কফির কাপে জীবনের ছাপ
নাজমুন নাঈম
৫০ বছর বয়সী ইব্রাহীম চাচা ছিলেন একজন তুর্কী মুসলিম মুদি দোকানদার। ১৯৫৭ সালে ফ্রান্সে যে ভবনে তার ছোট্ট একটি দোকান ছিল, সেখানে একটি ইহূদী পরিবার বাস করত। প্রতিদিন সকালে সেই পরিবারের সাত বছর বয়সী ছেলে জাদ বাজার করতে আসত। আর প্রতিদিন সে দোকান থেকে একটি করে চকলেট চুরি করত।
একদিন জাদ বাজার করল। কিন্তু সেদিন সে চকোলেট চুরি করতে ভুলে গেল। দোকান থেকে বের হওয়ার সময় ইব্রাহীম চাচা তাকে ডেকে বললেন, ‘জাদ, আজ তোমার চকলেট চুরি করা তো বাকি রয়ে গেল!’
জাদ ভয়ে অবাক হয়ে বলল, ‘আপনি তাহ’লে প্রতিদিনই আমাকে দেখতেন?’
তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, এই নাও তোমার আজকের চকলেট। জাদ ওয়াদা করল যে, সে আর কখনো চকলেট চুরি করবে না। কিন্তু ইব্রাহীম চাচা বললেন, ‘আমাকে প্রতিশ্রুতি দাও, তুমি আর কখনো কোনো কিছুই চুরি করবে না’। জাদ সেই প্রতিশ্রুতি দিল। এরপর থেকে প্রতিদিন যখন সে বাজার শেষ করত, ইব্রাহীম চাচা তাকে একটি চকলেট দিতেন। তারপর সে চলে যেত।
ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠল। জাদ তার ব্যক্তিগত গোপন কথা ও সমস্যাগুলো ইব্রাহীম চাচাকে বলত। তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। তারপর বাক্স খুলে একটি বই বের করতেন এবং জাদকে বলতেন, বইটি হাতে নিয়ে চোখ বন্ধ করে যেকোনো দু’টি পৃষ্ঠা খুলতে। এরপর ইব্রাহীম চাচা নীরবে সেই দু’টি পৃষ্ঠা পড়তেন এবং জাদের সঙ্গে আলোচনা করে তার সমস্যা সমাধানের পথ বের করতেন।
সময়ের প্রবাহে ইব্রাহীম চাচার বয়স হ’ল ৬৭ বছর। আর জাদের বয়স ২৪ বছর। তাদের সম্পর্ক তখন পিতা-পুত্রের চেয়ে গভীর। মৃত্যুর আগে ইব্রাহীম চাচা তার সন্তানদের কাছে একটি বাক্স দিয়ে বললেন, সেটি যেন জাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
অবশেষে ইব্রাহীম চাচা মৃত্যুবরণ করলেন। সবচেয়ে কাছের অভিভাবক ইব্রাহীম চাচার মৃত্যুর খবর শুনে জাদ প্রচন্ড কষ্ট পেল। তার কাছে ইব্রাহীম চাচার স্মৃতি হিসাবে থাকল কেবল একটি বাক্স। সে বাক্সটি সযত্নে তুলে রাখল।
একদিন সে একটি বড় সমস্যায় পড়ল। কিন্তু তার সকল সমস্যা সমাধানের সহজ পথটি বন্ধ হয়ে গেছে। তার সমস্যাগুলো শোনার জন্যও এখন কেউ নেই। তখন তার মনে হ’ল, আহ! ইব্রাহীম চাচা যদি আজ বেঁচে থাকতেন! তিনি আমার কথা শুনতেন। তারপর বাক্স খুলে সেই বইটি বের করতেন...। হঠাৎ তার বাক্সটির কথা মনে পড়ল। সে বাক্সটি খুলে দেখল, ভেতরে সেই বইটি রয়েছে। সে আগের মতো চোখ বন্ধ করে বইটি খুলল। দেখল বইয়ের পৃষ্ঠাগুলো আরবী ভাষায় লেখা। কিন্তু সে তো আরবী পড়তে জানে না।
সে দৌড়ে তার এক তিউনিসীয় বন্ধুর কাছে গেল এবং তাকে দু’টি পৃষ্ঠা পড়ে শোনাতে বলল। বন্ধু তা পড়ে শোনাল। এরপর জাদ নিজের সমস্যার কথা ও বইয়ের কথাগুলো একসাথে ভাবতে লাগল। কিছুক্ষণ পর সে দেখল, সমস্যার সমাধান যেন তার চোখের সামনেই স্পষ্ট হয়ে গেছে। সে বন্ধুকে জিজ্ঞেস করল, ‘এটি কী বই?’ বন্ধু উত্তর দিল, ‘এটি আল্লাহর কালাম, পবিত্র কুরআন’।
এরপর জাদ ইসলাম গ্রহণ করল। তার নাম হ’ল ড. জাদুল্লাহ আল-কুরআনী। পরবর্তীতে তিনি ইউরোপের অন্যতম বড় ইসলামী দাঈ হয়ে ওঠেন। তার হাতে ৬ হাযারের বেশী ইহূদী ও খ্রিস্টান ইসলাম গ্রহণ করে। যখন তাকে তার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হ’ত, তিনি বলতেন, ‘যখন আমার মাধ্যমে একজন মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে, তখন আমার মনে হয়, আমি যেন ইব্রাহীম চাচার উপকারের সামান্য হ’লেও কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে পেরেছি’।
তিনি আরও বলতেন, ‘আমি ১৭ বছর ইব্রাহীম চাচার সঙ্গে ছিলাম। তিনি কখনো বলেননি, তুমি ইহূদী, আমি মুসলিম। কখনো বলেননি, তুমি কাফের। এমনকি তিনি কখনো এটাও বলেননি যে, আমি যে বইটি খুলছি, সেটি কুরআন। অত্যন্ত প্রজ্ঞার সঙ্গে তিনি আমাকে কুরআনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে দিয়েছিলেন। তার নীতি ছিল, বান্দার কাজ হ’ল চেষ্টা করা; সফলতা এনে দেওয়া আল্লাহর হাতে’।
পরবর্তীতে ড. জাদ আফ্রীকায় যান এবং সেখানে ১০ বছর অবস্থান করেন। তার মাধ্যমে জুলু গোত্রের অনেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন। ২০০৩ সালে আফ্রীকায় আক্রান্ত বিভিন্ন রোগের প্রভাবে তিনি প্রায় ৫৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
প্রিয় পাঠক! ইব্রাহীম চাচা জাদকে কখনো সরাসরি ইসলামের দাওয়াত দেননি। তিনি তাকে বলেননি, ইসলামই সকল সমস্যার একমাত্র সমাধান। বরং তিনি ধীরে ধীরে একটি অচেনা কিতাবের উপর তার বিশ্বাসের বীজ বুনেছিলেন। আর যখন সে কিতাবটি সম্পর্কে জানল, তখন তার সামনে প্রস্ফুটিত হ’ল হেদায়াতের স্বচ্ছ আলো। আল্লাহর পথে দাওয়াত সর্বদা প্রকাশ্য ও তড়িৎফল নির্ভর নয়। বরং উত্তম কৌশল অবলম্বন ও ধৈর্যধারণ করতে হয়। কৃষকের মতো পরম মমতায় কেবল কল্যাণের বীজ বপন করুন; ফলদান তো আল্লাহর হাতে।
মূল : মুহসিন জববার, অনুবাদ : নাজমুন নাঈম