যৌবনে পাওয়া রামাযানকে মূল্যায়ন করুন!
ফায়ছাল মাহমূদ
ডা. মুহাম্মাদ সাইফুর রহমান 373 বার পঠিত
ভূমিকা : বিশ্বের বুকে জাতি হিসাবে ইহূদীদের চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র ও অপকর্মের ইতিহাস সর্বজনবিদিত। এ জাতি যুগ যুগ ধরে আল্লাহদ্রোহিতা, কুফরী, নবী-রাসূলদের হত্যা ও তাদের ষড়যন্ত্রপ্রিয়তার কারণে মানুষের কাছে অত্যন্ত ঘৃণাভরে পরিচিতি পেয়ে এসেছে। পবিত্র কুরআনে তাদেরকে অভিশপ্ত ও লজ্জিত জাতি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন-وَضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الذِّلَّةُ وَالْمَسْكَنَةُ وَبَاءُوا بِغَضَبٍ مِنَ اللهِ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَانُوا يَكْفُرُونَ بِآيَاتِ اللهِ وَيَقْتُلُونَ النَّبِيِّينَ بِغَيْرِ الْحَقِّ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ- ‘এভাবে তাদের উপর আপতিত হ’ল লাঞ্ছনা ও পরমুখাপেক্ষিতা। আর তারা নিজেদের উপর আল্লাহর শাস্তিকে ফিরিয়ে নিল। এটা এ কারণে যে, তারা আল্লাহর আয়াতসমূহে অবিশ্বাস করত এবং নবীগণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করত। আর এ কারণে যে, তারা অবাধ্যতা করেছিল এবং তারা সীমালংঘন করত’ (বাক্বারাহ-মাদানী ২/৬১)।
জন্মগতভাবেই এই জাতি খুবই ‘চতুর’ ও ‘ধুরন্ধর’ হওয়ায় বিভিন্ন ছলচাতুরী দিয়ে মানুষকে বশীভূত রাখার কৌশল অবলম্বন করে। যার ফলশ্রুতিতে তারা বিভিন্ন দেশ থেকে বিতাড়িত ও পরমুখাপেক্ষী হয়েও শতাব্দীর পর শতাব্দী নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। সংখ্যায় কম হয়েও তারা মানবীয় যোগ্যতার বিকাশ ও চতুরতার মাধ্যমে অন্যের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে।
বর্তমানে সারা বিশ্বে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। প্রায় ৩১ শতাংশ খ্রিস্টান ধর্মাবম্বীর বিপরীতে মুসলমান জনগোষ্ঠী প্রায় ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ ৮০০ কোটি মানুষের পৃথিবীতে প্রতি চারজনের একজন মুসলমান। অনুসারী বিবেচনায় পৃথিবীর সপ্তম বৃহৎ ধর্ম হ’ল ইহূদী। বিশ্বময় ইহূদী ধর্মের অনুসারীর সংখ্যা ১ থেকে দেড় কোটি। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার শূন্য দশমিক দুই শতাংশ (০.২%) ইহূদী। অর্থাৎ পৃথিবীতে প্রতি ৫০০ জনে ১ জন ইহূদী। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য বর্তমানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গোটা পৃথিবীর নেতৃত্ব দিচ্ছে ইহূদীরা’।[1]
সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এবং ইহূদীদের জায়নিজম (zionism) আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে ইসলাম ও মুসলমানদের ধ্বংস করার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া নামে অভিহিত অবৈধ ‘ইস্রাঈল’ রাষ্ট্রের জন্ম হয়। তাদের মৌলিক লক্ষ্য ইস্রাঈলের সম্প্রসারণকে অপ্রতিরোধ্য করে মক্কা-মদীনাসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে এক বৃহৎ ইস্রাঈল রাষ্ট্র গঠন করে তাদের একচ্ছত্র শাসন কায়েম করা।
তাই তাদের বিগত দিনের ষড়যন্ত্রের ইতিহাস ও বর্তমান অপতৎপরতা সম্পর্কে জানা অত্যন্ত জরুরী। Winston churchill বলেন- As far as you look behind so far you can see ahead. ‘যে জাতি তার বিগত দিনের ইতিহাস জানার যত বেশী চেষ্টা করবে, সে জাতি তত বেশী নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে মহীয়ান হওয়ার গৌরব লাভ করবে’। তাই ইহূদীদের এই গোপন ও প্রকাশ্য অপতৎপরতা সম্পর্কে পাঠকদের অবহিত করাই আমাদের মৌলিক লক্ষ্য।
ইহূদী ষড়যন্ত্রের গোড়ার কথা :
প্রাচীনকাল থেকেই মূসা (আঃ)-এর উম্মত হিসাবে পরিচয় দানকারী ইহূদীদের অধিকাংশই ছিল সুবিধাবাদী, বিশ্বাসঘাতক ও সূদী মহাজন চরিত্রের। তারা নিজেদের হীন স্বার্থে পবিত্র তাওরাত কিতাবকে বহুবার পরিবর্তন-পরিবর্ধন, সংযোজন-বিয়োজন করে নিজেদের অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থের হাতিয়ারে পরিণত করেছিল’ (বাক্বারাহ-২/৭৯, নিসা ৪/৪৬ মায়েদাহ ৫/১৩, ৪১)।
মূসা (আঃ)-এর নেতৃত্বে তারা যালিম শাসক ফেরাউনের কবল থেকে মুক্ত হয়ে গাযায় ও ফিলিস্তীনে হিজরত করেছিল। সেই মূসা ও হারূন (আঃ)-এর সাথে তারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল এবং মূসা (আঃ)-এর অনুপস্থিতিতে আল্লাহর একত্ববাদ থেকে সরে গিয়ে গরুর বাছুর পূজায় লিপ্ত হয়েছিল।[2]
নবী মূসা (আঃ)-এর সাথে বার বার বেআদবী ও অবাধ্যতার পরিণামে এবং আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার ও পরবর্তীতে নবীগণকে অন্যায়ভাবে হত্যার কারণে আল্লাহ তাদের উপর চিরস্থায়ী গযব ও অভিসম্পাৎ নামিল করছিলেন (বাক্বারাহ-মাদানী ২-২৯)। ইবনু কাছীর (রহঃ) বলেন, এ লাঞ্ছনা ও অবমাননার প্রকৃতি হ’ল ইহূদীরা সর্বদা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অপরের দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ থাকবে’।[3]
এ মর্মে সূরা আলে ইমরানে আল্লাহ বলেন, ضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الذِّلَّةُ أَيْنَ مَا ثُقِفُوا إِلَّا بِحَبْلٍ مِنَ اللهِ وَحَبْلٍ مِنَ النَّاسِ وَبَاءُوا بِغَضَبٍ مِنَ اللهِ وَضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الْمَسْكَنَةُ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَانُوا يَكْفُرُونَ بِآيَاتِ اللهِ وَيَقْتُلُونَ الْأَنْبِيَاءَ بِغَيْرِ حَقٍّ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ- ‘তাদের উপর লাঞ্ছনা অবধারিত করা হয়েছে যেখানেই তারা থাকুক না কেন, কেবলমাত্র আল্লাহর অঙ্গীকার ও মানুষের অঙ্গীকার ব্যতীত। আর তারা নিজেদের উপর আল্লাহর ক্রোধকে ফিরিয়ে নিয়েছে এবং তাদের উপর পরমুখাপেক্ষিতা অবধারিত হয়েছে। এটা এজন্য যে, তারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে এবং নবীগণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে। কেননা ওরা অবাধ্য হয়েছিল এবং সীমালংঘন করত’ (আল ইমরান-মাদানী ৩/১১২)।
بِحَبْلٍ مِنَ اللهِ ‘আল্লাহর অঙ্গীকার’ বলতে বুঝানো হয়েছে, যাদেরকে আল্লাহ নিজ চিরন্তন বিধান অনুযায়ী আশ্রয় ও অভয় দিয়েছেন। যেমন শিশু ও রমণীকূল এবং এমন সাধক ও উপাসকগণ, যারা যুদ্ধ-বিগ্রহ থেকে দূরে থাকেন। অতঃপর وَحَبْلٍ مِنَ النَّاسِ ‘মানুষের অঙ্গীকার’ হ’ল, অন্যের সাথে শান্তি চুক্তির মাধ্যমে নিরাপত্তা লাভ করা, যা মুসলমান বা অন্য যেকোন জাতির সাথে হ’তে পারে। যেমন বর্তমানে তারা আমেরিকা ও পাশ্চাত্য শক্তি বলয়ের সাথে গাটছড়া বেঁধে টিকে আছে। বৃহৎ শক্তিগুলো হাত গুটিয়ে নিলে ইস্রাঈল এক মাসও নিজের শক্তিতে টিকতে পারবে কি-না সন্দেহ। এতে কুরআনী সত্য وَحَبْلٍ مِنَ النَّاسِ ‘মানুষের অঙ্গীকার’-এর বাস্তব রূপ প্রকাশিত হয়’।[4]
রাসূল (ছাঃ)-এর সময় ইহূদী ষড়যন্ত :
হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর বংশে শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) জন্মগ্রহণ করবেন। তিনি কিরূপ শহরে জন্মগ্রহণ করবেন, কিরূপ শহরে হিজরত করবেন একথা ইহূদী-পন্ডিতগণ জানতেন। ইহূদীরা ধরে নিয়েছিল সর্বশেষ নবী ইস্রাঈলী বংশোদ্ভূত হবেন। কিন্তু যখন তারা দেখল নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) ইব্রাহীম (আঃ)-এর বংশে দুনিয়াতে এসেছেন ঠিকই; তবে ইস্রাঈল বংশে নয় বরং ইসমাঈল (আঃ)-এর বংশে। তখন থেকেই তারা সাম্প্রদায়িক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) এর বিরোধিতাকেই তাদের প্রধান কর্ম হিসাবে সাব্যস্ত করে।
ইতিপূর্বে কিশোর মুহাম্মাদ ১০ বা ১২ বছর বয়সে চাচার সাথে ব্যবসা উপলক্ষে সিরিয়ায় গমন করলে সেখানে জিরজীস ওরফে বাহীরা নামক জনৈক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাহেব অর্থাৎ খ্রিস্টান পাদ্রীর সাথে সাক্ষাৎ হলে তিনি কিশোর মুহাম্মাদকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে অনুমিত হন যে, ইনি ভবিষ্যতে নবী হবেন। তাই তিনি চাচা আবু তালেবকে বলেন, ‘আপনি অতি সত্ত্বর তাকে মক্কায় পাঠিয়ে দিন। নইলে ইহূদীরা জানতে পারলে তাকে হত্যা করবে, বলে সতর্ক করেন’।[5]
পরবর্তীতে রাসূল (ছাঃ) মদীনায় হিজরত করলে ইহূদীরা তাঁকে একাধিকবার হত্যার চেষ্টা করে। ব্যর্থ হয়ে অবশেষে ইসলাম ও মুসলমানদের চিরতার ধ্বংস করার জন্য কাফের, মুশরিক, মুনাফিক ও পৌত্তলিকদের সাথে হাত মিলায়’।[6] শিশু রাষ্ট্র মদীনাকে সমূলে ধ্বংস করার জন্য তারা ভয়ংকর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। বার বার চুক্তি ভঙ্গ ও বিশ্বাসঘাতকতার জন্য রাসূল (ছাঃ) কর্তৃক নির্বাসিত হলে মদীনা ইহূদীমুক্ত হয়’।[7]
মুহাম্মাদ (ছাঃ) ইন্তিকাল পরবর্তী ইহূদী ষড়যন্ত্র :
ষড়যন্ত্রপ্রিয়তা, অর্থলোলুপতা, সুবিধাদিতা, নিষ্ঠুরতা ইত্যাদি বদ স্বভাবের কারণে রাসূল (ছাঃ) কর্তৃক ইহূদীরা মদীনা থেকে চিরতরে নির্বাসিত হয়ে যাযাবরের জীবন-যাপনে বাধ্য হয়। তাদের জাতীয় জীবনের তিন হাযার বছরের মধ্যে ২১০০ বছর তারা যাযাবর অথবা গোলামীর জীবন-যাপন করে। দুর্বল ও বিজীত অবস্থায় লাঞ্ছিত, অপদস্থ হওয়া, বিজয়ী প্রভুকে তোষামোদ করা, আর শক্তিশালী অবস্থায় দুর্বল জাতিসমূহের সাথে অমানবিক আচরণ, প্রতারণা, শঠতা, সূদী কারবার, মুনাফেকী আচরণ, সত্যের পথে জনগনকে বাধা প্রদান করা তাদের জাতীয় অভ্যাস। শক্তিশালী অবস্থায় ইহূদীদের চেয়ে নিকৃষ্ট, ঘৃণিত, যুলুমবাজ কোন জাতি পৃথিবীবাসী দেখেনি। ইহূদীদের এহেন অমানবিক কার্যকলাপের দরুন তারা ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে অ্যামিরীয়, ব্যবিলনীয় ও রোমান সাম্রাজ্য কর্তৃক চরমভাবে নিগৃহীত হয় এবং আরব দেশ, ইংল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, চেকোশ্লোভিয়া, হল্যান্ড, ইতালি ও রাশিয়া থেকে বিতাড়িত হয়’।[8]
পরবর্তীতে রাসূল (ছাঃ)-এর মৃত্যুর পর ইহূদীরা ইসলাম ও মুসলমানদের ধ্বংস করার জন্য সম্মুখ যুদ্ধের পরিবর্তে কৌশলে মুসলমানদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে, মুসলমানদের মধ্যে চিন্তা ও কর্মের বিভেদ সৃষ্টি করে, বিভিন্ন দল-উপদল ও ফের্কা সৃষ্টি করে, এক পক্ষের দ্বারা অপর পক্ষকে নির্মূলের জঘন্য কর্মসূচী গ্রহণ করে।
খলীফা ওছমান (রাঃ)-এর সময়ে ইহূদী ষড়যন্ত্র :
তৃতীয় খলীফা হযরত ওছমান (রাঃ)-এর খেলাফতকালে ইয়েমেনের ‘ছানা’ এলাকার এক শিক্ষিত ধুরন্ধর ইহূদী যিন্দীক ‘আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা’ বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করে এবং ইসলামকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্র আরম্ভ করে। এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সে তিনটি পন্থা অবলম্বন করে- (১) নবী করীম (ছাঃ)-এর নামে ‘জাল’ বা মিথ্যা হাদীছ রচনা করে ইসলামের পবিত্রতা নষ্ট করা। (২) মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক বিরোধ সৃষ্টি করে তাদের অগ্রগতিকে ব্যাহত করা। (৩) ছাহাবীদের নামে দুর্নাম রটনা করে ইসলামের প্রতি মানুষের আকর্ষণকে বিনষ্ট করা। কেননা পরবর্তী অ-ছাহাবী লোকদের পক্ষে ইসলাম লাভের একমাত্র মাধ্যম ছিল ছাহাবীগণ। সুতরাং তাঁদের প্রতি আস্থা বজায় না থাকলে কারো পক্ষো কুরআন-হাদীছ বিশ্বাস কিংবা ইসলামের প্রতি আকর্ষণের কোন সূত্রই বাকী থাকে না’।[9]
আব্দুললাহ ইবনে সাবার এ মতবাদ ‘সাবাই মতবাদ’ বা ‘সাবাই আন্দোলন’ হিসাবে ইতিহাসে পরিচিত। আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাহ আহলে বায়েত তথা রাসূল (ছাঃ)-এর পরিবারের প্রতি মহববত ও আলী (রাঃ)-এর প্রতি ভালোবাসার ব্যাপারে সীমালঙ্ঘনে লিপ্ত হয় এবং আলী (রাঃ)-কে খেলাফতের প্রথম অসি দাবী করে। এক পর্যায়ে ইলাহ-এর স্থানে অধিষ্ঠিত করে। সেখান থেকে রাফেযী শী‘আ সম্প্রদায়ের উৎপত্তি’।[10]
ইবনু সাবাহ-এর এসব দ্বান্দ্বিক মতবাদ প্রচারের ফলে মুসলমানদের মধ্যে বিভিন্ন দল ও উপদলের সৃষ্টি হয়। এরূপ একটি উপদল প্রথমে ওছমান (রাঃ)-কে হত্যা করে। এ হত্যাকান্ডের পর তৎকালীন মুসলিম সমাজ বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। সাবাহর অনুসারীরা পরবর্তীতে হযরত আলী বনাম আয়শা (রাঃ)-এর মধ্যে উষ্ট্রের যুদ্ধ এবং হযরত আলী বনাম মুয়াবিয়া (রাঃ)-এর মধ্যে ছিফফীনের যুদ্ধ সংঘটিত করে’।[11]
অবশেষে আলী (রাঃ) তাঁর খিলাফতকালে ইবনু সাবা ও তার অনুচরসহ আগুনে পুড়িয়ে মারেন। আলী (রাঃ) যখন তাদেরকে আগুনে ফেললেন তখন তারা বলল, এখন আমরা নিশ্চিত হলাম যে, আপনিই আমাদের প্রভু (নাউযুবিল্লাহ)। কেননা আল্লাহ-তা‘আলা ছাড়া কেউ কাউকে আগুন দ্বারা শাস্তি দেয় না’।[12]
উমাইয়া ও আববাসীয় খেলাফতকালে ইহূদী ষড়যন্ত্র :
প্রখর ধী-শক্তিসম্পন্ন ইহূদীরা জানত যে, তারা রাসূল (ছাঃ)-এর ব্যক্তিসত্ত্বা এবং ইসলামের মৌলিকত্বের কোন আয়াত হানতে পারবে না। যেমনটি তারা পূর্ববর্তী নবীগণ এবং খ্রিষ্টধর্মের বেলায় সফলভাবে করেছে। তাই তারা উমাইয়া্ ও আববাসীয় খেলাফত ধ্বংসের হীন ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নেয় এবং আড়ালে-আবডালে থেকে মুসলমানদের মধ্যে মতবিরোধ ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন বাতিল ফেরক্বা তৈরী করে। তারা প্রথমে শী‘আ ও রাফেযী ফেরক্বা তৈরী করে। পরে এদের থেকেই ভ্রান্ত আক্বীদাধারী বিভিন্ন ফেরক্বা তৈরী হয়। মুতাযিলা, জাহমিয়া, বাতেনী, ইসমাঈলী, নাছারিইয়াহ, কারামেতা ও বাহাঈ সম্প্রদায়ের উত্থানের পিছনে রয়েছে ইহূদী পৃষ্টপোষকতা’।[13]
এসময় কুরাইশ বনাম অকুরাইশ, হাশেমী বনাম উমাইয়া, আনছার বনাম মুহাজির, শী‘আ বনাম সুন্নী প্রভৃতি নৃতাত্ত্বিক, জাতিতাত্ত্বিক, ভাষা, অঞ্চল, ভূখন্ড ও মাবাদভিত্তিক দল ও উপদলের দ্বন্দ্ব সংঘাতে কুচক্রী ইহূদীরা পিছন থেকে কলকাঠি নাড়ে এবং ঐক্যবদ্ধ মুসলিম শক্তির ঐক্যের মূলে কুঠারাঘাত করে। শী‘আ বনাম সুন্নী দ্বন্দ্ব কাজে লাগিয়ে বাগদাদের সুন্নী খলীফা মু‘তাছিম বিল্লাহর পতন ঘটানো হয় তার শী‘আ প্রধানমন্ত্রীর আল-কেমীর মাধ্যমে। উক্ত আলকেমী শী‘আ বুদ্ধিজীবী নাছিরুদ্দীন তূসী হালাকু খানের সাথে গোপন ষড়যন্ত্র করে আববাসীয় খেলাফত ধ্বংসের সহযোগীতা করে’।[14]
অথচ বর্তমানে নাছিরুদ্দীন তূসীকে ইসলামী ইতিহাসের একজন সফল বুদ্ধিজীবী হিসাবে স্মরণ করা হয়, যেখানে সে ছিল মূলত ইসলামী বিশ্বের সব চাইতে ভয়ংকর দুশমন ও ধ্বংসাত্মক শাসক হালাকু খানের উপদেষ্টা এবং মুসলিম নামধারী এক বিশ্বাসঘাতক। সে ছিল মূলত প্রসিদ্ধ শী‘আ দার্শনিক ও জ্যোতির্বিদ। সে তার সর্বশক্তি ব্যয় করতে থাকে ‘ফালসাফা’, মানতেক এবং গ্রিকদর্শনের হারানো ঐতিহ্যের পুনরুদ্ধারে। সে ইলমের জগতে মুসলমানদের এই পরিমাণ বিভ্রান্ত করতে সমর্থ হয়ে যে, ইরাক এবং খোরাসানে নিখাদ ইসলামী ইলম ও জ্ঞানচর্চা ও দুর্লভ হয়ে পড়ে এবং মানতিক ফালসাফার পঠন-পাঠন চালু হয়ে যায়। তার দুই শিষ্য কুতুবউদ্দীন সিরাজী এবং কুতুবউদ্দীন রাজী মানতিক, ইলমুল কালাম ও ফালসাফার চর্চায় নতুন গতি সঞ্চার করে। আর সেই প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে ইসলামী দুনিয়ার আলেমগণ নিজেদের বন্দী করে ফেলে দর্শন ও ফালসাফার ভয়ংকর ফাঁদে’।[15]
হিজরী পঞ্চম শতকে ইসলামের ভিত্তিমূলে ফাটল সৃষ্টির জন্য ‘বাতিনিয়াহ’ নামক একটি নতুন ফের্কার জন্ম হয়। এই দর্শনচিন্তার জনক ছিল (ইহূদী মদদপুষ্ট) ইসমাঈলী শী‘আ সম্প্রদায়। যারা মিশরে ‘ফাতেমী খেলাফত’ নামে আলাদা সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। তারা তাদের দর্শনচিন্তার প্রচারে ইসলামের প্রতিটি পরিভাষা ও তার অর্থ নিজেদের মত করে রং চড়িয়ে বিস্তৃত করতে থাকে। ইহূদী থেকে ধর্মান্তরিত হাসান ইবনু সাবাহ’র অনুসারী মুসলিম সেজে শী‘আদের সাথে মিশে গিয়ে বাতিল দর্শন ও চিন্তার প্রচার-প্রসারে ব্যাপৃত হয়। তারা শরী‘আতের প্রসিদ্ধ সব পরিভাষা ও অর্থ অস্বীকার করে হালাল-হারামের সীমারেখা মিটিয়ে দিয়ে জায়েয করে দেয় সব ধরনের কামনা ও প্রবৃত্তির পূজা। তারা ইসলামের নামে ইসলামের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক এক ধর্ম হাযির করে সমাজের সমানে। এর চেয়েও ভয়াবহ যে কাজটি তারা করে একদল খুনী তৈরী করে। গোপনে তাদের হাতে ইসলামের বড় বড় আলেমদের শহীদ করে দিতে থাকে। এই জঘন্য কাজের উদ্দেশ্য ছিল ইসলামী বিশ্বকে চরম মাত্রার ব্যক্তিত্ব ও আলেম খরায় ফেলে দেওয়া’।[16]
(ক্রমশঃ)
-ডা. মুহাম্মাদ সাইফুর রহমান
[1]. ড. মো. কামরুজ্জামান, বিশ্বকে শাসন করছে ইহূদীরা, দৈনিক ইনকিলাব, ১৭ই সেপ্টেম্বর-২০২২।
[2]. সূরা ত্বোয়াহা ২০/৮৮; মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল গালিব, নবীদের কাহিনী-২, ৭৫-৭৬ পৃ.।
[3]. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল গালিব, নবীদের কাহিনী-২, ১০১ পৃ.।
[4]. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, নবীদের কাহিনী-২, ১০১-১০২ পৃ.।
[5]. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, সীরাতুর রাসূল (ছাঃ), ৭১ পৃ.।
[6]. প্রাগুক্ত ৬৩৫-৬৩৬ পৃ.।
[7]. প্রাগুক্ত ৪১৯ পৃ.।
[8]. এস.এম নজরুল ইসলাম, সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতির সদরে-অন্দরে, ইতিহাস অন্বেষা প্রকাশনা ঢাকা, প্রথম প্রকাশ-২০১৪, পৃ-১৩৬।
[9]. ড. মুহাম্মাদ জামাল উদ্দিন, রিজাল শাস্ত্র ও জাল হাদীছের ইতিবৃত্ত, ইফাবা, ২য় সংস্করণ-২০০৫, পৃ. ১২৪।
[10]. সাজ্জাদ সালাদীন, প্রচলিত ভ্রান্ত মতবাদ, আত-তাওফীক প্রকাশনী, প্রথম প্রকাশ ২০২১ পৃ. ৩৫।
[11]. এম এম. এম নজরুল ইসলাম, সাম্রাজ্য-বাদী রাজনীতির সদরে- অন্দরে ২০ পৃ.।
[12]. ড. মুহাম্মাদ জামাল উদ্দিন, রিজাল শাস্ত্র ও জাল হাদীছের ইতিবৃত্ত, ১২৫ পৃ.।
[13]. ড. উমর মুহাম্মাদ খালিদ, বিশ্ব যেভাবে ইহূদীদের দখলে, অনুবাদ মুহাম্মাদ জহিরুল ইসলাম, ফিলহাল প্রকাশনী প্রথম প্রকাশ ২০২৪ পৃ. ২২।
[14]. এস. এম নজরুল ইসলাম, সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতির সদরে-অন্দরে, পৃ. ২০-২১।
[15]. মাওলানা ইসমাইল রেহান, বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত, আহমাদ সাবিবর অনূদিত, নাশাত পাবলিকেশন্স, প্রথম সংস্করণ মে, ২০২৩ পৃ. ৬১-৬২।
[16]. বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত, পৃ. ৫৯-৬০।