বেকারত্বের শিকল : রিযিক অন্বেষণে কর্মযাত্রা

মাহফূয আলম 30 বার পঠিত

আজকের মুসলিম সমাজের দিকে তাকালে এক বুক হাহাকার নিয়ে দেখতে হয়, আমাদের এক বিশাল সংখ্যক তেজদীপ্ত যুবক আজ ‘বেকারত্বের’ বিষাক্ত অভিশাপে নীল হয়ে আছে। এই সংকট শুধু পকেটের শূন্যতা কিংবা অর্থনৈতিক অনটন নয়। বরং এটি যুবকদের মানসিক প্রশান্তি কেড়ে নিচ্ছে। ভেঙ্গে চুরমার করে দিচ্ছে তাদের আত্মবিশ্বাস। আর ধ্বস নামাচ্ছে সামাজিক স্থিতিশীলতায়। একরাশ হতাশা আর অনিশ্চয়তার মায়াজালে আটকা পড়ে আমাদের অনেক উজ্জ্বল নক্ষত্র আজ কক্ষচ্যুত। অনেক প্রতিভাবান যুবক হারিয়েছে তাদের অসীম সম্ভাবনা।

কিন্তু একজন মুমিনের জীবনে কি সত্যিই ‘হতাশা’ বলে কিছু আছে? যেখানে আসমান ও যমীনের মালিক স্বয়ং আমাদের রিযিকের গ্যারান্টি দিয়েছেন! আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা পরম মমতায় ঘোষণা করেছেন,وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللهِ رِزْقُهَا، ‘আর ভূপৃষ্ঠে বিচরণশীল এমন কোন প্রাণী নেই যার রিযিক আল্লাহর যিম্মায় নেই’ (হুদ১১/৬)। মহাবিশ্বের প্রতিপালকের এই অমোঘ ঘোষণার পর একজন বিশ্বাসী যুবকের দুশ্চিন্তায় মগ্ন থাকা কি সাজে? তবুও যদি আমাদের মনের কোণে অস্থিরতার কালো মেঘ জমে থাকে, তবে বুঝতে হবে আমাদের মূল সমস্যা অর্থনৈতিক নয়, বরং আত্মিক। আমাদের ভেতরে হয়তো ‘তাওয়াক্কুল’ বা আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থার অভাব রয়েছে। যা একজন মুমিনকে পাহাড়সম প্রতিকূলতাতেও স্থির রাখে।

বেকারত্বের প্রকৃত স্বরূপ : বেকারত্ব আসলে কী? ইংরেজি 'Unemployment' শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হ’ল বেকারত্ব। সহজ কথায়, এটি এমন এক অনাকাংখিত পরিস্থিতি, যেখানে একজন ব্যক্তি কাজ করার মতো শারীরিক ও মানসিক সামর্থ্য থাকা এবং কাজ করার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও উপযুক্ত কোনো কর্মসংস্থান খুঁজে পায় না।

বেকারত্বের প্রকারভেদ : (১) স্বেচ্ছাকৃত বেকারত্ব : যেখানে একজন ব্যক্তি প্রচলিত মজুরিতে কাজ করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কাজ করতে আগ্রহী হন না। এটি মূলত অলসতা বা আভিজাত্যের মোহে তৈরি হয়। (২) অনিচ্ছাকৃত বেকারত্ব : যেখানে একজন ব্যক্তি বিদ্যমান মজুরিতে কাজ করতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, কিন্তু কোনো কাজের সন্ধান পাচ্ছেন না।

বস্ত্তবাদী অর্থনীতির চোখে বেকারত্ব : প্রচলিত অর্থনীতিবিদরা বেকারত্বের পেছনে একগুচ্ছ গাণিতিক ও সামাজিক কারণ দেখান। তাদের মতে-অতিরিক্ত জনসংখ্যা, দক্ষ শ্রমিকের অভাব, পুঁজির স্বল্পতা, অনুন্নত অবকাঠামো এবং প্রযুক্তির সাথে খাপ খাওয়াতে না পারাই বেকারত্বের প্রধান কারণ।

কোন দেশের জনসংখ্যা কম বা বেশি হওয়ার সাথে বেকারত্বের কোন স্থায়ী বা অকাট্য সম্পর্ক নেই। আমাদের মনে হ’তে পারে, কাজের সুযোগ সীমিত বলেই হয়তো বেকারত্ব বাড়ছে। কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় কর্মসংস্থানের অভাব বলে আদতে কিছু নেই। গতানুগতিক অর্থনীতির চশমা খুলে বাস্তবের কিছু ধ্রুব সত্য আর উদাহরণের দিকে তাকান। জনসংখ্যাকে ‘সমস্যা’ মনে না করে একে কীভাবে ‘সম্পদ’ এবং ‘রিযিকের মাধ্যম’ হিসাবে দেখা যায়, তা বিশ্লেষণ করলেই এই সন্দেহ দূর হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।

ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা বনাম রিযিকের প্রশস্ততা : বেকারত্ব যে কোনো নির্দিষ্ট ভূখন্ড বা জনসংখ্যার ওপর নির্ভরশীল নয়, তা বুঝার জন্য আমাদের চারপাশের বাস্তবতার দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়। চলুন বিষয়টি কিছু উদাহরণের মাধ্যমে তলিয়ে দেখি।

যমুনা সেতু ও উত্তরবঙ্গের শিক্ষা : এক সময় যমুনা নদী ছিল উত্তরবঙ্গের মানুষের জন্য এক বিশাল দেয়াল। ঢাকা থেকে রাজশাহী বা রংপুর ছিল কয়েক দিনের পথ। ফলে উত্তরবঙ্গের কর্মসংস্থান শুধু ওই অঞ্চলের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৯৫-৯৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যেখানে সারা দেশের দারিদ্রের হার ছিল ৫৩%, সেখানে উত্তরবঙ্গে তা ছিল ৬২% থেকে ৭৫% পর্যন্ত। কিন্তু যমুনা সেতু হওয়ার পর যখনই ঢাকার সাথে সরাসরি সংযোগ তৈরি হ’ল, হাযার হাযার মানুষ কাজের খোঁজে রাজধানী বা অন্যান্য শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ল। যারা নিজ এলাকায় ‘বেকার’ ছিল, তারা গার্মেন্টস বা কল-কারখানায় নিজেদের কাজের সুযোগ তৈরি করে নিল। অর্থাৎ শ্রম ও জনশক্তি এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ‘রপ্তানি’ হয়ে গেল। কোন নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ থাকল না।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও প্রবাসীদের সাফল্য : একই সত্য আমরা দেখি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং বিচ্ছিন্ন ছিল, তখন দারিদ্র‍¨ ছিল চরম সীমায়। কিন্তু যখনই বিদেশের শ্রমবাজার উন্মুক্ত হ’ল, আমাদের মানুষগুলো মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ল। সেখানে গিয়ে তারা দেখল কাজের কোনো অভাব নেই। এভাবে এক দেশের বেকারত্ব অন্য দেশের কর্মসংস্থানে রূপান্তরিত হ’ল। এখানে জনসংখ্যা কত বেশি তা মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং মুখ্য হয়েছে ‘সুযোগ অন্বেষণ’। আজ কানাডা বা মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকান। সেখানে কাজের সুযোগ এত বেশি যে, তারা বিদেশ থেকে কর্মী আমদানি করছে। অথচ তাদের নিজেদের অনেক নাগরিক অলস বসে আছে। একেই বলে ‘ইচ্ছাকৃত বেকারত্ব’।

দ্বীনের আলোকবর্তিকা ও আমাদের কর্মযাত্রা : ইসলামে রিযিক বা জীবিকার ধারণাটি যেমন স্বচ্ছ, তেমনি এটি অত্যন্ত বৈপ্লবিক। মহান আল্লাহ সুষ্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন,وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللهِ رِزْقُهَا، ‘আর ভূপৃষ্ঠে বিচরণশীল এমন কোন প্রাণী নেই যার রিযিক আল্লাহর যিম্মায় নেই’(হুদ ১১/৬)। তবে এই আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করে হাত গুটিয়ে বসে থাকার কোনো অবকাশ ইসলামে নেই। আল্লাহর ওপর ভরসা করার অর্থ এই নয় যে, আপনি নিষ্ক্রিয় হয়ে ঘরে বসে থাকবেন। আর রিযিক আপনার দরজায় কড়া নাড়বে। বরং ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, আল্লাহর ওপর বিশ্বাস হবে হৃদয়ে, আর শ্রম হবে হাতে।

আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (ছাঃ) শ্রমের মর্যাদা দিতে গিয়ে এক অনবদ্য শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,لأَنْ يَحْتَطِبَ أَحَدُكُمْ حُزْمَةً عَلَى ظَهْرِهِ خَيْرٌ مِنْ أَنْ يَسْأَلَ أَحَدًا، فَيُعْطِيَهُ أَوْ يَمْنَعَهُ- ‘সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! তোমাদের কারো পক্ষে তার রশি নিয়ে পিঠে কাঠের বোঝা বহন করে (বিক্রি করতে) আনা অনেক উত্তম; কোন ব্যক্তির কাছে হাত পাতার চেয়ে; সে তাকে দিক বা না দিক’ (বুখারী হা/২০৭৪)। এই ছোট্ট হাদীছটি আমাদের দেখিয়ে দেয় যে, নিজ হাতে পরিশ্রম করে জীবিকা অর্জন করা সম্মানজনক ও মহৎ কাজ। একজন মুসলিমের কাছে কোনো হালাল কাজই ছোট নয়।

ছাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-এর জীবনদর্শন : ছাহাবায়ে কেরাম শুধু ইবাদতে মগ্ন থাকতেন না, বরং তারা ছিলেন সমকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে পরিশ্রমী মানুষ। হযরত ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ)-এর একটি অমর বাণী এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট দিশারীহ’তে পারে। তিনি বলেছিলেন, ‘তোমাদের কেউ যেন জীবিকা উপার্জনে আলস্য করে বসে না থাকে আর বলে,হে আল্লাহ! আমাকে রিযিক দাও। কারণ তোমরা খুব ভালো করেই জানো যে, আকাশ কখনো সোনা বা রূপা বর্ষণ করে না’।[1]

ইসলামের দৃষ্টিতে অলসতা কেবল একটি মন্দ অভ্যাস নয়, বরং এটি একটি পরিত্যাজ্য বৈশিষ্ট্য। নিজের সুপ্ত মেধা ও কারিগরি দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে হালাল উপায়ে উপার্জনের সংগ্রামে লিপ্ত থাকাই হ’ল একজন প্রকৃত মুসলিমের বৈশিষ্ট্য। মনে রাখবেন হাত যখন শ্রমে ব্যস্ত থাকে এবং হৃদয় যখন আল্লাহর ওপর আস্থায় অবিচল থাকে, তখন সেই শ্রম আর সাধারণ থাকে না, তা ইবাদতে পরিণত হয়।

উপার্জন মানেই কি কেবল একটি চাকুরী? আমাদের বর্তমান সমাজব্যবস্থা তরুণদের মগজে এই ধারণা গেঁথে দিয়েছে যে, জীবিকা মানেই একটি ‘চাকুরী’। কিন্তু ইসলাম আমাদের চিন্তার এই সীমাবদ্ধতাকে ভেঙে দেয়। ইসলাম শুধু অন্যের অধীনে কাজ বা চাকুরীর পেছনে ছুটে বেড়াতে উৎসাহিত করে না, বরং স্বাধীনভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য ও উদ্যোক্তা (Entrepreneur) হওয়ার প্রতি জোরালো প্রেরণা দেয়।

ইসলামে ব্যবসার প্রতি উৎসাহ প্রদান : আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ (ছাঃ) নিজেও ছিলেন একজন সফল ও দূরদর্শী ব্যবসায়ী। তাঁর অসামান্য সততা, আমানতদারিতা এবং ব্যবসায়িক প্রজ্ঞা তাঁকে মক্কায় ‘আল-আমীন’ বা মহাবিশ্বস্ত উপাধিতে ভূষিত করেছিল। ব্যবসা সম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা রয়েছে,وَأَحَلَّ اللهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا، ‘আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সূদকে হারাম করেছেন’(বাক্বারাহ ২/২৭৫)। এই আয়াতটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, ব্যবসা কেবল জীবিকা নয়, বরং এটি হালাল উপার্জনের এক বরকতময় ও শ্রেষ্ঠ মাধ্যম।

আব্দুর রহমান ইবনু ‘আওফ (রাঃ) শূন্য থেকে শিখরে : ছাহাবীদের জীবনের দিকে তাকালে আমরা এক অদম্য সাহস, পরিশ্রম ও সফলতার গল্প খুঁজে পাই। আব্দুুর রহমান ইবনু ‘আওফ (রাঃ) যখন শূন্য হাতে হিজরত করে মদীনায় আসলেন, তখন রাসূল (ছাঃ) তাকে আনছার ছাহাবী সা‘দ বিন রবী‘ (রাঃ)-এর সাথে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন স্থাপন করে দিলেন। অতঃপর সা‘দ তার মুহাজির ভাইকে বললেন, ‘আনছারদের মধ্যে আমি সর্বাপেক্ষা ধনী। আপনি আমার সম্পদের অর্ধেক গ্রহণ করুন এবং আমার দু’জন স্ত্রীর মধ্যে যাকে আপনি পসন্দ করেন, তাকে আমি তালাক দিয়ে দিব। ইদ্দত শেষে আপনি তাকে বিবাহ করবেন’। আব্দুর রহমান বিন ‘আওফ তার আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে তাকে দো‘আ করলেন,بَارَكَ اللهُ لَكَ فِى أَهْلِكَ وَمَالِكَ ‘আল্লাহ আপনার পরিবারে ও সম্পদে বরকত দান করুন’! আপনি আমাকে আপনাদের বাজার দেখিয়ে দিন। অতঃপর তাঁকে বনু ক্বায়নুক্বা-র বাজার দেখিয়ে দেওয়া হ’ল। তিনি সেখানে গিয়ে পনির ও ঘি-এর ব্যবসা শুরু করলেন এবং কিছুদিনের মধ্যে সচ্ছলতা লাভ করলেন।[2]

তিনি অন্যের দয়া বা সরকারী ভাতার অপেক্ষায় বসে না থেকে নিজের হাতে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। তিনি কারো অধীনে চুক্তিবদ্ধ কাজের জন্য হাত পা গুটিয়ে বসে থাকেননি। বরং নিজের ভেতরের কর্মদক্ষতাকে ব্যবহার করেছিলেন। এটিই আজকের শিক্ষিত ও বেকার যুবকদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

কৃষি ও কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি : যাদের সামান্য কৃষি জমি রয়েছে, তাঁদের জন্য রয়েছে আরও এক অনন্য সুযোগ। কৃষি এমন এক পবিত্র পেশা, যেখানে বান্দা মাটির বুকে বীজ বপন করে সরাসরি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে। আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ বা সেঁচের মাধ্যমে মাটির বুক চিরে ফসল বের হওয়া আল্লাহর এক বিশাল অলৌকিকতা। সেখানে আল্লাহর ওপর বান্দার পূর্ণ ভরসা নিহিত থাকে। আর আল্লাহ তাঁর ওপর ভরসাকারীকে কখনও নিরাশ করেন না।

আজকের প্রযুক্তি কৃষিকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। কৃষি এখন কেবল লাঙল-জোয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং স্মার্ট ফার্মিং, ড্রিপ ইরিগেশন এবং হাইড্রোফোনিক্সের মতো আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে অল্প জমিতেই বিশাল বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। একজন শিক্ষিত মুসলিম যুবক যখন আধুনিক কৃষি প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে জমিতে নামবেন, তখন তিনি কেবল নিজের রিযিকই নয়, বরং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে একটি বিশাল ছওয়াবের অংশীদার হবেন।

আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন দিগন্তের হাতছানি : আজকের বিশ্ব আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্মুক্ত। আমাদের চারপাশে এখন শুধু প্রথাগত চাকুরী নেই। বরং ছড়িয়ে আছে ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স, ডিজিটাল মার্কেটিং কিংবা ইনোভেটিভ স্টার্টআপের মতো অগণিত সুযোগ। এই ক্ষেত্রগুলোতে নামতে আপনার হয়তো লাখ লাখ টাকার পুঁজি লাগবে না। কিন্তু যা লাগবে তা হ’ল আত্মবিশ্বাস, দক্ষতা, পরিশ্রম ও আল্লাহর ওপর অবিচল ভরসা। সঠিক কারিগরি জ্ঞান আর দক্ষতা অর্জন করে একজন মুসলিম যুবক ঘরে বসেই পুরো বিশ্বের শ্রমবাজারে নিজের স্থান করে নিতে পারে। এটি কেবল উপার্জনের মাধ্যম নয়। বরং বিশ্বমঞ্চে মুসলিম উম্মাহর মেধার স্বাক্ষর রাখার এক সুবর্ণ সুযোগ।

ব্যবসায় সততা বজায় রাখুন : পৃথিবীর ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া সহজ। কিন্তু সততার মশাল হাতে নিয়ে একা দাঁড়িয়ে থাকা অসীম সাহসের কাজ। আপনি মহাবিশ্বের বিচারকের কাছে আপনার সততার পরীক্ষা দিন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,التَّاجِرُ الصَّدُوقُ الأَمِينُ مَعَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ ‘সৎ ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী ক্বিয়ামতের দিন নবী, ছিদ্দীক ও শহীদদের সাথে থাকবে’।[3]

এই একটি বাক্যই কি যথেষ্ট নয় আপনার ক্লান্তিকে মুছে দিতে? আপনি কেবল একজন কর্মী বা উদ্যোক্তা নন; আপনি জান্নাতের সেই উচ্চাসনের একজন পদপ্রার্থী। আপনার প্রতিটি ঘাম, প্রতিটি নির্ঘুম রাত আর প্রতিটি সততার সিদ্ধান্ত আপনাকে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানুষদের কাতারে নিয়ে যাচ্ছে।

আপনার সততাই আপনার উত্তরাধিকার : মানুষ আপনাকে মনে রাখবে আপনার ব্যাংক ব্যালেন্সের জন্য নয়। বরং আপনার সততা ও উদারতার জন্য। যেদিন আপনি থাকবেন না, সেদিন আপনার রেখে যাওয়া ‘সততার দৃষ্টান্ত’ আপনার সন্তানদের জন্য সবচেয়ে বড় ঢাল হয়ে কাজ করবে। মনে রাখবেন, সৎ মানুষের রিযিকের যিম্মাদার স্বয়ং আল্লাহ।

আপনার কাজকে ইবাদত বানিয়ে নিন। যখন কি-বোর্ডে আঙ্গুল চলে কিংবা যখন কোনো ডিল ফাইনাল হয়, তখন মনে মনে বলুন, ‘হে আল্লাহ, এই কাজটি আমার কাছে আমানত, আমি তোমার সন্তুষ্টির জন্য এর পূর্ণ মর্যাদা রক্ষা করব’। বিশ্বাস করুন, এই ছোট একটি নিয়ত আপনার সাধারণ কাজটিও একটি ইবাদতে পরিণত হবে।

হেরে গিয়েও জিতে যান : হয়তো সততা ধরে রাখতে গিয়ে আপনি কোনো বড় প্রজেক্ট হারিয়েছেন। হয়তো আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে আপনার চেয়ে অনেক উঁচুতে উঠে গেছে। হয়তো আপনি চাকুরী হারিয়েছেন। হতাশ হবেন না! আপনি যা হারিয়েছেন, পরকালে জান্নাতের তুলনায় তা কেবল অতি সামান্যই। কিন্তু আপনি যা অর্জন করেছেন তা হ’ল আল্লাহর সন্তুষ্টি। আর এই সন্তুষ্টির ফলেই পরকালে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে চির শান্তির জান্নাত।

মনে রাখবেন, সূর্যের তেজ দিনের বেলা প্রখর হলেও রাতের বেলা চাঁদের স্নিগ্ধতাই মানুষকে শান্তি দেয়। আপনার সততা সেই স্নিগ্ধ আলো, যা এই অন্ধকার পৃথিবীতে মানুষের ভরসার শেষ আশ্রয়স্থল। স্বপ্ন দেখুন এমন এক জীবনের, যেখানে আপনার উপার্জনের প্রতিটি কণা হবে পবিত্র।

উপসংহার : আমার প্রিয় সংগ্রামী মুসলিম ভাই ও বন্ধুগণ! বেকারত্ব একটি চ্যালেঞ্জ হ’তে পারে। কিন্তু এটি কখনো আপনার জীবনের চূড়ান্ত পরিণতি নয়। আমাদের সামনে আছে ইসলামের শাশ্বত অর্থনৈতিক নীতিমালা। আর পেছনে রয়েছে ছাহাবীদের গৌরবময় ইতিহাস। সুতরাং আর কতদিন সোনার হরিণ নামক চাকুরীর পেছনে ছুটে নিজের সোনালী সময়গুলোকে নষ্ট করবেন? এখনই সময় নিজের ভেতরের সুপ্ত সিংহকে জাগিয়ে তোলার। নিজের দক্ষতাকে শানিত করুন, নতুন কিছু শিখুন। পরমুখাপেক্ষী না হয়ে ছোট থেকেই নিজের হালাল উদ্যোগ শুরু করুন।

আপনার পরিশ্রম আর আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা যখন এক হবে, তখন ইনশাআল্লাহ রিযিকের এমন সব বদ্ধ দুয়ার খুলে যাবে। যা আপনি কল্পনাও করতে পারেননি। আপনি তখন শুধু নিজের অভাবই দূর করবেন না। বরং আপনার মাধ্যমে আরও দশজন ভাই কাজের সুযোগ পাবে। উম্মাহর অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। আসুন, অলসতা আর হতাশার শিকল ভেঙ্গে আমরা গড়ে তুলি এক সমৃদ্ধ, কর্মঠ এবং আত্মনির্ভরশীল মুসলিম সমাজ। আমাদের শ্রম হবে দুনিয়ার কল্যাণে। আর আমাদের লক্ষ্য হবে আখেরাতের সাফল্য। আল্লাহ আমাদের এই কঠিন পথচলাকে সহজ করুন এবং আমাদের প্রচেষ্টায় বরকত দান করুন।-আমীন!

-মাহফূয আলম

[সাধারণ সম্পাদক, পবা উপযেলা, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ]


[1]. ইমাম গাযালী, ইহইয়াউ উলূমুদ্দীন ২/৬২ পৃ.।

[2]. বুখারী হা/৩৭৮০-৮১।

[3]. তিরমিযী হা/১২০৯; ছহীহুত তারগীব হা/১৭৮২।



বিষয়সমূহ: বিবিধ
আরও