দুনিয়ার বাস্তবতা
নাজমুন নাঈম
আমেরিকার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা প্রতি বছর প্রায় নিয়মিতভাবেই পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান আয়োজন করে। কিছু সময়ের জন্য তারা স্মৃতি ঘেরা ক্যাম্পাসে ফিরে আসে। বন্ধুদের সাথে আনন্দঘন সময় কাটায়, পুরাতন দিনের স্মৃতিচারণ করে, নতুন জীবনের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেয়। তারা একে অপরের খোঁজ-খবর নেয়, কে কর্মজীবনে সফল হয়েছে? কে কত বেতনে চাকরী করছে? কে বিয়ে করেছে? কার সন্তান হয়েছে? ইত্যাদি।
এমনই এক পুনর্মিলনীর দিনে কিছু প্রাক্তন শিক্ষার্থী তাদের এক বৃদ্ধ শিক্ষকের বাড়িতে গেল। শুভেচ্ছা ও সৌজন্য বিনিময়ের পর সবাই নিজের কাজ ও জীবনের চাপ নিয়ে অভিযোগ করতে লাগল। তাদের কথা-বার্তায় প্রকাশ পাচ্ছিল, তারা কেউ নিজের জীবন ও কাজ নিয়ে খুশি নয়। সবার চোখে তার অপর বন্ধুর জীবন ও কাজ বেশি সুখকর মনে হ’ল।
শিক্ষক তাদেরকে গভীরভাবে খেয়াল করছিলেন। তিনি তাদেরকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য একটি পরিকল্পনা করলেন। তিনি উঠে বাড়ির ভিতরে গেলেন এবং একটি বড় কফির পাত্র নিয়ে ফিরে আসলেন। সঙ্গে একটি ট্রেতে নিয়ে আসলেন নানা রকম কাপ। কিছু চীনা মাটির কাপ, কিছু সাধারণ কাঁচের কাপ, মেলামাইন কাপ, ক্রিস্টাল কাপ, প্লাস্টিক কাপ, আবার কিছু খুব সাধারণ কাপ।
শিক্ষক বললেন, ‘এসো, তোমরা প্রত্যেকে নিজের জন্য কফি ঢেলে নাও’। সবাই যখন নিজের হাতে একটি করে কাপ নিয়ে বসেছে, তখন শিক্ষক বললেন, প্রত্যেকে নিজের হাতের কাপের দিকে লক্ষ্য কর! এরপর অন্যদের কাপগুলোর দিকে তাকাও। দেখ, তোমরা শুধু সুন্দর ও দামী কাপগুলোই বেছে নিয়েছ, আর সাধারণ কাপগুলো এড়িয়ে গেছ। এটা স্বাভাবিক যে মানুষ ভালো জিনিসের দিকে আকৃষ্ট হয়। কিন্তু ঠিক এটিই তোমাদের দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপের কারণ।
আসলে তোমাদের দরকার ছিল কফি, কাপ নয়। কিন্তু তোমরা দামী ও সুন্দর কাপের জন্য প্রতিযোগিতা করেছ। আর প্রত্যেকে অন্যের কাপের দিকে তাকিয়ে সেটিকে বেশি সুন্দর ও আকর্ষণীয় মনে করেছ। কিন্তু কফির আসল স্বাদ কাপে থাকে না, কাপের ভিতরে কফিতে থাকে। কিন্তু যখন আমরা কেবল কাপের দিকে মন দিই, তখন আমরা কফির আসল আনন্দ থেকে বঞ্চিত হই।
যদি আমাদের জীবনকে কফি ধরা হয়, তবে চাকরি, অর্থ ও সামাজিক মর্যাদা হ’ল কাপ, যা শুধু জীবনকে ধারণ করার মাধ্যম। অর্থ-বিত্ত বা সামাজিক মর্যাদা জীবনে প্রশান্তি আনতে পারে না। এটি কেবল জীবনধারণ ও পৃথিবী পরিচালনার একটি অংশ মাত্র। জীবনের আসল স্বাদ উপভোগ করতে হয় হৃদয়ের গভীর থেকে। আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস, ভরসা ও সন্তুষ্টির মাধ্যমে তা অর্জিত হয়। কিন্তু আমরা যখন বাহ্যিক অবস্থার দিকে গুরুত্বারোপ করি, তখন ভিতরের প্রশান্তি বিনষ্ট হয়। তাই আমি তোমাদের পরামর্শ দিচ্ছি, বাহ্যিক জিনিসের প্রতি অতিরিক্ত গুরুত্ব দিও না, বরং জীবনের আসল স্বাদ উপভোগ করো।
ইংরেজীতে একটি প্রবাদ আছে, The grass is always greener on the other side of the fence (বেড়ার অন্য পাশে ঘাস সবসময় বেশি সবুজ মনে হয়)। অর্থাৎ মানুষ নিজের জীবনের প্রতি সন্তুষ্ট হয় না; নিজের চেয়ে অন্যের জীবনকে বেশি ভালো ও আকর্ষণীয় মনে করে। কেউ একজন সুন্দর ও সৎ চরিত্রের স্ত্রী পেয়েও মনে করে অন্য কেউ তার চেয়ে ভালো স্ত্রী পেয়েছে। আবার কেউ তার সহকর্মী যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতি বা পুরস্কার পেলে মন খারাপ করে।
এটি অন্তরের এক প্রকার রোগ। এ রোগ থেকে মুক্তির জন্য রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর একটি হাদীছই যথেষ্ট। তিনি বলেন, ‘যখন তোমাদের কেউ এমন ব্যক্তিকে দেখে যাকে ধন-সম্পদ এবং স্বাস্থ্য-সামর্থ্যে তার উপরে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে, তখন সে যেন নিজের চাইতে নিম্নমানের ব্যক্তির দিকে লক্ষ্য করে’ (বুখারী হা/৬৪৯০; ইবনু হিববান হা/৭১২; মিশকাত হা/৫২৪২)। ইবনু জারীর ত্বাবারী (রহঃ) বলেন, ‘এই হাদীছ যাবতীয় কল্যাণকে একত্রিত করেছে। কেননা বান্দা যখন প্রাচুর্য-সমৃদ্ধিতে তার চেয়ে উচ্চ পর্যায়ের কোন ব্যক্তির দিকে তাকায়, তখন তার অন্তর সেটাকে পাওয়ার জন্য আকাঙ্ক্ষী হয়ে উঠে। ফলে সে নিজের অবস্থাকে খুবই নগণ্য মনে করে এবং প্রাচুর্য বৃদ্ধির জন্য চেষ্টা করতে থাকে। আর সে যখন নিজের চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের লোকের দিকে তাকায়, তখন তার প্রতি আল্লাহ্ও নে’মতগুলি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে তার মন-প্রাণ আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় প্রণত হয়’।
(কাযী ইয়ায, ইকমালুল মু‘লিম বিফাওয়ায়িদিল মুসলিম, মুহাক্কিক ড. ইয়াহইয়া ইসমাঈল (মিসর : দারুল অফা, প্রথম প্রকাশ, ১৪১৯ হি./ ১৯৯৮ খৃ.) ৮/৫১৫ পৃ.।)।
মূল : মুহসিন জববার,
অনুবাদ : নাজমুন নাঈম