আল্লাহর সান্নিধ্যে হৃদয়ের প্রশান্তি

রাকীবুল ইসলাম 5 বার পঠিত

ভূমিকা : আমরা প্রতিনিয়ত জাগতিক সাফল্যের পিছনে ছুটছি। প্রযুক্তির উৎকর্ষ আর বস্ত্তগত প্রাচুর্যের মাঝেও এক চরম অস্থিরতা ও মানসিক অবসাদ আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। এই কৃত্রিম কোলাহলের ভিড়ে মানুষ তার রব থেকে যত দূরে সরে যাচ্ছে, তার হৃদয়ে ততই এক ভয়াবহ একাকিত্ব ও শূন্যতা দানা বাঁধছে। ফলে সমস্ত প্রাপ্তির ভিড়েও প্রকৃত প্রশান্তি অধরাই থেকে যাচ্ছে। অথচ প্রকৃত প্রশান্তি কোনো নশ্বর অর্জনে নয়, বরং তা নিহিত রয়েছে মহান আল্লাহর নিবিড় সান্নিধ্যে। যখন একজন মানুষ তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে আল্লাহকে স্থাপন করতে পারে, তখন বর্তমান সময়ের প্রতিটি কঠিন পরীক্ষা তার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘উপহার’ এবং প্রতিটি সাময়িক বিপদ অমূল্য ‘পুরস্কারে’ পরিণত হয়। এই বোধ তাকে এমন এক স্বর্গীয় জীবনের স্বাদ দেয়, যেখানে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো কিছুতেই তার আত্মা তৃপ্ত হয় না। আলোচ্য প্রবন্ধে হৃদয়ের প্রকৃত প্রশান্তি লাভে আল্লাহর সান্নিধ্যের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ!

আমাদের ভেতরের লুকানো শত্রু : মানুষের নফসের ভেতর লুকিয়ে আছে ইবলীসের মতো অহংকার, কাবিলের মতো হিংসা, আদ জাতির মতো অবাধ্যতা এবং সামুদ জাতির মতো সীমালংঘন। আমাদের ভেতরেই রয়েছে নমরুদের মতো দুঃসাহস, ফেরাউনের মতো ঔদ্ধত্য, কারুনের মতো বিদ্রোহ এবং আবু জাহেলের মতো জ্ঞানপাপশুধু তাই নয়, মানুষের স্বভাবের মধ্যে ইতর প্রাণীর স্বভাবও ফুটে ওঠে। যেমন, কাকের মতো লোভ, কুকুরের মতো লালসা, গুবরে পোকার মতো নীচতা, গুই সাপের মতো অবাধ্যতা, উটের মতো প্রতিহিংসা এবং সিংহের মতো হিংস্রতা। কখনো ইঁদুরের মতো পাপাচার, সাপের মতো বিষাক্ততা, বানরের মতো চপলতা, পিঁপড়ার মতো সঞ্চয়ী হওয়ার মোহ কিংবা শিয়ালের মতো ধূর্ততা আমাদের গ্রাস করে। এ কারণেই আল্লাহ তা‘আলা মানুষের (স্বভাবজাত) বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন যে, সে বড়ই যালেম ও অকৃতজ্ঞ (ইব্রাহীম ১৪/৩৭), অজ্ঞ (আহযাব ৩৩/৭২), ভীরু, কৃপণ (মা‘আরিজ ৭০/১৯, ২১), পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট (আ‘রাফ ৭/১৭৯) ইত্যাদি।

তবে নিরাশ হওয়ার কিছু নেই! আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা এবং এই আত্মিক ব্যাধি ও অপবিত্রতাগুলো দূর করার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার মধ্যে মুক্তি নিহিত রয়েছে। যখন কোনো বান্দা এই মন্দ স্বভাবগুলো থেকে নিজেকে মুক্ত করার সংকল্প করে, তখন থেকেই আল্লাহর রহমতে এই অন্ধকারগুলো দূর হ’তে থাকে এবং হৃদয়ে নূরের আভা ফুটে ওঠে।

বিষাক্ত হৃদয়ের উপমা : মন্দ স্বভাবে পরিপূর্ণ হৃদয়ের উদাহরণ হ’ল পুঁজে ঠাসা একটি বিষফোঁড়াশরীরের বিষফোঁড়া যেমন ভেতর থেকে পুঁজ বের না করা পর্যন্ত আপনাকে অবিরাম যন্ত্রণা দেয় এবং রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। তেমনি অন্তরের ব্যাধিগুলো যেমন হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার, মুনাফেকি এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর প্রতি আসক্তি ও অন্য কারো কাছে প্রত্যাশা রাখা আপনাকে ততক্ষণ পর্যন্ত দহন ও অস্থিরতার মাঝে রাখবে, যতক্ষণ না আপনি এগুলোকে অন্তর থেকে উপড়ে ফেলছেন। তাই দেরি না করে এখনই এই জঞ্জালগুলো অন্তর থেকে দূর করতে সচেষ্ট হোন তবেই আপনি আস্বাদন করতে পারবেন ঈমানের প্রকৃত স্বাদ, হৃদয়ের অনাবিল আনন্দ, মনের প্রশান্তি এবং এক পবিত্র ও সুন্দর জীবনের মাধুর্য। যে ব্যক্তি হৃদয়ে এই ব্যাধিগুলো বহন করে বেড়ায়, তার চেয়ে সংকীর্ণ ও কষ্টে ভরা জীবন আর কারো নয়।

হৃদয়ে প্রশান্তির পথ : যিনি চান আল্লাহ তা‘আলা তাঁর হৃদয়কে প্রশান্তি দিয়ে পরিপূর্ণ করে দিন, তাঁর প্রথম কাজ হ’ল অন্তর থেকে সেই সব ব্যাধি দূর করা যা আল্লাহর সান্নিধ্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। মনে রাখবেন, যতক্ষণ পর্যন্ত হৃদয়ের ভেতর থেকে মন্দ স্বভাবগুলো দূর করা না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত হৃদয়ের পবিত্রতা অর্জন করা সম্ভব নয়। একারণে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রিয় বন্ধু ইব্রাহীম (আঃ)-এর হৃদয়ের নিষ্কলুষতার প্রশংসা করেছেনপবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, وَإِنَّ مِنْ شِيعَتِهِ لَإِبْرَاهِيمَ- إِذْ جَاءَ رَبَّهُ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ- ‘আর নিশ্চয়ই নূহের দ্বীনভুক্ত ছিল ইব্রাহীম’‘যখন সে তার প্রতিপালকের নিকট উপস্থিত হয়েছিল বিশুদ্ধ চিত্তে’ (ছফফাত ৩৭/৮৩-৮৪)এছাড়াও ইব্রাহীম (আঃ)-এর সেই বিখ্যাত দো‘আও আল্লাহ কুরআনে তুলে ধরেছেন,يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ- إِلَّا مَنْ أَتَى اللهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ- ‘যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোন কাজে আসবে না’‘কেবল যে ব্যক্তি বিশুদ্ধ চিত্তে আল্লাহর নিকটে আসবে, সে ব্যতীত’ (শো‘আরা ২৬/৮৮-৮৯)

আল্লাহর সান্নিধ্যের ধাপ সমূহ :  যেকোনো পাত্রে মূল্যবান কিছু রাখার পূর্বে পাত্রটি ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করতে হয় তেমনি হৃদয়ে আল্লাহর ভালোবাসা স্থাপনের আগে অন্তর থেকে ব্যাধিগুলো দূর করতে হয়অন্তর পরিষ্কার করার পর তাকে সুসজ্জিত করতে হয় তাঁর আনুগত্য দিয়ে। আল্লাহর সাথে সখ্যতা গড়ার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হ’ল তাঁকে সব সময় স্মরণে রাখা। মানুষ যখন সৃষ্টির মোহ ত্যাগ করে স্রষ্টার দিকে মনোনিবেশ করে, তখনই সে আল্লাহর সান্নিধ্য অনুভব করে। তাই মুমিনের কাছে সবচেয়ে প্রিয় মুহূর্ত হয় সেটি, যখন সে তার রবের সামনে সিজদাবনত থাকে। সেকারণ আল্লাহর সাথে নিবিড় সখ্যতা বা আত্মিক প্রশান্তি কোনো আকস্মিক বিষয় নয় এটি একটি চিরন্তর সফরের ফসল। এই সফরের বিভিন্ন ধাপ রয়েছে। সেগুলি নিম্নে তুলে ধরা হ’ল।

প্রথম ধাপ : আত্মশুদ্ধিতা

অন্তরের কঠিন ব্যাধি ও অপবিত্রতাগুলো দূর করার জন্য নিরন্তর সাধনা করলে অবশ্যই মুক্তি সম্ভব। এই প্রচেষ্টাই হৃদয়ের বিষাক্ত ক্ষতগুলো মুছে দেয়। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি নিজের স্বভাবের কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং নফসের সংশোধনে উদাসীন থাকে, তার আত্মা কলুষিত হয়ে যায়সাথে সাথে সে যাবতীয় অকল্যাণের আধার হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়াও অন্তরের পরিচর্যায় অবহেলার কারণে সে বড় হওয়ার সাথে সাথে হৃদয়ের কোনো না কোনো মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়বে, যা পরবর্তীতে তার আচার-ব্যবহার ও কর্মকান্ডে তা প্রকটভাবে ফুটে উঠবে।

আত্মশুদ্ধির জন্য জ্ঞান : কারো ইলম বা জ্ঞানের গভীরতা অনেক বেশি হওয়া কিংবা বড় আলেম হিসাবে গণ্য হওয়ার অর্থ এই নয় যে, তিনি অন্তরের রোগ থেকে মুক্ত। অনেক সময় দেখা যায় একজন ইলম অন্বেষণকারী, একজন জগৎবিখ্যাত আলেম কিংবা বড় কোনো দাঈর মধ্যেও লুকিয়ে আছে সুখ্যাতির মোহ, আত্মমুগ্ধতা, প্রবৃত্তির অনুসরণ কিংবা অন্যকে তুচ্ছজ্ঞান করার মতো ব্যাধি। অনেক সময় তাদের মাঝে প্রকাশ পায় প্রচন্ড ক্রোধ কিংবা সাধারণ মানুষের প্রতি রূঢ়তা এমনকি গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ না করার মতো সংকীর্ণতাও

যারা পরকালের যাত্রী এবং হৃদয়ের পবিত্রতা অন্বেষণকারী, তারা সর্বদা নিজেদের অন্তরের গহীনে অনুসন্ধান চালান এবং প্রতিমুহূর্তে নিজেদের কাজের চুলচেরা হিসাব গ্রহণ করেন। তাই সর্বাবস্থায় আপনি আপনার হৃদয়ের সংশোধনে সচেষ্ট হোন। একে কেবল সাময়িকভাবে দমিয়ে রাখা কিংবা পরিবেশ থেকে আড়ালে রাখাই যথেষ্ট নয় বরং এদের মূল উৎপাটন করতে হবে এবং নিজের ওপর জয়ী হ’তে হবে।

আত্মশুদ্ধির বাধা নিরুপণ করা : নিজের প্রতি শুভাকাংখী প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য হ’ল ঈমান ও দৃঢ় বিশ্বাস হৃদয়ে প্রবেশের পথে যে পর্দা বা অন্তরায়গুলো বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলো খুঁজে বের করা। কেননা নবী করীম (ছাঃ) নির্দেশ দিয়েছেন যে, কারো যদি প্রস্রাব বা পায়খানার বেগ থাকে, তবে সে যেন ছালাত দাঁড়ানোর আগেই তা সেরে নেয়। এমনকি খাবারের উপস্থিতিতে যদি ছালাত শুরুও হয়ে যায়, তবুও তিনি আগে খাবার শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন[1]

এসব সতর্কতার মূল উদ্দেশ্য একটাই। তাহ’ল ছালাতের সময় যেন মুমিনের অন্তর সম্পূর্ণ একাগ্র থাকে এবং কোনো পার্থিব দুশ্চিন্তা বা শারীরিক অস্বস্তি যেন তাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিচ্যুত করতে না পারে।

শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) এক চমৎকার উপমা দিয়ে বলেছেন, রহমতের ফেরেশতারা এমন ঘরে প্রবেশ করে না, যেখানে কুকুর বা ছবি থাকে ঠিক তেমনি মহান আল্লাহর পরিচয়, তাঁর প্রতি ভালোবাসা, তাঁর যিকিরের মিষ্টতা এবং তাঁর সান্নিধ্যের প্রশান্তি সেই হৃদয়ে কীভাবে প্রবেশ করবে, যা লালসার কামনারূপী কুকুর এবং হাযারো দুনিয়াবি ছবিতে ভরপুর হয়ে আছে?[2]

সামান্য কিছু জাগতিক প্রয়োজন যদি আল্লাহর সাথে কথোপকথনের মাধুর্য, খুশু-খুযু এবং মানসিক প্রশান্তি কেড়ে নেয়, তবে আমরা কীভাবে আশা করি যে আমাদের হৃদয় আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করবেযখন সেই হৃদয় হিংসা, বিদ্বেষ, সম্পর্কচ্ছেদ, আত্মমুগ্ধতা, অহংকার আর প্রবৃত্তির লালসায় ঠাসা হয়ে আছে? চোখে দেখা যায় এমন কোনো ছবি বা প্রতিকৃতি তো আমরা হাত দিয়ে সরিয়ে দিতে বা মুছে ফেলতে পারি কিন্তু আমাদের উচিত তার চেয়েও দ্রুতবেগে হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা হিংসা, বিদ্বেষ, আত্মঅহংকার, আর যশের আকাংখারূপী ব্যাধিগুলো নিরাময়ে সচেষ্ট হওয়া। তবেই আসবে আল্লাহর সান্নিধ্যে হৃদয়ের প্রশান্তি।

এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে শিক্ষা : ভাবুন তো, ওহোদ যুদ্ধের দিন মাত্র একটি বা দু’টি ভুলের কারণে মহান আল্লাহ শ্রেষ্ঠতম দল ছাহাবায়ে কেরামকে সাময়িক পরাজয়ের স্বাদ আস্বাদন করিয়েছিলেন! পবিত্র কুরআনে সেই দৃশ্যপটের বর্ণনায় আল্লাহ বলেছেন, أَوَلَمَّا أَصَابَتْكُمْ مُصِيبَةٌ قَدْ أَصَبْتُمْ مِثْلَيْهَا قُلْتُمْ أَنَّى هَذَا قُلْ هُوَ مِنْ عِنْدِ أَنْفُسِكُمْ، ‘যদি (ওহোদের দিন) তোমাদের উপর বিপদ এসে থাকে, তবে তোমরাও (বদরের দিন তাদের উপর) দ্বিগুণ বিপদ চাপিয়েছিলে। তোমরা বললে, কোত্থেকে এ বিপদ এলো? তুমি বল, এটা তোমাদের পক্ষ থেকেই এসেছে (তীরন্দাযদের অবাধ্যতার কারণে) (আলে ইমরান ৩/১৬৫)

ছাহাবাদের সাথে স্বয়ং বিশ্বনবী (ছাঃ) থাকা সত্ত্বেও নিজেদের ভুলের কারণে যদি এমনটা হয়। তবে আমাদের অবস্থা কী? সুতরাং আমাদের অবশ্যই জয়ী হ’তে হবে আমাদের ভেতরে থাকা দৃশ্যমান ও অদৃশ্য লালসার বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে। আমাদের জয়ী হ’তে হবে সেই শয়তানদের বিরুদ্ধে, যারা আমাদের বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট করার শপথ নিয়েছে। তাদের নেতা ইবলীস তো দম্ভভরে বলেই দিয়েছে,فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ- আপনার ইয্যতের কসম! আমি অবশ্যই তাদের সবাইকে বিপথগামী করব’ (ছোয়াদ ৩৮/৮২)

সুস্থ হৃদয়ের পথে : একটি সুস্থ ও পবিত্র অন্তর তথা ‘কালবে সালিম’ হ’ল মুমিনের সেই অমূল্য আধ্যাত্মিক সম্পদ, যা জান্নাতের পথে যাত্রার একমাত্র পাথেয়। আমাদের দেহ যদি একটি বাহন হয়, তবে অন্তর হ’ল তার ‘ইঞ্জিন’ আর ইঞ্জিন বিকল থাকলে দামি বডি যেমন গাড়িকে গন্তব্যে নিতে পারে না তেমনি কলুষিত হৃদয় নিয়ে জান্নাতের পথে হাঁটা অসম্ভব। শরীরের অসুস্থতায় আমরা ডাক্তারের কাছে ছুটলেও মনের বিষাক্ত ব্যাধিগুলোকে অবহেলা করি অথচ লোহায় মরিচা পড়লে যেমন পালিশ লাগে। তেমনি হৃদয়ে পাপের মরিচা পড়লেও তা ধুয়ে ফেলা যরূরী। তাই হৃদয়ের গহীনে জমে থাকা ধ্বংসাত্মক বিষগুলো খুঁজে বের করা ও তা ধুয়ে পরিষ্কার যরূরী। নিম্নে হৃদয়কে নষ্ট করার ৮টি ব্যাধি উল্লেখ করা হ’ল। যেখান থেকে আমাদের বেঁচে থাকা আবশ্যক।-

(১) শিরক : শিরক হ’ল ভালোবাসা, আশা, ভয়, ভরসা, ভীতি বা আকাংখার ক্ষেত্রে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো কিছুর সাথে হৃদয়ের টান বা আসক্তি তৈরি হওয়া। বান্দা যখনই আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো দিকে মুখ ফেরায় বা অন্য কারো ওপর ভরসা করে, অমনি সেই পরনির্ভরশীলতা তার হৃদয়ের একটি অংশ দখল করে নেয়। ফলে তার অন্তর দুর্বল হয়ে যায় সেখানে ভীরুতা বাসা বাঁধে এবং তার মানসিক শক্তি ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে। এজন্য শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন, যখন হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি এই নিখাদ ভালোবাসা জন্মে, তখন আল্লাহ ছাড়া অন্য সবার ভালোবাসা অন্তর থেকে মুছে যায়। আল্লাহর প্রতি আশা তৈরি হলে অন্য সবার প্রতি আশা দূর হয়ে যায়। যখন কোনো কিছু চাওয়ার ক্ষেত্রে কেবল আল্লাহর ওপর নির্ভর করা হয়, তখন অন্যের কাছে হাত পাতার হীনম্মন্যতা দূর হয়যখন সকল কাজ কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়, তখন অন্যকে দেখানোর প্রবৃত্তি বিলীন হয়। আর যখন সাহায্য চাওয়ার ক্ষেত্রে কেবল তাঁরই শরণাপন্ন হওয়া হয়, তখন অন্য কোনো শক্তির মুখাপেক্ষিতা আর থাকে না’[3]

ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) আরও বলেছেন, জেনে রাখুন, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ‘-এর তেজস্ক্রিয় রশ্মি গুনাহের কুয়াশা ও মেঘমালাকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। এই রশ্মি কতটা শক্তিশালী বা দুর্বল হবে, তা নির্ভর করে ব্যক্তির ঈমানের গভীরতার ওপর। এই কালেমার একটি নিজস্ব নূর রয়েছে আর মানুষের অন্তরে এই নূরের তীব্রতা কতটা কম-বেশি হবে, তা মহান আল্লাহ ছাড়া আর কেউ গণনা করতে পারবে না’[4]

(২) বিদ্বেষ : বিদ্বেষ হ’ল দুনিয়াবী কোনো শত্রুতা বা মনোমালিন্যের কারণে অন্য কোনো মুসলিমের প্রতি অন্তরে ঘৃণা পোষণ করা। আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতের অন্যতম নে’মত হিসাবে ঘোষণা করেছেন, তিনি জান্নাতবাসীদের অন্তর থেকে যাবতীয় বিদ্বেষ ও মলিনতা দূর করে দিবেনকারণ, অন্তরের এই ঘৃণা মানুষের জীবনে কেবল অশান্তি, দুশ্চিন্তা আর অস্থিরতা বয়ে আনে যা এক প্রকার ভয়াবহ আযাব। যার হৃদয়ে বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসা জমা থাকে, সে এক নিরন্তর যন্ত্রণার মাঝে বসবাস করে সে কখনো প্রকৃত সুখ এবং ঈমানের মিষ্টতা আস্বাদন করতে পারে না।

ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেছেন, যিনি আল্লাহর সৃষ্টির সেরা এবং তাঁর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত সেই রাসূল কখনো নিজের ব্যক্তিগত কারণে কারো ওপর প্রতিশোধ নেননি। অথচ তাঁকে কষ্ট দেওয়া মানে স্বয়ং আল্লাহকে কষ্ট দেওয়া। তাঁর সাথে দ্বীনের স্বার্থ জড়িত ছিল এবং তাঁর পবিত্র আত্মা ছিল জগতের সকল অপবিত্রতা থেকে মুক্ত ও সকল সুন্দর চরিত্রের আধার। এত উচ্চ মর্যাদা থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজের নফসের জন্য কোনো প্রতিশোধ নিতেন না। তাহ’লে আমাদের মতো মানুষ যারা নিজেদের ভেতরের মন্দ স্বভাব ও ত্রুটিগুলো সম্পর্কে ভালো করেই অবগত তারা কীভাবে নিজের (অহংকারের) জন্য প্রতিশোধ নেওয়ার চিন্তা করতে পারে? বরং একজন প্রকৃত আল্লাহ ওয়ালা মানুষের কাছে তার নিজের অহংকারের বা নফস এতটুকু মূল্যও রাখে না যে, তার জন্য তাকে প্রতিশোধ নিতে হবে’[5]

ক্ষমার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেন ইউসুফ (আঃ)। আপন ভাইয়েরা তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে কূপে নিক্ষেপ করেছিল। দীর্ঘ চল্লিশ বছর মতান্তরে তাঁকে বাবা ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছিল। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি দাসত্বের গ্লানি, জেলখানার অন্ধকার আর চরম অবিচার সহ্য করেছেন। কিন্তু যখন আল্লাহ তাঁর মর্যাদা বাড়িয়ে দিলেন এবং তিনি মিশরের অধিপতি হলেন, তখন ভাইয়েরা নিজেদের ভুল স্বীকার করে বলল, আল্লাহর কসম! আল্লাহ তোমাকে আমাদের ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন, আর আমরা নিশ্চয়ই অপরাধী ছিলাম। উত্তরে ইউসুফ (আ.) কী বলেছিলেন? তিনি কি তাঁদের পুরনো কষ্টের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলেন? না! আল্লাহ বললেন, قَالَ لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللهُ لَكُمْ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ- ইউসুফ বলল, আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। আর তিনিই শ্রেষ্ঠ দয়ালু। (ইউসুফ ১২/৯২)

তিনি তাঁদের অতীত মনে করিয়ে দেননি, এমনকি সামান্য তিরস্কারও করেননি; বরং তাঁদের ক্ষমা করে দিয়ে তাঁদের জন্য দোআ করেছিলেন।

অনুরূপ এক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ)-এর জীবনে। পবিত্র কুরআনের একটি মাসআলা নিয়ে খলীফা মামূন, মুতাসিম এবং ওয়াসিকের আমলে তিনি চরম পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন। দীর্ঘ ২৮ মাস তাঁকে কারারুদ্ধ রাখা হয়েছিল। তাঁকে ত্রিশটিরও বেশি দোররা মারা হয়েছিল যা ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ ও নির্মম। চাবুকের আঘাতে তিনি বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন। কিন্তু এত নির্যাতনের পরও তিনি বিদআতীরা ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী প্রতিটি মানুষকে মন থেকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। এই ক্ষমার পেছনে তাঁর প্রেরণা ছিল আল্লাহর এই বাণী,...وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا أَلَا تُحِبُّونَ أَنْ يَغْفِرَ اللهُ لَكُمْ وَاللهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ- ‘তারা যেন তাদের মার্জনা করে ও দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করেন? বস্ত্তত আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াবান’ (নূর ২৪/২২)তিনি বলতেন, তোমার এক মুসলিম ভাইকে তোমার কারণে শাস্তি দিয়ে তোমার কী লাভ হবে? তিনি আরও আওড়াতেন, فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللهِ ‘যে ক্ষমা করে ও আপস করে, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে’ (শো‘আরা ২৬/৪০)[6]

একজন মুমিন কেন অনর্থক বিবাদ, বিদ্বেষ, পাল্টা জবাব আর অভিযোগের পেছনে নিজের মূল্যবান সময় নষ্ট করে অনেক বড় ক্ষতি ডেকে আনে। এসব নেতিবাচক চিন্তা তার অন্তর ও মনকে এমন কিছুতে ব্যস্ত রাখে, যা কেবল কষ্ট আর অশান্তিই বাড়ায়। কোনো বুদ্ধিমান মানুষ নিজের সাথে এমনটা করতে পারে না।

মুমিন দুনিয়াতে এসেছে নেক আমলের বীজ বপন করতে যাতে ক্বিয়ামতের দিন সে জান্নাতের ফসল ঘরে তুলতে পারে। যদি সে বিবাদ-বিদ্বেষে জড়িয়ে পড়ে, তবে তার সেই চাষাবাদ নষ্ট হয়ে যায়। একজন মুমিনের হাতে এই সব তুচ্ছ বিষয়ের জন্য মোটেও সময় নেই। সে তো পরকালের পথে এক অবিরাম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। আর প্রতিযোগিতার ময়দানে থাকা একজন দৌড়বিদ কখনোই তার দিকে ধেয়ে আসা গালিগালাজ বা উপহাসের দিকে তাকিয়ে সময় নষ্ট করে না বরং সে তার গন্তব্যের দিকেই দৌড়াতে থাকে যেন পিছিয়ে না পড়ে। সে যদি তাদের দিকে তাকাতে যায়, তবে সে নিশ্চিতভাবেই বিজয়ীদের তালিকা থেকে ছিটকে পড়বে।

ইবনুল আরাবী (রহঃ) একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন, বিখ্যাত আলেম ও বুযুর্গ শায়েখ আবু মুহাম্মাদ ইবনু আবি যাইদ-এর স্ত্রী ছিলেন অত্যন্ত দুর্ব্যবহারকারী। তিনি স্বামীর হকের ব্যাপারে ত্রুটি করতেন এবং কথা দিয়ে তাঁকে কষ্ট দিতেন। মানুষ যখন শায়খকে এই ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করত কেন তিনি ধৈর্য ধরে আছেন? তখন তিনি বলতেন, আমি এমন একজন মানুষ, যাকে আল্লাহ শরীরিক সুস্থতা, জ্ঞান এবং ধন-সম্পদ দিয়ে ধন্য করেছেন। হ’তে পারে আমার কোন গুনাহের শাস্তি হিসাবে আল্লাহ এই স্ত্রীকে পাঠিয়েছেন। আমি ভয় পাই, যদি আজ আমি তাকে তালাক দিয়ে দেই, তবে হয়তো এর চেয়েও কঠিন কোন বিপদ আমার ওপর নেমে আসবে’[7]

সহনশীলতা, রাগ নিয়ন্ত্রণ বা ক্ষমা করার অর্থ এই নয় যে, আপনি যালেমের অন্যায় প্রতিরোধে আইনী বা শারঈ কোনো পদক্ষেপ নিবেন না। অন্যায়কারীর হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার অধিকার আপনার অবশ্যই আছে। তবে সেই পদক্ষেপ নেওয়ার সময় নিজের ‘অহংবোধ’ মেটানোর জন্য গালিগালাজ, চেঁচামেচি বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসায় লিপ্ত হওয়া যাবে না। বরং আপনার উদ্দেশ্য হ’তে হবে কেবল যুলুম প্রতিহত করা এবং মানুষের ক্ষতি থেকে সেই যালেমকে বিরত রাখা।

(৩) হিংসা : হিংসা হ’ল এমন একজন মুসলিমের ওপর অর্পিত নে’মত বিলুপ্ত হওয়ার আকাংখা করা, যে নে’মতটি সে বৈধ কাজে ব্যবহার করছে। শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেছেন, হিংসার মধ্যে দু’টি বিষয় লুকিয়ে থাকে, কৃপণতা এবং যুলুম। এটি কৃপণতা কারণ, অন্যকে দেওয়া আল্লাহর দানে সে কার্পণ্য বোধ করে আর এটি যুলুম। কারণ সে সেই নে’মতটি অন্যের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়ার আকাংখা করে’[8]

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ইরশাদ করেছেন,لا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ- ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হ’তে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করবে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।[9]অর্থাৎ পূর্ণ ঈমানদার সেই ব্যক্তি যে মানুষের সাথে লেনদেনের ক্ষেত্রে তাদের কল্যাণকামী হয়। সে অন্যের জন্য তা-ই চায় যা নিজের জন্য চায় এবং অন্যের জন্য তা-ই অপসন্দ করে যা নিজের জন্য অপসন্দ করে। এমনকি এই গুণের মধ্যে অন্যকে নিজের ওপর প্রাধান্য দেওয়ারও শামিল। কারণ প্রতিটি মানুষই চায় অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হ’তে কিন্তু যখন সে নিজের ভাইয়ের জন্য তা-ই পসন্দ করে যা সে নিজের জন্য চায়, তখন সে প্রকৃতপক্ষে এটাই পসন্দ করল যে, তার ভাইও তার মতো বা তার চেয়েও শ্রেষ্ঠ হোক।

তবে যেকোনো দাবির জন্য প্রমাণের প্রয়োজন হয়। আপনি যে মানুষের জন্য সত্যিই মঙ্গল কামনা করেন তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হ’ল কেউ প্রশংসনীয় কোনো কাজ করলে আপনি তার প্রশংসা করবেন তাকে ধন্যবাদ জানাবেন এবং বিভিন্ন মজলিসে তার কাজের কথা তুলে ধরবেন। অন্য কেউ তার গুণগান বা প্রশংসা করলে তা শুনতে আপনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন। এমনকি আপনার ছাত্র, সহকর্মী বা বন্ধুরা যেন আপনার মতো বা আপনার চেয়েও ভালো অবস্থানে পৌঁছাতে পারে, সেজন্য আপনি সব ধরনের সহযোগিতা করবেন তাদের উৎকর্ষ, সফলতা ও উন্নতির কোনো পথ বা কৌশলই আপনি তাদের কাছে গোপন করবেন না। এছাড়া আপনি দ্বীনি বা দুনিয়াবি কোনো কল্যাণ লাভ করলে তা কীভাবে অর্জন করেছেন, তার পথ ও পদ্ধতিগুলো অন্যদেরও জানিয়ে দেওয়ার ব্যাকুলতা অনুভব করবেন যাতে তারা আপনার মতো বা আপনার চেয়েও উত্তম কিছু অর্জন করতে পারে।


[1] . মুসলিম হা/৫৬০; রাবী আয়েশা (রাঃ)।

[2]. মাদারিজুস সালিকীন ৩/২৫০ পৃ.।

[3]. মাজমু‘উল ফাতাওয়া ১১/৫২৪ পৃ.।

[4]. মাদারিজুস সালেহীন ১/৩৪১ পৃ.।

[5]. ইবনু তায়মিয়াহ. মাজেউল মাসায়েল ১/১৪৭১পৃ.।

[6]. আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ ১১/৪৫-৪৭ পৃ.

[7]. ইবনুল আরাবী, আহকামুল কুরআন ১/৪৬৯ পৃ.

[8]. মাজমু‘উল ফাতাওয়া ২৮/১৪৪ পৃ.।

[9]. বুখারী হা/১৩; মুসলিম হা/৪৫; রাবী আনাস বিন মালেক (রাঃ)



আরও