নানাজীর কথকতা ও পীর প্রসঙ্গ
শামসুদ্দীন মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সেলিম
মাঝে মাঝে কাছে একদম টাকা থাকেনা। সেদিন ছিলো ২০৫ টাকা। সারদা থেকে রাজশাহী আসবো। ৫০ টাকা হলেই চলবে। সুতরাং কোন সমস্যা নেই। রাস্তার মোড়ে বাসের অপেক্ষা করছি। এমন সময় এক বৃদ্ধ মানুষ এসে পাশে দাঁড়ালেন। জীর্ণ শরীর, অযত্নে বেড়ে ওঠা দাড়ি আর বয়সের আঁচড়ে কুঁচকানো চামড়া। তিনি আমার চেনা কেউ নন। অথচ তার চোখের দিকে তাকাতেই বুকের ভেতরটা কেমন হাহাকার করে উঠল। ধরা গলায় অতি কষ্টে বললেন, বাবা! আজ ঘরে চাল কেনা হয়নি।
ব্যাস, ঐটুকুই। কথা শেষ হতেই বৃদ্ধের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। তিনি তাড়াহুড়ো করে পাঞ্জাবীর হাতা দিয়ে তা মুছে ফেললেন। পৃথিবীতে পুরুষ মানুষের চোখের পানি সহ্য করা সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন কাজ। পকেট থেকে ১০০ টাকার নোটটা তার হাতে গুঁজে দিয়ে দ্রুত সেখান থেকে সরে এলাম। নিজেকে সান্তনা দিলাম অর্ধেক তো আছে, একটা লোক অন্তত আজ রাতে পেট ভরে খেতে পারবে!
মাগরিবের ছালাত শেষে মসজিদ থেকে বের হতেই দেখা সেই বৃদ্ধার সাথে, যিনি প্রতিদিন গেটের পাশে বসেন। তিনি প্রার্থনার স্বরে সালাম দিলেন। আমি উত্তর দিয়ে দ্রুত পাশ কাটিয়ে চলে গেলাম। পকেটে আছে মাত্র ১০৫ টাকা। এখন কাউকে দান করা মানেই নিজের জন্য মহাবিপদ ডেকে আনা। যুক্তিবাদী মন বলছিল, ‘জুয়েল, তুমি তো একজনকে দিয়েছই, এখন নিজেকে বাঁচাও’।
কিন্তু মানুষের বিপদ বোধ হয় তার পিছু ছাড়ে না, যতক্ষণ না সে ধৈর্য আর ত্যাগের চূড়ান্ত সীমানায় পৌঁছায়। আধাঘণ্টা বাজারে কাজ সেরে বাসস্ট্যান্ডের দিকে এগোচ্ছি। খেয়াল করলাম সেই বৃদ্ধা ছায়ার মতো আমার আশেপাশে ঘুরছেন। বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছাতেই তিনি সামনে এসে দাঁড়ালেন। মায়াবী গলায় ডাকলেন, বাবা জুয়েল, একটা কথা ছিল।
এ মানুষগুলো আমায় চেনেন, বড্ড আপন করে ডাকেন। বললাম, বলেন বিটি, কী হয়েছে! তিনি কাঁপা গলায় বললেন, বাবা, ভীষণ বিপদে পড়েছি। ১০০ টাকা খুব দরকার। আমি এক বুক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে অসহায়ভাবে হাসলাম। বললাম, বিটি, আমার পকেটে আছেই ১০৫ টাকা। আপনাকে দিলে আমি তো রাজশাহী ফিরতে পারব না। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। বৃদ্ধা মুহূর্তেই লজ্জিত হলেন। মলিন মুখে বললেন, ঠিক আছে বাবা, থাক। তুমি তো রোজই দাও। আজ দিও না, আমি অন্য ব্যবস্থা করে নেব।
আমি থমকে দাঁড়ালাম। তার সেই করুণ মুখটা দেখে মনে হ’ল নফসে মুত্বমাইন্নাহ যেন আমায় প্রশ্ন করছে, জুয়েল, তুমি কার ওপর ভরসা করো? তোমার পকেটের ওই কাগজের নোটের ওপর, নাকি যিনি এই মহাবিশ্ব পরিচালনা করেন তাঁর ওপর? হৃদপিন্ডের ধুকপুকুনি বেড়ে গেল। এক অদ্ভুত সাহসে পকেট থেকে সেই শেষ ১০০ টাকার নোটটা বের করে তার হাতে জোর করে ধরিয়ে দিলাম। বললাম, আপনি নেন। আল্লাহ তা‘আলা আমার জন্য কী ব্যবস্থা করেন দেখি।
এখন আমার সম্বল মাত্র ৫ টাকা। এই টাকায় রাজশাহী যাওয়া যাবে না। তাই মোড়েই দাঁড়িয়ে ভাবছি, কোনো পরিচিত মানুষের দেখা কি পাব না? কারো কাছ থেকে অন্তত ৫০টা টাকা ধার নিয়ে বাসে উঠব। কিন্তু অদ্ভুত বিষয়, প্রতিদিন পরিচিত মানুষের ভিড় থাকলেও আজ চারপাশটা কেমন নিঝুম আর অচেনা। বাসের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, ঘন হ’তে থাকা অন্ধকারের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আমার অস্থিরতা। মনে মনে শুধু বলছি, মালিক! তুমি তো সব দেখছো! ঠিক তখনই অন্ধকারের বুক চিরে এক জোড়া প্রখর হেডলাইটের আলো ঝিলিক দিয়ে উঠল। একটা ঝকঝকে সাদা প্রাইভেট কার এসে আমার ঠিক সামনে থামল। জানালার কাঁচ নামিয়ে ভদ্রলোকটি স্নিগ্ধ হাসিতে বললেন, ‘আরে জুয়েল ভাই না? একা দাঁড়িয়ে কেন এই অসময়ে?
আমি বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইলাম। লোকটিকে আমি চিনতে পারলাম না। তিনি নিজেই বললেন, রাজশাহীতে আপনার কফিশপে কফি খেতে যাই মাঝে মাঝে। আপনি হয়তো খেয়াল করেননি। কোথায় যাবেন? উঠে বসুন, পৌঁছে দিচ্ছি। গাড়িতে উঠে আমি জানালার বাইরে অন্ধকার পথের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ভদ্রলোক সারা রাস্তা কত কী গল্প করলেন, তার একবর্ণও আমার কানে ঢুকল না। সৌজন্যতা রক্ষায় শুধু জ্বী হ্যাঁ এসব বলে গেলাম। আমার চোখ বেয়ে শুধু পানি গড়িয়ে পড়ছিল। এই কি তবে সেই রহমানুর রহীমের প্রতিদান? তিনি চাইলেন না তাঁর এক সামান্য বান্দা অন্যের হাসির জন্য সবটুকু বিলিয়ে দেওয়ার পর পথে একা দাঁড়িয়ে কষ্ট পাক। নিজের পকেট শূন্য করার কয়েক মিনিটের মাথায় তিনি আমার জন্য বিলাসবহুল বাহন পাঠিয়ে দিলেন!
৪৫ মিনিটের পথ নিমিষেই শেষ হ’ল। আমার বাসার সামনে নামিয়ে দিলেন তিনি। কৃতজ্ঞতায় ভারাক্রান্ত মনে নাম ও ফোন নম্বর চাইলাম। তিনি মৃদু হাসলেন। এক অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে বললেন, আজ নয়। যেদিন আপনার ওখানে কফি খেতে যাব, সেদিন দিব। গাড়িটি চোখের সামনে দিয়ে ধুলো উড়িয়ে মিলিয়ে গেল। আমি ঝাপসা চোখে তাকিয়ে থাকলাম। গাড়ির নম্বর প্লেটও অস্পষ্ট দেখাচ্ছে। জানিনা, অশ্রুর কারণে নাকি এও প্রভুর কোন পরিকল্পনা! কেবল স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম ওপরের সেই বিশাল আকাশটা। অনুভব করলাম, আমার চারপাশের বাতাসে মিশে আছে স্রষ্টার অসীম করুণার সুবাস। শুকরিয়া হে মালিক, বৃষ্টির মতো ঝরে পড়া তোমার এই রহমতের জন্য। তুমি শিখিয়ে দিলে মানুষ যখন নিঃস্ব হয়, তখনই সে তোমার সবচাইতে নিকটবর্তী হয়।
আসাদুজ্জামান জুয়েল, রাজশাহী