অতি ভবিষ্যৎমুখিতায় যেন না হারায় বর্তমান
ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব
মানুষের ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটে তার চলায়-ফেরায়, কথায়-আচরণে, মন-মননে। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে বড় বড় সার্টিফিকেটে ভূষিত করে এবং তাতে মানুষের যোগ্যতার একটি সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে দেয়। কিন্তু তাতে যেটা স্পষ্ট হয় না তা হ’ল তার ব্যক্তিত্বের পরিচয়, তেমনি থাকে না তার মানবিক গুণাবলীর অপরূপ সৌন্দর্য কিংবা অমানবিক হিংস্রতার কদর্য কালিমা। ডিজিটাল ফিল্মে যদি মানুষের হৃদয়ছবিকে ধারণ করা যেত, তবে হয়ত জানা যেত তার আসল পরিচয়। অনুভব করা যেত হৃদয়ের শ্বেত-শুভ্র ভালোবাসার কাশফুল কিংবা মুখ ও মুখোশের ফারাক। বিজ্ঞানের অগ্রগতি যত আকাশছৌঁয়াই হোক না কেন, মানবচরিত্রের এই বিচিত্র রহস্যময়তা ধারণ করা তার পক্ষে অসম্ভবই রয়ে যাবে। আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিজগতে এমন কিছু জিনিস অদৃশ্য ও দুর্বোধ্য করে রেখেছেন, যা একদম সামনাসামনি দাড়িয়েও উদ্ঘাটন করার সাধ্য যেন কারো নেই। সত্যিই সে পরাজগৎ এক অপার বিস্ময়ের।
তবে মানুষের ব্যক্তিত্ব কিংবা তার নিয়ত বা সৎ উদ্দেশ্যের পরিচয় যদি কোথাও বিকশিত হয়, তবে তার অন্যতম মাধ্যম হ’ল তার কথা বা আলাপচারিতা। এজন্য রাসূল (ছা.) যবানের সদ্ব্যবহার ও সংযমের কথা বার বার উল্লেখ করেছেন এবং এর ভিত্তিতে মানুষের ব্যক্তিত্বের একটি মানদন্ড স্থাপন করেছেন। রাসূল (ছা.) বলেন, ‘কোন বান্দার ঈমান সঠিক হয় না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তার হৃদয় ঠিক হয়, আর তার হৃদয় ঠিক হয় না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তার যবান ঠিক হয়। আর সে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার অনিষ্টকারিতা থেকে তার প্রতিবেশী (বা ঘনিষ্টজনরা) নিরাপদ নয়’ (আহমাদ, সিলসিলাহ ছহীহাহ হা/২৮৪১)। এই হাদীছে কথার সক্ষমতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়া হয়েছে। একজন ব্যক্তির হৃদয়জগতের পরিচ্ছন্নতা নির্ভর করে তার কথার সততা ও যথার্থতার উপর। যদি কারো কথা-বার্তায় মিথ্যা থাকে, কপটতা থাকে, অন্যায় কিছু থাকে, তবে তা মুখেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং হৃদয়জগতের গভীরতম প্রদেশ পর্যন্ত কলুষিত করে ফেলে।
অপরদিকে মানুষের যবানের শক্তিশালী প্রকাশমাধ্যম হ’ল তার লেখালেখি। সুতরাং কথার সাথে সাথে লেখনীর মাধ্যমেও মানুষের মনোজাগতিক সততা-শালীনতা, কপটতা ও অপবিত্রতার প্রকাশ ঘটে। বর্তমান যুগ সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ। এই যুগে মানুষ অবারিতভাবে নিজের মতামত প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছে। সেই সাথে যিগির তোলা হয়েছে তথাকথিত বাকস্বাধীনতার। অতএব এই সুযোগের অপব্যবহার করে আমরা নির্বিবাদে যা খুশী বলি, যা খুশী লিখি, মন্তব্য করি। কখনও তা মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যায়। আবার রেকর্ডেড হওয়ায় যুগের পর যুগ ধরে তা পাপের বোঝা বাড়ায়। এতে অন্যায় ও অনৈতিকতার প্রচার স্থায়ীভাবে হ’তে থাকে।
আমাদের বাকযন্ত্রের অপব্যবহার দ্বিপাক্ষিকভাবেই হয়। একপক্ষ যারা ক্ষমতাধর তারা অপরপক্ষকে দমন করে রাখার জন্য অহংকারবশতঃ অন্যায়, অন্যায্য কথা বলে ক্ষোভের ধিকি ধিকি আগুন জ্বালায়। অপরপক্ষ যারা তুলনামূলক ক্ষমতাহীন তারা আবার ঈর্ষা করে, হিংসা করে; মিথ্যা, প্রতারণা ও গুজবের বিষ ছড়ায়। অর্থাৎ যালিম, মাযলূম উভয়েই ‘কথা’র দায় এড়াতে পারে না। এজন্য রাসূল (ছাঃ) সকল পক্ষের জন্য সাধারণ নির্দেশনা হিসাবে বলেছেন, ‘প্রকৃত মুসলিম তো সে-ই যার হাত ও যবান (মুখ) থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে’ (বুখারী হা/৯)। সুতরাং যালিম হোক, মাযলূম কারো পক্ষ থেকে কোন অন্যায় কথাবার্তা বান্দার হক নষ্টের শামিল। অন্যত্র রাসূল (ছা.) বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে নতুবা চুপ থাকে (বুখারী হা/৫৫৯৩)।
আর যাদের কাছে বাকসংযম কোন বিষয়ই নয়, তাদের ভয়াবহ পরিণামের ব্যাপারে সতর্ক করে রাসূল (ছা.) বলেন, ‘সকল কাজের মূল বিষয় ইসলাম, এর স্তম্ভ হ’ল ছালাত এবং এর সর্বোচ্চ চূড়া হ’ল জিহাদ’। এরপর তিনি সকল কল্যাণের নিয়ন্ত্রণকারী বস্ত্তটি সম্পর্কে বললেন, যা কিনা মানুষের ঈমান, ছালাত ও জিহাদের মত বিষয়কেও পূর্ণতা ও স্বার্থকতা দান করে। তিনি স্বীয় জিহবার দিকে ইশারা করে বললেন, ‘এটাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখ’। ছাহাবী মু‘আয জানতে চাইলেন, ‘কথার কারণেও কি আমাদেরকে জিজ্ঞাসিত হ’তে হবে?’ রাসূল (ছা.) বললেন, ‘মানুষের মুখের (জিহবার) ফসলই (কথা) তো তাকে জাহান্নামে মুখ থুবড়ে নিক্ষেপ করবে’ (তিরমিযী হা/২৬১৬)।
মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য হ’ল, মিথ্যা বলা এবং মিথ্যার প্রচার করা। পরনিন্দা, অপবাদ, না জেনে কথা বলা, অনর্থক সন্দেহ তৈরী করা, একের কথা অন্যের কাছে লাগানো, বাড়িয়ে কথা বলা, ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হওয়া এগুলো তাদের কাছে কোন অন্যায় নয়। এজন্য কথার লাগাম টেনে ধরা এবং কথার পরিণামফল চিন্তা করা তাদের ধাতেই নেই। ফলে তাদের মাধ্যমে সমাজে যাবতীয় অশান্তি ও অনর্থ সৃষ্টি হয়। সমাজে অস্থিরতা বাড়ে, একতা নষ্ট হয়।
প্রিয় পাঠক! বাকসংযম একটি ব্যাপক ধারণা। এর অর্থ কেবল কম কথা বলা নয়। বরং শরী‘আত ও বিবেকের ফিল্টারিং রেখে কথা বলা। আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার ভয় রেখে বলা। কখন, কোথায়, কী বলা উচিৎ এবং কতটা বলা উচিৎ সে সম্পর্কে সদা সচেতন থাকা। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল। তাহলে আল্লাহ তোমাদের কর্মকান্ড সংশোধন করবেন এবং তোমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করে দেবেন’ (আহযাব ৭০-৭১)। কেননা আমরা যে কথাই বলি না কেন সেটা হুবহু সংরক্ষণ করা হয়। আল্লাহ বলেন, ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তা সংরক্ষণের জন্য তার কাছেই (অদৃশ্য) তৎপর প্রহরী রয়েছে (ক্বাফ ১৮)। অর্থাৎ একদিন না একদিন আমাদের কথার জবাবদিহিতা করতেই হবে। সুবহানাল্লাহ!
শয়তান মানুষকে কথার অপব্যবহারের মাধ্যমে ফিৎনায় নিক্ষেপ করে। তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, ফাসাদ ও বিশৃংখলা সৃষ্টি করে। পরিশেষে ধ্বংসের পথ উন্মুক্ত করে দেয়। অতএব আসুন! আমরা বাকসংযমের যথাযথ অনুশীলন করি। একে আমাদের নিত্য অভ্যাসে পরিণত করি। বিশেষ করে বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সহজলভ্যতার যুগে আত্মসংযমের জন্য বাকসংযমের কোন বিকল্প নেই। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখতে হ’লে এবং একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ সমাজ-সংগঠন কায়েম করতে হ’লে আত্মসংযমের অন্যতম মৌলিক গুণ বাকসংযম আমাদেরকে অবশ্যই অর্জন করতে হবে। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন-আমীন!