আবু আহমাদ মুহাম্মাদ আমান আল-জামী (রহঃ)

তাওহীদের ডাক ডেস্ক 6 বার পঠিত

আবু আহমাদ মুহাম্মাদ আমান ইবনু আলী আল-জামী (রহঃ) আফ্রিকার দরিদ্র দেশ ইথিওপিয়ায় জন্মগ্রহণ করলেও জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন সঊদী আরবে। ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে পায়ে হেঁটে দীর্ঘ পথ সফর করে তিনি মক্কায় পৌঁছান। এরপর সঊদী আরবের বিভিন্ন শহরে প্রখ্যাত শায়খদের নিকট ইলম অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার পাশাপাশি মূল্যবান কিছু গ্রন্থ রচনা করেন।

শাসকদের প্রতি আনুগত্যের প্রশ্নে কঠোরতা আরোপ এবং রাজনৈতিক আন্দোলন, বিপ্লবের কঠোর সমালোচক হওয়ায় তার নামের সম্বন্ধ করে একটি ধারা ‘জামী’ পরিচিতি লাভ করে। আরব বিশ্বের বিভিন্ন অঙ্গনে বিশেষত শাসকদের প্রতি আনুগত্যের প্রশ্নে কঠোর অবস্থান গ্রহণকারী সালাফী আক্বীদার কিছু ব্যক্তিকে ‘জামী’ বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে।

জন্ম ও শৈশব : মুহাম্মাদ আমান ইবনু আলী আল-জামী আবু আহমাদ নামে বেশি পরিচিত ছিলেন। তিনি ১৩৪৯ হিজরী মোতাবেক ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে ইথিওপিয়ার (হাবশা) হারার অঞ্চলের তাগা তাব নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

তিনি তাগা তাব গ্রামেই বেড়ে ওঠেন এবং সেখানে পবিত্র কুরআনসহ প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। এরপর তিনি শাফেঈ মাযহাব অনুযায়ী ফিক্বহের কিতাব অধ্যয়ন শুরু করেন। একই সাথে তিনি নিজ গ্রামেই মুহাম্মাদ আমীন আল-হারারীর কাছে আরবী ভাষা শিক্ষা করেন।

পরে সে অঞ্চলের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী তিনি নিজের গ্রাম ত্যাগ করে অন্য একটি গ্রামে যান। সেখানে তার পরিচয় হয় তারই সহপাঠী ও পরবর্তীতে সঊদী আরবে হিজরতকারী শায়েখ আব্দুল করীমের সঙ্গে। তাদের মধ্যে গভীর ইসলামী ভ্রাতৃত্ব গড়ে ওঠে। তারা দু’জনে মিলে শায়েখ মূসা নামক এক আলেমের কাছে যান এবং তাঁর নিকট ইবনু রাসলান রচিত ‘নাযমুয যুবাদ’ অধ্যয়ন করেন। পরে শায়েখ আবাদারের কাছে ‘মাতনুল মিনহাজ’ পড়েন এবং ওই গ্রামেই বিভিন্ন শাস্ত্রের জ্ঞানার্জন করেন।

সঊদী আরবে ইলম অর্জন : তাদের মনে মক্কা মুকাররমায় গিয়ে শিক্ষা গ্রহণ ও হজ্জ আদায়ের আগ্রহ সৃষ্টি হয়। ফলে তারা হাবশা থেকে সোমালিয়াতে যান এবং সেখান থেকে সমুদ্রপথে ইয়েমেনের এডেনের উদ্দেশ্যে রওনা হন। সমুদ্র ও স্থলপথে তারা নানা কষ্ট ও বিপদের সম্মুখীন হন। পরে তারা পায়ে হেঁটে হুদায়দাহ পৌঁছান এবং সেখানে রামাযান মাস অতিবাহিত করেন। এরপর তারা সঊদী আরবের দিকে যাত্রা করেন এবং ছামিতাহ ও আবু আরীশ হয়ে মক্কায় প্রবেশের অনুমতি লাভ করেন। পুরো পথই তারা পায়ে হেঁটে অতিক্রম করেন। ইয়েমেনে অবস্থানকালে কয়েকজন শায়খ তাদেরকে ‘দাওয়াতুস সালাফিয়্যাহ’ সম্পর্কে সতর্ক করেন, যাকে তারা ‘ওয়াহাবিয়্যাহ’ নামে অভিহিত করতেন।

সঊদী আরবে জ্ঞানার্জন : ১৩৬৯ হিজরীতে হজ্জ আদায়ের পর মুহাম্মাদ আমান মসজিদুল হারামের বিভিন্ন ইলমী হালাকায় নিয়মিত অধ্যয়ন শুরু করেন। তিনি শায়খ আব্দুর রায্যাক হামযাহ, শায়খ আব্দুল হক আল-হাশীমী, শায়খ মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আস-সোমালীসহ বহু আলেমের কাছ থেকে জ্ঞান লাভ করেন।

মক্কায় তিনি শায়খ আব্দুল আযীয বিন বায (রহঃ)-এর সাথে পরিচিত হন এবং পরবর্তীতে নতুন প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা ইনস্টিটিউটে ভর্তি হওয়ার জন্য তাঁর সঙ্গে রিয়াদে যান। এটি ছিল হিজরী সত্তরের দশকের শুরুতে। রিয়াদের শিক্ষা ইনস্টিটিউটে তার সহপাঠীদের মধ্যে ছিলেন শায়খ আব্দুল মুহসিন আল-আববাদ এবং মদীনার সাবেক প্রধান শারঈ আদালতের বিচারক শায়খ আলী ইবনু মাহনা।

রিয়াদে অবস্থানকালে তিনি বিভিন্ন ইলমী মজলিসে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। তিনি মুফতী, ফক্বীহ ও উছূলবিদ শায়খ মুহাম্মাদ ইবনু ইব্রাহীম আলে শায়খের কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করেন এবং তার দ্বারা প্রভাবিত হন। একইভাবে তিনি শায়খ আব্দুর রহমান আল-আফ্রীকী ও শায়খ আব্দুল আযীয বিন বায (রহঃ)-এর সান্নিধ্যে ছিলেন। তাদের বিশাল জ্ঞানভান্ডার ও উত্তম চারিত্রিক গুণাবলী থেকে তিনি ব্যাপকভাবে উপকৃত হন।

এছাড়া তিনি রিয়াদে মুহাম্মাদ আল-আমীন শানক্বীতী ও মুহাদ্দিছ হাম্মাদ আল-আনছারীর কাছ থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করেন। শায়খ আব্দুর রায্যাক আফীফীর শিক্ষাদান পদ্ধতি দ্বারা তিনি এতটাই প্রভাবিত হন যে, তাঁর নিজস্ব পাঠদানের ধরণেও তার প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি শায়খ আব্দুর রহমান ইবনু নাছির আস-সা‘দীর দ্বারাও প্রভাবিত হন। তাদের মধ্যে পারস্পরিক পত্র যোগাযোগ ছিল। একইভাবে তিনি শায়খ মুহাম্মাদ খলীল হাররাসের কাছ থেকেও শিক্ষা লাভ করেন এবং তার চিন্তাধারায়ও প্রভাবিত হন। এছাড়া তিনি শায়খ আব্দুল্লাহ আল-কার‘আভীর কাছ থেকেও ইলম অর্জন করেন।

তিনি রিয়াদের শিক্ষা ইনস্টিটিউট থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা (ছানাবিয়্যাহ) সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি শরী‘আহ কলেজে ভর্তি হন এবং ১৩৮০ হিজরীতে সেখান থেকে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৩৯৩ হিজরীতে পাকিস্তানের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শরী‘আহ বিষয়ে মাস্টার্স সমমানের ডিগ্রী লাভ করেন। পরে কায়রোর দারুল উলূম থেকে ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জন করেন।

কর্মজীবন : মুহাম্মাদ আমান আল-জামীর ইলমী মর্যাদা আলেম সমাজে অত্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। তারা তাকে সুন্দর ভাষায় স্মরণ করেছেন এবং তার প্রতি গভীর আস্থা পোষণ করতেন। তার কর্মজীবনের ধারাবাহিক বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে জানা যায় যে, রিয়াদে ছাত্রাবস্থায় তার শিক্ষক শায়খ আব্দুল আযীয বিন বায (রহঃ) তার মেধা ও জ্ঞানপিপাসা দেখে তাকে মুহাম্মাদ ইবনু ইব্রাহীম আলে শায়খের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। পরে জাযান অঞ্চলের ছামিতাহ শিক্ষা ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা শুরু করেন।

অতঃপর মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হ’লে শায়খ আব্দুল আযীয বিন বায (রহঃ) তাকে সেখানে শিক্ষক হিসেবে মনোনীত করেন। উল্লেখ্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়টি মূলত সালাফী আক্বীদা প্রচারের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁর আক্বীদা, জ্ঞান ও মানহাজের ওপর আস্থা রেখে তাকে প্রথমে মাধ্যমিক বিভাগে এবং পরে শরী‘আহ অনুষদে আক্বীদা বিষয় পড়ানোর দায়িত্ব দেন, যাতে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য বাস্তবায়নে অবদান রাখতে পারেন।

তাঁর সম্পর্কে আলেমদের বক্তব্য : (১) শায়খ রবী‘ আল-মাদখালী বলেছেন, ‘শায়খ মুহাম্মাদ আমান সম্পর্কে আমি শুধু এটুকুই জানি যে, তিনি ছিলেন একজন মুমিন, তাওহীদপন্থী, সালাফী এবং দ্বীনের গভীর জ্ঞানসম্পন্ন ফক্বীহ। আক্বীদার বিষয় উপস্থাপনে তার মতো দক্ষ মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। তিনি আমাদের মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়িয়েছেন। তার চেয়ে উত্তমভাবে আক্বীদা ব্যাখ্যা করতে সক্ষম কাউকে আমরা দেখিনি। তিনি ছাত্রদের বোঝানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। আমরা তার মধ্যে উত্তম চরিত্র, বিনয় ও গাম্ভীর্য দেখেছি যে গুণগুলো তার কাছ থেকেই শেখা যেত’।

(২) শায়খ মুহাম্মাদ ইবনু ছালেহ আল-ফাওযান বলেছেন,মুহাম্মাদ আল-জামী আমাদের ভাই ও সহপাঠী ছিলেন। তিনি এই বরকতময় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হন এবং পরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। একইসঙ্গে তিনি মসজিদে নববীতেও পাঠদান করতেন এবং আল্লাহর পথে দাওয়াতী কাজ করতেন। আমরা তার ব্যাপারে ভালো ছাড়া অন্য কিছু জানি না। ‘জামিয়্যাহ’ (তার নামের দিকে সম্পর্কিত করে) নামে কোনো দল আছে একথা মিথ্যা অপবাদ ও বিকৃত প্রচারণা। শায়খ মুহাম্মাদ আমান আল-জামী সম্পর্কে আমরা এটুকুই জানি। কিন্তু যেহেতু তিনি তাওহীদের দিকে আহবান করতেন এবং বিদ‘আত ও ভ্রান্ত চিন্তাধারার বিরোধিতা করতেন, তাই কিছু মানুষ তার বিরোধিতা করে তাকে এ নামে অভিহিত করেছে’।

(৩) ড. মুহাম্মাদ বিন আব্দুর রহমান আল-খুমাইস (শিক্ষক, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সঊদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, রিয়াদ) বলেন, নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ আমান আল-জামী সালাফে ছালেহীনের আক্বীদার উপর দৃঢ় প্রত্যয়ী আলেমে দ্বীন ছিলেন। তিনি বইপুস্তক, বক্তৃতা ও সেমিনারসমূহে বিশুদ্ধ দাওয়াত দিতেন। আর যিনিই সালাফে ছালেহীনের আক্বীদার বিরোধিতা করতেন, তার প্রতিবাদ করার ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। মনে হ’ত যেন তিনি জ্ঞান অর্জন, শিক্ষাদান, পাঠদান ও দাওয়াতের মাধ্যমে এই আক্বীদার জন্যই নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন এবং মানুষের জীবনে এই আকীদার গুরুত্ব ও তার সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন।

তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ও রচনাসমূহ :

  • আযওয়া আলা তরীকিদ দা‘ওয়াহ ইলাল ইসলাম (ইসলামের দাওয়াতের পথে আলোকবর্তিকা)
  • মাজমূ‘ রাসায়িলিল জামী ফীল আক্বীদাহ ওয়াস সুন্নাহ (আক্বীদা ও সুন্নাহ বিষয়ক জামির প্রবন্ধসমগ্র)
  • আল-মুহাযারাতুদ দিফা‘ইয়্যাহ ‘আনিস সুন্নাতিল মুহাম্মাদিয়্যাহ (রাসূল ছাঃ)-এর সুন্নাহর পক্ষে প্রতিরক্ষামূলক আলোচনা)
  • হাক্বীক্বাতুদ দীমুকরাতিয়্যাহ ওয়া আন্নাহা লাইসাত মিনাল ইসলাম (গণতন্ত্রের বাস্তবতা এবং তা ইসলামের অন্তর্ভুক্ত নয়)
  • হাক্বীক্বাতুশ শূরা ফিল ইসলাম (ইসলামে পরামর্শের প্রকৃত ধারণা)
  • আল-‘আকীদাতুল ইসলামিয়্যাহ ওয়া তারীখুহা (ইসলামী আক্বীদা ও তার ইতিহাস)
  • শারহু মাতানি শুরূতিছ ছালাতি ওয়া আরকানিহা ওয়া ওয়াজিবাতিহা (ছালাতের শর্ত, রুকন ও ওয়াজিবসমূহ বিষয়ক মতনের ব্যাখ্যা)
  • কুররাতু ‘আয়নিল মুওয়াহহিদীন ফী তাহকীকি দা‘ওয়াতিল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন (নবী-রাসূলদের দাওয়াতের বাস্তবতা নিয়ে তাওহীদবাদীদের চক্ষুশীতলতা)
  • আছ-ছিফাতুল ইলাহিয়াহ ফীল কিতাবি ওয়াস সুনণাতিন নববিয়্যাহ ফী যাওইল ইছবাত ওয়াত তানযীহ (কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে প্রমাণ ও পবিত্রতার দৃষ্টিতে আল্লাহর গুণাবলি)

এছাড়াও তার অসংখ্য রচনা, গবেষণা ও বিভিন্ন গ্রন্থের ব্যাখ্যাগ্রন্থ রয়েছে।

অসুস্থতা ওমৃত্যু : মুহাম্মাদ আমান আল-জামী তার জীবনের শেষভাগে এক কঠিন ও দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন, যা তাঁকে প্রায় এক বছর শয্যাশায়ী করে রেখেছিল। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি অত্যন্ত ধৈর্য ধারণ করেন এবং আল্লাহর দরবারে প্রতিদানের আশা রাখেন। অতঃপর তিনি ১৪১৬ হিজরীর ২৬শে শা‘বান মোতাবেক ১৭ই জানুয়ারী ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে মদীনায় মৃত্যুবরণ করেন এবং মদীনা মুনাওয়ারার পবিত্র ‘বাক্বীউল গারক্বাদ’ (জান্নাতুল বাক্বী) কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল প্রায় আটষট্টি বছর। আল্লাহ তার খেদমতসমূহ কবুল করুন।- আমীন!



আরও