আমার মনে হ’ত আমার কাছে এমন একটি সত্য ও নিখুঁত জীবন ব্যবস্থা আছে, যা সবার জানা উচিত। মিডিয়া বা ইসলামোফোবিক ইন্ডাস্ট্রি মানুষের মনে যে বিদ্বেষ ছড়িয়েছিল, তার বিপরীতে ইসলামের আসল সৌন্দর্য তুলে ধরাই ছিল আমার লক্ষ্য। মানুষের কাছে গিয়ে সহজভাবে কথা বললে তারা বুঝতে পারে যে ইসলাম আসলে কোনো উগ্র বিষয় নয়, বরং এটি শান্তির পথ। সেই শুরু থেকে আজ পর্যন্ত এভাবেই মানুষকে সত্যের পথে ডাকার এই যাত্রা চলছে।
প্রশ্ন : দাওয়াতের ময়দানে আপনার কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি বা স্মরণীয় স্মৃতি সম্পর্কে বলুন।
এডি রেডজোভিক : দাওয়াত দেওয়া মানে হ’ল একজন মানুষকে অনন্ত জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করা। এটি একটি অসাধারণ অনুভূতি। আমি আমার বন্ধুদের সাথে রাস্তায় বেরিয়ে মানুষকে কুরআন ও যিশুর তথা ঈসা (আঃ)-এর প্রকৃত শিক্ষা নিয়ে লিফলেট দিতাম। অনেকে দু-এক মিনিট কথা বলেই ইসলাম গ্রহণ করত। নেতিবাচক দিক থেকে বললে, অনেকে আমাদের সন্ত্রাসী বলে গালি দিত বা নবীজী (ছা.)-কে নিয়ে কটু কথা বলত। তারা আসলে নিজেদের জীবনের উদ্দেশ্য না পেয়ে হতাশ ও তিক্ত। বাইবেলের শিক্ষা অনুযায়ী তাদের ভালোবাসা ও শান্তির কথা বলার কথা। কিন্তু তারা অপমানে লিপ্ত হয়। বিপরীতে ইসলাম আমাদের অন্য ধর্মের দেবতাদেরও গালি দিতে নিষেধ করে (আন‘আম ৬/১০৮)। একবার গাড়ি নষ্ট হওয়ায় রায়ান নামে এক অমুসলিম ছেলে আমাদের সাহায্য করতে এল। সে জানাল ৯/১১ ছাড়া সে ইসলাম সম্পর্কে আর কিছুই জানে না। অথচ সত্য জানার পর সেই ছেলেই ইসলামের প্রতি আগ্রহী হ’ল। এভাবেই প্রতিটি পরিস্থিতি আমাদের জন্য দাওয়াতের সুযোগ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রশ্ন : মার্শাল আর্ট জগতের কিংবদন্তি রয়েস গ্রেসির ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে আপনার অনুভূতি কেমন ছিল?
এডি রেডজোভিক : এটি আমার জন্য অনেকটা স্বপ্নের মতো ছিল। যারা মার্শাল আর্ট সম্পর্কে জানেন, তারা বোঝেন রয়েস গ্রেসি (Royce Gracie) হলেন এই জগতের ‘মাইকেল জর্ডান’। তিনি ‘দ্বীন সেন্টার’ পরিদর্শনে এলেন এবং আমাদের সাথে একটি অনুষ্ঠান করার পর শাহাদাহ পাঠ করলেন। তিনিই ছিলেন আমাদের ‘দ্বীন সেন্টারে’র প্রথম মুসলিম। যার কারণে আজ খাবীবের মতো চ্যাম্পিয়নরা ইউএফসিতে আসতে পেরেছে, সেই কিংবদন্তিকে মুসলিম ভাই হিসাবে পাওয়া আমাকে অভিভূত করে দিয়েছিল। এটি প্রমাণ করে যে, সত্যের আলো যে কারো হৃদয়ে পৌঁছাতে পারে।
প্রশ্ন : আমেরিকায় ইসলামের ভবিষ্যৎ এবং যারা এখনো ইসলাম নিয়ে দ্বিধায় আছেন, তাদের উদ্দেশ্যে আপনার বার্তা কী?
এডি রেডজোভিক : আমেরিকায় ইসলামের ভবিষ্যৎ এখন আলোকোজ্জ্বল। যারা একসময় কট্টর ইসলাম বিদ্বেষী ছিলেন বা যাজক ছিলেন, আজ তারা মুসলিমদের কাছে ক্ষমা চাইছেন এবং ভুল বুঝতে পারছেন। এমনকি গাযার বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মানুষ অবাক হয়ে ভাবছে কিসের শক্তিতে এই মানুষগুলো এত ধৈর্যশীল! ফলে হাযার হাযার মানুষ ইসলাম নিয়ে গবেষণা করছে। যারা পরিবর্তন হ’তে চান, তাদের জন্য আমার একটাই কথা এখনই সঠিক সময়। মাদক বা ক্লাবের অন্ধকার জীবনে ফিরে যাওয়ার আগেই এই সুযোগটি লুফে নিন। আল্লাহ আপনার হৃদয়ে হেদায়েতের ইচ্ছা দিয়েছেন বলেই আপনি এটি ভাবছেন। তাই দেরি না করে স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পণ করুন। ইনশাআল্লাহ আপনার জীবনে চমৎকার সব পরিবর্তন শুরু হবে।
প্রশ্ন: তরুণ প্রজন্মের প্রতি আপনার উপদেশ কী হবে যাতে তাদের মাঝেও দ্বীনের প্রতি এই উদ্দীপনা তৈরি হয়?
এডি রেডজোভিক : মনে রাখবেন, এই জীবন অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং যেকোনো সময় শেষ হয়ে যেতে পারে। যখন আমাদের মনে এই বাস্তবতা গেঁথে যাবে যে, আল্লাহ আমাদের এমন কিছুর দিকে ডাকছেন যা দুনিয়ার সব সম্পদের চেয়ে মূল্যবান, তখন তাকে খুশি করার আগ্রহ তৈরি হবে। আমাদের উচিত মিউজিক শোনা, মুভি দেখা বা ক্যাফেতে বসে সময় নষ্ট করার মতো অনর্থক কাজ ছেড়ে দেওয়া। আমাদের মৃত্যুর কথা চিন্তা করা উচিত এবং দাওয়াহর কাজে নিজেদের নিয়োজিত করা উচিত। এটাই ইহকাল ও পরকালে সফল হওয়ার একমাত্র পথ।
[তথ্য সূত্র : ইন্টারনেট]