আবুবকর ছিদ্দীক (রাঃ)-এর জীবনকর্ম ও খিলাফতকাল
শরীফ হোসাইন
শরীফ হোসাইন 5 বার পঠিত
বংশপরিচয় : তিনি হলেন আব্দুল্লাহ বিন ওছমান। বংশপরম্পরায় তিনি নবী করীম (ছাঃ)-এর সাথে ষষ্ঠ পুরুষে মিলিত হয়েছেন। তাঁর কুনিয়াত বা উপনাম হ’ল আবুবকর। ওছমান হ’ল তার পিতা আবু কুহাফার নাম। আবুবকরের মাতার নাম সালমা, তার কুনিয়াত উম্মুল খায়ের। তিনি ছিলেন সাখর বিন আমিরের কন্যা এবং আবুবকরের পিতার চাচাতো বোন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং হিজরতও করেছিলেন। আমুল ফিল তথা হস্তীবাহিনীর ঘটনা ও রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর জন্মের দুই বছর ছয় মাস পর মক্কায় আবুবকর জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই বেড়ে ওঠেন’।[1]
তার পেশা ও জীবিকা : আবুবকর (রাঃ) একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। ব্যবসার প্রয়োজনে তিনি সিরিয়া ও অন্যান্য দেশে সফর করতেন। আবার কখনো নিজ এলাকায় অবস্থান থাকতেন। ইসলাম গ্রহণের পরও তিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়া সফর করেছেন। তৎকালীন সময়ে কুরায়েশদের উপার্জনের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ মাধ্যম ছিল ব্যবসা। তাদের মধ্যে যারা শ্রেষ্ঠ সম্পদশালী ছিলেন, তারা মূলত ব্যবসায়ীই ছিলেন। আরবদের কাছে কুরায়েশরা ব্যবসায়ী হিসাবেই পরিচিত ছিল। যখন তিনি খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন, তখন তিনি নিজ পরিবারের ভরণপোষণের জন্য পুনরায় ব্যবসা শুরু করতে চাইলেন। কিন্তু মুসলমানরা তাকে এতে বাধা প্রদান করেন এবং বলেন, এটি আপনাকে মুসলমানদের রাষ্ট্রীয় ও জনকল্যাণমূলক কাজ থেকে বিমুখ করে ফেলবে। অতঃপর তারা তার জন্য প্রতিদিন দুই দিরহাম করে ভাতা নির্ধারণ করে দেন’।[2]
আবুবকর (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণ : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, আমি যখন বলেছিলাম হে লোকসকল! আমি তোমাদের সবার কাছে আল্লাহর রাসূল হিসাবে প্রেরিত হয়েছি, তখন তোমরা বলেছিলে, তুমি মিথ্যা বলছ, আর আবুবকর বলেছিল, আপনি সত্য বলেছেন’।[3] আবুবকর (রাঃ) কখনোই নবী করীমকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেননি। বরং যখন সকল মানুষ তাঁকে অস্বীকার করেছিল, তখন তিনি তাঁকে সত্যায়ন করেছিলেন। এটি স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয় যে, অন্যদের কাছে রিসালাতের দাওয়াত পৌঁছানোর আগেই তিনি নবী করীমকে বিশ্বাস করেছিলেন।
শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ বলেছেন, খাদীজা, আলী এবং যায়েদ (রাঃ) তারা ছিলেন নবী করীম (ছাঃ)-এর পরিবারের সদস্য এবং তাঁর ঘরেই থাকতেন। খাদীজার (রাঃ) কাছে যখন বিষয়টি পেশ করা হ’ল, অহি আসার সাথে সাথেই তিনি বিশ্বাস করেছিলেন। এমনকি নবী করীমকে রিসালাতের তাবলীগ বা প্রচারের নির্দেশ দেওয়ার আগেই। বস্ত্তত ঈমান তখন ওয়াজিব হয়, যখন রিসালাত বা দাওয়াত মানুষের কাছে পৌঁছায়। আলীর (রাঃ) ক্ষেত্রে সম্ভব যে, তিনি যখন খাদীজার মাধ্যমে বিষয়টি শুনেছিলেন, তখনই বিশ্বাস করেছিলেন। যদিও নবী করীম নিজে তখনও তাঁকে জানাননি। আমর ইবনু আবাসাহ (রাঃ)-এর হাদীছে নবী করীম (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এই পথে আপনার সাথে কে আছে? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, একজন স্বাধীন এবং একজন ক্রীতদাস (অর্থাৎ আবুবকর এবং বেলাল)’।[4]
ইসলাম-পূর্ব যুগে তার সামাজিক মর্যাদা : ইসলাম গ্রহণের পূর্বেও কুরায়েশ বংশে আবুবকর (রাঃ) অত্যন্ত সম্মানিত ও সবার কাছে প্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি মানুষের সাথে সহজেই মিশতে পারতেন এবং আরবের বংশলতিকা ও তাদের ঐতিহাসিক ঘটনাবলি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখতেন। তাঁর ব্যবসায়িক প্রজ্ঞা, অগাধ পান্ডিত্য এবং পরোপকারী স্বভাবের কারণে মানুষ তাঁর কাছে আসত।[5]
আয়েশা (রাঃ) বলেন, যখন মুসলিমরা চরম বিপদের সম্মুখীন হলেন, তখন আবুবকর (রাঃ) আবিসিনিয়ার (হাবশা) অভিমুখে হিজরতের উদ্দেশ্যে বের হলেন। যখন তিনি ‘বারকুল গিমাদ’ নামক স্থানে পৌঁছালেন, তখন আরবের অন্যতম নেতা এবং ‘কারাহ’ গোত্রের প্রধান ইবনুদ দাগিনাহ-র সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হ’ল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে আবুবকর, আপনি কোথায় যাচ্ছেন? তিনি উত্তরে বললেন, আমার কওম আমাকে বের করে দিয়েছে, তাই আমি পৃথিবীতে বিচরণ করতে চাই, যাতে স্বাধীনভাবে আমার রবের ইবাদত করতে পারি’।[6]
ইবনু দাগিনাহ তখন বলল, আপনার মতো লোক নিজে থেকেও বের হয় না, আর তাকে বের করে দেওয়াও যায় না। নিশ্চয়ই আপনি নিঃস্বকে সাহায্য করেন, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করেন, অসহায়ের বোঝা বহন করেন, মেহমানদারী করেন এবং বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ান। আমি আপনার আশ্রয়দাতা হিসাবে আছি। আপনি ফিরে যান এবং আপনার শহরেই আপনার রবের ইবাদত করুন’।[7] এরপর আবুবকর (রাঃ) ফিরে আসলেন এবং ইবনুদ দাগিনাহ তাঁর সাথে মক্কায় এসে কুরায়েশ নেতাদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে বলল, আবুবকরের মতো লোককে বের করে দেওয়া যায় না। তোমরা কি এমন একজনকে বের করে দিচ্ছো যে নিঃস্বকে সাহায্য করে এবং মেহমানদারী করে? কুরায়েশরা ইবনু দাগিনাহ-এর এই আশ্রয় মেনে নিল। তবে তারা শর্ত দিল যে, আবুবকর (রাঃ) যেন কেবল তাঁর ঘরের ভেতরেই ইবাদত করেন এবং প্রকাশ্যে তেলাওয়াত না করেন; কারণ তারা আশঙ্কা করছিল যে তাঁর তেলাওয়াত তাদের নারী ও সন্তানদের মুগ্ধ করে ফেলবে। আবুবকর (রাঃ) বেশ কিছুকাল এভাবেই কাটালেন’।[8]
কিন্তু কিছুদিন পর আবুবকর (রাঃ) তাঁর ঘরের আঙ্গিনায় একটি মসজিদ তৈরী করলেন। সেখানে তিনি নিয়মিত ছালাত পড়তে ও কুরআন তেলাওয়াত করতে লাগলেন। তখন মুশরিকদের নারী ও সন্তানরা তাঁর চারপাশে ভিড় জমাতে শুর করল। তারা তাঁর ইবাদতের দৃশ্য ও তেলাওয়াত শুনে চরম বিস্মিত হ’ত। আবুবকর (রাঃ) ছিলেন অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের মানুষ। কুরআন তেলাওয়াতকালে তিনি অশ্রু সংবরণ করতে পারতেন না। এতে কুরায়েশ নেতারা আতঙ্কিত হয়ে পুনরায় ইবনুদ দাগিনাহকে তলব করল। তারা বলল, আবুবকর শর্ত ভঙ্গ করেছেন। তিনি প্রকাশ্যে ছালাত ও তেলাওয়াত করছেন। হয় তাকে থামাও, নতুবা তোমার দেওয়া আশ্রয় ফিরিয়ে নাও। ইবনুদ দাগিনাহ আবুবকর (রাঃ)-কে এসে সব জানালে তিনি স্পষ্টভাবে উত্তর দিলেন, আমি তোমার দেওয়া আশ্রয় তোমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি এবং আমি কেবল আল্লাহর আশ্রয় ও নিরাপত্তাতেই সন্তষ্ট আছি’।[9]
‘ছিদ্দীক’ উপাধিতে ভূষিত হওয়া : অসংখ্য প্রমাণ এবং সর্বসাধারণের কাছে অতি পরিচিত ও অবিচ্ছিন্ন বর্ণনার মাধ্যমে আবুবকর (রাঃ)-এর এই উপাধিটি প্রতিষ্ঠিত। যা স্বয়ং নবী করীম (ছাঃ) তাঁকে এই বিশেষণে অভিহিত করেছেন। আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ওহোদ পাহাড়ে আরোহণ করলেন এবং তাঁর সাথে ছিলেন আবুবকর, ওমর ও ওছমান। পাহাড়টি তখন তাদের নিয়ে কাপতে শুরু করল। তখন নবী করীম (ছাঃ) বললেন, স্থির হও ওহোদ! কারণ তোমার ওপর একজন নবী, একজন ছিদ্দীক এবং দু’জন শহীদ অবস্থান করছেন’।[10] অপর হাদীছে তিনি আয়েশা (রাঃ)-কে ‘ছিদ্দীকের মেয়ে’ বলে অভিহিত করেছেন।[11]
উল্লেখ্য যে, ইসরা ও মি‘রাজের ঘটনার পর যখন মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা করছিল, তখন তিনি কোনো দ্বিধা ছাড়াই তা সত্যায়ন করেন। এই অটল বিশ্বাসের কারণেই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁকে ছিদ্দীক (মহাসত্যবাদী) উপাধিতে ভূষিত করেন। যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে মাসজিদুল আক্বছায় নৈশভ্রমণ (ইসরা) করানো হ’ল, তখন মক্কার লোকেরা এটি নিয়ে আলোচনা শুরু করল। এমনকি যারা ইতিপূর্বে ঈমান এনেছিল, তাদের কেউ কেউ (সংশয়ে পড়ে) ধর্মত্যাগী হয়ে গেল। তারা আবুবকর (রাঃ)-এর কাছে ছুটে গিয়ে বলল, আপনি কি আপনার সাথীর কথা শুনেছেন? তিনি দাবি করছেন যে আজ রাতে তিনি বায়তুল মুক্বাদ্দাস ভ্রমণ করে এসেছেন! আবুবকর (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কি সত্যিই এ কথা বলেছেন? তারা বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, যদি তিনি এ কথা বলে থাকেন, তবে অবশ্যই সত্য বলেছেন। তারা অবাক হয়ে বলল, আপনি কি এটি বিশ্বাস করেন যে তিনি এক রাতেই বায়তুল মুক্বাদ্দাস গিয়ে আবার সকাল হওয়ার আগেই ফিরে এসেছেন? তিনি উত্তর দিলেন, হ্যাঁ, আমি তো এর চেয়েও দূরের বিষয় অর্থাৎ আসমান থেকে আসা অহি-র খবরও সকাল-সন্ধ্যায় বিশ্বাস করি। এই ঘটনার পরই তাঁর নাম হয় আবুবকর ছিদ্দীক।[12]
ছিদ্দীক ও ছাদিক-এর মধ্যে পার্থক্য : ছিদ্দীক (মহা-সত্যবাদী) উপাধিটি ছাদিক (সত্যবাদী) অপেক্ষা অনেক বেশি অর্থবহ ও পূর্ণাঙ্গ। কারণ প্রত্যেক ‘ছিদ্দীক’ অবশ্যই ‘ছাদিক’, কিন্তু প্রত্যেক ‘ছাদিক’ ব্যক্তিই ‘ছিদ্দীক’ নন। আবুবকর (রাঃ)-এর শ্রেষ্ঠত্ব কেবল এতেই সীমাবদ্ধ নয় যে তিনি সত্য কথা বলতেন কিংবা অন্য কারো চেয়ে সত্যের অনুসন্ধান বেশি করতেন। বরং তাঁর বিশেষত্ব হ’ল নবী করীম (ছাঃ) যা কিছুই সংবাদ দিয়েছেন, তার সবটুকুই তিনি বিস্তারিত জানতেন এবং সেই সংবাদের প্রতি নিজের জ্ঞান, সংকল্প, কথা ও কর্মের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ সত্যায়ন করেছিলেন।
আবুবকর (রাঃ)-এর প্রতি নবী করীম (ছাঃ)-এর অটল সমর্থন ও ভালোবাসা : ছহীহ বুখারীতে আবুদ্দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি নবী করীম (ছাঃ)-এর কাছে বসা ছিলাম, এমন সময় আবুবকর (রাঃ) তাঁর কাপড়ের এক প্রান্ত ধরে দ্রত আসলেন, এমনকি তাঁর হাঁটু পর্যন্ত প্রকাশ হয়ে যাছিল। নবী করীম (ছাঃ) তাঁকে দেখে বললেন, তোমাদের এই সাথী আজ কোনো বিবাদে জড়িয়েছেন। তিনি এসে সালাম দিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার ও ইবনু খাত্ত্বাবের (ওমর) মধ্যে একটি বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়েছে। আমি তাঁর ওপর রাগ করেছিলাম, কিন্তু পরে অনুতপ্ত হয়ে তাঁর কাছে ক্ষমা চেয়েছি। তিনি আমাকে ক্ষমা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তাই আপনার কাছে এসেছি। নবী করীম (ছাঃ) তিনবার বললেন, হে আবুবকর! আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করন।
পরবর্তীতে ওমর (রাঃ) অনুতপ্ত হয়ে আবুবকরের বাড়ীতে গেলেন, কিন্তুও তাঁকে পেলেন না। অতঃপর তিনি নবী করীম (ছাঃ)-এর দরবারে আসলেন। ওমরকে দেখে নবী করীম (ছাঃ)-এর চেহারা রাগে বিবর্ণ হয়ে গেল। আবুবকর (রাঃ) হাঁটু গেড়ে বসে বিনয়ের সাথে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কসম, আমিই অন্যায়কারী ছিলাম (দু’বার বললেন)। তখন নবী করীম (ছাঃ) উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাকে তোমাদের কাছে পাঠিয়েছিলেন, তখন তোমরা বলেছিলে, তুমি মিথ্যা বলছ, আর আবুবকর বলেছিল, আপনি সত্য বলেছেন। সে তাঁর জীবন ও সম্পদ দিয়ে আমাকে সাহায্য করেছে। তোমরা কি আমার খাতিরে আমার এই সাথীকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকবে? (তিনি দু’বার এটি বললেন)। এরপর থেকে কেউ আর কখনো আবুবকর (রাঃ)-কে কষ্ট দেওয়ার সাহস করেনি।
অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, আবুবকর ও ওমরের মধ্যে একটি আলোচনা (তর্কাতর্কি) হয়েছিল। এতে আবুবকর ওমরকে রাগান্বিত করে ফেলেন। ফলে ওমর ক্ষুব্ধ হয়ে সেখান থেকে চলে যান। আবুবকর তাঁর পিছু পিছু ছুটলেন এবং বারবার অনুরোধ করতে লাগলেন যেন ওমর তাঁর জন্য (আল্লাহর কাছে) ক্ষমা প্রার্থনা করেন। কিন্তু ওমর তা করলেন না, এমনকি তিনি আবুবকরের মুখের ওপর নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলেন’।[13]
ইসলামের প্রথম খতীব : আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন, যখন ছাহাবীদের সংখ্যা মাত্র ৩৮ জনে পৌঁছাল, তখন আবুবকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে প্রকাশ্যে দাওয়াত দেওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন। নবী করীম (ছাঃ) বললেন, হে আবুবকর, আমরা সংখ্যায় খুব অল্প। কিন্তু আবুবকর (রাঃ)-এর বারবার অনুরোধে নবী করীম (ছাঃ) রাযী হলেন এবং ছাহাবীরা মসজিদুল হারামের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়লেন। আবুবকর (রাঃ) মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে খুৎবা দিতে শুরু করলেন, আর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) পাশে উপবিষ্ট ছিলেন। আবুবকর (রাঃ)-ই ছিলেন ইসলামের প্রথম খতীব (বক্তা), যিনি প্রকাশ্যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে মানুষকে আহবান করেছিলেন।
এই ঘোষণা শোনার সাথে সাথে মুশরিকরা আবুবকর (রাঃ) এবং অন্যান্য মুসলিমদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা মসজিদুল হারামের আনাচে-কানাচে তাঁদের নির্মমভাবে প্রহার করল। পাপিষ্ঠ উৎবা বিন রাবিয়াহ আবুবকর (রাঃ)-এর উপর চড়ে বসল এবং তাঁর দুই জোড়া জুতো দিয়ে আবুবকরের মুখমন্ডলে উপর্যুপরি আঘাত করতে লাগল। আঘাতের তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, আবুবকর (রাঃ)-এর নাক ও চেহারার মধ্যে কোনো পার্থক্য করা যাচ্ছিল না (অর্থাৎ তাঁর মুখমন্ডল রক্তাক্ত হয়ে ফুলে গিয়েছিল)।[14]
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর অকুতোভয় রক্ষক : মক্কায় মুশরিকরা যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে প্রহার করার বা হত্যা করার চেষ্টা করত, তখন আবুবকর (রাঃ)-ই প্রথম ব্যক্তি হিসাবে ঢাল হয়ে দাঁড়াতেন। উরওয়া বিন জুবায়ের (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি আব্দুল্লাহ বিন ‘আমরকে জিজ্ঞেস করেছিলেন মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে সবচেয়ে নিষ্ঠুর কী আচরণ করেছিল? তিনি বললেন, আমি দেখলাম, পাপিষ্ঠ উক্ববা বিন আবি মুআইত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে আসলেন যখন তিনি ছালাত পড়ছিলেন। উক্ববা নিজের চাদর নবী করীম (ছাঃ)-এর গলায় পেঁচিয়ে ধরল এবং এত জোরে শ্বাসরোধ করল যে তাঁর দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হ’ল। ঠিক সেই মুহূর্তে আবুবকর (রাঃ) ছুটে আসলেন এবং উক্ববাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলেন। তিনি চিৎকার করে বলছিলেন, তোমরা কি এমন একজন মানুষকে হত্যা করতে চাও, যিনি বলেন আমার প্রতিপালক আল্লাহ? অথচ তিনি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে এসেছেন! [15]
আছমা (রাঃ)-এর হাদীছে এসেছে, একবার একজন চিৎকার করে আবুবকর (রাঃ)-কে খবর দিল আপনার সাথীকে রক্ষা করুন! আবুবকর (রাঃ) চারদিকে বিনুনি করা চুলে হাত দিতে দিতে ঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। তিনি মুশরিকদের বলছিলেন, ধিক তোমাদের! তোমরা কি কেবল এই অপরাধে একজন মানুষকে হত্যা করবে, যিনি বলেন আমার রব আল্লাহ? মুশরিকরা তখন নবী করীম (ছাঃ)-কে ছেড়ে আবুবকর (রাঃ)-এর ওপর চড়াও হ’ল। আবুবকর (রাঃ) যখন আমাদের কাছে ফিরে আসলেন, তখন তাঁর চুলের বিনুনিতে হাত দিলেই চুলগুলো ছিঁড়ে আসছিল (অত্যাচারের তীব্রতায়)।[16]
আলী (রাঃ)-এর এক বর্ণনায় এসেছে, তিনি একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন সবচেয়ে সাহসী মানুষ কে? লোকেরা বলল, আপনি। আলী (রাঃ) বললেন, আমার সাথে যে লড়তে এসেছে আমি তার বদলা নিয়েছি, কিন্তু সবচেয়ে সাহসী হলেন আবুবকর। আমি দেখেছি কুরায়েশরা যখন নবী করীম (ছাঃ)-কে ঘিরে ধরে টানাহেঁচড়া করছিল, তখন আবুবকর ছাড়া আর কেউ কাছে যাওয়ার সাহস পায়নি। তিনি মুশরিকদের ধাক্কা দিচ্ছিলেন আর বলছিলেন ধিক তোমাদের! তোমরা কি কেবল এই অপরাধে একজন মানুষকে হত্যা করবে যে তিনি বলেন আমার রব আল্লাহ? এরপর আলী (রাঃ) কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, আল্লাহর কসম! ফেরাউনের বংশের সেই মুমিন ব্যক্তি (যিনি ঈমান গোপন করেছিলেন) অপেক্ষা আবু বকরের জীবনের একটি মুহূর্তও উত্তম। কারণ সেই ব্যক্তি তাঁর ঈমান গোপন রেখেছিলেন, আর আবুবকর তাঁর ঈমানকে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন’।[17]
[ক্রমশঃ]
-শরীফ হোসাইন
[আরবী প্রভাষক, পাতারহাট ইসলামিয়া ফাযিল মাদ্রাসা, মেহেন্দিগঞ্জ, বরিশাল]
[1]. ফাৎহুল বারী ৯/৭ পৃ.; আল-ইছাবাহ ২/৩৪১ পৃ.।
[2]. ইবনু তায়মিয়াহ, মিনহাজুস সুন্নাহ, ৪/২২৬, ২৮৮ পৃ.।
[3]. বুখারী হা/৩৬৬১।
[4]. শরহুন নববী, ৯/২৪৯ পৃ.।
[5]. মুসলিম, হা/২৪৯০।
[6]. বুখারী হা/৩৬৬১; সীরাত ইবনু হিশাম, পৃ. ১/৩৭২; ফাতহুল বারী ৯/৭ পৃ.; আল-ইছাবাহ, ২/৩৪১ পৃ.।
[7]. ইবনু হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী ৭/২৫-২৬ পৃ.।
[8]. ইবনু হাজার আসকালানী, আল-ইছাবাহ, ২/৩৪১ পৃ.।
[9]. ইবনু তায়মিয়াহ, মিনহাজুস সুন্নাহ, ৪/৪৮৮ পৃ.।
[10]. বুখারী, হা/৩৬৭৫; মিশকাত, হা/৬০৭৪।
[11]. হাকেম, হা/৬৭৩৭।
[12]. মুসতাদরাক হাকেম, ৩/৬২-৬৩; ছহীহাহ, হা/৩০৬।
[13]. বুখারী, হা/৩৬৬১।
[14]. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/৫৯ পৃ.।
[15]. বুখারী, হা/৩৬৬১।
[16]. ফাতহুল বারী, ৭/১৬৯ পৃ.।
[17]. মিনহাজুস সুন্নাহ, ৩/৪৬, ৪/৫২৫ পৃ.; ফাতহুল বারী, ৭/১৬৯ পৃ.।